এই মাঝ চল্লিশেও স্বপ্নে কেন যে মাঝে মাঝেই হারিয়ে যাওয়া কৈশোর ধাক্কা মারে বুঝতে পারিনা। বড়ডাঙ্গার মাঠ পেরিয়ে হাসপাতালের গা ঘেঁষে, বিনুদের আমবাগান আর নীলকর সাহেবদের বাংলোর ধ্বংসাবশেষকে পাশ কাটিয়ে লাল মোরাম বেছানো যে কাঁচা রাস্তাটা কাটোয়া-বর্ধমান ছোটরেলের লাইন পেরিয়ে দিগন্তরেখায় মিশে যেত, সেটা যে কোথায় শেষ হয়েছে বা আদপেও ওই রাস্তার কোনও শেষ আছে কিনা জানা হয়নি আজও। ওই রাস্তার পাশেই তো মামার বাড়ির চাষের জমি। ভট্ ভট্ শব্দ করে শ্যালো মেশিন জল ঢালছে জমিতে আর ছোটমামা দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করছে চাষের। ছোটমামার জমির আখগাছগুলো লম্বায় আমাদের মাথা ছাড়িয়ে যেতেই বুঝতুম আখে রস এসেছে। মামার বাড়ির রাখাল শঙ্করদা, যে আমাদের পেয়ারা গাছের ডাল দিয়ে ডাণ্ডাগুলি অথবা পাখি মারার জন্যে গুলতি বানিয়ে দিত, সেই শঙ্করদার কোমরে সব সময় গোঁজা থাকতো একটা কাস্তে। সেই ধারালো কাস্তে দিয়ে দু’তিনটে আস্ত আখগাছ গোঁড়া থেকে কেটে সেগুলোকে এক-দেড় ফুটের ছোটছোট টুকরো করে আমাদের হাতে দিতেই এক দৌড়ে তালগাছে ঘেরা ঘোষাল পুকুরের পাড়ে। চিবিয়ে চিবিয়ে রস খেয়ে আখের ছিবড়েগুলো পুকুরের জলে ফেললেই শুরু মাছের খাবি খাওয়া। ঘোষাল পুকুরের টলটলে কালো গভীর জলে দেখতে পাচ্ছি আখের ছিবড়েতে ঠোকর মারছে বড় বড় রুই-কাতলা অথবা কালবাউশ। আখ শেষ করেই মুখটা ভীষণ মিষ্টি হয়ে যেতেই হঠাত হানা কড়াইয়ের খেতে। শুঁটি ছাড়িয়ে কড়াই চিবোতে চিবোতে ক্রমাগত হাঁটা, সেই ছোটলাইনের লেভেলক্রসিং পেরিয়ে মুসলমান পাড়ার মসজিদের গম্বুজে বাঁধা মাইকের চোঙা থেকে ভেসে আসা আজানের উদাস মন খারাপ করে দেওয়া সুর শুনতে শুনতে ক্রমাগত হেঁটে যাওয়া সেই লাল মোরাম বেছানো কাঁচা রাস্তাটা ধরে, যেটা মিশে গেছে সেই দিগন্তরেখায়, যেখানে রোজ হারিয়ে যেতে দেখি সারাদিনের পরিশ্রম ক্লান্ত কমলা সূর্যকে, যে রাস্তা শেষ হওয়ার আগেই এলার্মক্লক জানিয়ে দেয় স্বপ্ন ছেড়ে এবার বাস্তবে ফেরার সময় হয়েছে। ভোর ছ’টা বাজে মেয়েকে স্কুলে ছাড়তে হবে……

স্কুলে যাওয়ার পথে মেয়েকে প্রায়ই শোনাই আমার সেই শেষ না হওয়া মেঠো পথের গল্প। গল্পটা যে শুধুই আমার ছেলেবেলার, সেটুকুই শুধু বলি মেয়েকে, স্বপ্নের কথাটা বেমালুম চেপে গিয়ে। স্বপ্নটা যে ভীষণ ব্যক্তিগত, ভীষণ গোপন, জানাজানি হয়ে গেলে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় যে নিজের কাছে নিজেই। মেয়ের সঙ্গে যখন আমার কৈশোরের অনুভূতিগুলো ভাগ করে নিই তখন যেন ঠাকমার ধানের মড়াই কেটে বের করে নেওয়া ধান বেচে কিনে খাওয়া নুন মেশানো তেঁতুলের স্বাদ পাই। আসলে আমার চোখেই মেয়েকে দেখাতে চাই আমার সেই ঘোষাল পুকুরের মাছের খাবি খাওয়ার অথবা নীলকর সাহেবের ভূতুরে পোড়োবাড়িতে সাপের তাড়া খাওয়ার চিত্রকল্প। মেয়ে কখনও চোখ গোলগোল করে শোনে আবার কখনও বা দায়সারা গোছের “ওহ্! আচ্ছা! তাই?” উত্তর শুনে বুঝতে পারি হয় আমার গল্পে বিশ্বাস করল না অথবা আমাদের বৈচিত্রহীন কৈশোরের গ্রাম্য জীবনের গল্পে কোনও আগ্রহই নেই। তবুও বলে যাই। নাঃ! আমার গল্পে মেয়ের বিশ্বাস জাগানোর জন্যে নয়, বলে যাই মেয়ের চোখ দিয়ে যদি আমার সেই প্রভাতের বাস্তব আর অপরাহ্ণের অসমাপ্ত স্বপ্নের সেই কোনও দিনও শেষ না হওয়া পথের শেষটা দেখা যায়!

******

বাবার আর মার পৈতৃক বড়ি একই গ্রামে, আমার স্বপ্নে বারবার ঘুরেফিরে আসা, আমার কৈশোরের বনকুল-খেজুরগুড়-নারকেলনাড়ুর গন্ধমাখা শ্রীখণ্ড। ‘পৈতৃক’ কথাটা কিন্তু আমাদের কাছে নিতান্তই আক্ষরিক। আরও সবার মত মার পৈতৃক বাড়িকে মামাবাড়ি বললেও বাবার পৈতৃক অর্থাৎ দাদুর বাড়িকে, কেন জানিনা, ‘ঠাকমার বাড়ি’ বলেই ডাকতুম। হয়তো সংসারে ঠাকমার প্রশ্নাতীত কর্তৃত্বের জন্যেই বাড়িটাকে ঠাকমারই মনে হত। বাড়িতে খড়খড়ি দেওয়া লম্বা লম্বা জানলা-যুক্ত বেশ কয়েকটা বিশাল বিশাল পাকা ঘর ছাড়াও বাড়ি সংলগ্ন মাটির অতিথি নিবাস, যাকে আমরা বাংলাবাড়ি বলতুম, সব থাকা সত্ত্বেও আমার স্বপ্নে ফিরে ফিরে আসে সেই বিশাল লম্বা আর উঠোন থেকে অনেকটা উঁচু কালো বর্ডার দেওয়া চকচকে লাল মেঝের বারান্দাটা। যেখানে গ্রীষ্মের সন্ধেয় আর পাখার দরকার হত না। উন্মুক্ত দক্ষিণ দিয়ে লালদিঘীর ঠাণ্ডা হাওয়া জোড়াতালতলার যমজ তালগাছদুটোকে ছুঁয়ে দিয়ে আছড়ে পড়তো আমাদের সেই বারান্দায় আর আমাদের পিঠের ঘামাচি মারতে মারতে ঠাকমা গলা উঁচিয়ে মায়ের কাছে জানতে চাইতো রাতের রান্না হতে আর কতক্ষণ, আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা হাতা খুন্তির টুংটাং শুনতে শুনতেই আমাদের সারাদিনের পরিশ্রম ক্লান্ত চোখ জুড়িয়ে আসতো ঘুমে। টিমটিমে লন্ঠনের আলোয় ওই উঁচু দরদালানে তালপাতার চাটাই পেতে শুতুম সবাই মিলে আর কখন যে ঘুমিয়ে পড়তুম জানতেও পারতুম না। ঘুমের ঘোরেই বাড়ির বড়রা কখন যে ঘরের ভেতর নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিত বুঝতুম না।

উঁচু দরদালান থেকে দু’তিনধাপ সিঁড়ি ভাঙলেই পাঁচিলঘেরা ইঁটবাঁধানো বিশাল উঠোনটা। ওই উঠোনটাই যেন ঠাকমার বাড়ির মধ্যমণি। পূর্বদিকে সেই বুড়ো নীম, পেয়ারা আর কূল গাছটার পেছনেই খড়েরচালের বাংলাবাড়ি, যার চালভরা তেলাকচু আর পুঁইলতা যেন আলপনা এঁকে রেখেছে। সরস্বতী পুজোর মাসখানেক আগেই পাকা কুলে ভরে যেত ঝাকড়া কুলগাছটা। ঠাকমার কড়া আদেশে সরস্বতী পুজোর আগে গাছের নিচে পড়ে থাকা কুল খাওয়া ছিল একেবারেই নিষিদ্ধ, তাই সেই কুলগুলোই শঙ্করদার বানিয়ে দেওয়া গুলতিতে ভরে পাখি মারার কাজে লাগতো। অবিশ্যি সকলের নজর এড়িয়ে দুয়েকটা লালচে রঙ ধরা টোপাকুল যে মুখেও ঢুকত না তা নয়, তবে ঠাকমার বানিয়ে দেওয়া নুনঝাল মাখিয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে কুল খাওয়াটা জমত সরস্বতী পুজোর পরের দিন থেকেই। উঠোনের পশ্চিমদিকে খড়ের দোতলা মাটকোঠার একতলায় রান্না আর ভাঁড়ার ঘর আর তার ঠিক পেছনে কুয়োতলা পেরলেই আমাদের আমবাগান। দশ বারোটা আমগাছের মাঝেই সেই বাতাবিলেবুর গাছটা, যে গাছের বাতাবিলেবু খাওয়ার থেকেও বেশি ফুটবল হিসেবে কাজে লাগতো। উঠোনের একদিকে নীম আর পেয়ারা গাছ আর অন্যদিকে রান্নাঘরের খড়ের চালের বাঁশের খুঁটি হয়ে যেত গোলপোস্ট। আমরা চারভাই আর পাড়ার চিনি, নীলু, বিলে ইত্যাদি মিলে দু’দলে ভাগ হয়ে শুরু হয়ে যেত বাতাবিলেবু দিয়ে ফুটবল। খেলা চলতো ততক্ষণ, যতক্ষণ না বাতাবিলেবু গিয়ে উল্টে দিত মুড়ি ভাজার চালভর্তি গামলা আর হাতা নিয়ে তেড়ে আসতো ঠাকমা।

******

কলকাতার ফ্ল্যাট কালচারে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম ভাবতেও পারেনা কোনও বাড়িতে অতবড় উঠোন থাকতে পারে, যেখানে জনাদশেক বন্ধু মিলে ফুটবলও খেলা যায়। আমার মেয়েও মানতে চায়না আমার সেই উঁচু দরদালানের, সেই ইঁটবাঁধানো উঠোনটার অস্তিত্ব। নিজের ছোটবেলাটা যে শুধুই আমার কল্পনা নয় আমার নিজের অস্তিত্বও, যা আজও আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা আছে সেই উঠোনের প্রতিটি কোনে অথবা সেই দরদালানের সন্ধে বেলার দখিনা বাতাসে সেটা বোঝাতেই অথবা নিজেই আরও একবার নিজের কৈশোরের প্রতিবিম্বের মুখোমুখি হতেই ঠিক করলুম মেয়েকে নিয়ে হাজির হব আমার সেই ফেলে আসা কৈশোরে, আমার স্বপ্নে ফিরেফিরে আসা শ্রীখণ্ডে। প্রায় একযুগ পরে মেয়েকে নিয়ে কাটোয় স্টেশনে দুকামরার ছোটলাইনের ট্রেনে চাপতেই ছন্দপতন। সেই স্টিম ইঞ্জিন এবং কাঠের বগি উধাও। অনেকটা কলকাতার রাস্তায় চলা ট্রামের মত দেখতে ডিজেল ইঞ্জিনে টানা ছোট ট্রেন। এই ট্রেন চলেও অনেক বেশি জোরে। ছোটবেলার ছোটলাইনের চলন্ত ট্রেন থেকে নেমে লাইনের ধারের ঝোপ থেকে বনকুল তুলে আবার ট্রেনে ওঠার যে গল্প মেয়েকে শুনিয়েছি বেশ কয়েকশো বার তা আর মেয়ের কাছে বিশ্বাস্য থাকবে বলে আর মনে হচ্ছে না। মেয়ের দিকে তাকাতেই কেমন যেন মনে হল আমার দিকেই তাকিয়ে মুচকি হাসছে। ধরা পড়ে যাওয়া অপরাধীর মত চোখ সরিয়ে নিলুম লজ্জায় নাকি অজানা কোনও আশঙ্কায়, তা নিজেই বুঝলুম না। ট্রেন শ্রীখণ্ড ষ্টেশনে থামতেই মেয়ের হাত ধরে ষ্টেশনে পা দিতেই নজরে এলো পরবর্তী চমক। যেন ভোজবাজীর মতই উধাও সেই এঁকে-বেঁকে সবুজ ধেনোজমিকে দুই প্রান্তে রেখে সোজা গ্রামের দিকে চলে যাওয়া মাটির রাস্তাটা, ওটা এখন ঝকঝকে পিচরাস্তা। সেখানে আজ গরুরগাড়িও চলে না, তার জায়গা নিয়েছে তিনচাকার সাইকেল-রিক্সা। একটা রিক্সায় দু’জনে বসে রিক্সাওয়ালাকে বললুম,
- “জোড়াতাললা চেনো?”
রিক্সাওয়ালা ঘাড় হেলিয়ে চলতে শুরু করল। রাস্তার দুধারে ধেনোজমি থাকলেও মাটির বাড়ি আর চোখেই পড়েনা প্রায়। মুসলমানপাড়াকে পেছনে ফেলে, মামাবাড়িকে পাশকাটিয়ে রিক্সা জোড়াতালতলার সামনে অসতেই স্বপ্নে বেঁচে থাকা আমার সেই কৈশোর যেন আচমকাই আমার কাছেও ভীষণ অপরিচিত হয়ে গেল। জোড়াতালতলার সেই যমজ তালগাছ দুটোই আর নেই, মাঠের মাঝখানেই আমারই এক কাকা পাকা বাড়ি তুলেছেন। কেমন যেন বীভৎস কুৎসিত দেখাচ্ছে আমার স্বপ্নময় কৈশোরের স্মৃতিগুলোকে। মাঠের একফালি যে অংশটুকু অবশিষ্ট আছে সেটুকু দ্রুত পায়ে পেরিয়ে এসে ঠাকমার বাড়ির বারদরজাটা খুলে আমার স্বপ্নেদেখা উঠোনে পা দিতেই সারা শরীর যেন অবশ হয়ে গেল। মেয়ের হাতটা শক্ত করে ধরে নিশ্চল পাথরের মত লক্ষ করলুম একটা বুক সমান উঁচু পাচিল আড়াআড়িভাবে চলে গেছে উঠোনের মাঝখান দিয়ে একেবারে সেই লালমেঝের দরদালান বরাবর। বাড়ির মানুষগুলোর মতই ভাগ হয়ে গেছে সেই নীম, পেয়ারা অথবা কুলগাছটাও। বুঝতে পারছি বুকভাঙ্গা কান্নার একটা অদম্য ঢেউ আটকে আছে গলার কাছে। মেয়ের হাত ধরেই ঘুরে বেরিয়ে এলুম বারদরজা দিয়ে। আবার সেই তালগাছহীন জোড়াতালতলার একফালি মাঠটা পেরিয়ে পিচ রাস্তা ধরে দ্রুত পায়ে এগিয়ে চললুম, কিন্তু গন্তব্য জানা নেই……

স্বপ্নের ফেরিওয়ালা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments