আজকাল ফেসবুক, খবরের কাগজ খুললেই নজরে একটা জিনিস বারংবার আসে। গোরু। দাদরির গো-নিধন তথা মহম্মদ আকলাখের হত্যার পর থেকেই আকাশে বাতাসে শুধু ভেসে বেড়াচ্ছে গো-মাতার গোপাল ছেলদের জয়ধ্বনি। আর তার সাথে সাম্প্রতিক সংযোজন উনার দলিতদের গো-চর্ম স্খলনের অভিযোগে তাদের মেরে ‘পিঠের চামড়া তুলে দেওয়া’র মতো ঘটনা। আর অনবরত এই চেষ্টা চলছে কিভাবে গো-মাতাকে বাঁচিয়ে রাখা যায়! কিংবা গো-মাতার দিকে যদি কেউ লালায়িত দৃষ্টিতে দেখে কীভাবে তার লালাগ্রন্থি টুঁটে-ফুঁটে ছিঁড়ে ফেলা যায়!
গো মাতার সুযোগ্য সন্তানেরা অবশ্য কোন্ সাহসে, কার মদতে এমন অবলীলায় মানুষ মারতে পারে তা না হয় বুঝতে বাকি কারো নেই। কিন্তু কোন্ যুক্তিতে, কোন্ বিধানে গো-হত্যা বন্ধ করতে আগ্রাসী হয়, গো-মাংস ভক্ষণে বিরোধীতা করে তা অনুধাবন করতে পারলাম না। সত্যিই আমি নিষ্পারগ! ইতিহাসকে তাই আশ্রয় নিলাম, যদি এ সম্পর্কে সম্যক ধারণা হয়।

ইতিহাস অবশ্য ঘাঁটতে গিয়ে পেলাম আলাদা কথা। সেসব নিয়ে নয় আলোচনা কিঞ্চিৎ পরে করা যাবে, এখন খানিক দেখা যাক আর্যদের গরুর প্রতি আকর্ষণ কেন হল?

মধ্য এশিয়া থেকে আগত আর্যরা ছিল মূলত যাযাবর। ফলেই এখন যেমন আমরা যাযাবর দেখি যারা সময়ে সময়ে স্থান পরিবর্তন করে, কিন্তু কৃষিকাজ জানে না। পশুপালনের উপরই মূলত এরা নির্ভর করে এদের জীবন-জীবীকা নির্বাহ করে। আর্যদের ক্ষেত্রে অবশ্য এরকমটা হবে কিনা বলা যায় না। সেক্ষেত্রে অনেক মতবিরোধ আছে। ভারতবর্ষে আসার আগে আর্যরা কৃষিকাজ করত কি না তা স্পষ্ট নয়। তবে ভারতবর্ষে বসবাসের পর আর্যরা যে কৃষিকাজ শিখেছিল তা জানতে পারা যায় ঋগ্বেদে বলদ ও লাঙলের উল্লেখ থাকায়। তবে সে কৃষিকর্মের দ্বারা যে আদৌ খাদ্যশস্য উৎপাদন হত কি না তা নিয়ে সংশয় আছে। যব (বারলি), ব্রিহী(ধান) ও গোধূম (গম)-এর উল্লেখ বহুলাংশে রয়েছে পরবর্তী বেদে, ঋগ্বেদে নয়। সুতরাং ধরে নেওয়া যেতে পারে ঋগ্বৈদিক যুগে আর্যরা কৃষিকাজে অত দক্ষ ছিল না। তবে ড. রাম শরন শর্মার মতে এরা বোধ হয় কৃষিকাজ শিখেছিল অনার্যদের (non-Aryan) কাছ থেকেই। এবং তাদের কৃষিকাজের মধ্যে প্রধান উৎপন্ন ফসল ছিল গবাদিপশুর খাদ্য (fodder crops). ঋগ্বেদে ‘লাঙল’ শব্দটিকে অনেক বিশেষজ্ঞই আবার interpolation বা পরবর্তী সংযোজন বলে মনে করেন। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়াও যায় যে আর্যরা কৃষিকার্য ব্যাপকহারে জানত তবুও তাদের জীবনযাত্রায় গোরুর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

ঋগ্বেদে ‘গাভিষ্ঠি’ যজ্ঞের কথা উল্লেখ করা আছে। গাভিষ্ঠি আর কিছু না গোরুর অনুসন্ধান। তা গোরুর অনুসন্ধান কিভাবে হত? মূলত গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের মাধ্যমে গোরুর অনুসন্ধান হত। অর্থাৎ এক গোষ্ঠীর সাথে আরেক গোষ্ঠীর যুদ্ধ হত, লড়াই হত আর বিজয়ী গোষ্ঠী বিজিত গোষ্ঠীর গোরু ছিনিয়ে নিত। সুতরাং এইসব ঘটনা থেকে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায় ঋগ্বৈদিক যুগে গরুই ছিল সর্বমূল্যবান। এমনকি সেযুগে জায়গা-সম্পত্তির প্রতি বিশেষ কারোর ন্যাক ছিল না। বিভিন্ন দানসূচক অনুষ্ঠানে মানুষ দানস্বরূও গোরু, নারী ও কৃতদাস গ্রহন করত। জায়গা সম্পত্তি নয়। [১]

এখন যদি একটু গভীরে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করি তবে বোঝা যায় আর্যরা গোরুকে ঠিক কেন এত মর্যাদা ও গুরুত্ব দিতে লাগল? উত্তর অতিব সহজ। গোরু থেকে সহজেই দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য পাওয়া যেত। গরুর বিষ্ঠা জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা যেত। সুতরাং কৃষিকার্যে অপটু আর্য সন্তানদের কাছে গো-মাতার উপর নির্ভরশীলতাই ছিল প্রধান উপায়।
আধুনিক বিজ্ঞানও কিন্তু বলে, শুধু মাত্র গোরুর দুধ খেয়েই একটা মানুষ সারাটা জীবন সম্পূর্ণ সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারে। সুতরাং আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না আর্যরা কেন গরুকে এত প্রাধান্য দিল।
তবে প্রাধান্য দেওয়া আর ভগবানস্বরূপ উচ্চাসনে উচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা, দুটো অন্যরকম জিনিস। কিন্তু আর্যরা তো এমনই। তারা প্রকৃতির পুজারী, প্রয়োজনের পুজারী। যা কিছু তাদের ভাল লাগে বা ভয়ের উদ্রেক করে, যা কিছু তাদের প্রয়োজনীয় তাদের সবকিছুকেই ঐশ্বরিক মাহাত্ম্যে প্রতিষ্ঠিত করেছে। গোরুও তার ব্যতিক্রম নয়।
তবে কি সত্যিই গো হত্যা অপরাধ? সত্যিই কি গোরু ভগবতী? দেখা যাক ঋগ্বেদসহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ কি বলছে?

ঋগ্বেদে গোরুর (নাকি গাভীর?) উল্লেখ ১৬ বার আছে। ঋগ্বেদে তাকে বলা হত অঘ্ন্যা- অর্থাৎ যাকে হত্যা করা যাবে না। আর ছিল অহি-অর্থাৎ যার গলা কাটা যাবে না (সম্ভবত)। সুতরাং উপরোক্ত শব্দদুটি থেকে একটা ধারণা করে নেওয়া যায় যে ঋগ্বেদে দুগ্ধবতী গাভীর একটা বিশেষ মর্যাদা ছিল।

কিন্তু উল্টোদিকটাও তো দেখুন, ঋগ্বেদে অজস্র স্লোকগুলিতে গো ও বলদ হত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বহু যজ্ঞে তা ইন্দ্র, মরুৎ আদিকে অর্ঘ্যস্বরূপ দান করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ড. আম্বেদকরের যুক্তি ও তাঁর রচনা ও বক্তব্যের কিয়দংশ এখানে বাংলা তর্জমা তুলে ধরলাম। প্রশ্নের ছলেই তিনি কিছু সমস্যার সমাধা করেছেন।
প্রমাণ কি…… যে হিন্দুরা কখনো গো মাংস খায়নি এবং গো হত্যার প্রতিবাদ করত?

উপরের ইটালিক্স অংশটি আবার পড়ুন এবং তার সাথে নিচের অংশটুকুও পড়ুন।

কিন্তু গোরুর এই প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব স্বত্তেও আর্যরা তাদের খাদ্যের তাগিদে গো নিধন বন্ধ করেনি।
শতপথ ব্রাহ্মণ ও আপস্তম্ভ ধর্মসুত্রের সংশা ছিল অবাধ গো-হত্যা বন্ধ করার প্রতি মিনতি বা পরামর্শ। গো হত্যার প্রতি কোনো নিষেধাজ্ঞা বা প্রতিবন্ধকতা নয়। [অর্থাৎ আপাতভাবে উপরোক্ত দুই গ্রন্থে গো হত্যা বিরোধী বক্তব্য রইলেও বাবাসাহেব বলতে চেয়েছেন তা একপ্রকার অনুরোধ মাত্র, কোনো বাধ্যবাধকতা নয়।]

অব্রাহ্মণরা তবে কেন গো-মাংস ভক্ষণ বন্ধ করল?
তাদের ইচ্ছা ছিল ব্রাহ্মণদের অনুকরন করার।

কিন্তু ব্রাহ্মণরা কেন গো-মাংস ভক্ষণ বন্ধ করল?
এটা ছিল ব্রাহ্মণদের পরিকল্পনা। ব্রাহ্মণ্যবাদ ও বৌদ্ধধর্মের মধ্যে একপ্রকার সংগ্রামের সৃষ্টি হয়েছিল। ব্রাহ্মণ্যধর্ম তাই বৌদ্ধধর্মের ওপর নিজের আধিপত্য বা প্রভুতা বিস্তারের জন্যই এমনটা ঘটিয়েছিল। [অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্য ও বৌদ্ধ- দুই ধর্মই গো-হত্যার বিরোধী ছিল, কিন্তু ব্রাহ্মণরা গোরুকে ঈশ্বরের স্থান দিল। অন্যদিকে বৌদ্ধধর্ম ছিল নিরেশ্বরবাদী। সুতরাং জয়ডংকা ব্রাহ্মণদেরই বাজল।] তাই গো মাংসকে অপবিত্র ঘোষনা করা হয়। আর যারা দরিদ্র, নিপীড়িত তারা তখনও গো মাংস ভক্ষণ করত….. আর সমাজের চোখে হল অপরাধী। তারাই পরবর্তীকালে হল অচ্ছুৎ, অস্পৃশ্য।[২]

ঐতিহাসিক এ.এল.বাসমের মতানুযায়ী যদিও বৈদিক যুগে গো-হত্যার বিরুদ্ধে কিছু অভিমত বর্তমান কিন্তু অশোকের জামানায় পুরোদস্তুর গো-হত্যা হত। গো হত্যা বিষয়ে কোনো প্রতিবন্ধকতা সে সময় ছিল না। তাঁর আমলে গো মাংস ও বলদ মাংস খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা হত।[৩]

মহাদেব চক্রবর্তী অবশ্য আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছেন – তাঁর মতে গো মাংস ভক্ষণ বৈদিক ভারতীয়দের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল। শুধুমাত্র যজ্ঞের আহুতির জন্যই নয়, খাদ্য হিসেবেও গেরস্থালীতে ষাঁড়ের[(?) bovine species] অবাধ হত্যা করা হত।
সংস্কৃত শব্দে ‘ভাস’ শব্দটি নির্বীজ গরু বা ভ্যাঁয়স ব্যবহৃত হত যজ্ঞে আহুতি দেবার জন্য। তবে দুগ্ধবতী গাভীর হত্যা নিষিদ্ধ ছিল। এছাড়াও চরক সংহিতায় গর্ভবতী মহিলাদের জন্য গোমাংস ভক্ষণের পরামর্শ দেওয়ার কথা উল্লিখিত আছে।[৪]

এতো গেল সাধারণ মনিষ্যির কথা। এবার ঋষি-মনিষীর কথায় আসা যাক। দেখা যাক রামায়ণ-মহাভারত কি বলে।

মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যের নাম আশা করি শুনেছেন। ভদ্রলোক নাকি নরম গো-মাংস(tender flesh) খেতেন।
এছাড়াও তৈত্তরীয় ব্রাহ্মণ, গৃহসূত্র ও ধর্মসুত্রেও গো মাংস ভক্ষণের কথা উল্লিখিত হয়েছে।

পরিশেষে আসা যাক ডি.এন. ঝাঁ-র কথায়। তাঁরই ভাষায় তুলে ধরলাম বাকিটা।
The ceremonial welcome of guests(sometime known as Arghya-অর্ঘ্য but generally as Madhuparka- মধুপর্ক) consisted…. of flesh blood of a cow or bull… [At] the sacred thread ceremony (উপনয়ন)…. it was necessary for a snataka ( স্নাতক) to wear upper garment of cowhide.[৫]
তিনি আরও লিখেছেন – The Mahabharata makes a laudatory reference to the King Rantideva, in whose kitchen two thousand cows(ভেবে দেখুন!) were butchered each day.
The Ramayana of Valmiki also makes frequent references to the killing of animals including the cow for sacrifice and for food.[৫]

হিন্দুত্ব, গোমাতা, রাজপাট ও বাঙালী নিয়ে এ বক্তব্য ক্রমশ প্রকাশিতব্য। তুল্যমূল্য বিচার হবে, আলাপ আলোচনা হবে। তবে সেসব কিছুর আগে যাজ্ঞবল্ক্যের জবানীই বলতে চাই – “আমি ততদিন মাংস খাব (গো ও বলদ) যতদিন তা সুস্বাদু থাকবে।

সৌজন্য:-
[১] India’s Ancient Past – R. S. Sharma

[২] The Untouchables: Who were they and why they become untouchables? Writings and Speeches, 1948 – Dr. B. R. Ambedkar

[৩] The Wonder that was India – A. L. Basham

[৪] Beef-Eating in Ancient India – Mahadev Chakravarti, 1979

[৫] The Myth of Holy Cow – D. N. Jha, 2002
৬. The Indian Express
৭. The Hindu
৮. wikipedia

হিন্দুত্ব, গো-মাতা, রাজপাট ও বাঙালী – পর্ব ১
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments