আমাদের দেশ বিবিধ বৈচিত্রের আঁতুরঘর। প্রকৃতি যেন স্রষ্টার কাছ থেকে ‘যত চাও তত’ স্কিমে রসদ ও সময় পেয়ে নিরন্তর গবেষণা করে চলেছে এই দেশের মানুষ নামক জন্তুটাকে নিয়ে। আমাদের দেশের নানা প্রান্তে নতুন মানুষ দেখলে পরেই প্রথমেই তার পরিচয় নিয়ে নানা রকম প্রশ্ন করা হয়ে থাকে। মানে ব্যাপারটা বোঝা যে ‘দেখি তুই কত বিচিত্র?’ এই যেরকম উত্তর ভারতে পোশাক চেহারা দেখে ধর্ম না বুঝতে পারলে ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করা হয়।আবার ধর্ম যদি হিন্দু হয় তাহলে জাত গোত্র জানতে চাওয়া হয়। মুসলমান হলে জানতে চাওয়া হয় সে শিয়া না সুন্নি, আহমাদি না বোরা ? ওদিকে দক্ষিণ ভারতে আবার প্রথমেই ভাষা যাচাই করা হয় , দাক্ষিণাত্যের চারটে মূল ভাষার সাথে আপনার ভাষা কমন না পড়লেই আপনি নর্থ ইন্ডিয়ান। ব্যাস আপনার প্রাথমিক পরিচয় চিরজীবনের জন্য এস্টাব্লিশড হয়ে গেলো।আমরা বাঙালি আবার সংকীর্ণ ভাবে ধর্ম, ভাষা, জাত নিয়ে মাথা ঘামাই না কেননা সেই বিশ্বামিত্রের আমল থেকেই বৃহৎ আকারে কে খোট্টা, কে পাইয়া , কে মেরো, কে উড়ে সব ঠিক করে রেখে দিয়েছি। তবে অন্য এক নতুন মাতৃভাষীকে দেখলে হয়তো একটা চিরাচরিত কৌতূহল জাগে – এই শর্মা কি পূর্ব নাকি পশ্চিম বঙ্গীয়? চলতি কথায় মালটা ঘটি না বাঙাল ? সেটা আবার সোজাসুজি প্রশ্ন করে জানাটা যদি একান্তই দৃষ্টিকটু লাগে তো তা জেনে নেবার আরো অনেক সফিস্টিকেটেড উপায়ও আছে। এই যেরকম সুযোগ বুঝে আলটপকা জিজ্ঞেস করা ,” কি দাদা এবার ডার্বিতে কি হবে? কি মনে হচ্ছে হুম?” কিংবা ” মাংসটা ঝোল ঝোল রাখবো নাকি একটু মাখা মাখা ?” আমি যদিও বরাবর এই সুক্ষ ভেদাভেদ সম্বন্ধে একটু গোদাভাবে আকাট গোছের ছিলাম তাই ছোটবেলায় বাঙাল আইডেন্টিটি সম্বন্ধে ভাবতে গেলে দাদু দিদার মুখ মনে পড়ার আগে ভানু বন্দোপাধ্যায়ের চেহারা চোপার কথাই মনে পড়তো বেশি। আমার বাবার দিকে বলতে গেলে প্রায় এদেশীয় তাই মাতুলাক্রমের প্রভাবে আমিও হলাম গিয়ে হাফ বাঙাল যাদেরকে বেশিরভাগ সময় বাটি বলা হয়ে থাকে।
তা আমার আইডেন্টিটির নামকরণ বাটি না হয়ে হাফ বাঙাল হওয়ার পেছনে প্রফুল্ল সাহা নামক এক একাত্তরের পরে দেশ ছাড়া উদ্বাস্তু প্রৌঢ়ের পরোক্ষ অবদান রয়েছে। ভানু বন্দোপাধ্যায় যদি বাঙাল হন তাহইলে প্রফুল্ল সাহা হইলো গিয়া এক্কেরে কাইঠ বাঙাল। মুখ দেখে কোনো সন্দেহ জাগলেও সেটা খুললে পরেই তার কোনো অবকাশ থাকতোনা। তার ফোকলা দাঁতের মাঝ থেকে বিচ্ছুরিত শব্দপুঞ্জগুলো তার আইডেন্টিটিকে আরো পোক্ত করে তুলতো আর কি ‼ প্রফুল্ল সাহা ওপারে কি ছিল জানিনা তবে এপারে আসার পর এ দেশের ভাষায় তার আইডেন্টিটি হয়ে গেলো ‘রিফিউজি’। সে ও তার পরিবার কিছুদিন খালপাড়ের জবরদখল কলোনীতে বাকি সবার সাথে একত্রে অনেক কষ্টে সৃষ্টে প্রথম ক’মাস কাটায়। তারপর কামকাজ না জোটাতে পেরে বৌয়ের সঞ্চিত কিছু সোনাদানা বিক্রি করে আমাদের পাড়ায় কাঠা দুয়েক জমি কিনে একটা দু-কামরার দরমার বাড়ি তোলে। ও ক্রমশ সামনে উঠোনে একটা চৌকি পেতে তাতে নানারকম বাক্স কৌটো সাজিয়ে সে তার রকমারি ভান্ডারের ব্যবসা শুরু করে।সাধারণ মুদি-দোকান বা দশকর্মা ভাণ্ডারে যা যা কম চাহিদা বা লো মার্জিন কিংবা স্থানাভাবে জন্য রাখা হতো না সেইসব বস্তু বহাল তবিয়তে সাহাবাবুর দোকানে মজুদ থাকতো।এই যেরকম ইঁদুর মারার কল,হ্যারিকেনের চিমনি,স্টোভের ফিতে,টন সুতো,রিঠার বিচি, ধুঁধুলের ছোবড়া,গুলি লজেন্স ইত্যাদি। সাহাবাবুর বৌ ঘরের ভেটো থেকে প্রায় বেরোতেন না বললেই চলে। সে সারাদিন তাদের অসম মাটির মেঝেতে ঘটঘট করে সেলাই মেশিন চালিয়ে ব্লাউস সায়া ইত্যাদি তৈরী করে দোকানে দোকানে সাপ্লাই দিতো। আর মেয়েটাতো আরেক ট্রাজেডি। ক্লাস এইট অব্দি পড়ে তারপর কেন জানি পাগল হয়ে গেছিলো। সারাদিন ঘরের ভেতরে বসে সায়া ব্লাউসের কাপড়গুলো ছিঁড়তো আর মা বকা দিলে মিনিট পাঁচেক ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে কুঁজো থেকে এক গ্লাস জল উপচিয়ে খেয়ে তারপর খবর কাগজ কাটতে বসে যেত। সাহাবাবু মেয়েকে কোনোদিন কিছু বলতোনা, খুব বায়না করলে লম্বা ফিতের গোছা এগিয়ে দিয়ে বলতো, “মা’র কামের জিনিস হাত দিস না, নে এইগুলান ধইরা মাইপ্যা কাঁচি দিয়া কাইট্যা থো।”
সন্ধেবেলায় এমনিতে তার দোকান ফাঁকাই থাকতো কেননা ইলেকট্রিসিটি না থাকার দরুন অৰ্ধেক জিনিস সে খুঁজে পেতো না আর পেলেও সেটা তার প্রচ্ছন্ন কুসংস্কারের জন্যে বেচতে চাইতো না.। রাত বাড়লে সে একটা কুপি জ্বালিয়ে ট্রান্সিস্টর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নানা রকম স্টেশন বিশেষ করে রেডিও বাংলাদেশ ধরতো ও ঘাড় বেকিয়ে, ভ্রু কুঁচকে সেই ফ্রিকোয়েন্সির অস্পষ্ট সম্প্রসারণের সারমর্ম বোঝার চেষ্টা করতো। দিনের বেলায় লোকের আনাগোনা থাকলেও সাহাবাবুর দোকানে ক্রেতার চেয়ে এক বিজাতীয় ভাষায় অন্য এক দেশের নানা কিস্সা-কাহিনী শুনতে আসা শ্রোতার ভিড় থাকতো বেশি।ধার বাকিতে জিনিস নেবার ফিকিরে অনেকেই তার ‘দ্যাশে এই ছ্যালো, সেই ছ্যালো….’ ধৈর্য্য ধরে মাথা নেড়ে নেড়ে শুনতো। আর তার ব্যক্তিগত ফেভারিট হিসেবে ওপারের থেকে কি ভাবে সে প্রাণ বাঁচিয়ে বৌ মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে এলো সেই আবেগমথিত বিস্তারিত বিবরণ সে সময় অসময় প্রচুর লোককে শুনিয়েছেন। আশ্চর্যভাবে সেই কাহিনীর এতো গুলো ভার্শন ছিল যে কোনটা অরিজিনাল আর কোনটা পাইরেটেড তা ঠাওর করা মুশকিল। কোনোবার সে জলপথে এদেশে আসেন তো কোনোবার বার অমাবশ্যার রাতে কাঁটাতার পেরিয়ে।আবার হাতে সময় থাকলে হয়তো ভারতে তার এন্ট্রি হতো আসাম কিংবা ত্রিপুরা দিয়ে। কোনোবার সামনে পরে যেত রাজাকার বাহিনী তো কখনও খানসেনা। তবে গল্পের শেষে তার ছেলেকে না বাঁচাতে পারা ও মেয়েকে কোলে নিয়ে বিশ মাইল পথ হাঁটার ঘটনা গুলো কিন্তু আদ্যোপান্ত সত্যি ছিল। তাই শুরু ও মধ্যভাগে যতই অমিল থাকুক না কেন শেষভাগ শুনে অনেকেরই চোখে জল চলে আসতো। গল্পের মাঝে যখন সাহাবাবু স্ট্রাগল পর্যায় চলছে তখন হুট্ করে পাড়ার কোনো ডেপো ছোঁড়া আবার সাহাবাবুকে যদি ইয়ার্কি মেরে বলে বসত যে,” কাকা, অত ঝামেলা না করে তুমি বর্মা পালিয়ে গিয়ে ওখান থেকে সোজা প্লেনে করে এখানে উড়ে আসলেই তো পারতে ‼” তখন বুড়ো খেপে গিয়ে, “দ্যাখো নাই তো সেই দিন ‼অন্যের দুঃখ নিয়ে মস্করা করো না? ফাজিল কথাকার ,যাও নিজের কামে লাগো গিয়া…” বলে সব্বাইকে দোকান থেকে তাড়িয়ে দিতো।
ফিরি সেই আমার হাফ বাঙাল নামের পেছনে প্রফুল্ল সাহার পরোক্ষ অবদানের গল্পে। ছোটবেলায় নববর্ষে এমনিতে বাবার ছুটি থাকতোনা। তাই বিকেল বিকেল আমাকে চেনা পরিচিত দোকানে পাঠানো হতো নতুন ক্যালেন্ডার ও মিষ্টির প্যাকেট কালেক্ট করে নিয়ে আসতে। পাড়ার ছোট বড় সব দোকানই ধুয়ে-মুছে ঝাড়পোছ করা হতো। কৌটোকাটি পাল্টে বাইরে দু একটা হাই পাওয়ারের লাইটও লাগানো হতো। মোটের ওপর গরমের শুরুতে গোটা ব্যাপারটা একটু উৎসব উৎসব ঠেকতো।মুদির দোকান, মিষ্টির দোকান, সোনার দোকান ছিল আমাদের প্রাইমারি টার্গেট। প্যাকেট পেলেই তা খুলে নিজের প্রিয় আইটেমটা উদরস্থ করে বাড়িতে বাকিটা জমা দেওয়াই ছিল আমাদের অলিখিত রেওয়াজ। প্রথমবার শিখেছিলাম যে পুরোনো বছরের সব হিসাব-কিতাব খতম করে নতুন হিসাবের খাতা খোলা হয় এই দিন। লাল মলাটে মোড়া স্বস্তিকা চিহ্ন অংকিত নতুন খাতাকে হিসেবের নতুন দলিল হিসেবে চালু করাটাকেই বলে হালখাতা। জানলাম নতুন কিছু ব্যবসা শুরু করার থাকলে এই দিনটাকেই শুভ সময় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। নতুন দোকান মানে আবার মিষ্টির বাক্স নয় ‼ সেখানে মালিক পায়জামা পাঞ্জাবি ও মালকিন ঝকমকে শাড়ী পরে করজোড়ে হাসিমুখে সব্বাইকে রীতিমতো কাটলেট, কেক,প্যাস্ট্রি ও কফি-কোল্ড ডিংক্স খেতে আমন্ত্রণ জানায়। আবার অনেক দোকান বিশেষ করে স্যাঁকড়ার দোকানের মোটা হিসেবে মেটাতে আরো ক’দিন সময় লাগে বলে তাদের হালখাতা সেদিন নাও হতে পারে । তাই যারা বছরের প্রথম দিনটা হিসেব মিটিয়ে উঠতে পারেননা অথবা নতুন কিছু শুরু করা হয়ে ওঠেনা তাদের জন্য অক্ষয় তৃতীয়া হিসেবে পরে আরো একটা অপসন রয়ে যায়। তা আমার শৈশবের কোনো এক নববর্ষ কালক্রমে রবিবারে পড়েছিল। স্কুল ছিল না তাই বিকেলে ঘুমোচ্ছিলাম। রবিবার মানে বাবারও ছুটি তাই আমার বদলে বাবা চেনা দোকান গুলোতে গিয়ে ওই বছরের আমার কোটার কালেকশন গুলো প্রক্সি হিসেবে তুলে ফেললো। ঘুম ভাঙতেই বুঝলাম সালের প্রথম দিনেই সালানা সব্বোনাশ হয়ে গেছে।পাড়ার অন্যান্য বন্ধুরা যখন লাড্ডু অমৃতি চেটে চুষে খাচ্ছে আমার ভাঁড়ার তখন ফক্কা। মা সবকটা প্যাকেট মিটসেফে ঢুকিয়ে তালা লাগিয়ে দিয়েছে‼ পড়ি কি মরি হয়ে ছুটলাম যদি কোনো নতুন দোকান খোলে, তাহলে অন্তত কেক কোল্ড্রিংকস জুটলেও জুটতে পারে। নাঃ একটা শাড়ীর দোকান খুলেছে বটে তবে তাদের খাওয়ানোর পালা প্রায় শেষ। শুধু এঁটো প্লেট আর ফাঁকা কাঁচের বোতল পরে আছে এক পাশে। নিজের ক্যালাসপনাকে দুষতে দুষতে যখন পাগলা দাশুর মতো নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে বাড়ি ফিরছি হটাৎ দেখি প্রফুল্ল সাহার দোকানের সামনে মোড়ায় দুজন বসে আছে। সামনের দিকে বাঁশের খুঁটিতে একটা ঝকঝকে নতুন হ্যাজাক লণ্ঠন টাঙানো ও কৌটোকাটি গুলো একটু ভদ্র সভ্য লাগছে। থমকে দাঁড়াতেই প্রফুল্ল সাহা হাতছানি দিয়ে ডাকলো , ” আসো আসো, এদিকে আসো। ” কাছে গেলাম ও যেতেই দেখলাম কৌটো গুলো পুরোনোই তবে সবকটার ঢাকনা সাহাবাবু পাল্টে নতুন করে দিয়েছে। আমাকে এটা সেটা জিজ্ঞেস করার পর বললো,” তাহইলে হইলো গিয়া তোমার বাপের দিক দিয়া তুমি এদেশীয় ও মায়ের সাইড দিয়া আবার ফুল বাঙাল। মানে এক কথায় ব্যাপারটা খাড়াইলো গিয়া যে তুমি হাফ বাঙাল‼” আসে পাশের দুই জন হা হা করে হেসে উঠলো।একটা ঠোঙায় দুটো কদমা ও কয়েকটা বাতাসা ও ফিনফিনে কাগজের দু ফুট বাই এক ফিটের একটা বাংলা ক্যালেন্ডার হাতে ধরিয়ে সে বললো , “অর্থাভাবে বেশি কিসু করা হয় নাই তাই সামান্য কিসু লইয়া আয়োজন করসি আরকি , ঘরে গিয়া মার হাতে দিবা আর কইবা ব্লাউস সায়া বানাইতে হইলে যেন আমার সাথে যোগাযোগ করে, যাও। “, ক্যালেন্ডারটা খুলে দেখলাম নিচে লেখা ইস্ট বেঙ্গল ভ্যারাইটি স্টোর্স ও তারও নিচে আরো খুদে হরফে লেখা হরেক প্রকার রকমারি দ্রব্য বিক্রেতা আর শেষ লাইনে সবথেকে বড় হরফে লেখা আছে প্রঃ শ্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সাহা। এই রাস্তা দিয়ে রোজ স্কুল যাই আসি কিন্ত আজকেই প্রথম খেয়াল করলাম যে সাহাবাবুর দোকানের মাথায় যে টিনের সাইনবোর্ডটা ত্যারছা ভাবে লটকে আছে তাতেও হলুদের ওপর কালো অক্ষরে ওই একই জিনিস লেখা।

হালখাতা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments