বাড়িতে হারিয়ে যাওয়া বা লুকানো জিনিষ খুঁজে পাওয়ার দাবীতে (হ্যাঁ, শুধু দাবীতেই!) গিন্নীদের একছত্র আধিপত্য। এই যেমন ধরুন অফিস যাওয়ার আগে শেভ করার পর হঠাত আবিষ্কার করলুম আমার গোঁফ ছাঁটার কাঁচিটা বিনা-নোটিশে নিরুদ্দেশ। সম্ভাব্য সমস্ত জায়গায় অনুসন্ধান করলুম, মায় বাথরুমের স্টক জলের পেল্লাই ড্রামেও একবার উঁকি দিয়ে নিলুম, নাঃ! কোথাও নেই। গত হপ্তায় আপিসে নতুন রিসেপসনিষ্ট জয়েন করেছে। হোক না গিন্নীর থেকে বয়েসে দু’চার বছরের বড়, বাইরের মহিলার সামনে কি তাই বলে পাকা গোঁফ নিয়ে দাঁড়ানো সম্ভব। অগত্যা ত্রাতা মধুসূদনের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া আর গত্যন্তর নেই। বাথরুম থেকেই কাঁচির সম্ভাব্য অবস্থান জানতে চেয়ে গিন্নীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিতেই ভীষণ উচ্চগ্রামে যে উত্তর ভেসে এলো সেই ডেসিবল সামলাতে না পেরে উল্টোদিকের কোয়ার্টারের বাথরুমে স্নানরত বেহেরা বাবুর কোমরের গামছা গেল হড়কে। কুতকুতে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বেহেরাবাবু পানদোক্তা খাওয়া রামধনুরাঙা বত্রিশ পাটি বের করতেই বাথরুমের জানলাটা দড়াম করে বন্ধ করে বেরিয়ে এলুম বাথরুম থেকে। গিন্নীর নির্দেশমতো খুঁজতে লাগলুম ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার সমেত আনাচকানাচ। নাঃ! সেখানেও মিলল না। অতঃপর একে একে গিন্নীর পরবর্তী নিদান মত মেয়ের পড়ার টেবিল, ডিভানের গদির তলা, মায় কালকের অফিসে পরে যাওয়া ট্রাওজারের পকেট হাতড়েও কোনও ফল মিলল না। অগত্যা মনের দুঃখে, নতুন রিসেপসনিস্টের মুচকি হাসির সামনে নিজের কাঁচুমাচু খেঁকুটে-বুড়ো মুখটা কল্পনা করতে করতে, মনেমনে “তোমার দেখা নাই রে, তোমার দেখা নাই…..” গুনগুন করতে করতে বাথরুমের দিকে এগতেই রান্নাঘরে ফ্রিজের মাথায় আচমকাই নজরে এলো আমার সেই সরু জিরো ফিগারের কাঙ্ক্ষিত কাঁচিখানা। সেটাকে তড়িৎ গতিতে হস্তগত করে মিনমিনে গলায় বোকাবোকা একচিলতে হাসি ঠোটে ঝুলিয়ে আলগোছে গিন্নীর কাছে জানতে চাইলুম,

- “এটা এখানে?”

- “আমি গোঁফ ছাঁটছিলুম….”

গিন্নীর আগুনঝরা প্রত্যুত্তরে নিশ্চিত না হয়ে আর উপায় রইল না যে গতকাল হলুদের প্যাকেট কাটার জন্যে নিয়ে এসে নির্ঘাত আমি নিজেই কাঁচিটা এখানে নিজের অজান্তেই রেখেছিলুম।

*****

আজ সন্ধেবেলায় আপিস থেকে ফিরতেই দেখি শোওয়ার ঘরের ডিভানটাতে আলমারির অর্ধেকটা উপুড় করে গোরুখোঁজা করে কিসের যেন তল্লাসি চলছে। দেখেই অনুমান করলুম একটা ভয়ঙ্কর অঘটন কিছু ঘটে গেছে। গিন্নীকে জিজ্ঞেস করার হিম্মত জোটাতে না পেরে ফিসফিস করে মেয়ের কাছে জানতে চাইলুম দুর্ঘটনা সম্পর্কে। শুনে যা বুঝলুম রাত্রে ডিনারের আশা অতি ক্ষীণ। রান্নাঘরে গিয়ে চেক করলুম মুড়ির টিনে মুড়ি মজুদ আছে চানাচুরের জারে চানাচুরও। একটু ধাতস্থ হয়ে পরিবেশটা যাচাই করতে গিন্নীকে গিয়ে বললুম,

- “লকেটটা কি খুব দামী? ওটা যদি হারিয়ে ফেলেই থাকো….”

লালচোখে গিন্নীর নিঃশব্দ উত্তর…..

- “লকেটের হীরেগুলো কি আসল…..”

একবুক সাহস সঞ্চয় করে আমার মরিয়া দুঃসাহসিক পরবর্তী প্রশ্ন উড়ে যেতেই গিন্নীর গলায় প্রত্যাশিত বিস্ফোরণ,

- “বুড়োভাম! মাথার চুল সাদা হয়ে গেল এখনও সাবালক হল না। আমার বলে সাধের হীরের লকেটটা বেপাত্তা আর মিনষের কোনও হেলদোল নেই……”

আগুনে আর ঘি না ঢেলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে পা বাড়াতেই গিন্নীর পাল্টা তলব,

- “এই শোন? চললে কোথায়? বলি, সত্যি সত্যি বলতো লকেটটা কোথায়?”

শুনে তো আমি চমকে চুয়াল্লিশ ব্যোমকে বাহান্ন। এ যেন মায়ের লক্ষ্মীর ঝাঁপি থেকে আধুলিটা সিকিটা না ঝেড়েও মায়ের হাতের কিল থেকে বাঁচার চেষ্টা। ভেবে কূলকিনারা পাই না গিন্নীর লকেট নিরুদ্দেশ হওয়ার পেছনে আমার ভূমিকা কি। কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছু যে কিছু বলব তারও তো উপায় নেই, গলা শুকিয়ে কাঠ। কিছুটা স্বগতোক্তির মত ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে উঠলুম,

- “সব তো হল, তুমি যে পুরনো পাউডারের কৌটোয় টাকা ঝেড়ে রাখ সেটা দেখেছো? গত রোববার তুমি যখন বিউটিপার্লারে গিয়েছিলে আমি টাকাগুলো গুনতে গিয়ে লকেটের মত দেখেছিলাম কিছু একটা। হাজার, পাঁচশো আর একশোর নোটে পুরো তেইশ হাজার সাতশো টাকা আর……”

আমার কথা শেষ না হতেই ওই বিশাল বপু নিয়েও উসেইন বোল্টের স্টাইলে জ্যামুক্ত তীরের গতিতে গিন্নী আলমারির দরজা খুলে কাঞ্জিভরম আর বেনারসির আদরে অদৃশ্য পাউডারের কৌটোটা খুলে ডিভানে উপুড় করতেই অসংখ্য দোমড়ানো নোটের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল সেই হীরের লকেট। লকেটটা সযত্নে পাশে সরিয়ে রেখে টাকাগুলো পাউডারের কৌটোয় ঢোকাতে ঢোকাতে গিন্নীর হুকুম,

- “যাও, আলু-ডিম-ডাল দিয়ে ভাতে ভাত বসিয়ে দাও, আমার সব জিনিষ আলমারিতে গোছাতে সময় লাগবে……”

“.. হীরের আংটি না পেলে কি, জ্বলত কি ওই নাকছাবি…” গুনগুন করতে করতে পা বাড়ালুম রান্নাঘরের দিকে।

হীরের লকেট
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments