শুক্রবার সকাল সাড়ে ন'টা-দশটা নাগাদ একটি মোবাইলে একটি ফোন এল। তারপর থেকেই আমার প্রাথমিক ঘাঁটা ভাবটা শুরু হয়েছিল। ঠিক ছিল সকালবেলা কিছুটা সময়ের জন্যে অফিসে ঢুঁ মেরে আমায় কলকাতা থেকে বেরিয়ে অন্য একটি জেলায় যেতে হবে। অতএব একটু তাড়াহুড়ো ছিল। তার মধ্যে ওই ফোন। এই অবস্থায় যা হয় আর কি – অফিসে পৌঁছে আবার আরেকপ্রস্থ ঘেঁটে গেলাম। আর যেহেতু জীবন আসলে পাকস্থলীতে বাঁধা অতএব এই ঘাঁটাটাকে তো অন স্পট ঠিক করতেই হবে। বসের উল্টোদিকের চেয়ারে বসে কি করে অবস্থা সামাল দেওয়া যায় ভাবছি এমন সময় ফোন একটি অচেনা নাম্বার থেকে। প্রথমে উপেক্ষা করলেও আবার ফোন বেজে উঠতেই বস আমাকে জানালেন সিচুয়েশন ঠিক অত ক্রিটিকাল নয় অতএব আমি স্বচ্ছন্দে কথা বলে আসতে পারি। বসের চেম্বার থেকে বেরিয়ে ফোন ধরতেই এক মহিলা কন্ঠ

- হ্যালো,

- আপনি কি হস্তিমুর্খ কথা বলছেন

- স্পিকিং (আমি রেগে গেলে ইংরিজি বলি)

- আমি অমুক,ফোটোগ্রাফার

আর নিজেকে সামলে রাখা অসম্ভব হল। মেজাজটা তড়াক করে চড়ে গেল। অনেক রকম শুনেছি,ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট,ইনসিওরেন্স,বাড়ি,গাড়ি,বেড়াতে যাওয়া মায় কলকাতা শহরেই হোটেলে রাত কাটানো কিন্তু ফোটোগ্রাফার !! এটাও বুঝতে ব্যর্থ হলাম যে আমি কোনও অনুষ্ঠানবাড়ি ভাড়া করিনি, সম্প্রতি কোথাও বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই, একঝলক ভাবতে চেষ্টা করলাম আশেপাশে আমার বা আমার পরিবারের কারও জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী আছে কিনা। সাথে সাথেই মনে পড়ল বাড়িতে কেউ গরমকালে পৃথিবীর মুখও দেখেনি, বিয়েও করেনি। নাহ,মনে পড়ল না। আর মনে পড়েই বা কি হবে ? এইসব মাথায় ঢুকে ততক্ষণে মাথাটা আরও বেশি গরম হয়ে গেছে। প্রথম রিঅ্যাকশন 'আপনি ফোটোগ্রাফার,তাতে আমার কি'-টা মুখ দিয়ে বের হতে গিয়েও যে কিভাবে আটকে গেল কে জানে। কিন্তু মেজাজটা চাপতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। জিজ্ঞেস করলাম – কে বলছেন? অপরপ্রান্ত পরিষ্কার টের পেল ব্যাপারটা। আবার নাম বললেন। নামটা আমার সামনে স্পষ্ট হয়ে রূপ নেওয়ার সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে মনে হল নামটা যেন শুনেছি কোথাও। এবারে একটু নম্র স্বরে আবার নাম জানতে চাইলাম। বললেন। এতক্ষণে মনে পড়ল,সঙ্গে এও বুঝলাম ফোটোগ্রাফির সাথে তাঁর সম্পর্ক। একটি অনুষ্ঠানে ছবি তোলার কথা তাঁর, আমি নিজেই যে অনুষ্ঠানের একজন হর্তাকর্তা।

আমার উচিৎ ছিল ক্ষমা চাওয়া কিন্তু স্রেফ ভুলে গিয়ে জানতে চাইলাম ফোন করার উদ্দেশ্য। অনুষ্ঠান কখন শুরু হবে এই নিরীহ প্রশ্নটির উত্তর জানতে আমাকে ফোন করেছেন কারণ বহু চেষ্টা করেও যিনি যোগাযোগ করেছিলেন তাঁর সাথে যে কোনও কারণেই হোক উনি কথা বলতে ব্যর্থ হয়েছেন। এবারে আমিও অত্যন্ত সতর্কভাবে জানতে চাইলাম উনি আমার নাম্বার পেলেন কোথায়। নাম জেনে ধরে প্রাণ এল কারণ যাঁর থেকে আমার নাম্বার জেনেছেন তাঁর সাথে অনুষ্ঠানের সেরকম কোনও সম্পর্ক নেই। যাক,ভদ্রমহিলাকে এবারে বলেই দেওয়া যায় যে আমিও সঠিক জানি না। বললাম,সঙ্গে এ-ও জানিয়ে দিলাম যে কে বা কে কে তাঁকে সাহায্য করতে পারেন।

আবার দেখা হল অনুষ্ঠানের দিন বিকেলে। দেখেই চিনেছি ইনিই তিনি। আবার ক্ষমা চাইতে ভুলে গিয়ে ওপরে লেখা গল্পটা বললাম। আর শুনলাম আমার নাম্বার জোগাড় করতে কি পরিমাণ গোয়েন্দাগিরি ওঁকে করতে হয়েছিল।

সর্পতে রজ্জু ভ্রম
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments