অ্যাক্কালে বাঙালী বইমুখো হিসেবে খ্যাত ছিল। ছেলে-বুড়ো-মেয়ে-পুরুষ সকলেই দিনের কোনও না কোন সময়ে অন্তত একবারটি হলেও কোন একটা বই নিয়ে বসতো। দু’চার পাতা ওল্টাত পাল্টাত। পড়ে ভালো লাগলে ভালো, ও খারাপ লাগলে চাট্টি খিস্তি করে প্রকাশকের দপ্তরে পোস্টকার্ড সেন্ড করতো। সমাজে লেখক ফেককদের আজকের তুলনায় ঢের বেশী সম্মান ছিল। অনেকেই এ লাইনে পাকাপাকি কেরিয়ার করার কথাও, এমনকি, ভাবতো।  

অধুনা পশ্চিমবঙ্গের টেক-স্যাভি বঙ্গ সন্তানকুল অন্তর্জ্বালের রগরগে আলিঙ্গনে দিশেহারা। রিদয়ের এ-কূল ও-কূল ভাসানো সমস্ত জ্বালা যন্ত্রণা মেটাবার উপায় হিসাবে উন্নতির শিখর দেশ থেকে সংগৃহীত এক-সে-বারকার-এক সব স্বপ্নাদ্য ডিভাইস এখন চলে এসেছে তার হাতের মুঠোয়। বিপুলা এ পৃথিবীর কোণে কোণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আনন্দকণা খুঁটে খেতে খেতে সে, বঙ্গ সন্তান, টোটালি বুঁদ হয়ে গ্যাছে, ঝিম হয়ে গ্যাছে, ভোঁ হয়ে গ্যাছে। শুধু ‘না’ হয়ে যেতেই যা বাকি। 

দোকানদার যেমন সকাল সকাল দোকান খুলেই সবার আগে দাঁড়িপাল্লাটিকে ধুপ ধুনো গঙ্গাজল দিয়ে অর্চনা করে, বাঙ্গালীও আজকাল সেইরম কম্পিউটার টি খুলেই সবার আগে আলতো করে মুখ রাখে ফেসবুকের সুডৌল নরমে। আর কি ভয়ংকর সেক্সি সেই জগত মাইরি। সেখানে সবাই সবার সব কিছু পছন্দ করছে। কারণে অকারনে সর্বত্র নিজেদের বাল(খিল্য) সুলভ মতামত দিচ্ছে, এবং আত্মগরিমার অনির্বচনীয় পন্ডে মার্ভেলাস পুণ্ডরীক হয়ে ফুটে ওঠবার পণ্ডশ্রমে মশগুল হয়ে উঠছে। অহো, বাঙালির কি ফ্যান্টাস্টিক উন্নতি।

কিন্তু পাঠিকা ক্ষমা করবেন। ফেসবুকের আজীব দুনিয়ার সাড়ে বত্রিশ ভাজার বিবরণ দিতে বসা এই লেখার (নাকি টাইপিং-এর) উদ্দেশ্য নয়। সে কাজের জন্য শহরের বিবিধ ডেইলির ঝিঙ্কু সাংবাদিকগণ রয়েছেন। (সেদিন কোন একটা কাজগে যেন দেখলুম বীটস্ট্রিপ নিয়েও হাফ পাতা জুড়ে লেখা!) আর তাছাড়া এ নিয়ে লেখবার রয়েছেটাই বা কি? সবাই সব কিছুই তো জানে। যে এখনো কিছু জানেনা তাকে তার মত থাকতে দিন। সে শালা ভাগ্যবান। আসুন সবাই মিলে তাকে দু’মিনিট হিংসে করি।

হ্যাঁ তো যা বলছিলুম, এই যে চতুর্দিকে বং মাঝারিয়ানার ‘বীভৎস মজা’ চলছে, তার ফুরফুরে হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিয়ে আমাদের পানসিও চলেছে। তবে গন্তব্য বেলঘরিয়া নয়। তার থেকে কিঞ্চিৎ উজানে গিয়ে পূব দিকে আমাদের গন্তব্য সোজ্জা শাহবাগ মোড়, ঢাকা, বাংলাদেশ। তবে সেখানে পৌঁছোবার আগে একটা গুরুত্বপুর্ণ ডিসক্লেইমার দিয়ে রাখি: ইওরস্‌ ট্রুলি একজন মারকাটারি মোহনবাগান সাপোর্টার এবং পুরদস্তুর ঘটি। ফলে, ফেলে আসা অতীতের হৃত-গৌরব কিম্বা দেশয়ালি ভাইদের পাশে থাকবার সেন্টি-মিশ্রিত আবেদন/নিবেদন/ঘোষণা/ – এই লেখা (নাকি ভাঁট বুকনি?) থেকে কোনটাই আশা করবার কোন কারণ নেই। অতএব, গৌরচন্দ্রিকার পালা সাঙ্গ করে এবার মূল অংশে প্রবেশ করা যাক।

 

শাহবাগ মোড় থেকে যে প্রবল জনচ্ছাসের শব্দ কানে ঢুকে ম্যাদামারা বাঙ্গালীর কাঁচা ঘুম ভাঙাবার উপক্রম হয়েছে তার ইতিহাস অনেকেরই বোধহয় জানা। যারা জানেন না তাঁরা মোল্লা নাসিরুদ্দিন কে স্মরণ করুন এবং যাঁরা জানেন তাদের কাছ থেকে জেনে নিনগে। এই নিয়ে বিস্তারিত চর্বিত চর্বন করে এই লেখার (নাকি উসকানি মূলক প্রোপ্যাগান্ডা?) গতর চওড়া করবার কোন কারণ দেখিনা। এই মুহূর্তে শাহবাগ মোড়ে হাজারে হাজারে গনতন্ত্রপ্রেমী, মুক্তিকামী, পরধর্ম সহিষ্ণু, দীর্ঘদিনের প্রবঞ্চিত মানুষ একত্রিত হয়ে স্লোগান দিচ্ছেন, গান গাইছেন, কবিতা লিখছেন, পথ নাটিকার মাধ্যমে বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর কে তুলে ধরছেন সমগ্র বিশ্বের সামনে। তাঁদের মূল দাবী ৭১’এর সমস্ত যুদ্ধাপরাধীকে ফাঁসিতে লটকাতে হবে এবং জামায়েতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। তবে শুধু এইটুকুই নয়, আরও একটি প্রচ্ছন্ন দাবী প্রজন্ম চত্বরের যুবতী বসন্তের তন্বী বাতাসে মৃদু গুঞ্জরিত হচ্ছে, মেঘের মত জমাট বাঁধছে ধীর ছন্দে এবং কালবৈশাখীর উন্মত্ত তুফান গর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়বার প্রশস্ত সময়ের অপেক্ষায় দিন গুনছে। তা হল মৌলবাদের বোরখা ছুঁড়ে ফেলে বাংলাদেশ কে ধর্ম-নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করতে হবে। “বাংলাদেশ দিচ্ছে ডাক, মৌলবাদ নিপাত যাক”।


অবিশ্যি আমাদের পঃ বঃ এর অনেক ঘর পোড়া গরুই আবার এর মধ্যে একটা সিঁদুর রঙা (পড়ুন বামপন্থী) মেঘ দেখতে পেলেও পেতে পারেন। তা এতে তাঁদের কোন দোষ আমি দেখিনা। বস্তুত প্রজন্ম চত্বর থেকে যখন একহাজার উন্মত্ত কন্ঠের সমবেত “লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই” স্লোগান উঠে এসে গায়ে-হাতের রোম খাড়া করে দিচ্ছে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে উচ্ছ্বাসে আবেগে, সমস্ত বন্ধন ছিঁড়ে ফেলে ওই উত্তাল মানব-সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়বার দুর্দম হাতছানি আসছে ক্রমাগত, তখন এইসব অর্বাচীন তৃণ-কংগ্রেসীদের হাফ-আখড়াই ঢ্যামনামীর দিকে নজর না দেওয়াই ভালো। তবে এই “ঘর পোড়া গরুর” আরেকটা ডাইমেনশানও আছে। যে দলে দুর্ভাগ্যবশত বর্তমান এই লেখকও পড়ে। আমরা যারা একটা সময় বামপন্থা কে সমস্ত শিক্ষিত চিন্তাশীল মুক্তিকামী মানুষের প্রকৃত এবং একমাত্র রাস্তা হিসাবে ভেবেছিলাম; দিব্যন্মাদের মত যারা দিন রাত এক করে পড়ে ফেলেছিলাম কম্যুনিস্ট মেনিফেস্টো থেকে হোয়াট ইস টু বি ডান থেকে অন কনট্রাডিকশান-এর মত জ্বালাময়ী পুঁথি গুলো; রাতের পর রাত জেগে আলোচনা-বিতর্ক-ঝগড়া করেছিলাম সাথী কমরেডদের সঙ্গে; আমরা যারা জর্জ বিশ্বাসের কায়দা নকল করে “আমার প্রতিবাদের ভাষা/ আমার প্রতিরোধের আগুন/ দ্বিগুণ জ্বলে যেন দ্বিগুণ দারুণ/ প্রতিশোধে করে চূর্ণ/ আনে মুক্তির আলো আনে/ আনে লক্ষ শত প্রানে” গাইতে গাইতে নেমে পরেছিলাম কলকাতার রাজপথে; এইতো সেদিনও, বাংলার তক্ত্‌ মোবারকে বুদ্ধ-বিমানরা তখনো সদর্পে আসীন। ভাবতে খারাপ লাগে যে একদল স্বার্থলোভী মাফিয়া আর কিছু অপরিণামদর্শী ও অযোগ্য নেতার চক্করে পড়ে একটা মহান আদর্শ কীভাবে সাধারণ মানুষের মনে ঘৃণ্য কলুষিত লাথখোরের জায়গায় নেমে এল। ‘সিপিএম’ শব্দ টা শুনলেই আজকাল সবজি বিক্রেতা থেকে সেলুনের ছোকরা- প্রত্যেকে এক বাক্যে খিস্তি করছে। পরিচিত বা সেমি-পরিচিত বন্ধুদের “আরে কমরেড যে, তাপ্পর কি খবর” প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়ে থাকা শ্লেষ মিশ্রিত বিদ্রূপের তীব্র ওভারটোন হজম করতে হচ্ছে আজকাল সমস্ত বাম-মনস্ক ছেলেপিলেদের (কমরেড মানে যে আসলে সিপিএম ক্যাডার নয় এই সত্যটা কে কাকে বোঝাবে!)। তলে তলে পাইয়ে দেওয়ার আর কামিয়ে নেওয়ার রাজনীতি করে আর বাইরে দিনের পর দিন ধোপ-দুরস্ত স্তুতিবাক্য আর সংগ্রামের কুমিরছানা দেখিয়ে এইসব নেতারা নব্বই মিলিয়ন বঙ্গবাসীর কাছে নিজেদের তথা পার্টির ক্রেডেনশিয়ালকে একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনলেন। এখন তাঁদের সঙ্গে একমাত্র তুলনা টানা চলে একালের হৃতগৌরব বামুন ঠাকুরদের, যাঁদের প্রবল পরাক্রমে এককালে গোটা হিন্দু সমাজ ছিল থরহরি কম্পমান, কিন্তু কালের অম্লান পরিহাসে তাঁদের ওভারঅল অস্তিত্ব এখন কোনোমতে টিকে আছে মাত্র। কারণ জীবনানন্দ-প্রেমী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বোধহয় জানতেন না যে কেবল নারীই নয়, ব্যবহৃত ব্যবহৃত ব্যবহৃত, ব্যবহৃত ব্যবহৃত হয়ে ক্ষমতাও একসময় পরিণত হয় শুয়োরের মাংসে।

আর আমরা? আমরাও দেখলাম কীভাবে গণজাগরণ আর পরিবর্তনের নাম করে, গনতন্ত্রের ধপধপে জামা গায়ে দিয়ে যাঁরা এলেন তাঁরা ওইসব ছাঁদাবাঁধা বামুন ঠাকুরদেরই সন্তান-সন্ততি। এবং অচিরেই এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হল যার সঙ্গে অনেকেই নাকি ‘ন্যাশানাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি’র (‘সোশ্যালিস্ট’ শব্দ টি উভয় ক্ষেত্রেই তাৎপর্যপূর্ণ) দোর্দণ্ডপ্রতাপ এক নেতার প্রভূত মিল খুঁজে পাচ্ছেন। কিন্তু কেন এমন হয়?… এই কেন’র উত্তরে ওয়াল্টার বেঞ্জামিন সাহেবের একটি উক্তি এক্কেরে যারে কয় ‘খাপে খাপ পঞ্চুর বাপ’-এর মত অব্যর্থ কাজ করে- “every fascism is an index of a failed revolution”.

 

নিশ্চয়ই ভাবছেন যে ধান ভানতে বসে এই পয়েন্টলেস শিবের গীত গাওয়া হচ্ছে কেন। বললে বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা, আমিও ঠিক এইটেই ভাবছি। এসব লিখে কি হবে! কেই বা পড়বে আর পড়ে কি ইয়েটাই বা হবে। কিন্তু আমার সমস্যার কথাটা আমি অলরেডি বলেছি। ঘর পোড়া গরুদের বৈশিষ্টই হল যে তারা যে কোন ব্যাপারেই অহেতুক স্কেপ্টিসিসম্‌ দেখিয়ে সকলের বিরাগ ভাজন হয়। এই বোধহয় তাদের নিয়তি। ঠিক করেছিলাম কোন রকম পলিটিকালি ইনকারেক্ট কথাবার্তা এখানে লিখব না। কিন্তু কথায় কথায় অনেক কথা বেড়িয়ে গেল যার দায় অবশ্যই আমার নয়। তো সে যাক। আবার পুরনো প্রসঙ্গে ফিরে আসি।

কথা হচ্ছিল শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর এবং সেখানে ঘটে চলা একটা অভাবিত নাটকের কিছু দৃশ্যকল্প নিয়ে, যার টুকরো টাকরা নানা ভাবে আমাদের সামনে এসে হাজির হচ্ছে আজ কয়েক সপ্তাহ ধরে। আর আমার কাছে সবচেয়ে যেটা উল্লেখযোগ্য তা হল এই এন্টায়ার ঘটনাটার সূত্রপাত এই বিশ্বব্যাপী অন্তর্জ্বাল বা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব-এর কোন একটা আনাড়ি কর্নারে। কয়েকজন ব্লগার একজোট হয়ে তাঁদের ব্লগে একটা মানব বন্ধনের ডাক দিলেন যা থেকে একটা দাবানল ছড়িয়ে পড়ল দেশের কোণায় কোণায়। যার আঁচ এসে লাগলো সীমানার এপারেও কারুর কারুর গায়ে। আর মজার কথা হল, এই যে রাত দুপুরে বসে বসে চর্যাপদ ব্লগের জন্য আমি এই লেখাটা (নাকি পাগলের প্রলাপ) লিখে চলেছি তার একটা গুরুত্বপূর্ণ অণুঘটকও হল ফেসবুক, যা না থাকলে হয়ত এই সাইটটির কথাই আমি কোনোদিন জানতেই পারতুম না। ফলে একথা অনস্বীকার্য যে ইন্টারনেট বাঙ্গালীর চোখ খুলে দিয়েছে। সে আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে বসেছে, পাশের খোলা জানলা দিয়ে গায়ে এসে পড়া নতুন আলোর সঙ্গে নিজের চোখ কে সেট করাচ্ছে ক্রমে। এই সেট করানোর প্রসেস টা বেশ লম্বা। তাই আপাতত সেটিং চলুক, ততোক্ষণ চলুন আমরা চট করে অন্য একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার কভার করে আসি।

বাংলাদেশের রাজধানীর পর এবার আমাদের গন্তব্য ভারতের রাজধানী শহর দিল্লী। আপাতত দিল্লীর পথঘাট শুনশান। কিন্তু মাস খানেক আগে এলেও এখানে দেখতে পেতেন হাজার হাজার ছেলেপিলে রং তুলি গিটার মোমবাতি পোস্টার নিয়ে মিছিল করছে, অবস্থান করছে ইত্যাদি। আর তার মর্মান্তিক কারণটাও আমরা সবাই ভালো করেই জানি। সভ্য মানুষের ইতিহাসকে এক লহমায় কলুষিত করে ফেলতে পারে এমন একটা বর্বরোচিত ঘটনার প্রতিবাদে এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবীতে কয়েকদিন আগেই একটা বিপুল স্বতঃস্ফূর্ত জনজোয়ারের সাক্ষ্মী থেকেছে রাজধানী। (কদিন আগেই খবরে শুনলাম যে সেই অপরাধীদের অন্যতম একজন নাকি জেলখানায় গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে!) কিন্তু দিল্লী থেকে শাহবাগ, আমি একটা অদ্ভুত সাদৃশ্য খেয়াল না করে পারছি না। দুটি গণজাগরণেরই অন্যতম প্রধান বিষয় হল কয়েকজন মানুষের মৃত্যুদণ্ডের দাবী। জানি, তারা প্রত্যেকেই ভয়ংকর অপরাধী এবং জঘন্য সব কুকীর্তির সঙ্গে তাদের নাম জড়িয়ে আছে।

আসলে এক্ষেত্রে আমার পয়েন্ট টা একদমই অন্য। আমার প্রশ্ন হল কয়েক হাজার (বা লাখ) প্রতিহিংসা পরায়ণ মানুষের রাস্তায় নেমে এসে বিক্ষোভ আন্দোলনকে কেন বা ঠিক কী কারণে {গণ (জাগরণ/অভ্যুত্তান/প্রতিরোধ)} নামে ডাকা হচ্ছে? আচ্ছা ধরুন ওদের দাবী মেনে নেওয়া হল এবং সব ব্যাটাকে ফাঁসিতে লটকানো হল? তারপর? সবাই সোৎসাহে ‘মোগাম্বো খুশ হুয়া’ বলে ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন? সমস্যার সমাধান? ব্যাপারটা ভাবতে আশ্চর্য লাগছে কি? আমার তো লাগছে। কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে এর চেয়ে অনেক কম মানুষ একত্রিত হয়ে অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে যার মধ্যে নিজেদের এবং গোটা দেশ-কালের ভাগ্য বদলে ফেলবার ইতিহাসও রয়েছে। কিন্তু এখানে তার নাম গন্ধ নেই। আগে ছিল ‘গণধোলাই’, এখন নাম-ধাম বদলে হল ‘গণজাগরণ’! আসলে পুরোটাই “হাতি পাদেগা হাতি পাদেগা- ফুস্‌”।

অথচ বাংলাদেশ বা ভারতবর্ষের আনাচে কানাচে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে ঘটে চলেছে অজস্র অন্যায় ঢপ্‌বাজী বদমায়েশি গুন্ডারাজ। আর এসবের পিছনে লুকিয়ে থাকা প্রচ্ছন্ন কারণ গুলি কি কি তাও জানতে কারুরই বাকি নেই। স্ক্যান্ডাল আর স্ক্যামে দুই দেশ প্রায় সেয়ানে সেয়ানে লড়ে চলেছে। সবচেয়ে হাস্যকর ঘটনা হল, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইন্টারন্যাশানাল ওয়ার ক্রাইম ট্রাইবুনাল-এর সদস্য বিচারপতিদের মধ্যেই কয়েকজন বিচারপতি একটা বড়সড় স্ক্যামে জড়িয়ে পড়েছিলেন এই মাস দুয়েক আগেই। তাঁদের স্কাইপি কথাবার্তা হ্যাক করে এমন কিছু অসঙ্গতির কথা জেনে ফেলে একটি বিদেশী সংবাদ মাধ্যম যার জেরে তাঁরা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। (ঘটনাটি বিস্তারিত পড়ুন) তবে এখানেই কি শেষ? সর্ষের মধ্যে আরও কত রকম ভূত ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে তার কতটুকুই বা জানতে পারি আমরা? তবে ভূত ভগবানরা আমাদের মত আঁতি-পাতি পাবলিকদের দেখা দেন না, তাই আমরা তাদের কথা বলতে পারিনা। কিন্তু চোখের সামনে একদল মানুষ নিত্যদিন যেভাবে সাধারণ মানুষের সর্বস্ব লুটে পুটে নিয়ে তাদের জিনা হারাম করে রেখে দিচ্ছে তার প্রতিবাদে কেন একটা প্রজন্ম বা নন্দন চত্বর হয়না? কেন একসঙ্গে দশ হাজার মানুষ ধর্মতলার মোড়ে মানব বন্ধনে শামিল হয়ে সাধারণ মানুষের খেয়ে পড়ে নির্বিঘ্নে বাঁচবার অধিকারের দাবী প্রকাশ করতে পারিনা আমরা? কেন একটা সামান্য ড্রাইভিং লাইসেন্স বের করতে গেলেও দালাল না ধরে উপায় নেই? কেন নিজের হকের পেন্সান আদায় করতে গিয়ে সত্তরোর্ধ বৃদ্ধারও ঘুষ না দিয়ে নিস্তার নেই? যারা গ্রামে গঞ্জে শিক্ষিত বেকার ছেলেপুলেদের হাতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারের বদলে প্ল্যানফুলি তুলে দিচ্ছে বেঢপ বিটকেল মোবাইল ফোন তাদের ফাঁসিতে লটকানোর দাবী তুলতে কেন দেখা যায় না একজনকেও? এত লোক যাঁরা মোমবাতি নিয়ে রাস্তায় হেঁটে বিভিন্ন অনাচারের প্রতিবাদ ট্রতিবাদ করছেন কেন তাঁদের চোখে এইসব প্রাত্যহিক অনিয়ম গুলো ধরা পড়েও পড়েনা? কি অদ্ভুত সেডো-ম্যাসোকিস্টিক আমরা, আমাদের এই সুশীল সমাজ! চারটে লোকের মৃত্যুদণ্ডের জন্যে অনশন আন্দোলন করতে আমরা পিছপা নই, এদিকে নিজেদের খাদ্য-সুরক্ষা বা হু হা মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আমরা কি অদ্ভুত নিরুদ্বেগ। কিন্তু কেন? আসলে এই ‘কেন’ প্রশ্নটা বোধহয় করাটা খুবই সহজ আর উত্তরটাও আমাদের সবারই জানা।

কারণ আমরা ভদ্দরনোঁক। আমরা শান্তিপ্রিয়। আমরা ক্যেরিয়ার কনসাস্‌। আমরা অকারণ ঝামেলায় জড়াতে চাইনা। আমরা চাই শান্তিপূর্ণ বিপ্লব (কি অসাধারণ অক্সিমোরন)। তাই আমাদের হাতে গুলি-বারুদ নয়, ৩ টাকা দামের শিরিঙ্গে মোমবাতি। আমরা একইসঙ্গে গান্ধিবাদি ও বামপন্থী! আমাদের বাড়ীতে বাল-বাচ্ছা আছে। আমরা নিঃশব্দে গর্জে উঠে প্রতিবাদ জানাই।

 কিন্তু আমার মনে হয় এই মেকী বুদ্ধিজীবীতা আর সুপারইগো স্যাটিসফ্যাকশান-এর চক্কর থেকে এবার আমাদের বেড়িয়ে আসবার সময় হয়েছে। মানে, এইসব লোক দেখানো ভন্ডামী করার চেয়ে বাড়িতে বসে দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে দেখা সাধু সন্তের লক্ষণ। কিছু তাৎক্ষণিক আবেগে মেতে উঠে হুজুগে বাঙালি যা করে আপনাকেও তাই করতে হবে? সেতো কত লোক হুজুগে পড়ে সোনাগাছিও যায়, তাই বলে আপনিও যাবেন? আর যাবেন তো যাবেন, আবার ফিরে এসে গণিকাদের জীবনের অসহনীয় দুর্দশার প্রতিবাদে ফেসবুকে কাব্যি করবেন? এই হিপোক্রিসির ট্র্যাডিশান আর কদ্দিন চলবে বলতে পারেন? আমি তো অনেক কে বলতে শুনেছি, মজা করেই, যে, “চ ভাই, আমরাও একটা মোমবাতি মিছিল করে ফেলি। পেপারে ছবিটা তো বেরোবে অ্যাটলিস্ট”! কিন্তু এই বলিউডি ধারণাটাকে অবিলম্বে ভেঙ্গে দেওয়া দরকার। মোমবাতি মিছিলের এই কনসেপ্ট-টি ভারতীয় জনমানসে ইন্ট্রোডিউস্‌ড্‌ হয় ২০০৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ ঝাঁ-তকতকে আধুনিকতার মোড়কে পণ্যায়িত অত্যন্ত ওভাররেটেড এবং আদ্যান্ত মেলোড্রামাটিক ও অবান্তর প্লটের ওপর বানানো একটা বলিউডি ছবির মাধ্যমে যার নাম ‘রং দে বাসান্তি’। এই ছবিরই একটা দৃশ্যে প্রথম এই ধরণের প্রজ্বলিত মোমবাতি হস্তে মৌন মিছিল দেখানো হয় এবং আমরাও এই নতুন ধরণের প্রোটেস্ট মার্চের মধ্যে খুঁজে পেতে শুরু করি ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ সুলভ আত্মিক পরিতৃপ্তি।

ফলে যা হওয়ার তাই হল, দিকে দিকে যে কোন ইস্যুতে পাবলিক হাতে তুলে নিল মোমবাতি আর মুহূর্তে তার সমস্ত সমস্যা যেন ভুস করে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে থাকলো। আর এদিকে আমাদের ‘গরমেন্ট’ও খুশ। তারাও বুঝে গেলেন যে এইসব মেদিমার্কা ছোঁড়াছুঁড়ি গুলোকে দিয়ে কিসু হওয়ার নয়, ওসব বড়োলোক বাপ-মায়ের হুজুগে ছেলেপিলের কান্ড যতসব। ও করছে করুক গে যাক। মোমবাতি, তা সে যত মোটাই হোক, গলতে তো আর বেশী টাইম লাগেনা রে বাপু। তারপর তো আবার নেমে আসবে সেই অদ্ভুত আঁধার…

শাহবাগ তবু সেদিক থেকে কিছুটা হলেও সদর্থক এই অর্থে যে একটি ইসলামিক মেজরিটির দেশে ধর্মীয় মৌলবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সেখানে সরাসরি আওয়াজ উঠতে শুরু করেছে। এবং তাঁরা দেখিয়ে দিতে পেরেছেন যে সারাদিন ফেসবুকে লাইক লাইক খেলা আর ব্লগ ভর্তি গাদাগাদা ধ্বজভঙ্গ কবিতা লেখাই শুধু নয়, দূরদৃষ্টি ও স্বচ্ছ চিন্তা থাকলে ইন্টারনেট কে কাজে লাগিয়েই কি অসাধ্য সাধন করা সম্ভব। যদিও প্রকৃত সত্য বড়ই নিষ্ঠুর, এবং সেটি হল ঢাকা ছাড়া প্রায় সমগ্র বাংলাদেশের সামাজিক জীবন, আমাদের ভারতবর্ষের মতই, এখনো প্রায় মধ্যযুগীয় ধর্মীয় বেড়াজ্বাল দিয়ে আস্টেপিস্টে বাঁধা। এবং সেই সঙ্গে শিক্ষার মান এতই নিম্নগামী যে এই অন্ধকার আগামী পঞ্চাশ বছরেও কাটবে কিনা সন্দেহ। তবু আশা… এই আশা টুকু ছাড়া আর কিই বা আছে আমার আপনার? আর ইতিহাসে এমন উদাহরণ তো অনেকই আছে যে একটা প্রজন্ম এগিয়ে এসে একটা গোটা জাতির দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাসকে এক ঝটকায় পাল্টে দিয়ে গেল। হতে পারে শাহবাগ প্রজন্ম সেইরকমই একটা প্রজন্ম। হতে পারে তার চোখ দিয়েই গোটা বাঙালী জাতি সাক্ষ্মী হবে এক নতুন সূর্যোদয়ের। কলকাতা লাইক করবে ঢাকার গান, ময়মনসিংহ শেয়ার করবে নন্দিগ্রামের গীতিকা, সাইবার আলিঙ্গনে এপার ওপার মিলে মিশে যাবে, একাকার হয়ে যাবে দুই বাঙলার সমস্ত চিন্তাশীল শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ। আর তার হাতে থাকবে বন্দুক নয়, ঝাণ্ডাও নয়, কেবল মাউস আর কীবোর্ড। সেই দিন এসে গেছে কমরেড, প্রস্তুত হন।

         

 

হাতে থাকবে কীবোর্ড
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments