ছোটবেলায় গরমের ছুটিতে মামারবাড়ি গেলেই ছোটমামা পেছনে লাগত ,” কিরে ছুটিতো ফুরিয়ে এলো , এবার ব্যাগ ট্যাগ গুছিয়ে ফেল। ” মনে হত সত্যি ছুটির সময়টা কিরকম দৌড়ে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। মামা মনের ভাব বুঝতে পেরে আবার বলত,” সময় দৌড়চ্ছে না রে, ভালো করে ভেবে দেখলে বুঝবি সে এক জায়গায় ঠায় দাড়িয়ে আছে। আসলে দৌড়ে মরছি আমরা, তুই ইস্কুলে আর আমি অফিসে। দেখ এই দৌড়তে দৌড়তে তুই কিরকম একটা নিরেট ধেড়ে খোকা হয়ে গেলি আর আমিও কেমন বুড়োটে মেরে গেলাম। আপেক্ষিকতার এই সরল প্যাঁচালো ঘটনাটাকেই বলে রিলেটিভিটি ! কি বুঝলি? অবশ্য তুই যা গবেট তাই এখন কেন বড় হলেও এসব বুঝতে পারবি কিনা সেটা সন্দেহ আছে।” বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এই রিলেটিভিটির জটিল হিসাব কিতাব বুঝতে পারেননি অনেক ডাকসাইটে বিজ্ঞানীই। ফলে স্থান, কাল, আলোর গতি এসব নিয়ে নতুন এই তত্বের উদ্ভাবক আলবার্ট আইনস্টাইনকে তখন অনেকেই উন্মাদ বলেই ধরে নিয়েছিলেন। কিন্ত কয়েক দশক পরে তার এই তত্বের মধ্যেই লুক্কায়িত পারমানবিক শক্তির গন্ধ পেয়ে একদল বিজ্ঞানী আবার নতুন করে নড়েচড়ে বসলেন।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাজারে এই ‘আপেক্ষিকতাই’ মত্ত রাষ্ট্রগুলোকে ‘পরম’ ক্ষমতালাভের স্বপ্ন দেখায়। নিজের স্পর্ধার সীমা অতিক্রম করে ক্ষুদে ক্ষুদে জাপানিরা বেশি ত্যান্ডাই ম্যান্ডাই করছিল দেখে মার্কিনরা তো এই ক্ষমতার জোরে দুম দাম হিরোশিমা আর নাগাসাকি কে দুই ফুত্কারে উড়িয়ে দিল।এখন তো শুনছি ব্যাদেও নাকি এইসব আগের থেকেই লেখা ছিলো।আইনস্টাইন আগডুম বাগডুম না ভেবে মন দিয়ে সুধু ব্যাদ পুরাণটা ঠিকঠাক পড়লে ওর ওই ঝাঁকরা কালো চুল এরকম অসময়ে সাদা হযে যেত না। তা ব্যাদ বলছে ব্রহ্ম মানেই এক অজানা চরম শক্তির উত্স মানে এখনকার ভাষায় পারমানবিক আর তাই তখনকার ব্রহ্মাস্ত্র হলো গিয়ে আজকের জমানার নিউক্লিয়ার বম্ব ! সুধু এখানেই শেষ নয়, এই ব্রহ্মলোক থেকে গোলকধাম নারদমুনি এত শর্টকাটে মারতেন কি করে? মানে স্থান যে আপেক্ষিক সেটা বুঝতে গিয়ে কসমিক ওয়ার্মহোল কি তা না জানলেও চলবে, ঋষি মুনিদের দৈনন্দিন রুটগুলো ট্রেস করলেই বেরিয়ে আসবে চমকে দেওয়া নতুন সব তথ্য। এবার ভেবে দেখুন যে ‘অমরত্ব’ লাভ মানে কি? মানে তোমার সময় বাড়ছে অথছ আমার বাড়ছে না – অর্থাত সময় যে আপেক্ষিক সেটা বোঝার জন্য জটিল গাণিতিক সমীকরণের সেই অর্থে না ঘাঁটলেও চলে। এছাড়া রকেট, স্যাটালাইট, ক্রোমোসোম, ইউএফো, মোসাদ, টিম্বাকটু – এগুলো বোঝার জন্য স্রেফ ঘনাদার গল্প পড়লেই চলবে, আইনস্টাইন বা ব্যাদ কোনটাই দরকার হবে না। এক কথায় স্থান ও কাল নির্বিশেষে জ্ঞানের ক্ষেত্রে যে ‘পাত্র’ ব্যাপারটাও রিলেটিভ সেটা অন্তত বাঙালিদের আলাদা করে বোঝাতে হয়না।

পশ্চিমা বিজ্ঞানে সুধু স্থান-কাল-পাত্রই রিলেটিভ কিন্ত আমাদের বাঙালি-দর্শনে তো হাসি কান্না মিলিয়ে পুরো জীবনটাই রিলেটিভ। দেখবেন এই সরল নিয়ম মেনেই আমাদের চলতি ভাষাতেও এই আপেক্ষিকতার ছাপ সুস্পষ্ট। “কি, কেমন আছেন?” প্রশ্নের সহজ উত্তরের জায়গায় আমরা একগুচ্ছ ত্যাড়া ব্যাঁকা উত্তর দিয়ে বা পেয়ে থাকি- “এই চলছে একপ্রকার”, কিরকম চলছে, একপ্রকারটা ঠিক কোনপ্রকার সেটা কেউ জানেনা অথবা ” ওপরওয়ালা যেরকম রেখেছেন..” মানে ওপরয়ালা আমাকে কিরকম রেখেছেন সেটা ওনাকেই জিজ্ঞেস করো উনিই সব বাতলে দেবেন ? সমগ্র উত্তর ভারতে দুজনের সামনাসামনি দেখা হলে দু পক্ষই বলবে ‘রাম রাম ‘ নাহলে ‘আউর সব খায়রিয়াত ?’ – উত্তরে একটা হাসি দিয়ে ঘাড় নাড়ালেই ল্যাটা চুকে গেলো। মুম্বাইতে আবার নিদারুণ ব্যস্ততা তাই সেখানে একে অন্যের খবরাখবর ভ্রূ নাচিয়ে বা হাত নেড়েই জেনে নেয়। দক্ষিনে দেখা হলে সেখানকার বাসিন্দারা স্প্রিং দেওয়া পুতুলের মত মাথা দুপাশে দুলিয়ে ‘চুক চুক ‘ শব্দে খবর আদান প্রদান করে। ভালো খবর বুঝলে দুজনে গন্ডা দশেক ইডলি দিয়ে দু কাপ কাপী সাঁটিয়ে দেয় আর খবর খারাপ হলে ‘আইও স্বামী, এন্না প্রাচ্চান্নে ‘ জাতীয় খটর-মটর বক্তব্য রাখার সাথে সাথে দু পেগ হুইস্কি মেরে দিয়ে যে যার রাস্তা মাপে। আবার ধরুন আরেকটা বেসিক প্রশ্ন ” কিরে কাল আসছিস তো?” আমাদের ক্ষেত্রে তার ছোট্ট অথচ অদ্ভূত উত্তর হলো ‘দেখা যাক’ কিম্বা ‘আসলে আসাই যায় ‘। প্রথম উত্তরটার আসল মানে হচ্ছে ‘মেনু’টা কি তা দেখা যাক তারপর নয় ভেন্যু ঠিক করব আর দ্বিতীয় উত্তরটার ভাব সম্প্রসারণ করলে যা দাড়াবে সেটা হলো ‘না আসলে আর আসা হবেনা’। চতুর বাঙালি হয়ত একসময় বিজাতীয় সম্রাটদের সাথে সংস্কৃত কিম্বা পালিতে বার্তালাপ করত। পরবর্তী ক্ষেত্রে তাদের মোঘলদের সাথে ফার্সিতে অতি সন্তর্পনে আলাপচারিতা করতে হত পাছে ভুল বুঝে বাদশাহ ঘ্যাচাং করে গলা উতরে দেয়। ও ক্রমে সাহেবদের সাথে ইংরজিতে মোসাহেবি করতে করতে তারা তাদের মাতৃভাষার মধ্যে কিছু আমূল পরিবর্তন আনে। এক কথায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাষার সাথে মেলামেশা করার ফলে যে বাঙ্গালা ভাষার উত্তরণ হয় তার একটা নিজস্ব ব্যাকরণ আছে এবং এই স্বাধীন গঠনসত্তার ক্ষুদ্র-বৃহৎ প্রত্যেকটা ফাঁকফোকরে লুকিয়ে আছে অকৃত্তিম ঢ্যামনামীর কিছু গোপন সুলূকসুত্র। তাই আমাদের চরিত্রে আমাদের ভাষার প্রতিফলন কিম্বা আমাদের ভাষায় আমাদের চরিত্রের প্রভাব একটা কঠিন বৈজ্ঞানিক বাস্তব।

ইতিহাসে বাঙালি জাত হিসেবে কারো সামনে মাথা নুয়েছে কি না তা আলোচনাসাপেক্ষ তবে ঘুরে ফিরে আসা মন্বন্তর বাঙালির মাজা ভেঙ্গে দিয়েছে একাধিকবার। আমাদের জাতির ওপর তার ক্ষত যে কতটা গভীর দাগ কেটে গেছে তার নিদর্শন আপামর বাঙালি গুরুজনদের মধ্যে সদাবিদ্যমান ‘ফুড ইনসিকিউরিটি সিনড্রোম’ দেখলেই টের পাওয়া যায় – কি খাবি? কি খেয়েছিস?কেন খাবিনা? মায় ‘খেয়ে নে বাবা, না খেলে দেশোদ্ধার করবি কি করে’ অব্দি গড়ায় এই খাইখাই মনস্কতা। যারা আসলে দেশোদ্ধার করে তারা শুনেছি বেশিরভাগ সময় নাওয়া খাওয়া ভুলেই থাকে। তবে ব্যতিক্রমও আছে এই বাঙালি সমাজেই – শুনেছি বাংলার বাঘ স্যার আশুতোষ মুকুজ্জ্যে ইউনিভার্সিটি যাওয়ার আগে হরেক রকম চব্য চোষ্য দিয়ে তিন থালা ভাত খেতেন। এবং তারপর পথে নকুরের দোকানের সামনে জুরিগাড়ি দাড় করাতেন , এক জনৈক ভৃত্য ওনার হাতে তুলে দিত এক ধামা গুলি সন্দেশ যা কিনা উনি টপাটপ মুখে ফেলতেন বাকি পথ অতিক্রম করতে করতে। এতে নাকি ওনার প্রাতকালীন ভুরিভোজের খানা অনায়াসে হজম হয়ে যেত ও কাজে মনোনিবেশ করতে বেজায় সুবিধে হতো।মা কালির মুখ একটা হলে কি হবে বাঙালি তাকে জোড়ার কমে বলি উত্স্বর্গ করে না ,মোষ-ছাগল মা’র নামে যাই যাবে জোড়ায় যাবে, মা তো আর খাবে না খাব তো সেই আমরাই। কালীর থেকে মনে পড়ল পন্ডিতেরা বলে বাংলা একদা ছিল বৌদ্ধ অধ্যুষিত শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের বাসভূমি। আমাদের সমকালীন আচার ব্যবহারে আজও তার ছাপ পাওয়া যায়। অমবশ্যার রাতে কালিপূজা , শ্বশানে বসে তন্ত্রসাধনা থেকে গেরুয়া বসন পরে বাউলদের ঘুরে ঘুরে গান গাওয়ার মধ্যে লুকিয়ে আছে প্রাচীন বৌদ্ধসমাজের অনেক নিয়ম কানুন। আমাদের পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি, কথায় কথায় এই জয়ন্তী ওই উত্সব পালন ও ক্লাবের নাম অমুক কিম্বা তমুক সংঘ হওয়ার পেছনে বৌদ্ধ ধর্মের অবদান প্রচুর। বুদ্ধগয়ায় বোধিবৃক্ষের তলায় বসে ধ্যান করতে করতে রাজকুমার সিদ্ধার্থর বোধিপ্রাপ্তি হয়ে তিনি শাক্যমুনি গৌতম বুদ্ধ হন ও সারনাথে গিয়ে প্রথম জ্ঞানদান করেন। তাই আমরা প্রত্যেক বাঙালি সংসারের প্রতি ঘেন্না ধরলে পার্কের এক কোণে বড় বটগাছের তলায় বসে থেকে ঘন্টার পর ঘন্টা ধ্যান করে যাই ও একটু হেটে গিয়ে পাড়ার মোড়ে সামনে যাকে পাই তাকে দার্শনিকের মতন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফেলে সংসারের সারমর্ম নিয়ে জ্ঞানদান করে থাকি। ভেবে দেখবেন আমাদের এই ঘন ঘন চা খেতে খেতে আড্ডা দেওয়া কিম্বা উপার্জনের চেয়ে টাকা ধার করে জীবন ব্যতীত করার মতন ছোটখাটো দর্শনগুলোই আজও বাঙালির মধ্যে কোথাও না কোথাও একটা সুপ্ত বৌদ্ধ ভিক্ষুককে বাঁচিয়ে রেখেছে। চট্টগ্রাম থেকে নবগ্রাম , শিলিগুড়ি থেকে সুন্দরবন একটু চোখ কান খোলা রাখলেই দেখতে পাবেন হাজারে হাজারে বোহেমিয়ান বুদ্ধেরা উদ্ভ্রান্ত জাতিস্মরের মত নিজেদের বয়ে বেড়াচ্ছে।

হরেকরকমবা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments