- বুঝলেন মশাই, এই এসপ্ল্যানেড চত্বরটা আমি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি।
- কি করে সম্ভব? আপনার অফিস তো পার্ক স্ট্রীটে। এসপ্ল্যানেড এড়িয়ে চলবেন কি করে?
- আরে অফিস থেকে দু পা হেঁটেই মেট্রো স্টেশন। কাজেই এসপ্ল্যানেড আসার দরকার পড়ে না।
হোটেল ফেয়ারলনের বারান্দায় বসে মেসেঞ্জারে গল্প চলছিল টালিগঞ্জের মোনিকা মিত্রর সাথে। বছর দুই পর কলকাতা এসেছে সুদীপ্ত, তবে অফিসের কাজে। দিল্লিতে বসে হোটেল খুঁজতে গিয়ে ফেয়ারলনে জায়গা পেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল। অনেক বছর ধরে কলকাতা আসার আগে এই হোটেলে ঘর খুঁজেছে। আগের মালকিন বুড়ি মেম বোধ হয় বিলিতি লোকজন ছাড়া কারোকে হোটেলে থাকতে দেওয়ার আগে তার পে-ডিগ্রি দেখতেন। এই হোটেলে জায়গা না পেয়ে এসপ্ল্যানেডের অন্য কোন হোটেলে থাকতো। আসলে এই এসপ্ল্যানেড এলাকার বাইরের কলকাতাটা সুদীপ্তর কাছে অস্তিত্বহীন। এসপ্ল্যানেডের মাদকতা আর কোথাও পায় নি।
- আরে চুপ করে গেলেন যে! মোনিকার কথায় বর্তমানে ফিরে এলো।
- আসলে বোঝার চেষ্টা করছিলাম এসপ্ল্যানেডে আপনার অ্যালার্জি কেন।
আমি তো এই জায়গাটার টানেই কলকাতা আসতে চাই।
- ধুর মশাই, আপনার মাথায় ছিট আছে ভালো মতন; এটা বুঝতে পারি। পাগলের মত ওই চত্তরে কেন যে ঘুরে বেড়ান কে জানে।
এসপ্ল্যানেড নিয়ে মফস্বলের ছেলে সুদীপ্তর পাগলামিটা সেই কলেজ-জীবন থেকে। প্রায়ই বিকেলের পর এই অঞ্চলের অলিগলি চষে বেড়াতো। সাদার স্ট্রীটের হোটেলগুলো থেকে তখন সাহেবদের বেরোতে দেখত। গলির দু’পাশে ল্যাম্পপোস্টের নীচে বসে থাকত ড্রাগ পেডলার বা মাদকের কারবারি রফিক, সাদিকেরা। হয়ত আরও অনেক কিছুর দালালেরাও থাকতো। এবার এসে আর ও রকম লোকজন দেখছে না। হয়তো আছে তারা, সুদীপ্ত তাদের চিনতে পারছে না। সময় এবং জীবন মানুষের দেখার চোখও বদলে দেয়।
- কি হল, জবাব দিলেন না যে। আবার মেসেজ এলো।
-কি বলব খুঁজে বেড়াচ্ছি। আসলে আমিও জানি না কেন এই জায়গাটার উপর এত টান আমার।
- সে কি নিজেই জানেন না!
- এখানকার মত এত বিচিত্র ধরণের মানুষ আমি কোথাও দেখি নি। জানেন একসময় কার্জন পার্কে বসে একদল লোক সারাদিন কন্ট্রাক্ট ব্রিজ খেলত। তাদের মধ্যে বড়বাজারের ব্যবসায়ী গুপ্তাজিও ছিল, আবার রাইটার্সে চাকরি করা কমরেড মোল্লাও ছিল। মস্তান নাম-ওয়ালা এক ভবঘুরে ভিখারিও থ্রি হার্টস, ফোর নো ট্রাম্প হাঁক দিত।
- ওদের কাজ নেই, তাই ওসব খেলত।
- ম্যাডাম, আপনাকে তো জেহাঙ্গিরের কথা বলেছি। পার্সি জেহাঙ্গির প্রতিদিন বিকাল থেকে রাত ন’টা পর্যন্ত ধর্মতলা থেকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল পর্যন্ত ঘুরে বেড়াত।
- হ্যাঁ, আপনার কাছে আগে শুনেছি।
- ওকে খোঁজার জন্যই হয়তো কলকাতা আসি বারবার। কেউ খবর দিতে পারে না। হয়ত আর বেঁচে নেই। হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল সুদীপ্ত।
- দেখুন মশাই, এ’সব লোকের কোন প্রয়োজন নেই সমাজে। এরা পরজীবী।
- ঠিকই বলেছেন ম্যাডাম। ইন্ডিয়ান পার্লামেন্টের বাইরে এত পরজীবী আর কোথাও পাবেন না। কিন্তু আপনি কলকাতার লোক হয়ে এসপ্ল্যানেডকে কেন এড়িয়ে চলেন? আপনি তো মেমসাহেব, এসপ্ল্যানেড সাহেবদের হাতেই তৈরি।
- আমি আবার মেমসাহেব হলাম কি করে!
- কেন? আপনি তো আপনার নামের বানানে নিজেকে বাঙালী মনিকা থেকে আমেরিকান মোনিকা করে নিয়েছেন।
- আপনি পারেন! শুনুন কেন অফিসের পর পার্ক স্ট্রীট থেকে ধর্মতলার দিকে যাই না।
- বলুন। হুইস্কির গ্লাসটা শেষ করে সুদীপ্ত বলল।
ওয়েটার সিরাজকে ডেকে আরেকটা পেগ আনার কথা বলে দেখল যে মোনিকার পরের মেসেজ এসে গেছে।
- মিউজিয়ামের সামনে পৌঁছতেই কিছু ছোকরা পিছু নেয় ম্যাডাম যাবেন?
আসলে ওখানে শরীর ব্যবসায়িনীদের এত ভিড় হয় যে একলা মহিলার দেখা পেলেই সবাই ওই দলের ভাবে। কতটা অস্বস্তিকর আর অপমানজনক বলুন তো।
- কি বলছেন ম্যাডাম! আট আর নয়ের দশকের এসপ্ল্যানেডে তো দুপুরের পর থেকে এদের রমরমা চলতো। আজকাল নজরে পরে না সে রকম।
- না না, তা না হলে লোকজন এভাবে পিছনে লাগে কেন?
এরপর হুইস্কির সাথে একটা চিকেন স্যান্ডউইচেরও অর্ডার দিল সুদীপ্ত। আজ আর বাইরে যেতে ইচ্ছে গেল না। গতকাল রাতে আমিনিয়ায় খেয়েছিল, অনেকদিন এত বাজে খাওয়া জোটে নি।তারপর সাদার স্ট্রীটে বাংলাদেশীদের ভিড়ে খানিকক্ষণ ঘুরে হোটেলে ফিরেছিল। এই রাস্তায় ফেয়ারলন ছাড়া বাকি সব হোটেলে কলকাতায় ডাক্তার দেখাতে আর বাজার করতে আসা বাংলাদেশীরা থাকে। রাস্তাটার অবস্থা মিনি বাংলাদেশ। এখন আর ফেয়ারলনের বাইরে সাদা চামড়াদের কমই দেখা যায়।
- hey man, still you are sitting here? কথাগুলো শুনে চোখ তুলে দেখল কাল হোটেলেই আলাপ হওয়া সারা জোন্স ওর দিকে এগিয়ে আসছে।
সারা এসে ওর পাশেই একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। ইংল্যান্ডের মেয়ে সারা ট্রাভেল বিজনেসে আছে। গত পনের বছর ধরে এই দেশে আসে। কাল বলছিল যে প্রতি বছর নাকি দিন দশ পনেরো এই হোটেলে কাটায়।
- আচ্ছা সারা, তুমি এই হোটেলে প্রতি বছর আসো কেন? সিগারেটের প্যাকেটটা সারার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সুদীপ্ত বলল।
- জানি না কেন এত ভালো লাগে। হয়তো দু’শো বছরের পুরনো বাড়িটা, তার অ্যান্টিক ফার্নিচার, ইংলিশ ব্রেকফাস্ট আমাদের পাস্ট ব্রিটিশ গৌরবকে মনে পড়ায়। হয়ত এখানকার কর্মচারীদের হ্যাঁ হুজুর আচরণ আমাকে টেনে আনে। আসলে আমার মধ্যে ফিউডাল রক্ত আছে।
- আমাদের সবার মধ্যেই খানিক ফিউডালিজমের বীজ আছে। সুযোগ পেলেই সেগুলো মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।
- ঠিকই বলেছ। সারা দেওয়ালে ঝোলানো শশী কাপুরের ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল।
- তুমি অনেক ড্রিঙ্ক করেছ; আর এখানে নয়; চলো আমার ঘরে। সুদীপ্তকে হাত ধরে তুলে সারা নিজের ঘরের দিকে টেনে নিয়ে গেল। ঘরের দরজা বন্ধ করতে করতে সারা বলল, আমি এই ঘরের ফিউডাল প্রভু। আমার হুকুম তামিল করো।
পরদিন সকালে সারার ডাকে ঘুম থেকে উঠে তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে গেল। তৈরি হয়ে নিতে হবে। ন’টার সময় মিটিং আছে যাদবপুরে।
ট্যাক্সিতে বসার পর ফোন এলো রনিতার, ফেসবুকেরই বন্ধু।
- কি রে, কলকাতা এসেছিস, জানাস নি! তোর পোস্ট করা ছবি দেখে জানলাম। এবার,দেখা করবই তোর সাথে।
এই এক পাকা মেয়ে। বছর দশেকের ছোট হয়েও তুইতোকারি করে সুদীপ্তকে। অনেকবার কথা হয়েছে, কিন্তু মুখোমুখি হয় নি কখনো। মাঝেমাঝেই রনিতা বলে, তোর মতো এক অদ্ভুত চরিত্রকে সামনে থেকে দেখার ইচ্ছে খুব।
- কাল বিকেলের ফ্লাইটে দিল্লি ফিরব। আজ সন্ধ্যেতে কোথাও বসে আড্ডা দিই।
- না না,ওই হোটেলটা দেখতে চাই। দিনের বেলা কোন একটা সময় বল।
- আরে বাবা, কোম্পানির কাজে এসেছি। দিনের বেলা ব্যস্ত। আজ সন্ধ্যেতে চলে আয়।
- ঠিক আছে তুই আমাকে মিউজিয়ামের সামনে থেকে নিয়ে যাস।
ওই জায়গাটায় গেলেই জিগোলোরা বড্ড পিছন নেয়। ভাবে একা মেয়ে মানেই ওদের খদ্দের।
ফোনে কথা ফুরলে সুদীপ্ত মেসেজ করল মোনিকা মিত্রকে, “ ম্যাডাম, মিউজিয়ামের সামনে যারা আপনার পিছু নেয় তারা বিছানার খাবার খোঁজে না। নিজেদের পেটের খাবার জোগাড় করতে মহিলাদের কাছে খাবার হিসেবে নিজেদের বেচতে আসে।”

সাদার স্ট্রীট
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments