নিজেকে ঠিক ভারতবর্ষের সুনাগরিক হিসেবে বোধহয় গড়ে তুলতে পারলাম না। বিশেষ করে যখন দেখি যাদের ভাষা বুঝি, তাদের এক অংশের কাছে যেতে গেলে কত ফর্মালিটির মুখোমুখি হতে হয়, কিন্তু যে অঞ্চলের বুঝি না সেখানে পৌঁছতে কাউকে কোনও কৈফিয়ত দিতে হয় না। মনে হয়, এরা বুঝি আমার দেশবাসী নয়। এমনকি ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশ ভারতকে হারালে পুরোপুরি খুব দুঃখ পাই এমনও সব সময় হয়ে ওঠে না। আর এই কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা সংসারের বাইরে যে জগত যেখানে সবাই মিলেমিশে থাকেন, ভাগ করে নেন সুখ দুঃখ, তাঁদের দেখলে সত্যি ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠি। এইভাবে সুখ দুঃখ ভাগ করে নিতে নিতেই একদিন জন্ম হয় অ্যাসোসিয়েশনের, কাছাকাছি আসে বদলে যাওয়া কিন্তু অনেকটাই একই থাকা সংস্কৃতি, রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের মত কমন ইন্টারেস্ট, সৃষ্টি হয় ‘মেলবন্ধন’। এবারে পঞ্চম বর্ষে পা রাখা সুদূর কুয়েত থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকা।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের লেখক লেখিকাদের লেখা সমৃদ্ধ, সুদৃশ্য পত্রিকাটি প্রকাশিত হল গত কয়েকদিন আগে। রয়েছে গল্প, অনুভব, কবিতা, নাটক, ইতিহাস, উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনী। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, যেহেতু এটি অন্তত কলকাতা থেকে প্রকাশিত নয়, সে কারনেই দুই বাংলার সামাজিক পরিমণ্ডলের যে পার্থক্য, তা লেখালেখির মধ্যে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এই ধারা বজায় রাখার জন্য সম্পাদকমণ্ডলীর প্রশংসা প্রাপ্য। আরও একটি কথা মনে রাখতে হয় যে অনেকেই নানা ব্যস্ততার মধ্যে আংশিক সময়ে লেখালেখি করে থাকেন যাঁদের কাছে পেশা সামলে সময় বের করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। এই দিক থেকে দেখলে পত্রিকা সফল। সব লেখাই যে সমান মানোত্তীর্ণ, এমনটি নয়, কিন্তু প্রত্যেকটিই সম্ভাবনাময়। হয়ত এই কারনেই কোনও বিশেষ নামোল্লেখ অপ্রয়োজনীয়, তবুও যে লেখাগুলি মন ছুঁয়ে যায় তার মধ্যে রয়েছে ‘তবু যেতে দিতে হয়’, ‘সেই অদ্ভুত লোকটা’, ‘চেনা অচেনা’, ‘বহুরূপী’, ‘গণ্ডি’, ‘পূরবী’, ‘বাপজান তুই আইছস!’, ‘যমুনার জলে’, ‘এভাবেই শুরু হয় আরেকটি পুরাণ’, ‘এও কি সম্ভব’, ‘ভালোলাগার থলি’, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়ের স্মৃতিগাঁথা’, ‘প্রবাসে আপনজন’, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সর্বকনিষ্ঠ বীরপ্রতীক শহীদুল ইসলাম লালু’র বীরত্ব গাঁথা’, ‘সময় বদলে যায়’ এবং ‘হিম সাগর থেকে মহা সাগরে’। কবিতা বিশেষ কিছু বুঝি না, ফলে উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকলাম।

উল্লিখিত লেখাগুলির মধ্যে বিষয়ের বৈচিত্র্য রয়েছে, রয়েছে ভীষণ চেনা বিষয়ের অন্যরকম উপস্থাপনা, রয়েছে পাঠককে ক্লান্তিহীন আকর্ষণ করার দুরূহ ক্ষমতা। পড়তে পড়তে আর কত পাতা বাকি, হিসেব মেলাতে হয় না, বরং মিলিয়ে নিতে হয় রোজকার চলার পথে সামনে এসে হারিয়ে যাওয়া পরিচিত অপরিচিত মুখগুলিকে, পড়ার নিয়মেই পড়া শেষ হয়, মনে দাগ কাটে। লেখক লেখিকাদের অন্যান্য সৃষ্টির সঙ্গলাভ কামনা করে। আরেকটি অনবদ্য সৃষ্টি, যার কথা উল্লেখ না করা আসলে অপরাধ সেটি হল একটি ছবি। মেহা চক্রবর্তীর আঁকা ভূতের রাজার সামনে দাঁড়িয়ে গুপি-বাঘা।

এতদসত্ত্বেও কোথাও কোথাও থমকাতে হয়। পত্রিকাটি প্রকাশের পেছনে যে পরিশ্রম রয়েছে, তা পাতায় পাতায় স্পষ্ট। তবু মনে হয়, আরেকটু অতিরিক্ত পরিশ্রম এটিকে অন্য রূপ দিতে পারত। একদম প্রথমেই যেটা বলার, তা হল প্রচ্ছদ। ইন্টার্নেটে বহু প্রচারিত, হয়ত বা বহু ব্যবহৃতও, কোনও ছবির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য যাই হোক না কেন, যে কোনও ধরনের পত্রিকার প্রচ্ছদ হিসেবে অত্যন্ত বেমানান। এমন কি বিভিন্ন লেখার ইলাস্ট্রেশন হিসেবে ইন্টার্নেট থেকে সংগৃহীত যে সমস্ত ছবি ব্যবহার করা হয়েছে তার বেশ কয়েকটিতেই ওয়াটার মার্কের সগৌরব উপস্থিতি। এই সমস্ত ইলাস্ট্রেশনের অনুপস্থিতি পত্রিকাটির মান এতটুকু ক্ষুণ্ণ করত না বলেই আমার ধারণা। তবে এই সব নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর ঘটনা। সবচেয়ে পীড়াদায়ক ঘটনা হল অজস্র মুদ্রণবিভ্রাট। কয়েকটি উদাহরণ। ‘সেই অদ্ভুত লোকটা’ গল্পে সুধাকর কখনও হয়েছে শুধাকর, কখনও বা সুধা কর। ‘যমুনার জলে’-তে কথোপকথন অংশ পড়তে গেলে বোঝা মুশকিল হয় কে কি বলছে। কিছুটা পড়ে ফেলার পর আকস্মিক ভাবে যখন সবকিছু অবিন্যস্ত লাগতে থাকে, মনে হয় যার যেটা বলা উচিত সে ঠিক তার উল্টো কথা বলে যাচ্ছে, তখন আবার অংশটির শুরু থেকে পড়ে বিষয়টি বুঝে নিতে হয়। শ্রাবণী ঘোষের লেখা ‘নারী আছেন, নীরা কোথায়?’-র পর হঠাৎ করে শুরু হয়ে যায় ‘সময় বদলে যায়’ লেখাটির একটি অংশ। এই কাহিনিটির প্রায় নব্বই শতাংশ মূল লেখায় পৌছনোর আগে এভাবেই পড়া হয়ে যায়। ‘চেনা অচেনা’ নাটকে ঢুকে পড়েছে ‘সবফরঁস’ জাতীয় কিছু ভুতুড়ে শব্দবন্ধ। এই ধরনের বিভ্রাট শুধু যে মনোযোগী পাঠকের মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটায় তাই নয়, নির্দিষ্ট লেখাটির মেরিটের প্রতিও অবিচার করে। আরও একটি পীড়াউদ্রেককারী ঘটনা হল লেখক / লেখিকা পরিচিতি। কারো আছে, কারো নেই। কিছু না কিছু পরিচিতি নিশ্চয় সবার আছে, লেখক বা লেখিকা হিসেবেই তা থাকতে হবে এমন কোনও বাধ্যবাধকতা তো থাকা উচিত নয়। সেটাই না হয় উল্লেখ করা হত। তবে সবচেয়ে হাস্যকর পরিচিতি বোধহয় দেব চ্যাটার্জী-র। ফ্যানস অফ মোহনবাগান। একই বক্তব্য প্রযোজ্য বাসস্থানের উল্লেখে। কারো আছে, কারো নেই।

এবারে একটি প্রস্তাব। ভ্রমণ কাহিনিটির সঙ্গে ছবিগুলিকেও যদি লেখার মধ্যে স্থান দেওয়া যেত, সেক্ষেত্রে ছবি এবং লেখার আভ্যন্তরীণ সংযোগস্থাপন সহজতর হয়ে উঠত।

সব শেষে আবার সেই কথাটি বলার যেটা আগেও বলা হয়েছে, সেটা হল, নানবিধ পেশাগত ব্যস্ততা সামলে নিজের দেশ থেকে দূরে নিজের দেশকে খুঁজে পাওয়ার যে প্রয়াস, আরও বেশি করে সমমানসিকতাসম্পন্ন মানুষজনকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার এই তাগিদ যে শত ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও নিঃশর্ত প্রশংসার দাবি রাখে সে কথা অনস্বীকার্য।

 

মেলবন্ধন পঞ্চম

সম্পাদক – ডাঃ অশোক দেব

হাতে আসা ম্যাগাজিন – মেলবন্ধন পঞ্চম
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments