ওপাড়ার হারু

পূর্ণিমা রাত্তিরে খেয়েছিল দারু

খেয়ে ভাবে “আরে বাস!

হয়ে গেছি দেবদাস!”

হাঁক পাড়ে চিল্লিয়ে “কাঁহা গয়ি পারু?”

 

এই হারু ওরফে হারাধন আমার কলেজের বন্ধু। কি ভাবছেন? আজকের দিনে শহুরে ছেলেদের নাম হারাধন তো বিশেষ শোনা যায়না। ঠিকই ধরেছেন, হারাধন ওর আসল নাম নয়, স্রেফ গল্পের খাতিরে ধরা যাক ওর নাম হারু। নামে কিবা আসে যায়?

 

কলেজে পড়তে এই হারু ছিল আমার খুব কাছের বন্ধু। সে ছিল খুব কুল একটি ছেলে, কোনোকিছুতেই সেরকম তাপ-উত্তাপ নেই। অন্তত বাইরে থেকে দেখে এরকমই লাগত। এহেন হারাধন একদিন পড়ল একটি মেয়ের প্রেমে। পড়বি তো পড় এমন মেয়ের প্রেমে পড়ল যে কিনা ওই অঞ্চলের সবচেয়ে সুন্দরী। সৌভাগ্যবশত এই পতনটা মিউচুয়াল, অর্থাৎ কিনা মেয়েটিও ভালবাসে হারুকে। দুজন কিছুদিন চুটিয়ে প্রেম করল… হাত ধরে বেড়াল, লেকের ধারে আড্ডা দিল, চুমু-টুমু খেল… তারপর একদিন হঠাৎ প্রচণ্ড ঝগড়া! আমরা ভাবলাম ওরকম দাম্পত্যকলহ তো হয়েই থাকে, দুদিন পর ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু না, ব্যাপারটা অত সহজ হলনা। যেকোনো কারণেই হোক মেয়েটি খুব আহত হয়েছিল, সে ঠিক করল আর কোনো সম্পর্ক রাখবেনা ওই হারুর সাথে। অতএব ব্রেক আপ! হারু দুঃখ পেল, আমরাও দুঃখ পেলাম, জীবন চলতে থাকল নিজের মত।

 

কিন্তু ব্যাটাচ্ছেলে হারু কিছুতেই জীবন নামক ব্যক্তিটির সাথে চলতে চাইলনা। কাঁদল, মনমরা হয়ে থাকল, হতাশায় ভেঙে পড়ল, পড়াশোনাও দিল বন্ধ করে। আর হ্যাঁ, মদকে বেছে নিল সঙ্গী হিসেবে। সে কত রকমের রঙবেরঙের দিশি-বিলিতি সব মদ! সেসব পেটে পড়লেই নাকি মানুষ সব সুখ-দুঃখ ভুলে যায়। সত্যিই কি যায়? আমি তো যা দেখেছি হারু মদ খেয়ে আরও বেশি কেঁদেছে, আরো বেশি করে ভেবেছে মেয়েটির কথা। আপনি হয়তো বলবেন “আমরা তো মদ খেয়ে দিব্যি ফুর্তি করি, দুঃখ বেদনা ফ্রাস্ট্রেশনের কথা সাময়িকভাবে বেরিয়ে যায় মাথা থেকে।” আপনি পারেন, হারুর মত লোকেরা পারেনা… কারণ ও এক বিশেষ শ্রেণীর মানুষ, যারে কয় “দেবদাস”।

 

হ্যাঁ শরৎচন্দ্রের সেই দেবদাস, বাঙালির ট্র্যাজিক হিরো দেবদাস। কালে কালে এই নামটা প্রায় কমন নাউন হয়ে এসেছে। সেই কমন নাউনের অর্থ “ব্যর্থ প্রেমিক” নয়, তার অর্থ “আমি ব্যর্থ প্রেমিক, আমি দুঃখী” এরকম যে ভাবে সেই মানুষ। হারাধনের আবেগকে অশ্রদ্ধা করা আমার উদ্দেশ্য নয়, বিচ্ছেদের কষ্ট আমি বুঝি, কিন্তু একথা সত্যি যে ওর হতাশার কারণ যত না বিচ্ছেদের জন্য, তার চেয়েও বেশি ওর দুঃখ-বিলাসিতার জন্যে।

 

যাহোক, এ হেন দেবদাস হারুর কি হল তারপর? পড়াশুনা ছেড়েছুড়ে গোল্লায় গেল এবং ফেলটু মারল। তাতে ফ্রাস্ট্রেশন বাড়ল বই কমলনা। বন্ধুরা অনেক বোঝাল, সঙ্গ দিল। সব শুনল, হয়তো বুঝলও, আবার রাত হতেই শুয়ে পড়ল দুঃখের চাদরের তলায়। হারুর ট্র্যাজিক পরিণাম নিয়ে বেশি শব্দ খরচ করবনা আর, এরকম ঘটনা আখচারই ঘটে থাকে। এই ঘটনাগুলো দেখে কেবল একটা কথাই বলতে ইচ্ছে করে – “বাঙালিকে এ কোন আফিম দিয়ে গেলেন আপনি শরৎবাবু?”

 

কে জানে, শরৎবাবু হয়তো দেবদাসের মধ্যে হিরোইসম সেভাবে দেখাতে চাননি, হয়তো তিনি সেই সময়ের সমাজের প্রেমঘটিত একটা সমস্যার কথাই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তারপর সেই উপন্যাসটি পাঠককে গেলাবার মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে দেবদাসের সেন্টুময় জীবনকথা ওরকমভাবে লিখেছিলেন। আসলে কি যে চেয়েছিলেন খোদায় মালুম, কিন্তু পাঠক তাকে দেখল হিরো হিসেবেই। যদি বা না দেখত, বা সময়ের সাথে সাথে যদি বা বাঙালি দেবদাসকে ভুলে যেত, সে আর হতে দিলনা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। দেবদাসকে নিয়ে বাঙলা এবং অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় এতবার ফিল্ম বানানো হয়েছে যে ধীরে ধীরে বিভিন্ন জেনারেশন ধরে এই দেবদাসত্ব ভারতীয়দের রক্তে ঢুকে পড়েছে। অন্য দেশ কালে কি এহেন বিরহের চোটে নিজের উপর অত্যাচার করার অভ্যেস নেই বা ছিলনা? আছে, কিন্তু দেবদাসের মাধ্যমে এটা যেভাবে ভারতীয় বিশেষ করে বাঙালি যুবকদের কাছে হিরোইজমে পরিণত হয়েছে তা অন্যত্র হয়নি।

 

উপন্যাসটা প্রথমবার পড়ে আমার আহামরি কিছু লাগেনি, ওই নিয়ে গোটা দুয়েক ফিল্ম দেখার পর অপছন্দটা আরও বেড়েছে। প্রথমত মেরুদণ্ডহীন দেবদাস যেভাবে ব্যবহার করেছে পার্বতীর সঙ্গে, তারপরও তাকে যে হিরো হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে এই ব্যাপারটাই প্রচণ্ড আপত্তিকর। তার ওপরে ব্যর্থ প্রেমের পরিণতি হিসেবে সে যে জীবন বেছে নিয়েছে সেটার মধ্যেও প্রশংসনীয় কিছু নেই। তবু সে পাঠকের এবং ফিল্ম দর্শকের অত্যন্ত সহানুভূতির পাত্র। এবং এইখেনেই গলদ। বাঙালি তরুণরা ভাবে এইটেই বুঝি সহানুভূতি আদায়ের শ্রেষ্ঠ উপায়। প্রেম ব্যর্থ হল কি হলনা, তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে মদের পিপেয়। সঙ্গে চাঁদনি রাত কিম্বা গভীর বেদনাভরা ফিল্মি গান। সবে মিলে বেশ একটা কিউট দুঃখ দুঃখ পরিবেশ। আহা…

 

 

 

মাঝেমাঝে ভাবি, এ কি কেবল অন্যের সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা? না বোধহয়। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় নিজেই নিজেকে পিঠ চাপড়ানো, নিজের প্রতি করুণাবোধ করা। খালি পেটে এক পাঁইট হুইস্কি গিলে হারাধনরা ভাবে “আহা রে হারুটার কি দুঃখ, কেবল ওর এক্স গার্লফ্রেন্ডটাই বুঝলনা”। এই ভাবনার মধ্যে থেকেই তারা খুঁজে নেয় এক অপূর্ব আনন্দ! ব্রেক আপের দুঃখ যত না থাকে তার চেয়েও দ্বিগুণ থাকে এই সেলফ-ইম্পোজড দুঃখ (নাকি আসলে সুখ?)। মনে আছে “পেয়ার কা সাইড এফেক্টস” ফিল্মে ব্রেক আপের পরও কান্না পাচ্ছেনা বলে সিদ্ধার্থ-রূপী রাহুল বোস কিরকম দুঃখের গান চালিয়ে ভেউ ভেউ করে কেঁদেছিলেন?

 

তবে বিচ্ছেদবেদনা এবং সেই থেকে নিজের লাইফটা নষ্ট করার শিক্ষা দেবদাস দিলেও এই সমস্যার মূল বোধহয় আরও গভীরে। এর পিছনে আছে ইটার্নাল লাভের ধারণা, যা কেবল বাঙালি বা ভারতীয়দেরই নয়, পশ্চিমেও মানুষকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে একটা সময় পর্যন্ত। এখন সময় বদলেছে, ভালবাসা যে সবসময় সারা জীবনের মতই হতে হবে এই গোঁড়া ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে মুক্ত চিন্তা। তবু “আমাদের দেশের ঐতিহ্য অন্য কথা বলে” এই দোহাই দিয়ে এখনও স্বামী বা স্ত্রী এর মৃত্যুর পর বা ডিভোর্সের পর কেউ পুনর্বিবাহ করলে তাকে একটু অন্য নজরে দেখে ভারতীয় সমাজ। এরকম করলে ভালবাসার দামটা যেন অনেকটা কমে যায়। যা আর ফিরে পাওয়া যাবেনা তাকে সরিয়ে রেখে (হয়তো খুব যত্ন করেই মনের এক কোণে সঞ্চিত রেখে) কেউ যদি নতুন করে ভালবাসতে চায়, তার কদর কেউ করেনা। আবার প্রেমিকা ফিরে আসবেনা নিশ্চিতভাবে জেনেও হিরো যখন ডায়লগ দেয় “তোমার জন্যে সারা জীবন অপেক্ষা করব”, সে ডায়ালগ যতই বোকা বোকা শোনাক, হাততালিতে ফেটে পড়ে সিনেমা হল!

 

এ হেন সমাজের যুবকরা যে দেবদাস সিনড্রোমে ভুগবে তাতে আর আশ্চর্য কি। দুঃখবিলাসে আচ্ছন্ন হয়ে হারুর মত নষ্ট করবে নিজের ভবিষ্যত। অতটা না করলেও ইররিভার্সিবল সময়ের স্রোতের একটা মূল্যবান অংশ হেলায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে অদ্ভুত সুখে মত্ত হবে। মদের নেশায় বুঁদ হয়ে গার্লফ্রেন্ডকে ফোন করে ইমোশনাল ডায়ালগ ঝাড়া এবং ব্যাপারটা আরও কেঁচিয়ে দেওয়ার উদাহরণও ভুরি ভুরি। এই প্রসঙ্গে বহুদিন আগে দেখা একটা ছবির কথা মনে পড়ে গেল। কোনো এক ওয়াইনের বোতলের লেবেলের এই লেখাটি পড়ে বেশ মজা পেয়েছিলাম।

 

এরকম একটা করুণ আবেদন দেখেও যদি আপনি দেবদাসত্বের লোভ ছাড়তে না পারেন, অন্তত ওরিজিন্যাল দেবদাস আর আমাদের হারাধনের করুণ অন্তিম পরিণতি দেখে আত্মসংবরণ করতে পারেন। এসব ছেঁদো হিরোইজম ছেড়ে জীবনটাকে একটু রেসপেক্ট দিলেও তো হয়! মিলন বা বিচ্ছেদ দুইই আসলে ওই জীবনের ছোট ছোট সাবসেট, শুধু ঐটুকু নিয়ে পড়ে থাকলে আপনারই লস। ভাল মন্দ যাহাই আসুক সত্যকে সহজে নেওয়ার একটু চেষ্টা করলেই দেখবেন সব এক্কেরে মাখন!

 

আর তার পরেও যদি পূর্ণিমা রাত্তিরে চাঁদের দিকে তাকিয়ে মনটা উড়ু উড়ু হয়ে যায়, তাহলে অতুলপ্রসাদের সেই গানটা আর একবার শুনে ফেলুন –

 

নীল আকাশে অমন করে হেসেই থাকে চাঁদ…

পাগলা, মনটারে তুই বাঁধ।

 

 

হারাধন একটি দেবদাসের নাম
  • 3.67 / 5 5
3 votes, 3.67 avg. rating (75% score)

Comments

comments