ডিপার্টমেন্ট থেকে মিটিং শেষে বাস ধরব বলে বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছি। মাঝপথেই এক ফোঁটা দু ফোঁটা দিয়ে শুরু করে চড়বড় করে বৃষ্টি চলে এল। ব্যাগ থেকে ছাতাটা ঝট্‌তি বের করে না নিলে ভিজে কাক হয়ে যেতাম। দুম্‌ করে ঠান্ডা লেগে গেলে আর দেখতে হত না! এখানে শরীর খারাপ হতেও ভয় করে। একা হাতে সব কিছু; আমি বিগড়ে গেলে আমাকে যে আমিটা দেখাশোনা করে, রান্না করে দেয়, গল্প করে, বেড়াতে যায় – তাকে প্রচুর miss করব। অগত্যা, ছাতা।
বড় Oak গাছটা রাস্তার ওপর cover করে আছে। ওটার নীচে দাঁড়িয়ে থাকা আমেরিকান ললনাটিকে ছাতার তলায় আসার অফার দেব কিনা ভাবতে ভাবতেই দেখি সে বৃষ্টির মধ্যেই অন্যদিকে দৌড় দিল। আমার এই চিরকাল হার্ড লাক। যাগ্‌গে, আমি যাই বরং বাসস্ট্যান্ডের দিকে। স্ট্যান্ডের ছাউনির তলায় দাঁড়িয়ে তবে স্বস্তি। ছাতাটাকে গুটিয়ে রেখে বসলাম একটু। সামনে Hillsborough Street -এর ওপর অঝোর ধারায় জল পড়ছে; জলের ছিটকে আসা ফোঁটাগুলোকে মাড়িয়ে চলেছে গাড়ির দল। একটা Towhee এ গাছ থেকে ও গাছ করল কিছুক্ষন – যাকে বলে এক্কেবারে উড়ন্ত স্নান। 
বৃষ্টি এলেই মনে কেমন একটা অনুভূতি জন্ম নেয়। ভাল-মন্দ মেশান। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বৃষ্টির কথা কিছু বলি। যতটা মনে করতে পারি। 

"জলে বুট ছপ্‌ছপ্‌, রিকশার পর্দা দিয়ে 'টুকি' "
তখন একটু বৃষ্টি হলেই হসপিটাল মোড়ে জল জমে যেত। রেনকোট গায়ে রিকশায় উঠে পর্দার দড়িটার ওপর দিয়ে রাস্তা দেখার মজাই ছিল আলাদা। অবশ্য যখন খুব ছোট ছিলাম তখন অত উঁচু অব্ধি চোখ যেত না। তখন পাশ দিয়েই অল্প ফাঁক করে উঁকি মারা হত। রিকশার চাকা ছলছে জল কেটে, পাশে একটা বড় গাড়ি গেলেই পুরো সমুদ্রের ঢেউ। পুরী-দিঘা না গিয়েই খোদ নিজের শহরেই সমুদ্রসুলভ পরিস্থিতি তৈরি হওয়াতে মজা বেড়ে যেত দশগুণ। জলে কত কি না ভেসে যেত! জানতাম জিনিষগুলো খুব একটা সুবিধের নয়; ওই জলে বেশিক্ষণ থাকলে পা কুট্‌কুট্‌, তারপর বাড়ি ফিরে অবধারিত একটা "হ্যাঁচ্চো!" তাই রিকশার ভেতরে থাকার সময়টাও যত পারো মজা লুটে নাও। ভেজা পায়ে জুতোর ভেতরটা অদ্ভুত ভারী হয়ে যেত। অস্বস্তি হত কিছুক্ষণ পর। শুকনো জায়গায় হাঁটলেই কেমন ভুস্‌ভুস্‌ আওয়াজ হত বুটে।  
স্কুলের খেলার মাঠটায় ঘাস বলে কিছু কোনোদিন মুখ তুলতে সাহস করেনি আমাদের অত্যাচারে। দেখতে লাগত পুরো Roland Garros-এর মত। বৃষ্টি হলেই অসামান্য রূপ হত তার। গোটা মাঠ জুড়ে অসংখ্য ছোট ছোট নদী, তার শাখা-প্রশাখা বের করে চলেছে মাঠের ধারের পুকুরটার দিকে। ওই মাঠে একবার নামলেই কাদা-প্রিন্ট সাদা জামার গ্যারান্টি দিতাম আমরা। কাউকে হতাশ হয়ে ফিরতে হত না। স্কুলের সামনেই গঙ্গা। বর্ষার জলে ফুলে ওঠা নদীর চেহারাই আলাদা তখন। জলের রঙ হালকা লাল্‌চে হলে বুঝতাম ইলিশ আসছে।
একপশলা বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পরবর্তী সময়টা অসামান্য লাগত। চারিদিকে কেমন প্রশান্তি, মৃদু ঠান্ডা হাওয়া, আর বাড়িতে গরম চা, সাথে একটু পাঁপড় বা চপ হলে তো কথাই নেই। তখনকার দিনে বৃষ্টিতে হাঁটতাম আমরা বৃষ্টিতে ভেজার জন্যই, আজকালকার মতো "no one can see me cry" -এর দমবন্ধ করা পরিস্থিতির শিকার হয়ে নয়।

"ধুর! আবার জল ঠেঙিয়ে যেতে হবে"
লিলুয়া ছেড়ে হাওড়ার দিকে যেতে ট্রেন তো এমনিতে দাঁড়িয়ে পড়েই, তার সাথে বৃষ্টি  হলে তো কথাই নেই। সেই কবে থেকে একটা কথা শুনতাম যে মাঝে মাঝে মনে হত পরীক্ষায় যদি প্রশ্ন আসে " 'কারশেড -এ জল জমেছে' কথাটার ব্যাখ্যা করো", তবে পুরো নম্বর বাঁধা। সকালে বৃষ্টি দেখলেই মেজাজ বিগড়ে যেত। আবার সেই মাঝপথে দাঁড়িয়ে থাকো, খাটালসুলভ হাওড়ার বাস্‌স্ট্যান্ড থেকে শর্ট জাম্প, লং জাম্প দিয়ে জল পেরিয়ে বাসে ওঠো – এসব ভাবলেই মনটা খারাপ হয়ে যেত। জলগুলোও ঈষৎ লাল্‌চে; না, ডাঙ্গায় ইলিশ ওঠেনি, ওগুলো কিছু মহাপুরুষের মুখনিঃসৃত গুটখার অবশিষ্ট সমূহ। পাগল, সিপিয়েম, অ্যান্টি-সিপিয়েম, ট্যাক্সি ইউনিয়ন – সব্বাইকে গালিগালাজ করতে করতে পার্ক স্ট্রিটে নামার পরেও রেহাই নেই। পার্ক হোটেলের সুইমিং পুলটা মনে হচ্ছে সাধারণদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। সত্যি কথা বলতে কি, কোনোদিন মজা পাইনি এই জমা জল ঠেঙিয়ে কলেজ যেতে। এখন অবশ্য ভাবি, একটু মজা পেলে মন্দ হত না। 
বাড়ি ফেরার পথে ট্রেনে জানলার ধারে বসে বৃষ্টি উপভোগ করা খুব একটা হত না। যদিও বা বসতে পারলাম, জানলাটা বন্ধই রাখতে হত। আমি একা না হয় মুখের ওপর water spray-র আনন্দ নিতে না করব না, কিন্তু বাকিরা দেখতাম তাতে মোটেও সায় নেই। অগত্যা! একবার জল মাড়িয়ে সারাদিন ক্লাস করে বাড়ি ফিরেই জ্বর বাধালাম। তবে থেকেই বেশ একটা ভয় কাজ করত। বুঝলাম, ছোটবেলাটা দুম্‌ করে বিদায় নেবার সাথে সাথে আমিও ভিতু হয়ে গেছি।

"তারে গাছ পড়েছে"
পুকুরের ওপাড়ের দিক থেকে বাজের আওয়াজের সাথে সাথেই লোডশেডিং। তা একদিক থেকে ভালই। বাজ জিনিষটাকে আমি বেশ ভয়ই পাই। রাতে বাড়ির সামনের তালগাছগুলোর দিকে তাকালে বেশ ভয় লাগত ছোটবেলায়। কিছুই না, ওই রসের হাঁড়িগুলোকে কেমন যেন ভূতের মাথা মনে হত। সেই তালগাছের একটাই যখন দেখলাম বাজ পড়ার কয়েকদিন বাদে পুরো ন্যাড়া হয়ে গেল, সেদিন থেকে বাজকে বেশ সমীহ করে চলি। একে তো ওই পিলে চম্‌কানি আওয়াজ, তার সাথে দুম্‌ করে ভূতের মুন্ডু উড়িয়ে দিল!
বৃষ্টি  জোরে শুরু হলে একটু নিশ্চিন্তি, আকাশের ঘনঘন টর্চলাইট প্রদর্শন কম হবে। বৃষ্টি থামলেও দেখা যেত তখনও হয়ত কারেন্ট আসেনি। পাড়ার অন্য বাড়িতে খোঁজ, "মাসিমা, আপনাদের লাইট আছে?" না থাকলে ইলেকট্রিক অফিসে ফোন। "তারে গাছ পড়েছে, কাজ করতে লোক গ্যাছে।" ব্যাস, হয়ে গেল। নাও দেখো কখন ফেরে বাবাজীবন। এর মধ্যে আবার টিপ্‌টিপ্‌ শুরু।

"নিম্নচাপ"
বাসে, ট্রেনে, আনন্দবাজারের পাতায় যে শব্দটা এই একটানা বৃষ্টির সময় ঘুরেফিরে আসে সেটা হল নিম্নচাপ। দাদা-ও এক্‌কালে টক্কর দিত, কিন্ত তিনি অবসর নেওয়ার পর টেক্কা মেরে বেরিয়ে গেছে নিম্নচাপ। অবসর নেওয়ার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না অদূর ভবিষ্যতে। জীবনে যে চাপ খালি আমাদের না, প্রকৃতির-ও হয় তার মোক্ষম প্রমাণ এই নিম্নচাপ। নীচে চাপ পড়লে কি কষ্ট সে কি আর আমরা বুঝি না বলুন! তবে একে দেখে সেখা উচিৎ। চাপ এল কি দে ঢেলে ওই মানুষগুলোর ওপর। 'চাপ নিতে না, দিতে হয়, তার সেরার সেরা উদাহরণ। এমনিতেই এক ঘন্টার বৃষ্টিতে কলকাতার পুরোটাই water amusement park হয়ে যায়, তার ওপর এই টানা পাঁচ দিনের বৃষ্টিতে বাড়ি থেকে বেরিয়েই ভেনিস।

"বৃষ্টি = আরো কাছাকাছি"
পুরনো সিনেমা থেকে হালের – বৃষ্টির দৃশ্য অধিকাংশেই এক্কেবারে বাঁধা। কড়্‌কড়্‌কড়াত করে একটু বিদ্যুৎ চমকালেই নায়িকা সোজ্জা নায়কের বুকে। তারপরের দৃশ্য তো চেনা – থম্‌ মেরে যাওয়া নায়ক-নায়িকা, চোখাচোখি। পরের sequence টা censor board নির্ভরশীল। পাঠক-পাঠিকারা নিজেদের মতো করে দৃশ্য সাজিয়ে ফেলুন, শুরু তো করেই দিলাম। 
তবে বৃষ্টির রোম্যান্টিকতাকে অস্বীকার করিই বা কি করে! এক জায়গায় একটা ছবি দেখেছিলাম। কেরলের ছবি। ভারতবর্ষের বুকে প্রবেশ করছে কুমারী বর্ষা, সে তখনও রাণী হয়ে ওঠেনি। চপল, কৃষ্ণকোমল বর্ষা। প্রত্যক্ষদর্শী সমুদ্রের পাড়ে হাত ধরে দাঁড়ানো দুজন। ছবিটা খুব ভাল লেগেছিল। কিন্তু ছবির একজন আর হতে পারলাম কই? 
বিঃ দ্রঃ – কলকাতার পার্কগুলোতে বৃষ্টি ছাড়াই ছাতা দেখা যায়। অগুন্তি ছাতা, চারপেয়ে। এরা censor board-এর ঊর্ধে। 

শেষ করা যাক। বৃষ্টিকে মোটেও মিস্‌ করি না এখানে। এখন যেখানে থাকি সেই র‍্যালে শহরে কারণে-অকারণে বৃষ্টি হয়। নির্মল বৃষ্টি। সবুজ বৃষ্টি। ধূসর বৃষ্টি। কখনও কখনও বৃষ্টিতে হাঁটতে ভাল লাগে। চোখে জলও আসে। বৃষ্টির সাথে ভাগ করে নি সেই আনন্দাশ্রু।

 

হঠাৎ বৃষ্টি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments