মিঃ ইন্ডিয়া নামক ছবিটিকে অনেকেই মনে রেখেছেন ‘কাটে নহী কাটতে ইয়ে দিন ইয়ে রাত’ গানটিতে নীল রংয়ের শাড়ি পরে নায়িকা শ্রীদেবীর বৃষ্টিভেজা নাচের দৃশ্যটির জন্যে। এর চেয়েও বেশি যদি কারও কিছু মনে থাকে তবে নিশ্চিতভাবেই তিনি মনে করতে পারবেন একটি হনুমানের মূর্তি চুরি করে বিদেশি পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার দৃশ্যটি। প্রমাণ সাইজের মূর্তিটি তুলে দেওয়া হচ্ছে পাচারকারীদের হাতে এমন মুহূর্তে অদৃশ্য নায়ক অকুস্থলে ঢুকে পড়ে পিতলের হনুমানজীকে হস্তগত করে তান্ডব বাধায়। কোথা থেকে কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে না পেরে সবাই মিলে হাত তুলে ‘জয় বজরংবলী’ বলে নৃত্য শুরু করে দিতেই হতভম্ব বিদেশিরাও একটু পরে একই পথ অনুসরণ করে কোনক্রমে সে যাত্রা বেঁচে যায়। কারণ সিনেমা মাত্র অর্ধেক গড়িয়েছে, তখনও যদি না বেঁচে যায় তবে আর কখন ?

প্রায় একইরকম অবস্থা এবারে বাস্তবেই দেখা গেল। ঢাকা শহরের হলি আর্টিসান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পরে অনেকটা কাছাকাছি দৃশ্য উঠে আসতে দেখা গেল পশ্চিমবঙ্গে। জ্ঞান হওয়া ইস্তক ১৯৮৪ সাল থেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শুনে আসা ‘সন্ত্রাসবাদীদের কোনও ধর্ম নেই’ আচমকাই বদলে দিয়ে ‘সন্ত্রাসবাদীদের ধর্ম নেই কে বলেছে, যাবতীয় সন্ত্রাস তো একটা ধর্মের নামেই চলছে’ এইরকম একটা স্ট্যান্ড নিয়েই প্রায় সবাই দাঁড়িয়ে গেলেন। এঁদের অবস্থা সেই মূর্তিচোর ভারতীয়দের মত। বিপরীতে রাজনৈতিক দলগুলির অবস্থা চোরাইমুর্তির বিদেশি ক্রেতাদের মত। কি করা উচিত, কিভাবে সব দিক বাঁচিয়ে ঠ্যাকনা দেওয়া যায়, ভেবেই হতভম্ব। আপাতত মানে এই লেখা তৈরি করা পর্যন্ত যাকে বলে প্রতিবাদে মুখর হওয়া, তা নজর এড়িয়ে গেছে। বিধানসভায় হট্টগোল থামানোর জন্যে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী ‘আগুন ছড়াবেন না’ বলে সামলেছেন। এমনকি বিজেপির মত রাজনৈতিক দল যাদের আষ্টেপৃষ্ঠে হিন্দুত্বের আঁশটে গন্ধ তারাও ওই বিধানসভার বাইরে একরকম চুপ করেই আছে বলা চলে। এর মধ্যেই টুকটাক ধরপাকড়ের ফলে জানা গেছে যে এই রাজ্যের কারও কারও সাথে আন্তর্জাতিক জিহাদপন্থী কর্তাব্যক্তিদের যোগাযোগ আছে।

প্রশাসন তার মত ব্যবস্থা নেবে কিন্তু প্রশ্ন হল যে, আমার মত সাধারণ মানুষ যাঁরা মনে করতেন ‘সন্ত্রাসবাদীদের ধর্ম হয় না’, এই দ্বারে এসে কড়া নাড়া শুনে তাঁদের মানসিক অবস্থা কেমন এই মুহূর্তে। এখানে বলে রাখা ভাল ভারতবর্ষে ধর্মীয় সংখ্যাগুরু বলতে যে গোষ্ঠীকে বোঝায় আমিও সেই সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়ার কারণে, এবং আরও বেশি করে কূপমণ্ডূক হওয়ার কারণে অন্য কারও খোঁজ নেওয়া হয়ে ওঠেনি। এই অবস্থায় আমার মানসিক অবস্থাই মনে হয় আমার মত আরও অনেকের মানসিক অবস্থা।

প্রথমেই আমার যা মনে হচ্ছে তা হল আমি ভীষণ ভয় পেয়েছি। মারাত্মক ভয় বলাই ভাল। এত ভয় আগে পাইনি। ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তার অভাব আছে বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিই। একটু আধটু ভয় পেয়ে যাই যখন শুনি ইউরোপেও জঙ্গি হামলায় প্রাণহানি হচ্ছে। ওসব দেশে তো নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট কঠোর। তো সেই সব অঞ্চলে যদি এই হাল হয় তবে আমাদের এখানে কি হতে পারে ভেবে রাতের ঘুমের সামান্য ব্যাঘাত ঘটে। এমনকি দেশের ভেতরে ঘটে যাওয়া মুম্বই হামলাকেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গলদ ভেবে চায়ের কাপে তুফান তুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু যাওয়ার জন্যে পাসপোর্ট লাগলেও ঢাকা একটা সত্যিকারের ত্রাসের সঞ্চার করতে পেরেছে।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুনিধন কিছু নতুন ঘটনা নয়। বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে। ব্লগার, হিন্দু পুরোহিত, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, মোদ্দা হিসেব দেশটির ধর্মীয় সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মধ্যে মতাবলম্বী হও নচেৎ পৃথিবী ত্যাগ করার জন্যে তৈরি থাকো এই মনোভাব বেশ প্রকট। এই অবধি ঠিক ছিল, দুম করে কেউ একটা মাথায় বাড়ি বসিয়ে ঘিলু বের করে দিল, এটা তো অসংগঠিত ক্রাইম। কোথায় না হচ্ছে। এত সব নিয়ে ভাবতে গেলে তো বেঁচে থাকাই দায় হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই হত্যালীলা যদি পূর্বপরিকল্পিত এবং সুসংগঠিত হয় খুব স্বাভাবিকভাবেই ভয়ের কারণ হয়ে ওঠে। যে মেট্রোরেলে করে অফিস পৌঁছই সেটা যদি একদিন হঠাৎ চ্যানেলে দাঁড়িয়ে যায় বা যে শপিং মলে ব্যক্তিগত কাজে নিত্য যাতায়াত করতেই হয়, সেখানে উপস্থিত থাকাকালীন এক বা একাধিক ব্যক্তি যদি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে তাহলে কি হতে পারে। ঢাকাতে না হয় ধর্মীয় পরিচয় জানার দায় ছিল, এই কলকাতা শহরে কি সেটা আদৌ থাকবে।

অতএব মনের মধ্যে সর্বধর্মসমন্বয় থাকলেও ভয়টা গেড়ে বসেছে। ভয় যে শুধু এই মাত্র আধাঘণ্টার আকাশযাত্রার মধ্যে নৃশংস ঘটনাটির জন্যে গেড়ে বসেছে এমনটা নয়, এর আরও কারণ আছে।  

ভাষার তফাৎ নেই। পাশের মানুষটাকে আগামীকাল বিশ্বাস করতে পারব তো ? বিশেষত যখন খবর পাচ্ছি ধৃত এক জঙ্গি স্রেফ হাত মকশো করবে তিনটে মানুষ খুন করবে বলে ঠিক করেছিল। প্রতিদিন অনায়াসে এক মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল দিয়ে যাতায়াত করি, এখন কি একইরকম থাকতে পারব ? সন্দেহের চোখ এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াবে না সেই নিশ্চয়তা দেওয়া তো কঠিন হয়ে উঠল।

এই ভয়টা ক্রমেই বেড়ে উঠছে আরও এই কারণে যে ডামাডোলের বাজারে গণমাধ্যমের তরফে একটা থিওরি ভাসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সেই থিওরি হল – ঢাকার এই হত্যালীলা আসলে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়। হাসিনা সরকারকে অস্থির করে তোলার জন্যেই এইসব ঘটানো হচ্ছে। রীতিমত বিস্ময়কর বালিতে মুখ গুঁজে রাখার এই প্রচেষ্টা। হতেই পারে বাংলাদেশ সরকারকে অস্থির করে তোলার জন্যেই এই উদ্যোগ। এবং এর দ্বারা সেই কার্য সমাধাও হয়ে গেল। তারপরে ? উদ্যোগ কি এখানেই শেষ হবে ? আপাতত হালচাল দেখে তো মনে হচ্ছে তার কোনও সম্ভাবনাই নেই।

ভয় আরও একটা কারণে। দীর্ঘদিন ধরে জানানো হয়েছিল যে শিক্ষার অভাব, দারিদ্র নাকি এইসব অসভ্যতার মূল কারণ। কিন্তু সেই গুড়ে বেশ ভালমত বালি ছড়িয়ে পড়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই বিষয়ে রাষ্ট্রের চিন্তা ভাবনা একটা ঘটনাতেই পরিষ্কার। দিন কয়েক আগে দিল্লির নির্ভয়াকান্ডে সাজাপ্রাপ্ত যে নাবালকটির মুক্তি ঘটেছে সে নাকি সংশোধনাগারে থাকাকালীন এই সব কাজে উৎসাহী হয়ে ওঠে। পুরো ব্যাপারটা দাঁড়ালো এইরকম, যে রাষ্ট্র ছেলেটির সংশোধনের দায়িত্ব নিয়েছিল তাতে যে সে শুধু ব্যর্থ তাই নয়, উল্টে আরও একজন সম্ভাব্য বিপজ্জনক সন্ত্রাসবাদী তার সামনেই তৈরি হয়ে গেল। এই ঘটনা একটাই ঘটেছে এটা মেনে নেওয়াই যায়, কিন্তু সেই মেনে নেওয়ার পেছনে যুক্তির চেয়ে আবেগের ভূমিকাই বড় হয়ে ওঠে। 

অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে সংবিধানের প্রস্তাবনায় যে ধর্মনিরপেক্ষতা-র উল্লেখ রয়েছে তাকে বেশ অনুশীলিত চেষ্টায় সর্বধর্মসাপেক্ষ বানিয়ে তোলা গেছে। দুর্জনেরা অবশ্য বলে থাকেন – সাম আর মোর ইক্যুয়াল। সেসব কথায় কান না দিয়েও বলা যায় অবস্থাটা পাল্টানোর সময় একেবারে না পেরিয়ে গেলেও কাছাকাছি এসে গেছে, এখনই সতর্ক না হলে অনেক বড় বিপদ অপেক্ষা করে আছে।

আমার ভেতর থেকে ভয়ের বাতাবরণ দূর করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ সন্দেহ নেই, তার চেয়ে সামান্য সহজ কাজ আমার বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, ফলত মনে হচ্ছে জাকির নায়েককে নিয়ে ন্যাকামি বন্ধ করে সেই দিকে একটু নজর দিলে উচিত কাজ হবে।

সেক্যুলারিজম ছুঁয়ে বলছি
  • 5.00 / 5 5
1 vote, 5.00 avg. rating (91% score)

Comments

comments