তখনো এতখানি গরম পড়েনি । গেল মাসের শুরুর দিকের কথা । অতএব সাধারণভাবে মানুষের মাথার পারা খুব চড়ে থাকবার কথা নয় । তবু একদিন চা- চিনি-সাবান কিনতে বেরিয়ে এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাড়ির উঠোন থেকে চিল চিৎকার শুনেছিলাম । বাড়ির কর্ত্রী রাগত স্বরে তাঁর স্বামীর (দুঃখিত যে এই ভদ্রলোককে এই মুহূর্তে আর কর্তা বলা গেল না, অনেক আগেই তিনি মুকুট ও রাজ্যপাট খুইয়ে বসেছেন ) প্রতি গালিগালাজ বর্ষণ করছিলেন । বহু তিরস্কারের মধ্যে হঠাৎ তীরের মতো যে কথাটা কানে বিঁধে গেল তা হল মহিলা তাঁর স্বামীকে মরে যাবার কথা বলছেন। তা ও এমন একটা সময়ে যখন ভদ্রলোক খেতে বসেছেন । ব্যাপারটা বুঝলাম ভদ্রলোকেরই বলা একটি কথা থেকে – "আচ্ছা , যা রাগ করার পাঁচ মিনিট পরে করে নিও, এখন রুটি দুটো দাও । চুল্লির পাশে শুয়ে ঠাণ্ডা হবার থেকে আমার থালাতেই হোক।" এতে চিঁড়ে ভিজেছিল কিনা আর জানি না। আমি এলাকা পেরিয়ে চলে এসেছিলাম।

গতকাল একবার যেতে হয়েছিল ওই চত্বরে। সকালের দুধ আনবার জন্যে। পুনরায় সেই চিল চিৎকার । নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এল -" ধুর শালা ! আবার !"। কিন্তু যেতে যেতেই হঠাৎ থমকে গেলাম। নাহ, আজকেরটা তো চিৎকার নয়! বরং উচ্চগ্রামের কান্না এবং বিলাপ । পাশের একটা চেনামুখ বললেন – ভদ্রলোক চলে গিয়েছেন। আজ সকালে বাজারটা এনে বাড়িতে রেখে সকালের খাবার মুখে তোলার আগেই নাকি অসুস্থ বোধ করেন এবং মিনিট পনেরোর মধ্যেই ভবলীলা সাঙ্গ হয়। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ভিতর থেকে কান্নামিশ্রিত প্রলাপ শুনতে পেলাম " তুমি তো আমাকে একবারের জন্যেও জানান দিলে না যে এরকম হবে ! বাইরের দুনিয়ার ব্যাপারে কখনো কিছু শেখালেনা। এতো কিছু আমি একার হাতে সামলাবো কি করে!" এক বয়স্ক লোক বাইরে দাঁড়িয়ে খানিক অশ্রদ্ধার সঙ্গেই বললেন -" মূর্খ মেয়েছেলে একটা ! দুদিন আগেই লোকটা বলেছিল তো, আর বেশিদিন তোমাকে অশান্তি ভোগ করতে হবে না। তোমার ভাগের শান্তি তুমি ঠিকই পেয়ে যাবে । যা বলতে চেয়েছিল তা তো বলেই দিয়েছিল লোকটা । তুইই বুঝিস নি!"। আমি মনে মনে ভাবলাম যে এটা " প্রাপ্য শান্তি , না প্রাপ্য শাস্তি, তা কেবা জানে !"
সব চাইতে হৃদয়বিদারী লাগলো শেষ কথাটা শুনে । এক ফলবিক্রেতাই জানালেন। তিনি ভ্যানের ওপরে ফল বিছিয়ে ঘুরে ঘুরে ফল বেচেন । তিনি বললেন যে দিন তিনেক আগেই একরাতে ব্যবসা গুটিয়ে ফেরার সময় উনি শুনেছেন যে ভদ্রলোক বড় ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে পিঠে হাত রেখে বলছিলেন – বাবা, বড় হয়েছিস, বাড়ির হপ্তা-মাসের খরচাপাতি বুঝেশুনে নে। টাকাপয়সা গুছিয়ে গাছিয়ে চলিস । আর শোন, তোর মা -টা এক নম্বরের মাথাখারাপ মানুষ । একটুও বোধগম্যি নেই। আমি চলে গেলে কিন্তু তোর মা-কে দেখিস। কোথাও ফেলে দিস না। ও বাঁচতে পারবে না । ও তো খুব ভীতু আর দুর্বল – তাই সবটাতেই চিৎকার করে বেশি। তোরা মজবুত পায়ার মতো সংসারটা কাঁধে না নিলে আমি আর শেষ সুতো কেটে যাই কি করে বল ? " ।

এমন এক সুভদ্র মানুষ, সংসারে একজন প্রকৃত "সন্ন্যাসী" হয়ে বেঁচে থাকা মানুষের জী্বনাবসান এমন জৌলুসবিহীন, এমন অকস্মাৎ এবং রোগভোগ বিহীন না হলে সত্যিই অবিচার হতো । এমন বুঝদার মানুষ, এমন প্রেমিক পতি ও পিতার চরিত্রগুলিকে সাহিত্যের লাইনের লোকেরা বানিয়ে বানিয়ে লিখে তৈরি করে বলেই জানতাম এবং মানতাম। আজ সে সব ততোটাও অসম্ভব, অবাস্তব বলে মনে হচ্ছে না ।
মানুষটা আমার নিজের কেউ না হয়েও বড় একটা মনখারাপ রেখে গেলেন , ছেড়ে যাওয়া আর বাকি সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির সাথেই ।

হে নির্মোহী… ভালোবাসা, আঁখিজল তোমায়
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments