প্রথম পর্ব:

'স্যর, পঞ্চাননতলা, ফাঁসিতলা, দুদিকেই বিশাল জ্যাম। ব্রিজে গাড়ি তুলব কী করে?' প্রশ্নটা শুনে চটক ভাঙল অরিজিতের। ও হ্যাঁ! তাই তো! আজ তো কী সব মিটিঙ আছে। ওদিকে ট্যাক্সিড্রাইভার বোকার মতো তাকিয়ে আছে। তাকে স্যর অনিচ্ছা সত্তেও ইন্সট্রাকশন দিলেন, 'এক কাজ করো, শরৎ সদন দিয়ে গাড়ীটা ঘুরিয়ে নিয়ে কোর্টের পাশ বরাবর হয়ে রামকৃষ্ণপুর ঘাট হয়ে চলো।'
সাধারণতঃ এই র‍্যূটটা অরিজিৎ বরাবর এড়িয়ে চলেন আজ বছর পাঁচেক তো হলই। আজ আর কোনো উপায় নেই বলে যেতে হচ্ছে তাঁকে। গাড়িতে যাওয়ার সময় এসি গাড়ি হলেও কাচ নামিয়ে রাখেন, গাড়িটা যখন দেখলেন শরৎ সদনের দিকে ঢুকছে, হঠাতই সব কাচ তুলে দিয়ে এসি চালিয়ে দিলেন তিনি। গাড়ীটা বেশ। কাচগুলো কালো। তাই বাইরেটা দেখা যাচ্ছে না। এই অঞ্চলটা অরিজিতের হাতের তালুর মতো চেনা। তবু কাচটা তুলে দেওয়ায় স্বস্তি পেলেন তিনি। আর যাই হোক মনের মধ্যে সেই অসাধারণ বন্ধুত্বের, সম্পর্কের স্মৃতিটা মনের মধ্যে রোমন্থিত হলেও সেই পরিবেশটা না দেখতে হলে তাঁকে অতটাও কষ্ট পেতে হবে না। হাওড়া স্টেশনে এমনিতেই অনেক কষ্ট অপেক্ষা করছে, আর না। চোখ বন্ধ করে রামকৃষ্ণপুর ঘাট, রেলওয়ে মিউজিয়াম এসব জায়গাতে সেই প্রিয় মানুষটাকে পিক আপ করা, ড্রপ করে দেওয়া, কত বোকাবোকা প্রেমিকমার্কা ফিলোসফি বলে নিজেই হেসে ফেলা, সব মনে করতে লাগলেন অরিজিৎ। বা বলা ভাল মনে পড়তে লাগল তাঁর।
অরিজিৎ চ্যাটার্জী। যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে জন মিলটনের ওপর রিসার্চ ওয়ার্ক করে ইংলিশ ক্রিটিক জগতে এক কিংবদন্তী। পেশায় যাদবপুরেরই মাস্টার্স কোর্সের লেকচারার। বর্তমানে তিনি ফরাসী ফোনেটিকসের ওপর রিসার্চ করছেন, ফরাসী ভাষার প্রভাব ইংরেজি সাহিত্য এবং বাংলা সাহিত্যে ঠিক কতটা, সেটা নিয়েই তাঁর কাজ। অবশ্য এ কাজে তাঁর সহকারী আছে। বা বলা ভালো তিনি তাঁর এক ছাত্রের পথপ্রদর্শক এই কাজে। অর্ক খুব ব্রাইট স্টুডেন্ট। সাধারণতঃ অরিজিৎ কাউকে কোনো রিসার্চ ওয়ার্কে গাইড করেননা। কিন্তু একে করছেন। ছেলেটার পরিশ্রমের ওপর কীরকম মায়া পড়ে যাওয়ায় অর্কের অনুরোধটা তিনি ফিরিয়ে দেন নি। কিন্তু এত ব্যস্ত মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তিনি খুব একটা কারুর সঙ্গে মেশেন না। আজ চোখ বন্ধ করে তিনি এরকম পালটে যাওয়ার কারণটা ভাবছিলেন। সত্যিই এরকম হতে পারে? ব্যাপারটা তো তাঁর কলেজ জীবনের প্রথম দিকের ঘটনা! ব্যাপারটা যে তাঁর মধ্যে এভাবে দাগ ফেলবে তিনি ভাবতে পারেননি। যে জন্যে তিনি যেসব জায়গার সঙ্গে তাঁর সেই কষ্টকর স্মৃতি জড়িয়েছিল, সেই জায়গাগুলোকে আজও তিনি এড়িয়ে চলেন। এমনকি অর্কর সঙ্গে ফীল্ডওয়ার্কে কাজ করার সময়ও তিনি সযত্নে এড়িয়ে গেছেন। সাধারণতঃ কোনো বড় অ্যাসাইনমেন্ট থাকলে গাইডরা সঙ্গে থাকেন স্টুডেন্টের বা খুব বাজে পরিস্থিতি হলে গাইডরা নিজেরাই ক্রেডিট নিয়ে নেন কাজটা সফল করার। কিন্তু এক্ষেত্রে সেটা ঘটেনি।
অর্ক একদিন হঠাতই তাঁর অফিসে এসে বলেছিল, 'স্যর এক ভদ্রলোকের সন্ধান পেয়েছি। ক্রুশিয়াল লীড দিতে পারবেন তিনি। যাবেন?' লাফিয়ে উঠেছিলেন অরিজিৎ। কোথায় থাকেন সেই ভদ্রলোক, কিছু না জিজ্ঞাস করেই বেরিয়ে পড়েছিলেন অর্কের ঠিক করে রাখা ট্যাক্সিতে। গড়ী যখন রাসেল স্ট্রীটে ঢুকছে, তখন অরিজিতের প্রশ্নে অর্কে জবাব দেয় তাঁর বাড়ি পার্ক স্ট্রীটের গোরস্থানের পাশে। অরিজিৎ আর যেতে চাননি। ট্যাক্সি থেকে নেমে, অর্ককে কী কী প্রশ্ন করতে হবে বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ী ফিরে গেছিলেন। অর্ক বোকার মতো তাকিয়েছিল। ব্যাপারট থেকে সত্যিই একটা ক্রুশিয়াল লীড পাওয়া গেছিল। অর্ক কাল অফিসে এসে বলেছিল চন্দননগর যেতে হবে। শুনেই অরিজিতের মুখটা কেমন থমথমে হয়ে যায়। তারপরেই তিনি বলেন, 'ফরাসডাঙা তো যেতেই হবে। বাংলায় ফ্রেঞ্চের এফেক্ট তো ওখানেই বেশি। কিন্তু ওখানে গিয়ে কার সঙ্গে যোগাযোগ করবে?'
'স্যর সেসব হয়ে যবে। আপনি যাবেন তো? আমি আজই যাচ্ছি। আপনি কাল এলেও হবে।'
মাথার মধ্যে আবছা হয়ে আসা কিছু কথা, কিছু স্মৃতি ফুটে ঊঠছিল অরিজিতের। তবু তিনি রাজী হলেন।
'ঠিক আছে স্যর। বিকেল চারটে চল্লিশে হাওড়া স্টেশন থেকে বিশ্বভারতী প্যাসেঞ্জার ছাড়ে। ওটাতে চলে আসুন। তাড়াতাড়ী হবে।।'
চারটে চল্লিশ? বিশ্বভারতী? অরিজিতের মনে পড়ে যায় প্রিয় মানুষটার তাড়াহুড়ো এই ট্রেনটার জন্যে। হঠাত করে যে কী হয়ে গেল!
'স্যর, যাবেন তো?'
'অ্যাঁ? হ্যাঁ, যাবো। তুমি স্টেশনে থেকো।'
'শিওর স্যর।'
এসব ভাবতে ভাবতেই কখন হাওড়া এসে যায়। যথারীতি অ্যারাইভাল ডিপার্চার স্ক্রীন দেখেন অরিজিৎ। নাঃ, টাইম শুধু না, প্ল্যাটফর্মটাও পালটায় নি। সেই দশ নম্বর। মনের মধ্যে আবার ভীড় করতে থাকে সেই 'প্ল্যাটিনাম ভ্যালুড' কয়েকটা মাসের স্মৃতি। ভাবতে ভাবতেই কখন পৌঁছে গেলেন তিনি চন্দননগর। অর্ক ছিল স্টেশনে। আর চন্দননগরের ফটকগোড়া? সে তো মেমোরির ডিপো। তাই স্টেশনে নেমে থেকেই তিনি একটু চুপচাপ ছিলেন। অর্ক অনেক কিছু বলছিল, কানে ঢুকছিল না অরিজিতের। হঠাৎই সামান্য দূরে একজনকে দেখে অরিজিৎ অবাক হয়েই ডেকে উঠলেন, 'প্রশান্তকাকু!'

(ক্রমশঃ)

© দীপ্তজিৎ মিশ্র

সময়টা চারটে চল্লিশ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments