কদিন আগে হাসপাতাল থেকে ঘুরে এলুম। মানে ভিজিটিং আওয়ারে না, দিনচারেক ভর্তি থেকে। আগে জীবনে কখনো অ্যাডমিটেড হইনি। বিদেশ-বিভুঁইয়ে প্রথমবার, কাজেই খুব সুখের অভিজ্ঞতা না হবারই কথা। তবে ফাঁকে ফাঁকে আজব কিছু মানুষের সঙ্গে অদ্ভুত মোলাকাত হবার দরুণ মজা পেয়েছি বেশ। সেই সব কথাই লিখতে বসেছি।

ভর্তি হবার পর শুরুর কিছুক্ষণ বিশেষ হুঁশ ছিল না। কে এসেছে, কি করেছে খুব একটা টের পাইনি। রাতের দিকে এমন একজন এলেন যে টের না পেয়ে উপায় রইল না। হাসপাতালের হাই ফাই স্পেশাল ঘর (বিলটাও পরে স্পেশালই এসেছে :P )। আকারে বিশাল। ঘুমনোর সুবিধের জন্য কেবল টিমটিমে একটা নাইট বাল্ব জ্বলছে। সেখানে প্রবেশ করলেন কেঁদো চেহারার এক মহিলা।  গায়ের রঙ মিশকালো। চেহারাটিও বেশ ভয় পাওয়ার মতই। তিনি এসে বললেন "উই হ্যাভ ফাউন্ড আউট হোয়াট ইজ কজিং ইওর ইলনেস"… বলে আরও ঘনিয়ে এলেন। তারপর হাত পা নেড়ে বলতে লাগলেন – "এ ভাইরাস অ্যান্ড এ ব্যাক্টিরিয়া অ্যাটাকড ইউ টুগেদার… অ্যান্ড দে আর নট ফাইটিং অ্যামং দেমসেল্ভস… দে হ্যাভ কাম টু ডেস্ট্রঅঅঅয় ইউ!" শেষ অংশটা বলার সময় তাঁর হাতগুলোর ভঙ্গিমা হল "হাঁউ মাউ খাঁউ" মার্কা। স্পষ্ট বুঝলাম ভাইরাস আর ব্যাক্টিরিয়ার হাত থেকে যদি বা বেঁচে যাই, এনার হাত থেকে আর রক্ষে নেই। আমার ভয়ার্ত মুখ দেখে গালভরা হাসি হেসে তিনি বললেন "ডোন্ট ওয়রি, উই আর গোইং টু কিওর ইউ… আই অ্যাম ইওর নার্স টুনাইট!"
কাঁচুমাচু হয়ে বল্লুম "নাইস টু মীট ইউ"…

প্রথম রাতে কোনো ডাক্তারকে দেখিনি। ভোরে উঠে ভাবছিলাম তবে কি এখানে নার্সরাই চিকিচ্ছে করে, ডাক্তাররা নেপথ্যেই রয়ে যায়? বলতে বলতেই দেখি হঠাত সমস্বরে কারা বলে উঠল "গুডমর্নিং!!"
চমকে তাকিয়ে দেখি দরজা দিয়ে (নাকি ছাদ ফুঁড়ে কে জানে) ঢুকেছে ছ-সাত জন ব্যক্তি। সেই দলে পুরুষ মহিলা দুইই আছে। পরনে গাউন। মাঝখানের বয়স্ক ভদ্রলোকের মুখের আদল হুবহু ডঃ কালেন এর মত (টোয়াইলাইট দ্রষ্টব্য)! সকাল সকাল ভ্যাম্পায়ারের আবির্ভাব হলে ভাল লাগেনা, কিন্তু আদৌ জেগে আছি না শরীর খারাপের ঘোরে উষ্টুম ধুষ্টুম স্বপ্ন দেখছি কে জানে। কদিন আগে ওই হাবিজাবি সিনেমাগুলো দেখার ফল হয়তো! ভাবতে ভাবতে দেখি বয়স্ক ভদ্রলোক এগিয়ে এসেছেন। বলছেন "উই আর ইয়োর ডক্টরস!" ভাবলুম সব্বনাশ করেছে! একটা রোগী দেখতে সাতজন ডাক্তার? তবে কি আমি মারা টারা যেতে বসেছি? যাই হোক অবিলম্বেই তাঁরা ভয় ভাঙালেন। বিশদে বর্ণনা করলেন পরিস্থিতি। বললেন, ভয় নেই, শিগগিরই তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে। আবার পরের দিন সকালে খোঁজ নিতে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁরা বিদায় নিলেন। তারপর সারাদিন চুপচাপ বসে থাকা… আর জানালার বাইরে তুষারপাত… স্পেশাল ঘরের স্পেশাল জন্তরে সারাক্ষণ হার্টবীট আর ব্লাড প্রেসারের মাপ দেখতে দেখতে কেটে গেল দিনটা।

পরদিন সকালে যথারীতি ডাক্তারের দল হাজির। সেদিন রোদ উঠেছে। সেই দেখে আমার মেজাজ কিঞ্চিত ভাল। মুখ দেখে তাঁরা রায় দিলেন "ইউ লুক মাচ মাচ বেটার টুডে!" আদৌ বেটার ফীল করছিলাম না, তাই কি উত্তর দেব বুঝে উঠতে না পেরে তাকিয়ে রইলাম। তাই দেখে একজন বললেন "সীমস লাইক হি ডাজন্ট বাই দ্যাট… ওকে, হাও অ্যাবাউট ইউ লুক লিটল বিট বেটার দ্যান ইয়েস্টারডে?" এবার আমি হেসে ফেললাম।

সেদিন যিনি নার্স ছিলেন তিনি অনেকক্ষণ আমার সঙ্গে গপ্প করলেন। এই অসুস্থতার পর আমি যে বেশ কিছুদিন মদ খেতে পারবনা এটা বারেবারে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। আমি বিশেষ ড্রিঙ্ক করিনা শুনে অত্যন্ত অবাক হলেন এবং সাম্প্রতিক অসুস্থতার পর থেকে তাঁর মদ খাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার তাঁর আন্তরিক বেদনার কথা ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে থাকলেন।

তাঁর যে অ্যাসিস্ট্যান্ট নার্স ছিল, সেই ছেলেটির বয়েস বেশ কম। আমার থেকে কিছুটা ছোটই হবে। সে দেখা গেল ইন্ডিয়া নিয়ে খুব আগ্রহী। নানারকম ভারতীয় ব্যাপার স্যাপার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে লাগল। কথা বলে জানা গেল সে এসেছে কিনিয়া থেকে। ছোট থেকেই তার অনেক ভারতীয় বন্ধু আছে। তাই ভারত সম্পর্কে তার অপার জ্ঞান। বলল "ডিড ইউ ওয়াচ দ্য টিভি সিরিজ কলড মাহাভারাটা?" আমি জানালুম তা অল্পবিস্তর দেখেছি বই কি। তাতে চরম উৎসাহ পেয়ে সে বলতে থাকল রামায়ানা আর মাহাভারাটা সে কিরকম গোগ্রাসে গিলত ছোটবেলায়। "ইউ নো, হোয়েন আই ওয়াজ আ চাইল্ড, আই অলওয়েজ ওয়ান্টেড টু বি লাইক হানুম্যান…দ্যাট গ্রেট মাঙ্কি গাই!" বলতে বলতে চোখ চকচক করে উঠছিল তার।
আমি মনে মনে ভাবলুম, তা বটে… আজকের সুপারম্যান স্পাইডারম্যানদের চেয়ে আমাদের "হানুম্যান"ও কিছু কম সুপারহিরোসুলভ নন…

 

 

হাসপাতালের রোজনামচা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments