বিদেশে সবাই নিজের কাজের জায়গা থেকে একটু দূরেই থাকতে ভালোবাসে।ওদের রাস্তাঘাট কিংবা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট গড়পড়তায় এতটাই ভালো যে মাইলের পর মাইল চললেও ক্লান্তি আসেনা। দিনে শেষে ওরা বরঞ্চ এই জার্নিটাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে। আমাদের দেশের বড় শহরগুলোতেও অবশ্য এই একই ট্রেন্ড অনেকদিন ধরে দেখা দিয়েছে। বিপ্লব মুখার্জী খুব অল্প বয়সেই এক নামি দামি বিদেশী কোম্পানির জোনাল ম্যানেজার হয়ে যেতেই তার স্ত্রীও ওইরকম এক ট্রেন্ডি ফরেনমার্কা আবদার করলো, শহরের বাইরে প্রকৃতির কোলে একটি ৩ কামরাওয়ালা বাসগৃহ তার চাই। একমাত্র পুত্র বুবুন এখন নরেন্দ্রপুর হোস্টেলে থেকে পড়ছে তাই পরিবার বলতে শুধু মিঞা আর বিবি। বিপ্লব কাজের জন্য মাসে দু সপ্তাহ প্রায় টুরেই থাকে। একা একা শহরতলীর ছোট্ট দু কামরার ফ্ল্যাটে মিতার দম বন্ধ হয়ে আসে। আর আসে পাশে লোকেদের যা গাঁইয়া কাল্চার তাতে তাদের সাথে ভাব জমিয়ে বসে বোকা বোকা বিষয় নিয়ে পিএনপিসি করাটা মিতার এক্কেবারে ধাতে সয়না। বিপ্লব ওকে স্কুলে চাকরি করার কথা বলেওছিলো, মিতা কয়েক মাস করেওছিলো কিন্তু মিতার ওই সাত সকালে উঠে কাজের লোক না আসলে নিজে বাসন মেজে টিফিন বানিয়ে অটোয় করে মেট্রো ধরতে যাওয়াটা একদমই পোষায়নি। অগত্যা বিপ্লব স্ত্রীর কথা মেনেই শহরের অন্যপ্রান্তে একটা ৩ বিএইচকে এপার্টমেন্ট বুক করেই ফেললো। গরমের ছুটিতে বাড়ি এসে বুবুন জানলো যে এবার ওরা কমপ্লেক্সে শিফ্ট করছে। নতুন বাড়ি দেখতে যাওয়ার পথে সামনের সিটে বসে থাকা বুবুন বাবাকে জিজ্ঞেস করলো , ” বাবা, এগুলোকে কমপ্লেক্স বলে কেন?” স্টিয়ারিং থেকে বা হাত তুলে ছেলের মাথায় একটু বুলিয়ে দিয়ে সে বললো , ” এই ফ্ল্যাটগুলো অনেক বড় আর অনেকগুলো একসাথে তৈরী করা তাই কমপ্লেক্স বলে। ” ছেলের পরের প্রশ্ন, ” তার মানে আমরা এখন যেখানে থাকি সেটা কি সিম্পল ? “পেছন থেকে মিতা ছেলেকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বললো ,” বুবুন কতবার না বলেছি বাবাকে গাড়ি চালানোর সময় বিরক্ত করবেনা ‼” যাই হোক স্ত্রী পুত্রের দুজনেরই খুব পছন্দ হলো নতুন বাসাটি। বিশাল লন , সুইমিং পুল , জিম , কমিউনিটি হল , ডিপার্টমেন্টাল স্টোর কি নেই এ কমপ্লেক্সে। মাস্টার বেডরুমের সাথে লাগোয়া বড় ব্যালকনি দেখেই মিতা জানালো এখানে সে টবের বাগান করবে। বুবুন ইতিমধ্যে এদিক সেদিক ঘুরে এসে রিপোর্ট দিলো যে অলরেডি নাকি প্রত্যেকটা ফ্লোরে দু তিনটে করে ফ্যামিলি এসে গেছে আর সামনের লনে অনেক বাচ্চাই ক্রিকেট ও ব্যাডমিন্টন খেলছে। পুরোনো ফ্ল্যাটটা ভাড়া দেওয়াও হয়ে গেলো তাড়াতাড়ি। ব্যাস এখন শুধু মালপত্তর শিফটিংয়ের অপেক্ষা।
শুরুর দিকে টুকি টাকি অসুবিধে হলেও মাসখানেকের মধ্যেই সব কিছু সেটল করে গেলো। গরমের ছুটির শেষে বুবুন হোস্টেল ফিরে গেলে পরেও মিতার আর সেরকম একা একা লাগেনা। সোসাইটির বাকি লোকজনদের সাথে বেশ আলাপ জমলো আস্তে আস্তে। এদের মধ্যে ওই মফস্বলী কুটকাচালিপনাটা একদম নেই। পরোনিন্দে করাটাও এখানে একটা মুন্সিয়ানার ব্যাপার। মোটের ওপর এই ক্লাসি ব্যাপারগুলোর সাথে মিতার মানিয়ে গুছিয়ে নিতে বেশি বেগ পেতে হলোনা। আজ মিসেস রায়ের বাড়িতে কিটটি তো কাল মিসেস আগারওয়ালদের ফ্ল্যাটে গণেশপুজো, রোজ প্রায় কিছু না কিছু লেগেই আছে। বিপ্লবেরও টুর থেকে ফিরে বৌয়ের ঘ্যান ঘ্যান শুনতে হয়না বরং চা খেতে খেতে কার হাসব্যান্ড কাকে আইফোন দিয়েছে বা কারা পরের মাসে পাট্টায়া যাচ্ছে এগুলো হুঁ হাঁ করে শুনলেই কাজ হয়ে যায়। বিপ্লব প্রথম প্রথম ভাবতো ফোন বা ব্যাংকক টুর বুঝি মিতারও দাবি। কিন্ত ক্রমশ সে বুঝতে পারলো আসলে ওই গল্প গুলো করতে পারাটাই মিতার আসল উদ্দেশ্য, নিজে সেরকম ভাবে সে ওসব কিছু চায়না। কিন্তু ঠিক পার্থিব দাবি নাহলেও মিতার মনে একটা চাহিদার বীজ পোতা হলো দূর্গা পুজোর মিটিংয়ে শেষে মিস্টার এন্ড মিসেস সম্বিৎ চ্যাটার্জীর সাথে কয়েকটা বাঙালি পরিবারের এক্সটেন্ডেড আড্ডা মারার সময়। সম্বিৎ বিপ্লবের আগের কোম্পানিতে এখন রিজিওনাল ম্যানেজার। মানে দুজনের মধ্যে কমন কলিগ, এক্স কলিগ মিলিয়ে একটা জানাশোনা আছে। তবে বিপ্লবের আগের কোম্পানির মাইনে পত্তর যে বিশেষ ভালো ছিলোনা সেটা সম্বিৎ হাবে ভাবে বুঝতেই দেয়না। ব্যাপারটা অনেকটা এইরকম যে বিপ্লব ছাড়ার পরেই যেন সবকিছু রাতারাতি পাল্টে গেছে। যাই হোক তা মিসেস চ্যাটার্জী জানালেন যে এবার ১৫ই আগস্টে ওরা,মানে সম্বিৎ আর ও, একটা এনজিও চালিত স্কুল ভিসিট করে সারাদিন সেখানে বাচ্ছাদের সাথে কাটিয়ে এসেছে। ওরা সাথে করে কিছু পুরোনো জামাকাপড়, সাবান, টুথব্রাশ ও পেন্সিল বাক্স নিয়ে গেছিলো যেগুলো পেয়ে বাচ্ছারা বেজায় খুশি আর ওদের এই ‘ শেয়ার উইথ কেয়ার’ গোছের অভিনব উদ্যোগটি নিয়ে টাইমস অফ ইন্ডিয়াতেও একটা ছোট্ট খবর বেরিয়েছিল, শীর্ষক ছিল – কাপল হু কেয়ারজ ‼ সম্বিৎ নিজে ট্যাব থেকে সব্বাইকে সেই নিউজ কাভারেজ দেখায় তো ওর স্ত্রী নিপা চ্যাটার্জী ফেসবুকে সেই ইভেন্টের ছবি ও তাতে কতগুলো লাইক তা গোনায়। সবাই বেশ প্রশংসা করলো চ্যাটার্জী দম্পতির এই সামাজিক সচেতনতামূলক প্রয়াসের। পুজোর সেক্রেটারি সান্যালদা তো বলেই দিলো,” এবার আমাদের এপার্টমেন্টের পুজো থেকে যা পয়সা বা জিনিস বাঁচবে তা দিয়ে ওই স্কুলের বাচ্ছাগুলোকে কিছু খাতা বই ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে দেওয়া যেতে পারে। সবাই তাতে ‘পারে, যেতেই পারে ‘ বলে ঘাড় নাড়িয়ে সায়ও দিলো।
আড্ডায় বসে বসেই মিতার মনে হচ্ছিলো পুজোর পরে কেন, পুজোর আগেই তো এরকম কিছু একটা করা যায়। ফ্ল্যাটে ফিরে আসার পর থেকেই মিতার সেই ইচ্ছেটা আবার মাথাচাড়া দিলো। বিপ্লবকে তা জানাতে তারও আইডিয়াটা মন্দ লাগলো না। বৌ তো আর ব্যাংকক বা আইফোন চাইছেনা ‼কিন্তু ওখানে কি নিয়ে যাওয়া যায় ?কতজন বাচ্ছা আর তারা কত বড় তাও তো জানা নেই। তাই অনেক বুদ্ধি খাটিয়ে স্কুলে দান করে জন্য বিপ্লব অফিসের দুটো বাতিল হয়ে যাওয়া কম্পিউটার সস্তায় কিনে সারিয়ে নিয়ে এলো। মিতাও বেজায় খুশি ,এক্কেবারে তাক লাগিয়ে দেবে সব্বাইকে। রবিবার সক্কাল সক্কাল চুপি চুপি ডিকিতে কম্পিউটার পুরে বিপ্লব আর মিতা চললো -কাপল হু কেয়ারজ স্মার্টলি খবরের শীর্ষক রচনা করতে। অনেকটা পথ ড্রাইভ করে হাইওয়ে ছেড়ে মাঠের রাস্তা ধরে অবশেষে তারা পৌঁছলো সেই সুদূর গ্রামের এনজিও স্কুলে। খবর দেওয়াই ছিল তাই সংস্থার সম্পাদক বরুন কান্তি নস্কর আগে থেকেই মালা টালা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। গাড়ি থেকে নামতেই বাচ্ছা কাচ্ছারা এদিক ওদিক উঁকি মেরে দেখতে লাগলো যে বাবু বিবিরা কি এনেছেন সাথে? সেরকম কিছু দেখতে না পেয়ে ভিড়টাও আস্তে আস্তে কমতে লাগলো। ষাটোর্ধ নস্করবাবু ওদেরকে অফিস ঘরে নিয়ে বসালেন , জানালেন এটাই একাধারে ওনার অফিস ও অন্যাধারে ইস্কুলের হেডস্যারের ঘর। মানে উনি-ই হেডস্যার বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস , ভূগোল সব পড়ান ও ওনার মেয়ে পিয়ালী সবে মাস্টার্স শেষ করেছে , সে অঙ্ক ও বিজ্ঞান পড়ায় । বিপ্লব বললো , ” বাহ্, কিন্ত আপনারা ছাড়া আর কোনো শিক্ষক নেই স্কুলে?”
নস্কর বাবু জানালেন ,” না স্যার, ওটাই তো সমস্যা।শহর থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরের জায়গা, আপনারা এসে জামা কাপড়, খাতা বই দিয়ে যান , তবে মাষ্টার তো আর কেউ এনে দেয়না ‼ মাইনে তো দিতে পারি না , আর সাম্মানিক দক্ষিণা নিয়ে আজকাল কেউ আর পড়াতে চায়না। যারা ভালো তারা চাকরি বাকরি পেয়ে গ্রামে বাইরে চলে যায় আর যারা পরে থাকে তারা নিজেরাই ‘ক অক্ষর গোমাংস’। ” বিপ্লব এবার ডিকি থেকে দুটো বড় বড় বাক্স বের করে অফিসে নিয়ে এসে রাখতেই নস্কর বাবু জিজ্ঞেস করলেন, ” এতে কি আছে?”
এবার মিতা বললো , ” কম্পিউটার , বাচ্ছারা একটু ভালো ভাবে শিখবে বলে এগুলো স্কুলের জন্য এনেছি। ”
নস্করবাবুর মুখটা এবার কিরকম ‘অবাক পৃথিবী’ গোছের হয়ে গেলো , বললেন ” ওগুলো দিয়ে এখানে কি হবে? দিনে ৪ ঘন্টার বেশি কারেন্ট থাকেনা। অ্যাসবেসটস এর চালের তলায় বসে বাচ্ছারা গরমে সেদ্ধ হয়ে যায়। আমরা এনজিও তাই মিড্ ডে মিল দিতে পারি না। মিল ছাড়ুন পরিশ্রুত জলও পায়না বাচ্ছারা, ওইযে ওই দেখুন একটা মাত্র টিপকল আর তাতে নাকি আর্সেনিক আছে। পঞ্চায়েতকে বলে বলে বাড়িতে একটা পাকা পায়খানা বানাতে পারলাম না। তা এই যন্ত্রগুলো দিয়ে আমরা কি করবো?”
বিপ্লব পোড় খাওয়া ম্যানেজার তাই খানিকটা সামলে নিয়ে বললো , “আজ কারেন্ট নেই কাল তো আসবে, বাচ্ছারা রোজ আধ ঘন্টা ওটা নিয়ে ঘাঁটা ঘাঁটি করলেই কিন্তু অনেক শিখবে। ”
নস্কর বাবু তবুও নাছোড়বান্দা , ” না মশাই , এই হাতে হাতে মোবাইল ঘাঁটতে গিয়ে যে কতজন মাটি ঘাঁটা ভুলে গেলো , না ও আপনি ফেরত নিয়ে যান। ”
মিতা কি একটা বলতে যাচ্ছিলো পিয়ালী এসে জানালো খাবার রেডি। খেতে খেতে নস্করবাবু শুরু করলো, ” আপনারা কলকাতায় থাকেন। মন্ত্রী আমলা সাংবাদিকরা আপনাদের চারিপাশ দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। যদি সত্যি কিছু করতে চান তাহলে তাদের বলুন এই উৎসবে সেই পার্বনে ওই ক্লাবে ক্লাবে টাকা না বিলিয়ে এই স্কুল গুলোর জন্য কিছু করতে। আমি ৩৪ বছর ধরে ওসব বলে বলে হাঁপিয়ে গেছি। আর এখন বলতে গেলে তো মার্ডারই হয়ে যাবো ‼ ”
ছিমছাম খাওয়া দাওয়ার শেষে সবাই মিলে এবার বাইরেই বেঞ্চি ও মোড়া পেতে বসলো। বিপ্লব বা মিতার আর কিছু করার বা বলার নেই দেখে নস্কর বাবুই আবার শুরু করলো, ” বুঝলেন এক ফ্ল্যাটবাড়ির মহিলা সংগঠন, ওই যে কি লেডিস ক্লাব নাকি বলে, তারা এসেছিলো। এসে জানালো যে ওরা কিছু করতে চায় এখানে। আমি বললাম বেশ তো, আপনারা সবাই শিক্ষিত, এখানে এসে দু চারদিন থেকে বাচ্ছাদের মাঝেমধ্যে পড়িয়ে যাবেন। সবাই হ্যাঁ হ্যাঁ করলো বটে তবে ওই শীতকালে দু একদিন এসে পিকনিক ছাড়া আর কিছু তাদের দ্বারা করা হয়ে উঠলো না ‼ তাই এখন আর বিশেষ কিছু আমরা আশাও করিনা কারো থেকে, যা ওই আমার জমানো টাকায় কুলোয় ঐটুকুই হয় আরকি ..” বেলা পড়ছে, এবার বিপ্লব আর মিতার ওঠবার পালা।কম্পিউটার দুটো অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও নস্করবাবুরা রাখলেন না। ওগুলো ডিকিতেই কলকাতা ফিরে গেলো। পথটা যেন আসার সময়ের থেকে একটু বেশি ঠেকলো বিপ্লবের। মিতা অনেক্ষন চুপ ছিলো , কলকাতা ঢোকার আগে হাইওয়ের শেষ সীমানায় যখন গাড়িটা প্রায় পৌঁছে গেছে তখন মিতা মুখ খুললো , ‘তোমার নেক্সট টুর কবে?”
বিপ্লব একটু আনমনা ছিল তাই একটু ভেবে বললো ,” সেরকম লং কিছু নেই আপাতত তবে পরের সপ্তাহে একটা ৩ দিনের ছোট্ট মিট হওয়ার কথা আছে শিলিগুড়িতে।কেন?”
মিতা এসিটা বন্ধ করে দিয়ে জানলার কাঁচ নামাতে নামাতে বললো ,” নাহ, ভাবছিলাম,তখন আমি নস্করবাবুদের ওখানে গিয়ে দু দিন থেকে বাচ্ছাগুলোর সাথে একটু দেখা করে আসবো, আজকে তো ওদের সাথে….”

সাড়ে ষোলো আনা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments