এ বাড়িতে কেউ চোখে চোখ রাখে না আজকাল, পাছে আবজে ওঠা হাসি আড়াল না করতে পারে চোখের কোণায় জমা হওয়া টুকরো হিরের কুচিগুলো। এ বাড়িতে শুধু দেখা যায় হাসির রকমফের। ভাইবোনেদের হুল্লোড়ে হাসি, আত্মীয়-স্বজনের শুভেচ্ছার হাসি, মা বাপের ঠোঁটে গর্বে-আনন্দে মাখানো চাপা হাসি। এ বাড়ির একমাত্র মেয়েটির বিয়ে আগামী শীতে। ঘরের মেয়ে পরের কাছে চলে যাওয়ার আগে এই শেষ শরত, শেষবার পুজোর গন্ধ মেখে নেওয়া।

‘ওরে ও নাতনি লো, বলি বিয়ের দিন তো এগিয়ে এলো রে। বুকের ভেতরটা কতটা ধুকপুক করছে বল দেখি। ’

‘ওফ দিদা কি যে বলো না! এ কি আর তোমাদের প্রথমভাগ কোলে করে বিয়ের পিড়িতে বসার যুগ? সাত বছর ধরে ওর সাথে সম্পর্ক, ধুকপুকুনি আবার কিসের?’

এক চিমটি ছাঁচি পান গালে ঠেসে, পিঠের বালিশটা একটু ঠিক করে নিয়ে দিদা বললেন ‘ হুহ তাও যদি না দুদিন বাদে বাদে দেখতুম চোখ রাঙ্গা করে, নাকের জল টানতে টানতে জানলার ধরে বসে উদাস হয়ে বসে আছ। বলি বিয়ে করতে যাচ্ছ দুদিন বাদে, এখনো কথায় কথায় এতো ঠোঁট ফোলালে চলবে?’

দোপাট্টা উড়িয়ে ভুরু বাঁকিয়ে ঋতি জিগ্গেস করলো ‘আচ্ছা তাহলে কি চলবে শুনি? কি কি চলবে বিয়েতে একটু বুঝিয়ে দাও দেখি। মেয়েদেরই সব মানিয়ে নিতে হয় বললে কিন্তু আমি চললাম এই। ’

‘ও নাতনি রে, বিয়ে কি তোর একার জিনিস? দুজনের যদি মিলই না হলো তো সুখের বাসাখানি গড়বি কিসে? সুখ কিরকম জানিস……এই যেমন ধর যজ্ঞির ছ্যাঁচড়া। না না হেসে ফেললে হবে নাকো দিদিমনি। বলি ছ্যাঁচড়া বানাতে দেখেছ কখনো? তবে শোনো। প্রথমে নাও একটা আস্ত মাছের মাথা। ভেঙ্গে দুভাগ করো। এক ভাগ হলে তুমি আর এক ভাগ হলো আমার আদরের নাতজামাই। এবারে গরম তেলে কড়া করে ভাজ দেখি। সংসারে কত ঝড় ঝাপটা আসবে, কত উথাল পাথাল. যত খারাপ সময় একে অপরের সঙ্গে একসাথে, পাশাপাশি কাটাবে ততই দেখবে সম্পর্ক আরো মুচমুচে হচ্ছে, আরো স্বাদু। যেই মাছের মাথাদুটি কড়কড়ে ভাজা হলো খুন্তি দিয়ে দাও তো দুটিকে ভেঙ্গে, মিলে মিশে একাকার হয়ে যাক দুজনের মন দুটি। এবারে মাছের মাথার টুকরোগুলি ভালো করে ভেজে তুলে রাখো আর জড়ো করে আন রান্নাঘরের ফেলাছড়ানো কুটি কুটি সব্জি। সংসারের ছোটো ছোট দুঃখ হাসি এরা. কুটি কুটি করে কাট একটু আলু, বেগুন, কুমড়ো,  ঝিঙে, কচু, শাক……যা পাও হাতের কাছে। এবারে ওই মাছ ভাজার তেলেই আর খানিক তেল দাও দেখি হাত খুলে। তেল গরম হলে ওতে দাও পাঁচ ফোরণ, শুকনো লংকা আর তেজপাতা দুটি। এবারে ওতে ঢেলে দাও কাটা সবজীগুলো। এবারে শুধু খুন্তি ধরে উলটপালট করো আর মাঝে মাঝে থেমে একটু কষতে দাও। বলি বুঝলে কিছু নাতনি সুন্দরী? রোগা হওয়ার দোহাই দিয়ে তেল ঢালতে কসুর করেছ কি গেছ। ওই তেলটুকু হলো ভালোবাসা, সংসারের যত হাসিকান্না ডুবিয়ে রাখো ওই ভালোবাসাটুকুতে। যত ইচ্ছে ওলটপালট খাও না কেন জীবনের খুন্তি নাড়ায় দেখবে রস মরবে না, শুধু জমে আসবে। আর তারই মাঝে একটু চমকের জায়গা রেখো নাতনি ওই ফোরণ দেওয়ার মতো। ওতে পিরিত আরো জমে। এবারে দাও দেখি চাট্টি মশলা.. হলুদ, জিরে গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো, শুকনো লংকা গুঁড়ো। আর দেবে কি? নুন আর চিনি অল্প অল্প করে স্বাদ বুঝে। আর দিও একটু জিভ সুলোনো কাসুন্দি বা সর্ষে বাটা। এবারে ওই তুলে রাখা মাছের কাঁটা চোকড়াগুলো মিশিয়ে দাও দেখি। আমার বাবা বলতেন ‘ছ্যাঁচড়া মজে তেলে কষে আর ভালোবাসা জমে ধৈর্যর বশে’। যতই দুঃখ আসুক, অভিমান হোক এমনকি রাগারাগিও,  ওই ভালোবাসার আঁচলটি দুজনে ধরে থেকো শক্ত করে…….ওই দেখো আবার কাঁদে…
কেন! আয় তো ধন বুকে আয়. আর কটাই বা দিন পাবো তোকে?’
 
 
 
 

 

 

সুখ কারে কয়?
  • 5.00 / 5 5
2 votes, 5.00 avg. rating (94% score)

Comments

comments