অর্জুনপুর থানার দোর্দণ্ডপ্রতাপ ওসি খগেন মিত্তিরের গত দু'দিন থেকেই ভীষণ ব্যস্ততা। আক্ষরিক অর্থেই নাওয়া খাওয়ার সময় নেই। রবিবারে মিউনিসিপ্যাল ইলেকশন। প্রস্তুতির সমস্ত গুরু দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে একেবারে হেডকোয়ার্টার থেকে, খোদ ডি.জি-র স্পেশাল নোট সহ। শুক্কুরবার থেকেই লম্ফঝম্প শুরু। শহরে নবাগত 'বিশেষ অতিথিদের' উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলো চেনানো থেকে শুরু করে স্থানীয় স্কুল বাড়ির যে ঘরগুলো পোলিং বুথ হিসেবে ব্যবহৃত হবে সেখানকার বিশেষ সাজসজ্জার প্রতিটি বন্দোবস্ত পর্যন্ত খগেন মিত্তির তদারকি করেছেন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। হেড কোয়ার্টারের নির্দেশ মতই বহিরাগত 'বিশেষ অতিথি'-দের বিশেষ সহায়তায় ভোটপর্ব মেটাতে পারলেই নিশ্চিত প্রোমোশন। তাই নিখুঁত বন্দোবস্তে কোনও রকম ফাঁক রাখতে বিন্দুমাত্র ঝুঁকিও নেননি।

রবিবার ভোর পাঁচটাতেই গোটা অর্জুনপুর জেনে গেল, অর্জুনপুরের ত্রাস, বহুকাল ধরেই প্রাক্তন এবং বর্তমান শাসকদলের ভোট পরিচালনার নায়ক বুলু মোল্লা পুলিশ থানার অনতিদূরেই গুলি খেয়ে খুন হয়েছে। খোদ ভোটের দিন সাত সকালেই খুন, তাও আবার শাসকদলের অতি গুরুত্বপূর্ণ কর্মী অথচ থানার ওসি খগেন মিত্তিরের আশ্চর্য রকমের নিঃস্পৃহতা অবাক করছে এস.আই মন্ডলবাবু সহ থানার বাকীদের।

ঠিক যেমনটি ভাবা গেছিল ভোটের দিনটা এগোচ্ছে সেই পথেই। বুলু মোল্লার খুনের জন্যে পুলিশের ধরপাকড় শুরু হতেই প্রত্যাশামতই রাস্তাঘাট ফাঁকা। সকাল দশটা বাজতে না বাজতেই শুরু বহিরাগত 'বিশেষ অতিথি'-দের তৎপরতা। সামনের টেবিলে পা দু'টো তুলে পরম নিশ্চিন্দিতে গত দু'দিনের বিনিদ্র ক্লান্ত চোখদুটো বুজিয়ে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল খগেন মিত্তির…..

প্রবল কোলাহলে খগেন মিত্তির চোখ খুলতেই দেখলেন একমুখ হাসি নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে শাসকদলের অর্জুনপুর মিউনিসিপ্যলিটির চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী পঞ্চানন রায়। থতমত খেয়ে খগেন মিত্তির উঠে দাঁড়াতেই পঞ্চানন রায় হাতের লাড্ডু ওর মুখে গুঁজে দিয়ে পুরো বত্রিশপাটি বিকশিত করে বলে উঠলেন-
- "অগ্রিম মিষ্টিমুখ করিয়ে দিলাম স্যার……."

পুরো অর্জুনপুরকে নিজের হাতে 'শান্ত' করে দোর্দণ্ডপ্রতাপ খগেন মিত্তির, যাকে অর্জুনপুরবাসী ভরসার থেকে ভয় করে বেশি, নিন্দুকদের মতে যিনি এতদিনে থানার ওসির থেকেও জেলার সবথেকে বড় মস্তান হিসেবে বেশি পরিচিত হয়ে গেছেন, সেই হেন খগেন মিত্তির ঘরে ঢুকতেই গিন্নি চেঁচিয়ে বলে উঠলেন-
- "তিনদিন পরে বাড়ি ঢুকলে দেশোদ্ধার করে। বলি, মাছ-মাংস আনাজপাতি ঘরে তো কিছুই নেই। তা, পিণ্ডি রাঁধবো কি নিজের হাত পা কেটে?"
গত তিনদিনের অমানুষিক মানসিক চাপ এবং শারীরিক ধকলে বিধ্বস্ত খগেন মিত্তিরের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল গিন্নির বক্রোক্তিতে বিরোধী দলের ক্যাডার, পাড়ার মস্তান অথবা ছিঁচকে চোর ছ্যাঁচড়কে ধমকানোর কায়দায় চেঁচিয়ে উঠল খগেন মিত্তির-
- "শাট আপ! এবার মুখ বন্ধ না করলে কিন্তু….."
কত্তার মুখের কথা শেষ করতে না দিয়েই শাড়ির আঁচল কোমরে জড়িয়ে রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে এসে ওসি সাহেবের যোগ্য সহধর্মীনি একেবারে এস.পির মেজাজে হুকুম দিলেন-
- "তোমার ওই সব মেকি ধমকি বাইরের লোককে দেখিও, এখন যা বলছি কর, নইলে…."
আর কথা বাড়াতে সাহস হল না খগেন মিত্তিরের। পুলিশের পোশাক পরেই হাতে বাজারের থলে নিয়ে পা বাড়ালেন বাজারের দিকে।

‘হোম মিনিস্টার’
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments