সেদিন ইনো রিভার স্টেট পার্কে ঘুরতে ঘুরতে দেখি উজ্জ্বল হলুদ কালো ডিসাইন করা কি একটা হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে। একটু কাছে যেতেই বোঝা গেল ইনি হলেন নর্থ ক্যারোলিনার স্টেট রেপটাইল – ইস্টার্ন বক্স টার্টল… খুব সম্ভবত পুরুষ।

 

         

        বহুদিন থেকেই দেখার ইচ্ছে ছিল এই বান্দা কে। আমাদের ছোটো শহরের আশেপাশে কচ্ছপের অভাব নেই। একটু জলা জায়গায় গেলেই দেখা যায় নানা রকম স্লাইডার বা কুটার জাতীয় কচ্ছপদের। কিন্তু তারা সবাই জলের কচ্ছপ। ইস্টার্ন বক্স টার্টল কিন্তু তা নয়। এর বাসস্থান, খাদ্য সংগ্রহ করার জায়গা, প্রজনন সবই ডাঙায়। ইন ফ্যাক্ট এরা নর্থ ক্যারোলিনার একমাত্র ডাঙার কচ্ছপ। ডাঙার কচ্ছপ সম্পর্কে যাদের ধারণা নেই তাঁরা হয়তো অবাক হচ্ছেন, কিন্তু টার্টল দের অনেকেই কিন্তু ডাঙার অধিবাসী। জঙ্গলের মেঝেতে শুকনো পাতার ফাঁকে চলাফেরা করতে দেখা যায় এঁদের। মাঝেমধ্যে স্নান করে শরীর ঠাণ্ডা করার জন্য ছাড়া বিশেষ জলে নামেনা এরা।

কচ্ছপের জুলজুল করে তাকানো ভারি মজাদার। কিন্তু এদের দৃষ্টিশক্তি খুব জোরালো নয়। তাই বেশ কিছুটা কাছে চলে আসা গেল ওর দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে। কাছে গিয়ে চমকে গেলাম। কি অপূর্ব এর গায়ের ছোপ! দেখে মনে হয় কেউ অতি যত্ন নিয়ে রঙ তুলি দিয়ে এঁকেছে ওর পিঠের খোলসের ওপর। আমি যখন একে দেখলাম তখন সে অলসভাবে রোদ পোহাতে ব্যস্ত ছিল। একটু পর আমায় টের পেয়ে ধীরে ধীরে গুটিসুটি পায়ে ঢুকে গেল ঘন জঙ্গলের মধ্যে। ইতিমধ্যেই আমি চটজলদি তুলে নিয়েছি গোটাকয়েক ছবি। 

এই বক্স টার্টলের এ হেন নামকরনের পিছনে কারণ হল এদের খোলার বিশেষ বৈশিষ্ট। এদের খোলাটা একটা বাক্সের মত, যার তলায় আছে একটা কব্জা। বিপদ বুঝলেই নিজেকে বাক্সের মধ্যে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিয়ে সেই কব্জার সাহায্যে নিজেকে পুরপুরি ভিতরে বন্দী করে ফেলে এরা। তার ফলে আক্রমণকারী ওকে সম্পূর্ণ উলটে ফেললেও ওর নাগাল পাবেনা। অন্যান্য কচ্ছপের খোলসের তলার দরজায় (Plastron) এরকম স্পেশাল কব্জা থাকেনা যা তাকে পুরোপুরি বাক্সবন্দী করে ফেলতে পারে। তখন খুব জোরালো দাঁত ওয়ালা জন্তু ছাড়া কার সাধ্যি ওর নাগাল পায়! নীচের ভিডিওটায় দেখুন কিভাবে একটি র‍্যাকুন এই ইস্টার্ন বক্স টার্টলটিকে শিকার করার চেষ্টা করল এবং শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল।

 

 

 

খাবারের ব্যাপারে কিছুতেই না নেই এদের। ফলমূল, মাশরুম, ঘাসের গোড়া থেকে শুরু করে পোকামাকড়, কেঁচো সব খেয়ে থাকে। জোয়ান বয়সে ননভেজ বেশি খেতে দেখা যায় আর বয়েস বাড়লে (ডাক্তারের পরামর্শে কিনা কে জানে) ভেজিটেরিয়ান ডায়েটের দিকে শিফট করে ধীরে ধীরে। সাধারণত ২৫-৩০ বছরের জীবন এদের, তবে কখনও কখনও আরো দীর্ঘায়ুও হতে দেখা গেছে। এদের একটা বৈশিষ্ট হল এরা অল্প বয়েসে যৌনতার চরম বিরোধী। তবে মানুষের মত সামাজিক চাপে নয়, এদের ক্ষেত্রে সেক্সুয়াল ম্যাচিউরিটি আসতেই অনেকটা দেরি হয়। ৭-৮ বছর বয়েস হওয়ার আগে তাই এরা প্রজননে লিপ্ত হতে পারেনা।

 

 

 

 

 

 

দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হল এরা ধীরে ধীরে অবলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শেয়াল নয়, র‍্যাকুন নয়, চিল বা ঈগল নয়, এর জন্য প্রধানভাবে দায়ী পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত প্রজাতিটিই। এদের বাসস্থান, অর্থাৎ জঙ্গলে থাবা বসাতে বসাতে মানুষ এমন অবস্থা করেছে যে এদের থাকার জায়গা কমে এসেছে। যেটুকু জঙ্গল আছে, তার আশেপাশেই আছে মানুষের বানানো রাস্তা। সেই রাস্তা পার হতে গিয়ে গাড়ি চাপা পড়ে মৃত্যু হয় হাজার হাজার বক্স টার্টলের। রাস্তা দিয়ে গাড়ি ধেয়ে এলে চটজলদি দৌড়ে পালানোর উপায় এদের জানা নেই। তাই হতভাগ্য কচ্ছপরা অনেক সময়ই রাস্তা পার হতে গিয়ে মারা পড়ে। তার উপর আছে "পেটুক" শ্রেণীর মানুষেরা। এরা সুন্দর দেখতে কোনো জন্তু পেলেই তাকে "পেট" অর্থাৎ পোষ্য বানানোর তোড়জোড় করে। ডাঙার কচ্ছপদের নজরে পড়লে তাদের ধরে বাড়ি নিয়ে আসা কোনো ব্যাপারই না। এইভাবে মানুষের হাতে বন্দী হয়ে পড়ে এরা। আমরা বৈঠকখানায় বসে ওর "কিউটনেস" দেখে আপ্লুত হই, ভুলে যাই ওরা ওয়াইল্ড অ্যানিমাল। মানুষের আশ্রয়ে এসে ওরা বেঁচে থাকলেও সুখী থাকতে পারবেনা, প্রজননে অংশ নিতে পারবেনা। এরা ইতিমধ্যেই থ্রেটনড স্পিশিজ, তাই আমাদের এই "পেটুকপনায়" এরা আরো বেশি করে এগিয়ে চলেছে অবলুপ্তির পথে। যেহেতু এরা প্রজনন শুরু করে অনেক দেরিতে তাই অনেকেই প্রজননের আগে মারা পড়ে বা স্বজাতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তার ফলে এই প্রজাতি পড়েছে আরও বিপদে।

 

 

সুখের বিষয় অ্যামেরিকা দেশটায় স্রেফ ভোগবাদী এবং "পেটুক" মানুষের দল যেমন রয়েছে, তেমনই আছেন আরেকদল মানুষ যাঁরা প্রকৃতিকে ভালবেসে তার জন্য জীবন উৎসর্গ করেন। এঁদের উদ্যোগেই শুরু হয়েছে বক্স টার্টলকে রক্ষা করার নানারকম ব্যবস্থা। যদিও তা সত্বেও কমে চলেছে এদের সংখ্যা, তবু সেই কমার হারকে নিয়ন্ত্রণ করা গেছে অনেকটাই। সাউথ ক্যারোলিনা ছাড়া বাকি সমস্ত স্টেট বক্স টার্টলকে পোষ্য হিসেবে বিক্রি করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আশা করা যায় ভবিষ্যতে প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে এই ধরনের থ্রেটনড স্পিশিজ সম্পর্কে আরও সাবধান করা যাবে যাতে এই সুন্দর জীবটি হারিয়ে না যায় পৃথিবীর বুক থেকে।

 

 

** ছবিগুলি সমস্ত আমার ক্যানন পাওয়ারশট এস থ্রি আই এস ক্যামেরায় তোলা।

হলদে বাক্সের কথা
  • 4.40 / 5 5
5 votes, 4.40 avg. rating (87% score)

Comments

comments