সময়টা শীত কালই ছিল, ২০০০ এর শেষ, একে সালতামামি তারপর আবার নতুন সহস্রাব্দ। সহর জুড়ে উজ্জাপনের তোড়জোড় চলছে পুরোদমে। জানুয়ারির ১ আর ২ তারিখ শনি আর রোববার পড়ে যাওয়াতে আরও পোয়া বারো। যাই হোক,বিজয়ার পরে বড়দের নিয়ম মেনে প্রনাম না করলেও,বর্ষ শেষে পুরনো পাপীজনদের কে ফোন করতাম, জানার জন্য তাদের কে, কি স্কিম কষছে। তখন মোবাইল-এর চল শহরেই কম আর মফস্বলে কর্ডলেস ফোন থাকাটাই হাল ফ্যাশনের ব্যাপার। তাই ল্যান্ডলাইন বা অফিস-এর নম্বর এ অনেক কষ্টে জনগনকে ধরতে হত। আমাদের পাপী চূড়ামণি ছিল 'বেচুদা ', যে জীবনের অনেক কিছু হয়ে ওঠার বাম্পার লক্ষ্য গুলো কে একে একে নিজের হাতে murder করে শেষ মেষ নিজের ডাকনামটা কে স্বার্থক করতে পেরেছিল । কি বেচেনি লোকটা? মাথার তেল থেকে পায়ের হাজার ওষুধ। ডাইরেক্ট সেল, পুস সেল, চ্যানেল সেল, কনসেপ্ট সেল এমনকি মায় চৈত্র সেলও বাদ যায়েনি তার লিস্ট থেকে। তা প্রত্যেক মাসের শেষেই বেচুদা হেভি টার্গেট এর চাপে কুঁকড়ে যেত আর বছরের শেষে সেটা অষ্টবক্র অবতার নিত । বস এর ধ্যাতানি খেয়ে ২৫এ ডিসেম্বর বৌদি ও মেয়েকে বহরমপুরে মানে বৌদির বাপের বাড়িতে গ্যারেজ করে শেষ কটা দিন ইনসেনটিভের মায়ায় পাগলা কুত্তার মত দৌড়ে বেড়াত।
অবশেষে ৩১ তারিখ সন্ধে বেলায়ে বেচুদার দু কামরার ছোট্ট ফ্ল্যাটে আমরা ৩-৪ জন একত্রিত হতাম ও রাতভর মোচ্ছবের চোটে জায়েগাটাকে নরক গুলজার করে সকাল বেলায়ে বৌদি ফিরে আসার আগে কেটে পরতাম।
যথারীতি এবারও ২৬ বা ২৭ ডিসেম্বর নাগাদ বেচুদাকে অফিস এ ফোন করলাম, "কাকা, এবার কে কে থাকছে পার্টি তে?"
ওদিক থেকে একটা অদ্ভূত উত্তর এলো,"মর্নিং স্যার, আপনার ডেলিভারিটা নিয়েই মিটিং চলছে , চিন্তা করবেন না পরশুর মধ্যে হয়ে যাবে। "
ভাবলাম বুঝি রং নম্বর, তাই বললাম "আপনি কি সৌরেন মন্ডল কথা বলছেন?"
আবার ওদিক থেকে ভুল ভাল জবাব, "না স্যার বলছি তো আপনার চাপ মানে আমার ডবল চাপ, টেনসন করবেন না , Merry Christmas and happy new year in advance " বলে খট করে ফোন কেটে দিল। বুঝলাম হয় বস সামনে আছে আর না হলে আধ মন সিদ্ধি ভাঙ খেয়ে নেশা করেছে। এর মাঝে আমিও কাজের চাপে ব্যস্ত হয়ে পরায় আর যোগাযোগ করা হয়নি। বেচুদাই ৩১ তারিখ দুপুর বেলা আমাকে অফিসে ফোন করলো ,"কিরে পাগলা ,আসছিস তো সন্ধেবেলা?"
এমনিতেই খেপে ছিলাম ওরকম একটা ঘটনা হবার পর তাই একটু অভিমান করেই বললাম , "না রাজভবনে নেমন্তন্ন আছে, সিঙ্গেল মল্ট খেতে যাব। "
মনের ভাব বুঝেই সুর পাল্টে ফেলল দাদা, "যাঃ , ওইদিনের ব্যাপারটা মাইন্ড করিস না, বরাহনন্দন বসটা কে প্রক্সি দিছিলাম, যাক বিকেল চারটের মধ্যে ফ্রি হয়ে নে , তোকে অফিস থেকে বাইকে তুলে নিচ্ছি। "
রাস্তায়ে যেতে যেতেই জিগ্গেস করলাম বাকিদের কথা, তাতে বেচুদা বলল, "তুই ছাড়া তো এ চত্তরে কেউ যোগাযোগ করলো না, millenium end বলে কথা, দেখ কোনো ডীস্কো থেকের পাস জুটিয়েছে সবাই , আমার আবার ওসব ভিড় ভাট্টা পোষায়ে না."
বাড়িতে পৌছে বেচুদা আমাকে নিচে দাড়াতে বলে নিজে ওপরে চলে গেল ও কিছুক্ষণ পর দুটো পেল্লায়ে সাইজের বস্তা টানতে টানতে নিয়ে এলো, একটাতে কেজি তিরিশের পুরনো খবর কাগজ, পূজাবার্ষিকী ইত্যাদি আর অন্যটাতে গোটা পঞ্চাশেক হরেক রকমের মদ ও বিয়ারের বোতল।
"নে একটা ধর , এই বছরের পাপ, বছরের শেষেই মিটিয়ে ফেলি নাহলে তোর বৌদির সাথে বছরের প্রথম দিনেই কিচাইন লাগবে।"
ভাঙ্গা বোতল ও কাগজ বিক্রির জনৈক দোকান অব্দি যেতে পাড়ার রিক্সা ৮ টাকা ভাড়া চাওয়াতে, বেচুদা ক্ষেপে রিক্সাওয়ালা কে বলল ,"বেশ তাহলে তুমি আমায়ে ৫ টাকা দাও, আর বস্তা দুটো ধরে বস, আমি চালিয়ে নিয়ে যাই। " যাই হোক ৬ টাকায়ে ভাড়া রফা হলো। কাগজ বোতল বেচা হলো, বেচুদা নিক্তি মেপে পয়সা নিল, ওল্ড মঙ্ক রামের পাইন্ট ও নিব কেনা হলো , ছোলাভাজা চাট ও রাতে রুটি ডিমের কষা। এবার ব্যাপারটা একটু গোলমেলে ঠেকলো, বেচুদার বাড়ি সালতামামি পার্টিতে কিনা পিটার স্কট বা বাকার্ডি নেই, দেশী মুরগির ঝোল বা সামি কাবাবের জায়েগায়ে ছোলা আর ডিম !! দু পেগ পেটে পড়তেই ব্যাপারটা খোলসা হলো, সিগারেটে টান দিয়ে সে বলল ,"চাকরিটা আজ ছেড়েই দিলাম বুঝলি! " আমি চমকালেও,একটু সামলে নিয়ে বললাম , "বেশ করেছ, ওই বালের চাকরি , আবার জুটবে খন। তুমি বরঞ্চ হপ্তাখানেকের জন্যে বৌদি আর মেয়েকে নিয়ে কাছাকাছি কোথাও একটা বেরিয়ে এস।"
বেচুদার সেই জমাটি মুড তো দুরে থাক, আরো যেন মুষড়ে পড়ল, "তোদের আর কি, তোরা হলি কুলি, ট্রেন ঢুকবে এই মাল তুলবি আর ওই মাল কামাবি। শালা আমাদের মত গাধাকে ঘোড়া সাজিয়ে বেচে ফিরতে তো হয় না। "
আগের বার বারোটার সময় আমি ,বাঘা আর অর্ক ছাদে বাজি ফাটানো দেখতে উঠে ছিলাম। বেচুদা টলমল টলমল করে চাট সাপ্লাই দিচ্ছিল। পাশের ফ্ল্যাট-এ কে মারা যাওয়াতে ওদের অসৌচ চলছিল আর তাদের প্রচুর মাছ মাংস বেচুদার ফ্রিজে ঠাসা ছিল। বেচুদা সেই মাছের কাটলেট ভাজতে ভাজতে বলেছিল ," শালা কারো সব্বনাশে যে এরকম পৌষ হবে কে জানত..খা খা, এর পর পোলাও আর কষা মাংস !!" আমরা সমস্বরে চিত্কার করে উঠেছিলাম, "জিও মামা , তামাম সালের তামামি হচ্ছে বটে !! "
এইবার সাড়ে দশটায়ে বেচুদা ফুল আউট। বস আর কোম্পানি কে "বেইমান", "বেআক্কেল " দিয়ে শুরু করে শেষে 'ব' আদ্যাক্ষর যুক্ত গোটা দশেক কাঁচা খিস্তি দিতে দিতে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি খানিকক্ষণ জেগে ছিলাম যদি বমি টমি করে, অবশেষে আমিও নিজের অজান্তে ঘুমিয়ে পরি।
সকালে ঘুম ভাঙ্গলো বৌদির গলার আওয়াজে। বেচুদা ঘরে চা নিয়ে ঢুকে বলল , "শোন না, হাজার দুএক ধার দিস , ফুল সেটেলমেন্ট হতে হতে ১০-১৫ তারিখ হয়ে যাবে, তখন ফেরত নিস খন।"
আমি বললাম , "চাপ নিও না , যত লাগবে বোলো আর বৌদিকে এখনই কিছু জানিওনা।"
বেচুদা একটু হেসেই বলল, "উঃ ,ঘরে ঢুকতে না ঢুকতে ইনসেনটিভের হিসেব চাইছে, সময় মত বম ফেলবো দাড়া । "
আমি উঠে বললাম, "সিগারেট ফুরিয়ে গেছে ,দাড়াও কিনে নিয়ে আসি। "
বৌদি দেখেই বলল, " happy new year, এবার বাকিরা কোথায়ে?"
"happy new year বৌদি , বাকিরা গার্ল ফ্রেন্ড দের সাথে ছিল বোধ হয়। "
বৌদি হেসে বলল, "যাঃ, তাড়াতাড়ি তুমিও একটা জোটাও, বছর তো ঘুরে গেল !!"
আমি কোনরকমে চটি গলিয়ে ATM এর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

সালতামামি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments