এই লেখাটি একদিন সংবাদপত্রে পূর্ব প্রকাশিত। জানি যে – নিয়ম কানুন ঠিকঠাক মানা হল না। কিন্তু আমার মনে হল অনেকেই পড়ে নি লেখাটা। তা সে খাদ্য হোক বা অখাদ্য হোক বিনিময় তো করা যায়। ব্লগে দিয়ে ফেললাম। অ্যাডমিনরা চাইলে অবশ্যই উড়িয়ে দিতে পারেন। তবে এটুকু অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে ভালোই লাগবে আমার।

পাহাড়ে যখন বৃষ্টি নামত… হয়তো তখন আমরা খোলা মাঠে। দূর আকাশ বেয়ে বেগে ছুটে আসছে জলের চাদর । ছুটে আসছে স্তিমিত আকাশের নীলচে বৃত্তের ব্যাস ছোট করে। অদ্ভুত সে দৃশ্য । তুখোড় তুলির আরামে বুক চিরে , চিকমিকে রোদ্দুর মাখা কুয়াশার মত কোন ত্রিমাত্রিক দানব অবয়ব। বুকের ভেতর লড়াই আর অনবরত ঢিপঢিপ , কে জিতবে ! ওই হুড়মুড় করে এসে পড়া বৃষ্টির ফোঁটাগুলো নাকি আমাদের ছটফটে পা। তাই দিক আন্দাজ করে হাতে চপ্পল নিয়ে ভোঁভোঁ দৌড়। প্রায় অসম প্রতিযোগিতা। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ-টাদ জেনে ওঠার বয়েস হয় নি তাই কখনো সখনো জিতেও যাওয়া যেত। বৃষ্টি আমাদের কব্জায় এনে ভিজিয়ে ফেলবার আগেই আমরা ছাউনি খুঁজে নিয়েছি। কোন পুরনো দেওয়ালহীন একচালা অথবা চিলতে মুদির দোকান। প্রায় তক্ষুনি ঝরঝর শব্দে দোকানে টিনের চালার কেঁপে ওঠা এবং নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে , পাঁচ পয়সার লজেন্স চুষতে চুষতে ওপরের দিকে মুখ তুলে অসীম প্রতিযোগীকে মেপে নেওয়া । সবটাই প্রায় একসঙ্গেই ঘটে যায় । একটু পরেই ঝকমকে জলের ছোট বড় স্রোত নীচের দিকে বয়ে যাবে । সবুজ ঘাস শুধু কিছু মুহূর্তের স্মৃতি ধরে রাখবে ফোঁটায় ফোঁটায় । বাকি সব জল কোথায় যায় সেটা তখনো হাফপেন্টুল অবতারে আমরা কেউ জানি না বা কৌতূহলও নেই । তার ওপর ভূগোল বইটা নিতান্ত অখাদ্য লাগে ।
শুধু এটুকু জানি যে একটু পরেই আবার আকাশ ভেঙ্গে রোদ উঠবে। ভেজা ঘাসের আড়াল থেকে লুকোনো সবুজ , ধুসর পঙ্গপালের দল চরতে বেরোবে । ছোট পোকা ধরে খাবার আসায় এসে জুটবে রঙ বেরঙের শিকারি ফড়িঙ । চোরকাঁটাগুলো আমাদের পায়ে সুড়সুড়ি দেবার আশা ত্যাগ করে খানিকক্ষণ ঝিমিয়ে থাকবে । আর নিখাদ সবুজের মাঝে মাঝে অল্প জমে থাকা ছলাৎছল জলের মিনি পুকুর পেয়ে গেলে আমরা ফুটবল সহ দস্তুর মত জলকেলি করব । যদিও রাস্তাঘাটে ততক্ষনে আর জল নেই । শুকনো নুড়ি পাথরের স্তুপ দেখলে বোঝাও যায় না সামান্য আগেই বৃষ্টি হয়ে গেলো। আরও ওপরের পাহাড় থেকে কেনাকাটার জন্য নেমে আসা টুকটুকে ফর্সা গালের নেপালি মেয়েরা লাল নীল বর্ষাতি , শিলিগুড়ির হংকং মার্কেট থেকে সদ্য কেনা ফুলকাটা সস্তা ছাতা গুটিয়ে ফেলেছে । হাটের আলসে দোকানী ঘুমের নেশায় বিকেল বিকেল বাড়ি যাবে বলে দোকান গোছাতে ব্যস্ত। দূরের ছোট্ট রেল ষ্টেশনটায় ধীরে সুস্থে ইঞ্জিন স্টার্ট নেওয়ার আওয়াজ। হাতে গোনা চায়ের ঠেক আধভেজা সিগারেট আর উষ্ণ তরলের ধোঁয়ায় একাত্ম। বৃষ্টির দমকা ভিজিটে সবকটা মোমোর দোকানে আকুলি বিকুলি ভিড়। ভিজে যাওয়া ঠাণ্ডা শরীরটাকে সেঁকে নিতে গরম সূপ । তারপর হয়তো আবার বৃষ্টি । কিন্তু বৃষ্টি যদি অলসতায় একটু শুয়ে বসে যেতে চায় ?
সে তো বেশ কিছুদিনের ধাক্কা । তার এক্কেবারে কুম্ভকর্ণের ঘুম । সাথে সাথে আমাদেরও রোজ ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখা জানালার কার্নিশে জলছবি। কাঁচের মধ্যে প্রতি মুহূর্তে নিত্য নতুন আলপনা । শুরু হতে হতেই ধুয়ে যাচ্ছে নতুনের আশ্বাসে । গাছের পাতা থেকে পাতায় প্রবাহিত হচ্ছে প্রান। একটা কাঁঠাল গাছের ভেজা গুঁড়ির মধ্যে দিয়ে একেবেকে হলুদ-কালো সাপ। অনবরত পাখীর ডাকের মাঝে মাঝে অন্তরার মত টিনের ওপর গাছ থেকে আম পড়ার শব্দ । কেন যে কখনো ভাবি নি ছবি তুলে রাখবার কথা, শব্দ রেকর্ড করে রাখবার কথা । এই ক্ষণজন্মা সৃষ্টি মানুষের হাতে হওয়ার যো নেই যে । ক্যানভাসে হোক না যতই সুরিয়ালের ছড়াছড়ি ; এতটা ভাবতেই পারে না মানুষ। কে জানে ? সৃষ্টি বাঁচিয়ে রাখবার দায় থাকলে হয়তো এসব কাছে ঘেঁষে না ।
দূরে একটা ছেঁড়া হলুদ ফ্রক পরা মেয়ে বৃষ্টির তালে তালে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে । সারাদিন ভিক্ষে করার আর উপায় নেই ধরে নিয়েই তার মা একটা গাছের নীচে বসে মনে হয় ঘুমিয়েই পড়েছে । হঠাৎ করে সবকিছু গুলিয়ে এক হয়ে যায় , কোন এক দুপুর বেলায় ছুটি ছুটিতে দেখে ফেলা সাদা কালো সিনেমায় প্রবল ঝড় বৃষ্টির তাণ্ডবের মাঝে দুগগা নামের একটি শ্যামলা মেয়ের সঙ্গে। তারও তো আগামীর নিশ্বাসে মৃত্যু ছিল । হয়ত এরও… ।
ইউনিফর্ম বারান্দার এক কোনে দড়িতে ঝুলন্ত ভিজে বেড়াল। স্কুলে গেলে তো নির্ঘাত রেনি ডে। সব্বাই জানে। তবুও তাড়া কিসের স্কুলে যাওয়ার ? সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট এর শুকিয়ে যাওয়ার দিকে কিসের এত নেকনজর ? রঙ পেন্সিল ভালো জিনিস। কাউকে ডেকে দু হাত ক্যারামও নিশ্চিন্তে খেলে ফেলা যায় । কিন্তু সেটা নিয়ে আর কতক্ষন বসে থাকা ? টিভিতে একটাই ঝিরঝিরে চ্যানেল । কে একটা গম্ভীর মত লোক আর একজন চশমা আঁটা দিদিমনি এসে যখন তখন দেশ ও দশের কাহিনী শোনান । তাতে আমার আপ্লুত হওয়ার মত কিছু থাকে না । তার ওপর কারেন্ট লুকোচুরি খেলে চলেছে । এমন অবস্থায় স্কুলটাই নিরাপদ আশ্রয়। মাস্টারদের ধুতি পাঞ্জাবী পরাটা আমাদের অ্যাডভান্টেজ। বেশি বৃষ্টি হলে কোঁচা সামলে স্কুলে আসার রিস্ক নেবেন না তারা। ব্যাস। জলের মধ্যে দাপাদাপি আর খুচরো সাইকেল নিয়ে সার্কাস , কে কতটা লায়েক হয়েছে তা দেখানোর প্রতিযোগিতা আর ডাকব্যাগের ভেতরে থেকেও ভিজে সপসপে অঙ্কের খাতার নিউমোনিয়ার হাত থেকে রেহাই নেই।
বৃষ্টি নিজের মর্জি মত কয়েক মিনিট বিশ্রাম নিলে রাস্তাঘাটে বেতিক্রমি সামান্য কিছু কেজো লোকদের ছাতাহীন চলাচল , বাজারে তাড়াহুড়োর কেনাকাটা , বড় বড় গাছের নীচে ফল কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য বিচ্ছুদের দৌড়ঝাঁপ , বাগানের আদিবাসীদের থোকায় থোকায় ঘরে ফেরা। চা বাগানের ভাঁজে পাড়ার দাদাদের লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খাওয়া দেখে ফেলায় অজ্ঞাত আনন্দ। এভাবেই চলতে থাকে সূর্যের আসা যাওয়া। ক্যালেন্ডারে শুধু পাতা বদলায় । আরও জবুথবু করে চেপে ধরে বৃষ্টি ।
রাতের পর রাত নিকষ অন্ধকার । মেঘ ডাকতে শুনলেই বিদ্যুতের লাইন কেটে যাওয়াটাই নিয়ম এখানে। বড় কিছু হয়ে গেলে রাতের বেলা সামলাবে কে ! জানালার বাইরে শুধু ঝিলিক কেটে যাওয়া বিদ্যুৎ আর হাড় হিম করা মেঘের থ্রেটনিং । ঝরঝর বয়ে যাওয়ার বিরাম নেই। ঝোড়ো হাওয়ায় হঠাৎ হ্যারিকেনের আলো প্রায় নিভে যেতে যেতেও শেষ আত্মসম্মান নিয়ে থমকে দাঁড়ায়। পড়ার বই খোলা পড়ে । মন ঘড়ঘড়ে রেডিওতে। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য ঝর্ণার মত গাইছেন – “ ঝিরঝির-ঝির ঝিরঝিরি বরষায় , হায় কিগো ভরসায় …আমার ভাঙা ঘরে তুমি বিনে… ” ।
এমনি সময়ে শুনলে কি হত জানি না। কিন্তু ওই দুর্যোগের রাতগুলোতে কিশোর মনে রোমান্টিকতা থাবা গেড়ে বসে। হয়তো লিখতে শিখে যায় দু একটা কবিতার মত কিছু। সেখান থেকেই ভাঙতে শেখে কল্পনার আগল । হয়তো এরপর যখনই পা পড়বে তা হবে কিছু না কিছু পেরিয়ে যাওয়ার জন্য । মা খেতে ডাকলে দার্শনিকের মুগ্ধতা ভাঙে ।
সময়ের সাথে চলাচল বদলে গেছে । বৃষ্টি আজ শহরমুখী মনকে আর খেলতে ডাকে না । স্বপ্ন আছে , কিন্তু জটিল মন্তাজে । অঙ্ক আছে , কিন্তু ভীষণ বাস্তবে । খোলা মাঠে নয় , কুরিয়ারের ঠিকানা আছে চার দেওয়ালে …শুধু মাঝে মাঝে কংক্রিটের বস্তী ঘেরা রাজপথ দিয়ে যেতে যেতে দৈবাৎ একটা ঘাসফড়িঙ হাতে এসে বসলে সেটার দিকে কিছুক্ষন নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকি।

সেদিন বৃষ্টি ছিল
  • 4.50 / 5 5
4 votes, 4.50 avg. rating (88% score)

Comments

comments