এক একেকটা দিন সকালে ঘুম ভাঙতেই অফিসে না যাওয়ার ইচ্ছেটা প্রচন্ড বিটকেল ভাবে জাঁকিয়ে বসে। শনিবারে সপ্তাহান্তে সেই ইচ্ছেটা তীব্র থেকে আরো তীব্রতর হয়ে যায়। পুরোনো নোকিয়ার ৩৩১০ এর কর্কশ অ্যালার্ম সকালে বাজতেই সুদীপ্তও খানিকটা সেরকম বোধ করলো। শনিবার মানেই তো সেই টিম মিটিং ও নেকড়েসম সেলসের বড়কত্তাদের মুশিকপ্রায় এক্সেকিউটিভদের ধরে ধরে মা বাপান্ত করা। ধুসস এর চেয়ে আলিপুর চিড়িয়াখানার ওরাং ওটাংদের জীবন অনেক ভালো। টার্গেট নেই , দুধ, খবর কাগজ, ফোন, কাজের মাসি, কেবেল টিভি, রেশন ,বাজার, এলআইসি, ওষুধ ,ছেলের পড়াশুনা কোনোকিছুর জন্যেই কোনো টেনশন নেই। এর ওপর আজ নববর্ষ কাল পুজো পরশু গিন্নির বেড়াতে যাওয়ার বায়না – নাঃ পরের জন্মে আলিপুরেই জন্মাবো – হয় অট্টালিকাগুলোর ভেতর আর নাহলে খাঁচায় ! এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো সুদীপ্ত। এই বিশাল নগরে ক্ষুদ্র এক নাগরিকের কর্তব্য পালন করতে গিয়ে ঘুম থেকে উঠে অফিস যাওয়াটা আজ কিরকম জানি একটা সমবেত বদভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপর গিন্নির ‘এটা লাগবে’ ‘ওটা ফুরিয়ে গেছে, আজ আনতে ভুলবে না’ ইত্যাদি মগজে রেজিস্টার করতে করতে প্রাতঃকৃত সারা। পুরো সপ্তাহের পচা ঘামের গন্ধ ঢাকতে জামায় সস্তার ডিও মেরে ছেলেকে স্কুলের জন্য তৈরী করা। ব্রেকফাস্ট মানেই তো সেই বাসি রুটি আর আলু ভাজা নাহলে কপাল ভালো থাকলে পাউরুটি স্যাকা আর ডিম্। আধ কাপ চা দিয়ে সেটা সেরেই হুড়মুড় করে বাইকে চেপে প্রথমে ছেলেকে স্কুলে ছাড়া ও তারপর এক ঘন্টা জ্যাম সামলে অফিস দেরিতে পৌঁছানো। মিটিং শুরু হয়ে গেছে! রিয়েল এস্টেটের বাজারে ভীষণ মন্দা আর সুদীপ্তদের কোম্পানির অবস্থা অন্যদের তুলনায় নাকি আরো খারাপ। মুখ কাঁচুমাচু করে বোর্ডরুমে ঢুকে কোণের চেয়ারটা টেনে বসতেই এরিয়া ম্যানেজার মিঃ দত্ত শ্লেষযুক্ত বাক্যটি সুদীপ্তের উদ্দেশ্যে ছুড়লেন , ” শুক্কুরবার রাতে কি সন্তোষীমার জন্য রাত্রি জাগরণ করতে হচ্ছে ?”
“নাঃ মানে স্যার , চিৎপুরের দিকটা আজ অস্বাভাবিক জ্যাম ছিল, মানে কোনোদিন এরকম দেখিনি..” সুদীপ্তর মুখটা হোমওয়ার্ক না করা ক্লাস ফোরের ছাত্রের চেয়েও করুণ দেখালো। পর পর তিন মাস টার্গেট ফেল করেছে সুদীপ্তদের সেলস টীম। স্বাভাবিক তার পর দেরিতে আসার এরকম ক্লিশে অজুহাত শুনে বস নিশ্চই চুক চুক শব্দ করে সমবেদনা জানাবেনা। তাই মিঃ দত্ত আবার শুরু করল , ” হুম, এবারে দেখছি চিৎপুরের ফ্লাইওভারটা না তৈরী করলেই নয় , দেখি মেয়রের সাথে কথা বলে কিছু করা যায় কিনা?ঘোষ (সুদীপ্তর পদবি ধরেই বস ডেকে থাকে তাকে ) তোমাকে হোয়াটস্যাপে পাচ্ছি না কেন?” হোয়াটস্যাপ!! সুদীপ্তর কার্জন জমানার মোবাইলে সাদা কালো এসএমএস আর ওই খেয়ে খেয়ে সাপ লম্বা হওয়া খেলাটা ছাড়া আর কিছুই যে নেই। তাই সে বললো , ” স্যার আমার ফোনটা একটু পুরোনো তো বোধহয় তাই পাচ্ছেন না। ” বস এতক্ষন ঠান্ডা মাথায় কথা বলছিলো ,এবারে টেবিল চাপড়ে চিল্লিয়ে উঠলো ” তবে সেটা ফেলে দাও। গেট এ স্মার্টফোন, ইনস্টল হোয়াটস্যাপ। কানেক্ট উইথ দা ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড এন্ড গেট সাম ক্লায়েন্টস ইউ ডাম্বঅ্যাস। এ ভাবে চললে পরের মাস থেকে তোমাকে কেন আমাকেও আর এই অফিসে আসতে হবে না। ”
ঝাড়টা যদিও পুরো টিমের জন্যই ছিলো কিন্ত বন্দুকটা ছিল এই দফায় সুদীপ্তর ঘাড়ে। পাশের কিউবিকেলে বসা অরুনাভ ছেলেটি বেশ চালাক চতুর , আগের মাসে এই মাগ্গির বাজারেও দুটো প্রপার্টি সেল করেছে তাও আবার তার মধ্যে একটা কমার্শিয়াল। কানাঘুষো শোনা যায় যে ও নাকি অন্যের ক্লায়েন্টকে অফিসের বাইরে থেকে পাকড়াও করে কাফে কফিডেতে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে বাড়তি ডিসকাউন্ট দিয়ে সেলস ক্লোস করে। বস ও এই মন্দায় বাড়তি ডিসকাউন্টের ব্যাপারে সেরকম একটা মাইন্ড করেনা। একবার তো এই ছোকড়া নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে প্রপার্টি অ্যাড দিয়েছিলো ক্লাসিফাইড কলামে , রোবিবারে সবার ছুটি থাকে তাই সেদিন অনেকেই ফ্ল্যাট দেখতে বেরোয় ও সেই অ্যাডে ছিল সাইটে এলেই প্রচুর ছাড়ের স্পট অফার । তারপর যখন বাকিরা নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে অরুনাভ তখন চুপি চুপি ক্লায়েন্টদেড় সাইট দেখিয়ে জনৈক রেস্তোরাঁয় এগ্রিমেন্ট সই করিয়ে নিচ্ছিলো। সুদীপ্ত ওকেই জিজ্ঞেস করলো , ” তোমার ফোনটা কি মডেল গো?” কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই সে উত্তর দিলো , ” স্যামসুং গ্যালাক্সি ৩ ” সুদীপ্ত অতসত কিছু বোঝেনা তাই সে আবার জিজ্ঞেস করলো , ” আচ্ছা , এটা দেড় দুইএর মধ্যে কি পাওয়া যাবে , মানে সেকেন্ড হ্যান্ড। ” এবারে অরুনাভ ঘাড়টা ঘোড়ালো , ” আমারটা কোনোদিন ড্রেনে পরে গেলে তোমাকে আমি এমনিতেই দিয়ে দেবো। ওরে বাবা এতো টেনশন নিচ্ছ কেন ? ওই নতুন রিসেপশনিস্ট কাম এইচ আর ম্যানেজারটাকে দেখো না। চাম্পু মাল, দুটো ফোন চারটে সিম আবার প্রত্যেক মাসে কমদামিটা বদলে লেটেস্ট মডেল হাতে চলে আসছে। এই বাজারে এই মাইনেতে তা কিভাবে সম্ভব সেটা আবার আমার কাছে জানতে চেয়ো না। যাও ওকেই জিজ্ঞেস করো যদি এই মাসেরটা তোমাকে কমসম করে বেচে। ” সুদীপ্তর আর সেই সাহস হয়ে ওঠেনি, এমনিতে বেচুবাবুরা কেনার বেলায় বেজায় আনাড়ী হয় সেটা সবাই জানে। নাঃ আজ একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে। ফেরার পথে সুদীপ্ত পাড়ায় হুলোর চায়ের দোকানে ঢুঁ মারলো , ওখানে এইসব সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল হ্যান্ড টু হ্যান্ড কেনা বেচা হয়। ফ্ল্যাটবাড়িতে মেস করে থাকা প্রাইভেট কলেজের ছাত্ররা মূল খদ্দের। হুলো কাকে যেন মনোযোগ দিয়ে ঠিকানা বাতলে দিচ্ছিলো আর বেঞ্চিতে দুটো ছোকড়া গোছের ছেলে কানে স্পিকার গুঁজে তাদের মোবাইলে খুট খাট করছিলো। সুদীপ্তর দিকে নজর পড়তেই হুলো জিজ্ঞেস করলো , ” কি ব্যাপার স্যার, আজকে কি পথ ভুলে ?” সুদীপ্ত একটু হাসি দিয়ে বললো , ” নারে কাজের যা চাপ বাড়ি ঢুকতে ঢুকতেই তো বেরোনোর সময় হয়ে যায়। বলছি শোননা একটা ভালো স্মার্টফোন হবে, সস্তায় কাজ চালাবার মতো ?”
হুলো ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো, ” বাজেট কত?”
“এই ধর দেড় থেকে দুই। ”
” হুম হবে তবে ব্র্যান্ডেড নয়, চাইনিজ মাল চলবে ?”
” ফোনটা চললেই আমার চলবে মানে গান, সিনেমা কিছু চাই না শুধু মেইল আর হোয়াটস্যাপ হলেই হবে। ”
“অরে বাবা মেল্ ফিমেল সব আছে , তবে ১৭০০এর কমে এক পয়সা দিতে পারবোনা। ” এই বলে হুলো তাকের ওপর থেকে একটা ইয়া পেল্লায় স্ক্রিনওয়ালা একখানি ফোন বার করলো। পেছনের দিকটা ঘষে মেজে সব উঠে গেছে আর চার্জারটাও অদ্ভুত গোছের। নিচের দিকটা হালকা করে চীনা ভাষায় কি একটা লেখা আছে। সুদীপ্ত এবার নিজের সিমটা ওটাতে ভরে স্ক্রিনে আঙ্গুল বোলাতে বোলাতে হুলোর কাছ থেকে প্রথম টাচফোনের খুঁটিনাটি সম্বন্ধে জেনে নিতে থাকলো। কি জটিল রে বাবা ! এর চেয়ে আগেরটার বোতাম সিস্টেম অনেক ভালো ছিল। যাই হোক হুলোকে এবারে সুদীপ্ত তার প্রাচীন সেটটা দেখিয়ে বলল , ” এটা তুই রেখে দে আর ২০০ টাকা কম নে। ”
” ২০০ টাকা ! তোমার মাথা ফাথা পুরো গেছে , ওটা কে নেবে ? তুমি বরঞ্চ ১৬৫০ আর তোমার দাদু সেটটা দাও ,ওটা আমার ওই বাসন যে মাজে সেই ছেলেটাকে দিয়ে দেব। ” যাই হোক ১৬০০য় রফা হলো ও স্মার্টফোন বাগিয়ে সুদীপ্ত স্মার্ট কায়দায় বাড়ির দিকে রওনা দিলো। গিন্নি তো এমনিতেই টং হয়ে ছিল দেরি করে আসার জন্য তার ওপর আবার যা যা আনতে বলেছিলো সেগুলো একটাও আনেনি সুদীপ্ত। আর এই ফোনটা বার করতেই গৃহস্থ জীবনের পরপম্পরা মেনে ভীষণ এক আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়লো, ” তোমার কাণ্ডজ্ঞান কোনোদিনই ছিল না, এখন তো দেখছি তোমার সাধারণ বুদ্ধিটাও পুরোপুরি গেছে ! মাসের শেষে সংসার সামলাতে আমি এদিকে হিমশিম খাচ্ছি, বুবলুর স্কুলের মাইনে বাকি, একটা ছাতা কিনে আনতে বললে আনো না – আর দুম করে একটা নাম না জানা কোম্পানির ফোন কিনে বসলেন উনি। না বস বলেছে। তা ল্যাপটপ ডাটা কার্ড কোম্পানি দিলে ফোনটাও তো ওরা দিতে পারে। ” সুদীপ্ত একবার একটু চেষ্টা করেছিল বুঝিয়ে বলার যে কোম্পানির যা অবস্থা তাতে একটা পেন কিনতে রিফিল ফোরায় তো ওর মতো আন্ডারপারফরমারকে স্মার্টফোন দিতে গেলে তো ওরই চেয়ার টেবিল বেচতে হবে। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা ! শনিবারের রাতের শেষ পরিচ্ছেদটা “থাকো তুমি এই পোড়া সংসার নিয়ে ,আমি যেদিক দু চোখ চায় চলে যাবো। ” মার্কা পরিসংহারীও হুঙ্কার দিয়ে ইতি হলো।
পরের দিন রবিবার মানে বাঙালির জীবনে সপ্তাহের সব থেকে আকাঙ্খিত দিন। সুদীপ্তর সকালটা কাটলো বাজারে গুঁতো খেতে খেতে ত্যাড়াব্যাঁকা সবজি ও ফরমালিন মারা মাছের ডেডবডি কিনতে কিনতে। গিন্নি কথা বলছে না , বলবেও না, তাই সুদীপ্ত গুটি গুটি পায় বাজারটা রান্নাঘরে রেখে নতুন ফোনটা নিয়ে তদারকি করতে বসলো। বুবলু ইতিমধ্যে বাবার ল্যাপটপ খুলে বাবার কার্ড ব্যবহার করে ফোনে ইন্টারনেট প্যাক ভরিয়ে দিয়েছে। হোয়াটস্যাপ ইন্স্টল্ করে অনেককে মেসেজেও পাঠিয়ে দিয়েছে। সাধে বলে পরের জেনারেশন স্মার্টার দ্যান দা প্রিভিয়াস ! সুদীপ্ত বুবলুকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো , ” আর কি কি লাগে রে ওই ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডের সাথে কানেক্ট করতে?” বুবলু কি বুঝলো কে জানে , নিজের পড়াশুনা মগডালে তুলে গম্ভীর ভাবে গুছিয়ে বসলো ওর পাঞ্জার চেয়ে বড় ওই যন্ত্রটিকে নিয়ে। একটু ঘাঁটে আর বাবাকে শেখায়, ” এগুলোকে বলে ইমোটিকন আর এইভাবে তুমি স্ক্রিনশট নিতে পারো। ” বাবা অবাক বিস্ময়ে দেখে যায় তার উত্তরসূরির মগজের দৌড় ! হটাৎ এক জায়গায় বুবলু থমকে গিয়ে বলে, ” এখানে ফ্লাইট মোড, সাইলেন্ট মোড ছাড়াও আরেকটা কি মোড আছে। দেখোনা বাবা কি ভাষায় লেখা আমি বুঝতে পারছি না। ” সুদীপ্ত ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো সত্যি চীনা ভাষায় কি একটা লেখা ও তার পাশে মোড কথাটা ইংরেজিতে। গুগল খুলে এই শব্দটার মানে জানলেই তো হয়ে যাবে। কিন্তু চীন হরফ টাইপ করবে কি করে ?এমন সময় বুবলুর মা ঘরে ঢুকে ঠান্ডা গলায় বললো , ” বুবলু চান করে খেয়ে নাও। টেবিলে তোমার ও বাবার খাবার ঢাকা দেওয়া আছে। ” সুদীপ্ত গিন্নির পারা খানিকটা নেমেছে দেখে একটু খুশি মনেই ঝটপট চান সেরে পুত্রকে নিয়ে কোনোরকমে দুটি গিলে আবার পরে গেলো ফোনটার পেছনে। এবারে বিছানায় গাটা এলিয়ে বাবা ঘাঁটাঘাঁটি করে আর পাশে শুয়ে ছেলে ঢুলুঢুলু চোখে চেয়ে দেখে। জিমেইলটা এখানেই সেট করতে হবে , ফেসবুকও করা যাবে। কিন্তু আবার সেই অজানা মোডটা যে কি সেই কৌতূহলটাই সুদীপ্তর মনে খচখচ করতে থাকে। বুবলু ঘুমিয়ে পড়েছে, গিন্নি টিভিতে সিরিয়াল দেখছে। বিকেলে চা করে মুখের কাছে ধরে মান ভাঙাতে হবে । অলস দুপুর কাজ কর্ম নেই ভরা পেটে একটু নতুন ফোন কাঁটাছেঁড়া করতে অসুবিধে কি ? নাঃ সেই মোডটা এবার টাচ করে এক্টিভেট করলো সুদীপ্ত , সঙ্গে সঙ্গে ফোন জিজ্ঞেস করলো ‘ল্যাঙ্গুয়েজে’? সুদীপ্ত হাফ ছেড়ে বাঁচলো কিন্ত চুজ করতে গিয়ে দেখলো ইংলিশ বলে কোনো অপসনই নেই, সবই চীনা জাপানি বা হিব্রূর মতো ঠেকছে । সে চীনা ভাষার মতো কিছু একটা বেছে নিতেই এবারে অদ্ভুত একটা স্ক্রিন এলো – ফরওয়ার্ড আর ব্যাকওয়ার্ড বোতামের মতন দুটো অপসন ও নিচে সেই চীনা ভাষায় কি যেন একটা লেখা। সুদীপ্ত ব্যাক বাটনটা ছুঁতেই একটা ক্যালেন্ডার মতন ইন্টারফেস এলো যাতে সাল ও তারিখগুলো ইংরেজি হরফেই দেখাচ্ছে। এবারে সুদীপ্ত বেছে নিলো ১৯৭৭ সালের ১৬ই এপ্রিল ও ডান টাচ করতেই তার মাথা বোঁবোঁ করে ঘুরতে লাগলো, গলা শুকিয়ে আসছে , ঝড়তিপড়তি পৈতৃক বাড়িটা নতুন নতুন ঠেকছে। খানিকটা জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে এবারে সে চারপাশটা ঠিক করে দেখতে লাগলো। একি ! এ তো সে ৪০-৫০ বছর পিছিয়ে গেছে মনে হচ্ছে। রাস্তায় বেড়িয়ে মাথাটা কিরকম আরো বেশি বোঁবোঁ করতে লাগলো। মোড়ের দোকানে ক্যাটক্যাটে হলুদ রঙের গোল্ড ফ্লেকের প্যাকেটটার দাম বলছে সাড়ে তিন টাকা, দশ টাকার নোট দিলে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে দোকানদার, যেন বলছে এটা কোন দেশের টাকা? সালা চিনে ফোনটা কি তাহলে টাইম মেশিন নাকি? কথায় বলে না ওই ক্ষুদে চক্ষুগুলো সব পারে ! চায়ের দোকানে পড়ে থাকা একটা খবর কাগজে চোখ পড়তেই সুদীপ্ত দেখলো গাভাস্কার ওয়েস্ট ইন্ডিজে নাকি হেব্বি পেঁদিয়ে সেঞ্চুরি বানিয়েছে, কি প্রশংসা। কাগজটা তুলে প্রথম পাতার নিচে দেখলো সোনার দাম লেখা আছে ৪৮৬ টাকা ভরি, ওপরে তারিখটা সেই ইংরেজিতে ১৬ই এপ্রিল ১৯৭৭ ও বাংলায় ৩রা বৈশাখ ১৩৮৪ ! আনন্দে প্রায় চোখে জল চলে এলো সুদীপ্তর ! এবারে ৪৮৬ টাকায় কিছু সোনা কিনে সোজা ২০৩০ তে গিয়ে বেচে নোটের বান্ডিল গুটিয়ে নিয়ে বসের মুখে ইস্তফাটা ছুড়ে মারবে সে। শুধু পুরোনো কয়েক গাছি নোট জোগাড় করতে হবে, সাথে পুরোনো কিছু জামা কাপড় আর চুলটা একটু বড় করে রেখে টেরি কেটে নিলেই কেল্লা ফতে। পুরোনো নোটের জন্য দশ বছর করে পিছিয়ে যেতে যেতে কালেকশন করলেই হবে। পুরোনো জামা মানে বাবার পুরোনো পাঞ্জাবি পায়জামাতো আছে, বেশি বেগ পেতে হবে না। চুল কাটাতো ব্যক্তিগত ব্যাপার ও চিৎপুরের আব্দুলকে বললেই দিব্য ম্যানেজ করে নেবে। প্রথমে একটা ভালো ফ্রিজ কিনবে ভাবলো সুদীপ্ত তারপর একটা আর-ও লাগাবে রান্নাঘরে , বুবলুকে ডিপিএসে ভর্তি করাবে -যা ডোনেশন লাগে তার দুগুণ দেবে , তারপর ব্যাংকক পাট্টায়া টুর পুজোর সময় …..টুইন ট্যং টিং ট্যাঁও….টুইন ট্যং টিং ট্যাঁও….টুইন ট্যং টিং ট্যাঁও….একি ফোনটা এরকম আওয়াজ করছে কেন? বিগড়োলো নাকি, ফিরবো কি করে ? প্রায় দম বন্ধ হতে হতে সুদীপ্ত ছিটকে উঠলো। পাশে বুবলু অকাতরে ঘুমোচ্ছে। বাইরের ঘর থেকে টিভির আওয়াজ আসছে। ফোনটা সেই বেজে চলেছে টুইন ট্যং টিং ট্যাঁও….টুইন ট্যং টিং ট্যাঁও…করে। নতুন ফোন কোনো নম্বর সেভ নেই তাই ফোনটা তুলতেই ওপার থেকে চেনা গলায় শব্দ ভেসে আসলো , ” কি হে, হোয়াটস্যাপ তো নাহয় লাগালে, এবার সেটা ঘন ঘন চেক কে করবে? দুটো লিড দিয়েছি, একটার ক্লোসিং আমার কালকের মধ্যে চাই-চাই। এক্ষনি ফোন করে কালকে ফার্স্ট হাফে মিটিং সেট করো। “

হোয়াটস্যাপ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments