গত পরশু রাত্রে আমি মারা গেলাম। এইডস হয়েছিল। বছর তিনেক টিকেছিলাম। তারপর আর শরীর নিতে পারলনা। শুনেছি আজকাল নাকি এমন সব চিকিৎসা বেরিয়েছে যাতে এইডস রুগীকে অনেকদিন বাঁচিয়ে রাখা যায়। আমার আর অত পয়সা কোথায়? তাই অগত্যা… চটজলদি মরতে হল। যাগগে সেসব… আসল ঘটনাটা হল মরার পর।

মুশকো জোয়ান একটা লোক এসে বলল “ভাই, আমার সঙ্গে যেতে হবে। উপর থেকে ডাক এসেছে।” কি আর করি, গেলুম ওর পিছন পিছন। কিছুক্ষণ পর এসে হাজির হলাম একটা বিরাট ফটকের সামনে। উপরে বড় বড় করে লেখা “স্বর্গ”। হেব্বি জাঁকজমক করে সাজানো গেট খানা। এইখেনে ঢোকাবে নাকি আমাকে? অবাক হলাম খুব। আমি নিশ্চিত ছিলাম আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে নরক। সারাজীবন তো পাপ-কাজ করে আর অপরের ক্ষতি করেই কাটিয়েছি। স্বর্গের দেখা পেয়ে তাই অপ্রত্যাশিত একটা আনন্দ হল। মৃদুস্বরে মুশকো লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম “দাদা নরকটা কোন দিকে?” বললে “নরক ফরক সব স্যারের গুপি, ওইরম কিস্যু নেই আসলে”। স্যারটা আবার কেডা? ভাবতেই আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই বোধহয় লোকটা বলল “চল তোমায় স্যারের কাছে নিয়ে যাই।”

গেট দিয়ে ঢুকে একটা বিরাট বড় লবি তে এসে উপস্থিত হলাম। খানদানি হোটেল টোটেলে গেছি অনেকবার, কিন্তু এরকম দেখিনি কোথাও। সে কি বাহার। সোনায় মুড়িয়েই দিয়েছে যেন। লবিটা থেকে এদিক ওদিক অনেকগুলো দরজা বেরিয়েছে। তারই একটা দিয়ে ঢুকে চলতে থাকলাম আমরা। যাওয়ার পথে অপ্সরা ফপ্সরা দেখতে পেলে ভালই লাগত, কিন্তু কোথায় কি। চারিদিক শুনশান। শেষপর্যন্ত এসে হাজির হলাম একটা ঘরের সামনে। ঘরে ঢুকতেই গম্ভীর গলায় কে যেন বলল “সুস্বাগতম!”

**************************

জোব্বা পরা ফ্রেঞ্চকাট দাড়িওয়ালা লোকটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি, পাশ থেকে মুশকো লোকটা কানে কানে বলল “দেখছ কি, স্যার কে প্রণাম কর”। ইনিই কি তাহলে ভগবান? ভাবতে ভাবতে দিলাম একখানা প্রণাম ঠুকে। মাথা তুলতেই শুনি সেই গম্ভীর গলা “হ্যাঁ আমিই।”

“ওহ থ্যাঙ্ক ইউ স্যার…আমায় এই স্বর্গে ঢুকতে দেওয়ার জন্য। আমি ভাবতেই পারিনি আমি…মানে কোনওদিন স্বর্গে…”

“ওরে গাধা, মরলে পরে সবাই এইখেনেই আসে, নরক বলে আসলে কিছু নেই। ওটা আমার অপপ্রচার।”

আড় চোখে পাশের লোকটার দিকে চেয়ে দেখি সে মিটিমিটি হাসছে। আমার মাথা টা কেমন ভনভন করছিল। মিনমিন করে বললাম “কিন্তু স্যার…”

“উফফ বড্ড বকিস তো তুই! সব বুঝবি ধীরে ধীরে। অত তাড়া কিসের? আজই তো তোকে ভাজছিনা। তোকে ভাজব সামনের মাসে। আজ যাদের কড়ায় ভাজছি তাদের মধ্যে আছে তোদের পাড়ার সেই হেঁপো বুড়োটা, যে গত মাসে মরেছিল। হিউম্যান মাঞ্চুরিয়ান বানানো হবে আজ। হে হে…”

“কিন্তু স্যার ওসব কড়ায় ভাজা টাজা তো নরকে…”

“আবার!” এক ধমকে আমায় থামিয়ে দিয়ে ভদ্রলোক বললেন “কতবার করে এক কথা বলতে হবে তোকে? ওইসব প্রচার বাধ্য হয়ে করতে হয়েছে। নইলে মাঝে মাঝে এত মারদাঙ্গা শুরু করে দিস তোরা পৃথিবীতে। ভয় হয় কোনদিন অ্যাটম বোমা মেরে কেউ গোটা পৃথিবীটাই যদি ধ্বংস করে দেয়। তার ওপর এমনিতেই রোজ এত পাবলিক আসছে, ভেজে শেষ করা চাপ হয়ে যাচ্ছে। তাই মৃত্যুর রেট বেশি বাড়তে দিলে চলেনা।”

আমার মুখে কথা ফুটছেনা। কিন্তু সেটার বোধহয় দরকার নেই। উনি এমনিই সব বুঝে যাচ্ছেন আমি মনে মনে যা ভাবছি।

“কি ভাবছিস? আমার সম্পর্কে যা যা জানতিস সব ভুল বেরোচ্ছে? হবেই তো। লোককে আগেভাগেই জানতে দিলে চলবে যে আমি শেষমেশ ওদের কড়ায় ভাজব? তাই অনেক প্ল্যান করে এগোতে হয়। মাঝে মাঝে এজেন্ট পাঠাই পৃথিবীতে। ওই যীশু ফিশু…তারপর ওই যে…তোদের মহম্মদ, বুদ্ধ, সব তো এখান থেকেই পাঠানো। ওই ভোটের আগে যেমন তোদের নেতা গুলো মিথ্যা প্রচার করে না? আমরা এত ভাল ইত্যাদি ইত্যাদি… ওইরকম প্রচার করাটাই উদ্দেশ্য। এজেন্টদের পাখি পড়া করে শিখিয়ে দিই কি বলতে হবে। ওরা সেরকম সেরকম বলে আসে, হিংসা হানাহানি কোরোনা, ভগবানকে ভক্তি কর, তাইলে ভাল হবে। সবই আসলে প্রি-প্ল্যানড।”

আমি বললাম “কিন্তু স্যার সবাই তো আপনাকে হেবি ভক্তি করে। আর লোকে তো বলে আপনি নাকি ভাল লোকেদের স্বর্গে আসতে দেন আর বাজে লোকেদের নরকে পাঠান? এরকম প্রচার করার কি মানে হয়?”

“আরে আসলে আমি দুশ্চরিত্র আর বদমায়েস লোকেদের বেশি ভালবাসি। আমি লোকটা জানিস তো একটু স্যাডিস্ট টাইপের। তাই পৃথিবীতে কেউ কষ্ট পাচ্ছে এইটে দেখতে আমার দারুণ লাগে। তাই তো পৃথিবীতে এত দুঃখ কষ্ট বানিয়েছি। নইলে আমার এত্ত পাওয়ার, চাইলে কি শুধু সুখময় ধরণী বানাতে পারতাম না? কিন্তু দেখলুম শুধু হিংসা হানাহানি বাড়িয়ে দিলে এত বেশি লোক মরবে রোজ রোজ যে আমার কড়ায় আর ধরবেনা। আর তাছাড়া হয়তো মনুষ্যজাতিটাই ধ্বংস হয়ে যাবে মারামারি করে। তখন আবার কষ্ট করে মানুষ সৃষ্টি কর রে…অত খাটবে কে? তাই ওইসব স্বর্গ-নরকের থিওরি প্রচার করেছি”।

“আপনি স্যাডিস্ট?” অবাক হয়ে বললাম আমি।

“তা নয়তো কি? এই যেমন ধর পৃথিবীতে খাদ্য-খাদকের সম্পর্ক তৈরি করেছি। বেঁচে থাকতে চাও তো অন্য প্রাণ ধ্বংস কর… এটাই তো জীবজগতের প্রধান মোটো। তোর কখনও মনে হয়নি পরমকল্যাণময় ভগবান এরকম নিয়ম তৈরি করলেন কেন?”

“তা জোয়ান বয়সে মনে হত মাঝে মাঝে। ওই বিবেকানন্দ না কে একটা বলেছিলেন না যে আমি যদি জগত বানাতাম তাহলে এর থেকে ভালভাবে বানাতাম? ওইটে বেশ মনে ধরেছিল। কিন্তু তারপর মা পইপই করে বলল ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্য। তো সেইটেই মেনে নিলাম। ভাবলাম সত্যিই তো, এরম না করলে পৃথিবীতে এত জীবজন্তু হয়ে যেত যে আর ধরতই না। তো…”

“হাঃ হাঃ হাঃ” অট্টহাস্য করে উঠলেন ভদ্রলোক, “সত্যি তোরা পারিসও বটে। ওই কয়েকটা এজেন্টকে দিয়ে তোদের এমন ব্রেনওয়াশ করিয়েছি যে সবকিছুতেই আমার শুভবুদ্ধি দেখিস। মাঝে মাঝে ভাবলে বেশ তৃপ্তি হয় যে ওদের দিয়ে যা যা প্রচার করিয়েছি সেগুলো বেশ ভাল খেটে গেছে। কেবল ওই দুয়েকটা নাস্তিক শ্রেণীর লোক মাঝে মাঝে একটু ভুলভাল বকে লোককে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে বটে, কিন্তু এখনও অব্দি সেরম কায়দা করতে পারেনি”।

“কিন্তু ধরুন আজ থেকে একশো বছর পর হয়তো বেশিরভাগ লোকই নাস্তিক হবে। তখন?”

“তখন আরেকটা এজেন্ট পাঠাবো, আর কি?” গোঁফের ফাঁকে মুচকি হাসলেন ভগবান।

আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম কি সাংঘাতিক প্ল্যানই না ফেঁদেছেন ভদ্রলোক। কোথায় লাগে অপপ্রচারকারী রাজনীতিবিদ, ইনি তো সব রাজনীতিবিদের বাপ! কেবল একটা জিনিস খটকা লাগল, যদ্দুর মনে হচ্ছে যে ইনি ইচ্ছে মত প্রতিটি লোকের প্রতিটি পদক্ষেপ কন্ট্রোল করতে পারেন। তাহলে এইসব কূটনীতি করে লোককে প্রভাবিত করে তাদের দিয়ে কিছু করানোর চেয়ে তাদের প্রতিটি অ্যাকশন কে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করলেই তো মিটে যেত।

“ওরে ছাগল”, আমার মনের কথা ধরে ফেলে উনি বললেন, “সেটা করতে তো আমি পারিই, কিন্তু পৃথিবীতে কোটি কোটি লোক, সবার পিছনে অত এফর্ট দেব কোন দুঃখে, আমার কি আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, সারাদিন এই সবই করব? সারাদিন ফুর্তি করি, আমার কিছু অপ্সরা আছে তাদের সাথে সেক্স টেক্স করি, উঁহু উঁহু! উত্তেজিত হোসনা, তোর কপালে ওসব জুটবেনা, ওগুলো আমার এক্সক্লুসিভ। মাঝে মাঝে তোরা যেমন ফিল্ম দেখিস, আমি সেরম অবসর সময়ে বসি পৃথিবী অবসার্ভ করতে। একেকদিন একেকটা রিজিয়ন দেখি। একসাথে ৩-৪টের বেশি লোকের উপর কন্সেন্ট্রেট করিনা, বড্ড স্ট্রেস হয়ে যায়। একেকটা লোককে কিছুক্ষণ ফলো করে দেখি সে ব্যাটা আমায় কত ভক্তি করছে, ভক্তি করতে দেখলে হেব্বি মজা লাগে বোকাগুলোর পাঁঠামো দেখে। আর যদি এদের মধ্যে কেউ বদ লোক বেরিয়ে যায় তাহলে তো কথাই নেই, বদমায়েসি আর অন্য লোকের ক্ষতি করা দেখতে কি যে মজা লাগে!”

“আমার কেন জানি খটকা লাগছে…আপনি সত্যিই এরম স্যাডিস্ট সেটা মেনে নেওয়া…”

“হ্যাঁ প্রথম প্রথম ওরম মনে তো হবেই, ছোট থেকে পাখি-পড়া করে সবাই শিখিয়েছে, তার একটা এফেক্ট তো থাকবেই। অন্ধের মত ওদের কথা না মেনে কোনদিন যদি নিজে একটু ঘিলুটাকে ব্যবহার করে দেখতিস, তাহলে এই সম্ভাবনার কথা মাথায় ঠিকই আসত। পৃথিবীতে এত বদ লোক, এত নির্যাতন, এত ধর্ষণ, শিশুদের ওপর অত্যাচার, সব দেখেও তোরা তবু চোখ বন্ধ করে ভেবেই যাস ‘ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্য’। তোদের এই ছাগলপনা গুলো দেখতে দারুণ লাগে।”

“কিন্তু পৃথিবীতে তো কত সুখও আছে, কত আনন্দও আছে, কত সুন্দর সুন্দর…”

“এটা তো মহা এঁড়ে তর্ক করে কিছু না বুঝে! ওরে পাগলা, সুখ কি এমনি এমনি দিয়েছি? দেখ তুই কাউকে যদি সারাক্ষণই দুঃখে রাখিস সে ধীরে ধীরে সেটাতেই অভ্যস্ত হয়ে যাবে, কয়েকদিন পর আর ততটা খারাপ লাগবেনা তার। কিন্তু মাঝে মাঝে সুখের ঝিলিক দিয়ে আশা দেখিয়ে তারপর দুঃখ দিলে? ওহ! পুরো জমে ক্ষীর!” আনন্দে হাতে হাত ঘষতে লাগলেন ভগবান।

আমি ক্যাবলার মত হাঁ করে তাকিয়ে থাকলাম।

“যাগগে তুই এবার ভাগ। আরও অন্য লোকেরা আসছে এখানে, তাদের সাথে একটু বাতচিত করি, তোর সাথেই সারাদিন বকব নাকি? সবার সাথে আমি কথা বলিনা, যে লোকগুলো জীবৎকালে চরম হারামিগিরি করে আমার মনোরঞ্জন করেছে শুধু তাদের সাথেই কথা বলি।”

“এক মিনিট স্যার…আরেকটা প্রশ্ন ছিল…”

“আর কোনও প্রশ্ন নয়, স্যার তোমায় নিয়ে যেতে বলেছেন। এস আমার সাথে” হাঁক পারল যমদূতমার্কা চেহারার লোকটা।
অগত্যা গুটি গুটি পায় বেরিয়ে আসতে হল ঘরটা থেকে।

*************************

আমার জেলখানার মত খুদে ঘরটায় নিয়ে যাওয়ার পথেই পড়েছিল ওই রান্নাঘরটা। মা গো! কি বিশ্রীভাবে ‘জ্যান্ত’ ভাজছে মানুষগুলোকে! আর সবাই বাঁচাও বাঁচাও করে চীৎকার করছে। দেখেই কেমন একটা গা গুলোচ্ছিল। আমি একবার ফিসফিসিয়ে বলার চেষ্টা করেছিলাম লোকটাকে – “আর তো কদিন পর ভাজবেই আমায়, তার আগে একবারটি ওই অপ্সরাদের সঙ্গে…”
শুনেই এমন কড়া দৃষ্টিতে তাকালো আমি চুপ মেরে গেলাম। আবার গিয়ে যদি ভগবানের কাছে লাগিয়ে দেয় তাহলে না জানি আরও কি নৃশংসভাবে মারবে।

যে ঘরটায় আমায় রেখেছে সেটায় প্রায় কিছুই নেই, তাই কিছুই করার নেই বসে বসে ভাবা ছাড়া। সারাদিন বসে বসে ভাবছিলাম ভগবানের এই কুটিল স্যাডিস্টিক চরিত্রের কথা। সত্যি, স্বপ্নেও কখনও ভাবিনি লোকটা এরম হতে পারে! ভাবতে ভাবতে রাগ হতে লাগল। শালা আমি বেঁচে থাকাকালীন যা যা করেছি সেই দেখে তো খুবই মজা লুটেছে, সেই আনন্দটা দু হাত ভরে নিয়েছে, এখন আমার কপালে জুটবে কড়ায় ভাজা ভাজা হওয়া। যত ভাবতে লাগলাম তত মনে হতে লাগল কিছু একটা করতেই হবে লোকটার বিরুদ্ধে। যতই ক্ষমতাশালী হোক, আমিও শয়তানিতে কম যাইনা সেটা দেখিয়ে দেব।
ভেবেই মনে হল, এই রে, আমার মনের কথা সব বুঝে নিচ্ছেনা তো। তারপর এই ভেবে আশ্বস্ত হলাম যে মালটা যেরকম অলস, আমার পিছনে এত এফর্ট দেবেনা। এখন নিশ্চয়ই অন্য কোন কুকীর্তি তে ব্যস্ত।

সারা রাত জেগে একটা চিঠি লিখে ফেললাম। ভগবানের সব কুকীর্তির কথা ডিটেলস-এ লিখেছি তাতে। অনেক হয়েছে, এবারে পৃথিবীর মানুষের জানা উচিত লোকটা আসলে কি। আমার ঘরে আসার সময়ই দেখেছি এখানে একটা ভ্যান আছে যেটায় করে রোববার রোববার পৃথিবীতে কিসব জিনিসপত্র ডেলিভারি যায়। সেটার মধ্যে ফেলে দেব কোনো এক ফাঁকে। ইংরেজিতে লেখা চিঠি, পৃথিবীর কারো হাতে পড়লে আশা করি আশেপাশে কেউ না কেউ বুঝে নেবে। একবার চিঠির মেসেজটা জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক, তারপর দেখছি ছাগলদাড়ি ওলা লোকটা কি করে!

***************************

এক সপ্তাহ পর আমার ডাক পড়ল ভগবানের ঘর থেকে। নিশ্চয়ই আমার চিঠির ফল। খুশি খুশি মনেই গেলাম, নিজে চোখে দেখেছি ভ্যানটা আমার চিঠি সমেত পৃথিবীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছে। যা হওয়ার নিশ্চয়ই হয়ে গেছে, আর ভগবান রাগে আগুন তেলে বেগুন হয়ে আমায় ডেকে পাঠিয়েছেন। আমায় নিয়ে এখন যা করার করুক, আমি আর কিছুতে ডরাইনা।
ঘরে ঢোকার সাথে সাথে গম্ভীর গলায় অভ্যর্থনা করলেন আগের দিনের মতই। তারপর মুচকি হেসে বললেন “আয় বোস…একটা ফিলিম দেখছি, সেইটে তোকেও দেখাব বলে নিয়ে এলাম।” তাকিয়ে দেখি দেওয়ালে ঠিক একদম সিনেমার মতই কিসব দেখা যাচ্ছে। আগের দিনের আলোচনা থেকে আন্দাজ করলাম যে এটা পৃথিবীর কোন অঞ্চলের উপর ফোকাস করেছেন ভগবান। একটা রিমোট দিয়ে একটু জুম করলেন উনি। তাইতে দৃশ্যটা স্পষ্ট হল।  একটা জনসমাগম। একজন লোক বক্তৃতা দিচ্ছে। আরেব্বাস! বাংলা ভাষা বলেই তো মনে হচ্ছে। লোকটা বলছে… আরে, ওর হাতে ওটা কি? আমার লেখা সেই চিঠিটাই না? বেশ রোমাঞ্চ হতে লাগল। কান খাড়া করে শুনতে লাগলাম কি বলছে লোকটা…

“…এই যে চিঠি টা দেখছেন, এটাই সেই চিঠি। এটায় কি লেখা আছে সে তো এতক্ষণ বললাম। কিন্তু বন্ধুগণ, আমাদের বুঝতে হবে এই ষড়যন্ত্রের আসল স্বরূপটা। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম এ আমার কোন নাস্তিক বন্ধুর লেখা। কিন্তু সেই সম্ভাবনা খুব একটা বাস্তবসম্মত নয়। প্রথমত চিঠিটা আমি ঘুম থেকে উঠে মাথার পাশে পেয়েছি, সেখানে রেখে যাওয়া কারও পক্ষে নিতান্তই অসম্ভব। আর তাছাড়া যে কাগজের উপর লেখা সেটাও বেশ অদ্ভুত। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ কে দিয়ে আমরা পরীক্ষা করিয়েছি, তাঁরা সকলেই বলেছেন এটা এমন কোন পদার্থ দিয়ে তৈরি যার হদিস বিজ্ঞানীরা এখনও পাননি। সুতরাং বুঝতেই পারছেন বন্ধুরা, একটা অলৌকিকত্ব আছে চিঠিটার মধ্যে। এখন প্রশ্ন হল এরকম অলৌকিক কোন চরিত্র আছে যে ভগবানের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করবে? একটাই নাম মাথায় আসে…শয়তান! হ্যাঁ বন্ধুরা! এ শয়তানের কাজ। আমার ধারণা এটা শয়তানের একটা চাল। যে ব্যাক্তি চিঠিটা লিখেছেন তাঁকে আসলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল নরকে। সেখানে তাঁর সাথে দেখা করে শয়তান স্বয়ং নিজেকে ভগবান বলে দাবি করে ভগবান সম্পর্কে এইসব জঘন্য কথা বলেছেন। এছাড়া আর কোনও বিশ্বাসযোগ্য সমাধান নেই এই চিঠির। সুতরাং আসুন, আমরা সবাই মিলে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি! দিকে দিকে প্রচার করি এই নারকীয় ষড়যন্ত্রের কথা! যাতে আর কোনও ব্যক্তি ভবিষ্যতে এই ধরনের মিথ্যাচারের শিকার না হন। আসুন আমরা সবাই মিলে……”

আর কিছু কানে ঢুকছেনা আমার। মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম ভগবান মৃদু হেসে আমারই দিকে তাকিয়ে আছেন।

স্বর্গীয় নরক
  • 5.00 / 5 5
1 vote, 5.00 avg. rating (91% score)

Comments

comments