**এক**

বাবার চাকরিসূত্রে কালনার পাট চুকিয়ে কাটোয়ায় এসে ক্লাস টেনে ভর্তি হলুম কাশীরাম দাস ইন্সটিটিউশনে। আমার তখন রোগাসোগা চেহারা। নাকের নিচে গোঁফের রেখার চিহ্নমাত্র নেই। অনায়াসেই সিক্স-সেভেনের ছাত্র বলে চালিয়ে দেওয়া যেত আর মুখের ক্যাবলা চিহ্নটা এখনকার মত তখনও মুখের প্রতিটা রেখায় ফুটে উঠত। একে নতুন স্কুলে প্রথম দিন তাও আবার টেনের মত উঁচু ক্লাস, কোনওমতে প্রেয়ার সেরে গুটিগুটি পায়ে ক্লাসে প্রবেশ। ইতস্তত: পায়ে ক্লাসে ঢুকে একেবারে শেষ বেঞ্চে গিয়ে বসলুম। বসে বসেই অনুভব করতে লাগলুম বেশ কয়েক জোড়া লোলুপ চোখ আমার আপাদ মস্তক চেটে যাচ্ছে। যেন বেশ একটা ঘোরের মধ্যে আছি। হঠাৎ ঘোর কাটল এক মৃদু ধাক্কায়। চোখ তুলে দেখলুম মোটা কাঁচের চশমা পড়া, আমারই মত ক্যাবলা চেহারার আমার এক নতুন সহপাঠী আর তাকে ঘিরে জনাদশেক ছেলে অশেষ কৌতূহলে চিড়িয়াখানার শিম্পাঞ্জি দেখার কৌতূহল মেশানো দৃষ্টি দিয়ে ক্রমাগত পর্যবেক্ষণ করে চলেছে আমাকে। ওদের দিকে তাকিয়ে মুখে ক্যাবলামি মেশানো দেঁতো হাসি হাসতেই আমাকে লক্ষ্য করে চশমাধারীর তরফ থেকে উড়ে এলো প্রথম প্রশ্নবাণ,
- “নতুন মনে হচ্ছে? তা, খোকার আগমন কোথা থেকে?”
- “কালনার মহারাজা হাইস্কুল থেকে….”
আমায় প্রশ্নের উত্তর শেষ করতে না দিয়েই চশমাধারীর পরবর্তী প্রহার,
- “আগের স্কুলে ফার্স্ট সেকেন্ড কিছু হতিস?”
মুখে কিছু উত্তর না দিয়ে দু’দিকে ঘাড় নাড়াতেই যেন এক প্রশান্তির চিহ্ন ফুটে উঠলো চশমাধারীর চোখে মুখে। আমার ইন্টারভিউ পর্ব হয়তো আরও কিছুক্ষণ চলত কিন্তু প্রথম পিরিয়ডের বাংলার স্যার সুদেববাবুর আগমন ঘটতেই যে যার সিটে।
এবার ওই চশমাধারীর একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া যাক। নাম আলয়, একদা ক্লাসের ফার্স্টবয় কিন্তু ক্লাস সেভেনে নতুন ছাত্র সুজয়ের আগমনে আলয়ের সিংহাশনচ্যুতি ঘটে। সেই থেকে ক্লাসে নতুন ছাত্রের আগমন হলেই আলয়ের মনে পুরনো আতঙ্ক তাজা হয়ে যায়।

ভালোয় ভালোয় চারটে পিরিয়ড কেটে গেল, টিফিনের ঘণ্টা পড়তেই ছেলেরা মুখে বিকট আওয়াজ করতে করতে ক্লাস থেকে বেরোতে লাগলো। আমি তখনও বেঞ্চে বসে, ভাবছি একটু ফাঁকা হলে আস্তে আস্তে বেরবো। কিন্তু হঠাৎ দেখি আমারই ক্লাসের তিন মূর্তি আমার সামনে। প্রথমেই ফর্সামত একটা ছেলে বলে উঠলো,
- “কি বে! নাম কি তোর?”
- “তুষার, তোমার নাম?
আমার জড়তা মেশানো স্বরে বলা কথা শুনে ফর্সামত ছেলেটা বাকি দু’জনের দিকে তাকিয়ে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে বলে উঠলো,
- “আব্বে দেখ! জ্যেঠুমনি আমায় তুমি বলছে..”
বলেই আমার থুতনিটা একটু নেড়ে দিয়ে বাকি দু’জনের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল,
- “এর নাম গৌতম আর ও হচ্ছে দেবনাথ আর আমি সিধু। বাড়ি থেকে টিফিন এনেছিস?”
আমি মৃদুস্বরে “না” বলতেই, সিধু বলল,
- “চল! আজ আমরা তোকে টিফিন করাবো..”
গুটিগুটি পায়ে ওদের অনুসরণ করে বেড়িয়ে এলুম ক্লাসরুম থেকে, থামলাম সোজা গিয়ে বাবলুদার আলুকাবলীর ঝুড়ির সামনে। অতঃপর বাবলুদার উদ্দেশ্যে সিধুর নির্দেশ,
- “বাবলুদা! তোমার নতুন কাস্টমার! বেশী করে ঝাল দিয়ে চার আনা করে চারটে দাও চটপট”
শালপাতা ভর্তি আলুকাবলী হাতে নিয়ে সিধুর ইশারায় কড়কড়ে একটা একটাকার নোট বাবলুদার হাতে দিয়ে ওদের পিছুপিছু গিয়ে বসলুম স্কুলের ফুটবল মাঠের একেবারে শেষ প্রান্তে বটগাছের গোঁড়ায়। আলুকাবলী খেয়ে ঝালে একেবারে ব্রহ্মতালু জ্বলে যাচ্ছে, নাক চোখ দিয়ে জল ঝরছে। জামার হাতায় চোখ আর নাক মুছতে মুছতেই কানে এলো দেবনাথের গলা,
- “বিড়ি খাস?”
আমি আলতো করে “না” বলতেই ভীষণ গম্ভীর স্বরে সিধুর উপদেশ,
- “ক্লাস টেনে পড়ছিস আর বিড়ি খাস না? এতগুলো পিরিয়ডের পড়া! বলি, শক্তি পাবি কোত্থেকে?”
- “না, মানে কোনদিন খাইনি তো..”
আমার কাঁচুমাচু মুখে মিনমিনে উত্তরে সিধুর ঝাঁঝালো প্রত্যুত্তর,
- “নাহ্! তোকে মানুষ করার দায়িত্বটাও দেখছি আমার ঘাড়েই চাপবে।”
বলেই একটা বিড়ি বের করে ধরিয়েই দু’টান দিয়েই আমার হাতে ধরিয়ে দিল। অনভ্যস্ত হাতে সিধুর প্রসাদ ঠোঁটে লাগিয়ে টান দিতেই শুরু হল দমকা কাশি। কাশতে কাশতেই কানে এলো টিফিন পিরিয়ডের বেল পড়লো। আমায় হাত ধরে দাড় করিয়ে দিয়েই সিধু পা বাড়াল ক্লাসের দিকে আর পিছুপিছু আমরা তিনজন।

**দুই**

মাধ্যমিক পরীক্ষা দিলুম। হঠাত যেন বড় হতে শুরু করলুম। মাকে ম্যনেজ করে এক রোমাঞ্চকর শনিবারে সারারাতব্যপী ফিস্টি করার অভাবিত সুযোগ জুটে গেল। কানুর বাবা মা ওদের গ্রামের বাড়িতে গেছিল বলে ওদের ফাঁকা বাড়িতে আসর বসল। রাত নটায় মুড়ি-আলুরচপ, পেয়াজ কাঁচালঙ্কা সহযোগে সন্ধ্যাকালীন জলখাবার শুরু হল। রান্নার দায়িত্ব গৌতমের। ফিস্টির মেনু খাসীর মাংস আর ভাত। ওই বয়েসেই কানু, দেবার মত দু’চারজন যারা পানাভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে গেছিল তারা বসে গেল চানাচুর আর ঝালে বোম্মতালু গরম করা কচুভাজা সহযোগে বাংলুর বোতল নিয়ে। আমরা যারা সবে বিড়িতে টান দিতে শুরু করেছি, তারা বিড়িতে টান দিতে দিতে দশপয়সা কার্ডে ব্রে খেলাতে মত্ত হয়ে গেলুম।
দু’তিন ঘন্টা পরে সবারই খিদে পেতে শুরু করলো। গৌতমকে জিজ্ঞেস করে জানলুম মাংস নামতে এখনো দশ-পনেরো মিনিট লাগবে। কারো হাতেই ঘড়ি নেই। সেই সময় মাধ্যমিক পাশ করলেই রিস্টওয়াচ প্রাপ্তির চল ছিল। সিধুকে জিজ্ঞেস করলাম,
- “কটা বাজে রে?”
অনায়াসেই সিধু পাশের ঘরের দেওয়াল ঘড়িতে টাইম দেখতে পারত, কিন্তু সেটা না করে দুম করে বাংলুর নেশায় এক অদ্ভুত কান্ড করল। কানুদের ফোনটা তুলে কোথায় যেন ফোন করল। কানে ফোনটা ধরা, মুখে কিচ্ছু বলছে না। আমরা সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি সিধুর দিকে। মিনিট খানেক পরে ফোনটা নামিয়ে রেখে বলল,
- “রাত একটা মত বাজে..”
- “কি করে বুঝলি?”
আমার বিস্মিত প্রশ্নের উত্তরে সিধুর সংক্ষিপ্ত জবাব,
- “মৃনালের বাড়িতে ব্ল্যাঙ্ক কল করলাম, ওর বাবা খচে গিয়ে বলল, কোন শুয়োরের বাচ্চা এই রাত একটায় ফোন করে চুপ করে আছিস বে?”
বলেই সিধু আবার গিয়ে বাংলুর আসরে বসে পরল। গৌতমও ঘোষণা করল,
- “মাংস নেমে গেছে, সবাই খেতে আয়………….”

**তিন**

তখন বোধহয় ক্লাস ইলেভেন/টুয়েলভ। আমার চেহারা একেবারে প্যাকাটি, মেরেকেটে ছেচল্লিশ/সাতচল্লিশ কিলো ওজন। সেই সময় আমাদের মত মেদহীন চেহারার কদর একেবারেই ছিল না। বেশ নাদুস নুদুস চেহারার ছেলে দেখলেই মা/কাকীমা/জেঠিমারা গদগদ স্বরে বলে উঠতেন,
- “আহ:! কি সুন্দর গোপাল গোপাল চেহারা! দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়, আর আমাদেরটাকে দেখ? যেন জ্যান্ত কাকতাড়ুয়া! এত চোব্য-চোষ্য খেয়েও গায়ে লাগেনা কেন কে জানে…..”
চেহারার হীনমন্যতা বন্ধুমহলে বেশিরভাগেরই ছিল। মনে মনে ভগবানের উদ্দেশ্যে গায়ে একটু মেদ-মাংসের সংযোগের প্রার্থনা প্রায় সকলেই করত, প্রসূন-সুকুমারের মত দুয়েকজন প্রয়োজনতিরিক্ত ভাগ্যবান ছাড়া। ছয় ফিট উচ্চতা সঙ্গে শতোর্ধ ওজন নিয়ে ওরা আমাদের মত লিলিপুটদের দলে ছিল নিতান্তই ব্যতিক্রম।

গৌরচন্দ্রিকা ছেড়ে এবার আসল গল্পে আসা যাক। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ দেখে ঘরে ফেরার জন্যে হাওড়া স্টেশনে কাটোয়া লোকালের জন্যে অপেক্ষা করছি সবাই মিলে, আমি, গৌতম, নীলে, সিধু….. এবং অবশ্যই প্রসূন। টিপিক্যাল মারোয়াড়ী সুলভ ঘিয়ে ভেজানো চেহারা, মুখে স্বীকার না করলেও আমাদের সকলেরই স্থির বিশ্বাস প্রসূনের দৈহিক ওজন একশো অতিক্রম করেছে। ট্রেনের জন্যে এখনও ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা করতে হবে। সময় কাটানোর জন্যে সবাই মিলে হামলে পরলাম ওজন মাপার যন্ত্রের ওপর। দু’একজনের পরে আমারও সুযোগ এলো। কম্পিত বক্ষে চেপে দাঁড়ালাম যন্ত্রের ওপর, কয়েন ঢোকাতেই বেরিয়ে এলো ওজন লেখা টিকিট। দেখেই মনটা খুশিতে ভরে গেল, টিকিটে লেখা 50.5 kg, এবার বোধহয় কাকতাড়ুয়া অপবাদটা ঘুচবে। একে একে সবার ওজন মাপা হল কিন্তু লক্ষ্য করলাম প্রসূন নিরাপদ দূরত্বে দাড়িয়ে। মুখ দেখে মনেই হচ্ছেনা ওজন মাপাতে কোন রকম উৎসাহ ওর আছে। অবশেষে সিধু ওকে একরকম টানতে টানতে এনে দাড় করিয়ে দিল ওজন মাপার যন্ত্রের ওপর। সিধু নিজেই পকেট থেকে একটা কয়েন বের করে ঢুকিয়ে দিল যন্ত্রে এবং বেরিয়ে আসা ওজন লেখা টিকিটটাকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে পকেটে ঢুকিয়ে এগিয়ে এলো আমাদের দিকে। আমাদের সকলের চোখে মুখে তখন পাহাড় প্রমাণ কৌতূহল, সকলেই প্রসূনের ওজন জানার জন্যে তীর্থের কাকের মত অপেক্ষা করছি। সিধুকে জিজ্ঞেস করতেই চোখে মুখে ভীষণ বিজ্ঞ বিজ্ঞ ভাব করে ঘোষণার ভঙ্গিতে বলে উঠল,

- “টিকিটে লেখা আছে, Use weighing mechine one by one, dnt use more than one person at a time”

**চার**

মাধ্যমিকের পরে আমাদের বেলতলার শানবাঁধানো বেদীর আড্ডার স্থানান্তরটা অবশেষে সমরদার চায়ের দোকানের বেঞ্চে হয়েই গেল। আসলে গেমস টিচার নন্দবাবুর সাথে সেদিনের ঘটে যাওয়া বিচ্ছিরি ঘটনাটা না ঘটলে আড্ডাস্থলের এই স্থানান্তরটা অবিশ্যি ঘটতো বলে মনে হয় না। মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে হাতে অখণ্ড অবসর। বিকেলের আড্ডাটা শুরু হয়ে যেত বিকেল তিনটেতেই। আড্ডার শুরু স্কুলের ফুটবল মাঠের একেবারে শেষ প্রান্তে বটগাছের গোঁড়ায় আর স্কুলের ছুটি হলেই গুটিগুটি পায়ে বেলতলার শানবাঁধানো বেদীর নিশ্চিত আশ্রয়ে। সেদিনও তিনটে বাজতে না বাজতেই সদলবলে হাজির। সিধুসহ দেবনাথ, গৌতমের সঙ্গে আমরা আরও দু’তিনজন। আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরনো আড্ডার সংসারে যেখানে বিড়ির খরচা জোগাতে বাবার পকেটের খুচরো পয়সা কিম্বা মায়ের লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে রাখা একটাকার কয়েনই ভরসা, সেখানে সেদিন গৌতমের পকেটে দু’দুখানা ফিল্টার উইলস! সবার নজর তখন গৌতমের পকেটে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সিগারেটের সংখ্যা দুই আর তার ওপর নজর ছ’সাত জোড়া তৃষ্ণার্ত চোখের। সিধু আর গৌতম দু’জনে একটা করে সিগারেট ধরিয়ে দু’একটান দিয়ে অন্যকে দিয়ে দিল। কাউন্টারটা আমার হাতেও এলো অবশেষে। মৌজ করে দু’তিন টান দিতেই সিধুর নির্দেশ,
- “ব্যাস! লাস্ট টানটা দিয়ে কাউন্টারটা আমায় দে…”
অতঃকিম! শেষ টানটা দিয়ে কাউন্টারটা সিধুর দিকে এগিয়ে দিতে গিয়েই একেবারে চক্ষু ছানাবড়া। যমদূতের মত নন্দবাবু কখন আমাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতেই পারিনি। ততোক্ষণে সিগারেটের কাউন্টার সিধুর হাতে। সিধু চোখ বুজে সুখটান দিতেই নন্দবাবুর হাত সিধুর কাঁধে আর সাথে সাথেই সিধুর মধুর সম্ভাষণ,
- “শুয়োরের বাচ্চা! কাউন্টারেরও কাউন্টার চাস?”
বলে পেছন ফিরতেই নন্দবাবুর চোখে চোখ, আর নন্দবাবুর মুঠোয় সিধুর ডান কান…….

সমরদার দোকানের বেঞ্চের আড্ডাটাও দিনদিন জমতে শুরু করল। চায়ের জগতের “একটাকে দুটো”, “ঠেকানো” ইত্যাদি মনি মাণিক্য ততদিনে আমার বঙ্গীয় শব্দভাণ্ডারের অমূল্য সঞ্চয় হিসেবে সঞ্চিত হতে শুরু করেছে। পঞ্চাশ পয়সায় একভাঁড় চা, কখনো সখনো অর্থাভাবে একভাঁড়কে দু’ভাগ অথবা একজন একভাঁড় শেষ করার পর অন্যজনের ভাগে ফাঁকা ভাঁড়ে সমরদার ঠেকানো মুফত আধভাঁড় চা। বিড়ির কাউন্টারের মতই চায়ের কাউন্টারও ততদিন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে গেছে। আমাদের ছ’সাতজন ছাড়াও বাইরের কিছু আড্ডাবাজও ভিড়ে গেল এই সমরদার চায়ের দোকানের আড্ডাতে, আর খুব স্বাভাবিকভাবেই সিধুই সেই আড্ডারও মধ্যমণি। সেদিনও সবাইমিলে আড্ডা দিচ্ছি। সেদিন প্রসূনের কল্যাণে সবার কপালে পুরো একভাঁড় চা, “ঠেকানো” সমেত সঙ্গে পুরো বিড়ি। প্রসূন ছিল জাতে মারোয়াড়ী কিন্তু বুদ্ধি আর চিন্তায় ষোলআনা বাঙালী। পৈতৃক ব্যবসায় সময় দেওয়ার প্রতিদানে ওর কিছু হাতখরচা জুটে যেত, যার সিংহভাগই আমাদের ভোগে লাগত। অবিশ্যি আমরাও কৃতজ্ঞতা স্বরূপ প্রসূনের মত ঘোর নিরামিষাশী মারোয়াড়ীকে গরম গরম ডিমসেদ্ধর স্বাদ আরোহণের মানসিক শক্তি জুগিয়েছিলুম।
সবাই মন দিয়ে চায়ে চুমুক দিচ্ছি, সিধুর চোখ রাস্তার দিকে। ঠোঁটের কোনে ঝুলছে সেই বিখ্যাত রহস্যময় হাসি, যার অর্থ ওর মগজে পাক খাচ্ছে আমাদের পক্ষে আকল্পনীয় কোন কাজের পরিকল্পনা। চা খেয়ে ভাঁড়টা ফেলে একটা বিড়িতে ফুঁ দিতে দিতে এগিয়ে গেল সামনের রাস্তার ধারে। সিধুর চোখে চতুর শিকারির দৃষ্টি। হঠাত দেখি একটা ছেলে সিগারেট টানতে টানতে আসছে আর সিধু ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে, “আগুনটা দেখি” বলতেই ছেলেটা বিড়ি ধরাতে নিজের সিগারেটটা সিধুর হাতে দিল এবং সবাইকে চমকে দিয়ে সিধু নিজের বিড়িটা ওর হাতে দিয়ে সিগারেটটা টানতে টানতে বেঞ্চে এসে বসলো। হতবম্ভ ছেলেটা কি করবে বুঝতে না পেরে হাঁটা দিল সামনের রাস্তায়।
আমাদের আড্ডা তখন একেবারে তুঙ্গে। মারাদোনা, রুড গুলিটের সঙ্গেই আলোচনায় তখন শ্রীদেবী অথবা পাশের বাড়ির বারান্দায় চুল আঁচড়াতে ব্যস্ত সদ্যবিবাহিত বৌদি। আমাদের উদ্দাম আড্ডার মাঝেই কানে এলো সিধুর “এ্যাই রিক্সা” বলে সিধুর চিৎকার। আচমকা থেমে গেল আমাদের আলোচনা, অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি আমাদের মজলিসকে পেছনে ফেলে বেশ কিছুটা এগিয়ে যাওয়া একটা রিক্সা ঘুরে এসে সমরদার চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়াতেই উচ্চস্বরে সিধুর প্রশ্ন,
- “ভাই, স্টেশনে যাবে?”
রিক্সাওয়ালা সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়াতেই সিধু সংক্ষেপে “যাও” বলে অবশিষ্ট সিগারেটে শেষ টানটা দিয়ে যোগ দিল আমাদের আলোচনায়…..

**পাঁচ**

তখন গড়িয়াতে মেসে থাকতুম। টিউশনের পয়সায় দিন গুজরান। আমহার্স্টস্ট্রীটে দুটো টিউশন সেরে রাত আটটা দশের বারুইপুর লোকাল ধরতুম। রবিবার ছাড়া সপ্তাহের বাকী ছ’দিন একই ট্রেনে ফেরা। কোনও কোনও দিন একটু আগে এসে পড়লে দাড়িয়ে থাকা ক্যানিং বা ডায়মন্ড হারবার লোকাল ছেড়ে দিতুম। আটটা দশের বারুইপুর লোকালের পেছন থেকে তিন নম্বর কামড়ার বাঁদিকের গেটের ঠিক পেছনের সিটের জানলার ধারের সিটটা আমার বরাদ্দ ছিল, আর তার ঠিক উল্টোদিকের সিটটা, আমার ফ্রেন্ড, ফিলোজফার এন্ড গাইড শ্রীমান সিধুর। দীর্ঘদিনের পরিচিত সহযাত্রীরা সিটদুটো আমাদের জন্যে ফাঁকাই রাখত। প্রতিদিনের মত সেদিনও আমরা রিজার্ভ সিটে বসে আছি। এক ভদ্রলোক দুহাতে দুটো বড় বড় সুটকেস নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে জানলার কাছে মুখ এনে জিজ্ঞেস করলো,
- ” দাদা, এটা কি গাড়ি?”
বোধহয় জানতে চাইছিল এটা কোন লোকাল। কিন্তু সিধুর স্বভাবসিদ্ধ নির্লিপ্ত উত্তর,
- “রেল গাড়ি…”
শুনেই ভদ্রলোক একরাশ বিরক্তি মেশানো স্বরে সংক্ষেপে “জানি” বলে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। আটটা বেজে পাঁচ মিনিট হয়েছে। আমার প্রতি সিধুর নির্দেশ,
- “চ, দ’রজায় দাড়িয়ে একটু দম দিয়ে নি।”
তখন ষ্টেশনে বা ট্রেনের মধ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ হলেও এখনকার মত কড়াকড়ি ছিল না। দু’জনে দুটো বিড়ি ধরিয়ে সবে দু’চার টান দিয়েছি ট্রেন হুইসেল মেরে দিল। ধীরে ধীরে ট্রেন সবে গড়াতে শুরু করেছে, হঠাৎ তিনজন লোক দৌড়তে দৌড়তে আমাদের গেটের সামনে এসে জিজ্ঞেস করলো,
- “দাদা এটা বারুইপুর লোকাল তো?”
এই ট্রেনেরই যাত্রী বুঝতে পেরে আমার প্রতি সিধুর স্বভাবসিদ্ধ নির্দেশ,
- “মালগুলোকে টেনে তোল!”
সিধুর নির্দেশে আমার রোগাপাতলা শরীরে হঠাৎ যেন যৌবনের রক্ত টগবগ করে ফুটতে শুরু করলো। দু’জনমিলে একহাতে গেটের মাঝখানের রডটাকে শক্ত করে ধরে অন্যহাতে দুজন লোকের হাত খপ করে ধরে এক ঝটকায় কামড়ায় তুলে নিলুম। ইলেকট্রিক ট্রেনতো! হঠাত গতি বেড়ে যাওয়ায় তৃতীয়জন আর উঠতে পারলো না। লোকদুটো তখনও হাঁপাচ্ছে। ওদের সহযাত্রী ট্রেন মিস করে গেল। সিধু বিজ্ঞের মতো সান্ত্বনা দিয়ে বললো,
- “ট্রেনের স্পীডটা হঠাৎ বেড়ে গেল বলে আপনাদের বন্ধুকে তুলতে পারলুম না। না হলে…..”
সিধুর কথা শেষ করতে না দিয়েই ওদের মধ্যে একজন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বলল,
- “থামো তো হে ছোকরা! অনেক উপকার করেছো আর নয়! যাকে তুলতে পারলে না, আসলে ওই ছিল যাত্রী, আমরা দু’জন ওকে ট্রেনে ওঠাতে এসেছিলাম…..”
ওখানে দাড়িয়ে থাকা আর নিরাপদ মনে হল না। টুকটুক করে নিজের সিটে গিয়ে বসে পরলুম।

**ছয়**

আমাদের মেসের দু’একজনের স্টেডি গার্লফ্রেন্ড থাকলেও অধিকাংশের অবস্থাই ছিল বড্ড নড়বড়ে। পূজো এলেই সবার বুকে অদ্ভুত এক ধড়ফড়ানি, নড়বড়ে গার্লফ্রেন্ড হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়, আর তাহলেই পূজোর কয়েকটা দিন সিধুর হাত ধরে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ভবঘুরের মত উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরা। কথায় কথায় সিধুর কথা যখন উঠেই গেল তখন সিধুর সাথে সবার পরিচয়টা সেরেই ফেলা যাক। মেসের অভিভাবক বা রিংমাস্টার বিদ্যুৎ অন্যদের সবথেকে কাছের লোক হলেও সিধু আর আমি ছিলাম হরিহর আত্মা। হয়তো আমার আর সিধুর পাগলাটে চিন্তাভাবনার মিলই আমাদের অন্তরঙ্গতার অন্যতম কারণ ছিল। হঠাৎ হঠাৎ অদ্ভুত অদ্ভুত কাণ্ড করে বসতো সিধু, পরিণতির কথা না ভেবেই। স্কিন ডিজিজে ভোগা, দেহের নিষিদ্ধ অঞ্চলে দৃষ্টিকটুভাবে সারাদিন ধরে চুলকতে থাকা নির্মলদাকে জন্মদিনে সেলিকল উপহার দেওয়া অথবা ক্লাসমেট ঋতুপর্নার দাদার বিয়ের ভোজে আইসক্রিম মনে করে হাত ধোয়ার সাবান জল খাওয়া এবং ক্লাসে সবার সামনে সেটার দুঃসাহসিক স্বীকারোক্তি বোধহয় কেবলমাত্র সিধুর পক্ষেই সম্ভব ছিল। যদিও সাবান জল খাওয়াতে সিধুর পাগলামি মোটেও দায়ী ছিলনা। গ্রামের গন্ধ লেগে থাকা কাটোয়ার মত আধা শহর থেকে আসা একটা ছেলের কাছে সপ্রতিভভাবে বালিগঞ্জের অভিজাত এলাকার ম্যারেজ হলের ক্যাটারার পরিচালিত বিয়ের ভোজ খাওয়াটা, আমার কাছে শোয়েব আখতারের বাউন্সারের মুখোমুখি হওয়ারই সামিল ছিল। সেই সময় আজকালকার মত বিয়ের ভোজ মানেই বুফে সিস্টেম ছিল না। টাই পড়া ছেলেরা সেজে গুজে টেবিল চেয়ারে বসা নিমন্ত্রিতদের খাবার পরিবেশন করত। সিধুও সেদিন অপ্রস্তুত হাতে মেনুকার্ড মিলিয়ে মিলিয়ে একটার পর একটা পদ খেয়ে যাচ্ছিল, পাতে মিষ্টিও পরে গেছে শুধু আইসক্রিম দেওয়া বাকী। কিন্তু ক্যাটারারের গর্দভগুলো আইসক্রিমের আগেই প্লাস্টিকের বাটিতে করে হাত ধোয়ার সাবানজল দিয়ে যাবে, সেটা ইতিপূর্বে কেবলমাত্র কাঠি দেওয়া আইসক্রিম খাওয়া সিধুর পক্ষে তো বুঝতে না পারারই কথা। অতএব যা ঘটার কথা ছিল, ঠিক সেটাই ঘটলো, আইসক্রিম মনে করে সাবানজলের বাটি তুলে নিয়ে এক চুমুকে শেষ…..
পূজো এলেই আমাদের মেসের রিংমাস্টার বিদ্যুতের ব্যস্ততাটা হঠাৎই ভীষণ বেড়ে যেত। বিদ্যুৎ ছিল পাক্কা ইভেন্ট ম্যানেজার অথবা ট্যুর প্রোগ্রামারও বলা যেতে পারে। পূজোর সময় বর্ধমানে নিজের গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার আগে সবার জন্যে আলাদা আলাদাভাবে গার্লফ্রেন্ড সহযোগে ষষ্টির সকাল থেকে দশমীর সন্ধে পর্যন্ত প্রোগ্রাম সাজিয়ে দিত নিখুঁতভাবে। কোলকাতার বিখ্যাত বিখ্যাত লাভারস পয়েন্টের প্রতিটি বিন্দু যেন বিদ্যুতের নখদর্পণে। বাবুঘাটের কোন জায়গাটা সবথেকে বেশী নিরিবিলি, সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্কের কোন বেদীর গার্ড একটু বেশী উদার, ভিক্টোরিয়ার কোন ঝোপে নিশ্চিতভাবে ক্যামেরা বসানো নেই অথবা ঢাকুরিয়া লেকের কোন গাছের আড়ালে বসলে পথচলতি মানুষের নজর এড়ানো যাবে ইত্যাদি টেকনিকাল ব্যাপারে বিদ্যুৎ ছিল গুগলের তৎকালীন সংস্করণ। অতএব পূজোর ঠিক আগের সপ্তাহে কলেজ যাওয়াতো দুরের কথা ঠিক সময়ে স্নান খাওয়াও করতে পারতো না বিদ্যুৎ। সেদিন সন্ধে বেলাতেও চলছে কৌশিকের সাথে বিদ্যুতের বিশেষ সেশন। কৌশিকের আনা ফিল্টার উইলস টানতে টানতে চলছে বিদ্যুতের ক্লাস, মনযোগী ছাত্র কৌশিক আর ওদের ঘিরে অসীম ঔৎসুক্য মাখানো মুখে ঘিরে আছে এই অধমসহ বাকী দশ-বারোজন। হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকেই সিধু উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করল,
- “এবার ভাবছি পূজোর কটাদিন গার্লফ্রেন্ডের সাথে চুটিয়ে প্রেম করব। বিদ্যুৎ, আমার জন্যে একটা রোমান্টিক প্রোগ্রাম বানা তো…”
সবাই হতচকিত হয়ে গেল। ঘাবড়ে গিয়ে সিধুকে জায়গা ছেড়ে দিল কৌশিক। অকল্পনীয় টাস্ক পেয়ে নিজেকে উজাড় করে দিতে লাগলো বিদ্যুৎও। ঘন্টাখানেক ধরে একটা গা ছমছমে, রোমান্টিক পরিকল্পনা ছকে দিয়ে গর্বিত মুখে বিদ্যুৎ সিধুকে জিজ্ঞেস করলো,
- “কি বস্, খুশি তো?”
- “কিন্তু একটা প্রবলেম থেকেই গেল..”
বলেই মুখে বিজ্ঞের মত অদ্ভুত একটা ভাব করে সবার মুখের দিকে তাকাতে লাগলো সিধু। আমরা ভরকে গিয়ে সবাই মিলে চেঁচিয়ে উঠলাম,
- “কিন্তু প্রবলেমটা কি বলবি তো?
- “বিদ্যুৎ প্রোগ্রামটা চমৎকার ছকেছে, আমারতো ভাবলে এখন থেকেই শরীর গরম হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভাইসব আমার ছোট্ট একটা প্রবলেম আছে। আর সেটা হচ্ছে গিয়ে, আমার গার্লফ্রেন্ডটাই এখনও জোগাড় হয়নি….”
বলেই সামনে পড়ে থাকা সিগারেটের প্যাকেট থেকে নিয়ে একটা সিগারেট ফস্ করে জ্বালিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সিধু….

সিধুর ডায়েরি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments