কালো কোট পরা লোকটাকে দেখলেই বোঝা যায় টিকিট চেকার। লোকটা হাত বাড়াল। টিকিট দেখালাম। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে উল্টে পাল্টে আমার টিকিটা দেখল অনেকক্ষণ ধরে। লোকটার চোখে খুব মোটা কাচ লাগানো চশমা। একদম ঘোলাটে ঘষা কাঁচ। বোঝাই যায় না তাকিয়ে আছে না চোখ বুজে। কেমন যেন নির্লিপ্ত মুখ। ঠিক যতটুকু না করলেই নয় দু’টো ঠোঁট ততটুকু ফাঁক করে লোকটা অদ্ভুত ঠাণ্ডা স্বরে জিজ্ঞেস করল,

- “কতদূর যাওয়া হবে?”

- “একদম শুরু পর্যন্ত স্যার….”

আমাকে শেষ করতে না দিয়েই খুব নিঃস্পৃহ অথচ নিষ্ঠুর স্বরে লোকটা বলে উঠলো,

- “টিকিট তো অতদুর নেই। পঁচিশ পর্যন্ত যেতে পারেন…

- “স্যার পঁচিশ? আর একটু সময় দিন না স্যার। এই মাস ছয়েক মতন, এক্সট্রা…”

আমার কাকুতি মিনতিতে খুব বিরক্ত হল লোকটা। খেঁকিয়ে উঠে বলল,

- “মামার বাড়ির আব্দার নাকি? পঁচিশের টিকিট কেটে সাড়ে চব্বিশ? আহ্লাদের আর সীমা নেই। তা এতই যদি সাড়ে চব্বিশের ইচ্ছে তো টিকিট করলেন না কেন?”

- ইচ্ছে তো ছিল স্যার শুরু পর্যন্ত। কিন্তু কি করি, বিশ হাজারের বেশি ছিল না যে। ওতেই যদ্দুর হয় টিকিট কেটেছি। তখন কি জানতাম নাকি পঁচিশেই থামিয়ে দেবেন?”

আমার করুন আর্তনাদ শুনে বোধহয় মায়া হল লোকটার। মুখের কাঠকাঠ ভাবটা একটু শিথিল করে জিজ্ঞেস করল,

- “তা, সাড়ে চব্বিশে গিয়ে কি তীরটা মারবেন শুনি? ইণ্ড্রাস্টিয়ালিস্ট হয়ে যাবেন নাকি ফিল্ম স্টার অথবা দেশের প্রধানমন্ত্রী?”

- “না না স্যার! আপনি যদি ছটা মাস এক্সট্রা দেন তো বিনুকে সত্যি কথাটা বলে আসব।”

- “ওহো সত্যবাদী যুধিষ্ঠির রে! তা কোন সত্যিটা বলবেন?”

- “স্যার! বিনুকে বলে আসব যে আমাকে পুলিশে ধরলেও, সেদিন রাতে যে তিনজন ওকে ঝিলপাড়ে টেনে নিয়ে গেছিল ওরা আমার বন্ধু হলেও ওদের সঙ্গে সেদিন আমি ছিলাম না। আমি বিনুকে সত্যিই ভালবাসতাম”

- “ওহ:! এতদিন পরে বলতে ইচ্ছা করছে? পরের দিন বলেন নি কেন?

লোকটার অসম্ভব শ্লেষ আর তাচ্ছিল্য মেশানো কথায় আমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। আমি লোকটার কলার চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলাম,

- “বলতে তো চেয়েছিলাম। কিন্তু হাসপাতালের মর্গে শুয়ে বিনু কিচ্ছু শুনতে পায় নি। কিচ্ছু না….”

পাষাণ হৃদয় নিষ্ঠুর লোকটারও মনের জমে থাকা বরফ গলতে শুরু করল। বিনাটিকিটেই বাকি ছ’মাস যাত্রার মঞ্জুরি মিলল টাইম মেশিনে।

স্বীকারোক্তি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments