বাংলার সুলতান সুলাইমান খান কার্রানি যখন গৌড়ের মসনদে বসেন তখন তাহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা তাজ খান কার্রানি মৃত। সময়টা আনুমানিক ১৫৬৬, পরবর্তীকালে উনি তার রাজপাট গৌড় থেকে সরিয়ে টান্ডায় নিয়ে যান। কার্রানিরা মূলত আফগান বংশোদ্ভূত মার্সেনারি হিসেবেই মোঘলদের দরবারে পরিচিত ছিল, যেরকম ছিল পরবর্তীকালে রোহিলা কিংবা আব্দালিরা। আকবরের মোঘল সেনা কার্রানিদের অন্তর্বর্তী যুদ্ধে হারাবার পরে তারা পূর্ব ভারতের দিকে সেঁটে গিয়ে বাংলায় রিফিউজ নিয়েছিলো। রিফিউজ থেকে রাজ্যপাট অধিগ্রহণ করতে তাদের অবশ্য খুব বেশি দেরি হয়নি। আফগান কূটনৈতিক পরপম্পরা মেনে সুলাইমান, বাদশার প্রতি আনুগত্য দেখায় ও গৌড় থেকে নিয়ন্ত্রিত বাংলা সুবা থেকে কুঁড়িয়ে গুছিয়ে পাওয়া খাজনার থেকে নিমিত্ত মাত্র নজরানা দিয়ে তাকে ক্ষনিকের মতো ঠান্ডা রাখে। বাদশা সাময়িক ভাবে শান্ত হলেও কার্রানির উচ্চাভিলাষা থেমে থাকেনি, তার গৌড় থেকে চুপি চুপি নিজের নামে মুদ্রা চালু করার খবর দিল্লির দরবারে পৌঁছালে বাদশা আবার যারপরনাই ক্ষেপে যান।গুস্তাখীর মুয়াফ চেয়ে গলতির মাশুল হিসেবে সুলাইমান তামাম বাংলার মসজিদে জুম্মাবারের আজানে বাদশা আকবরের নাম উচ্চারণ করাটা বাধ্যতামূলক করেন, আল্লাহ-হু-আকবরের পরেই আকবর-হু-আকবর গোছের কিছু এক ইডিওটপানা হবে হয়তো। এই তুমুল ঝামেলার মধ্যে যখন কার্রানি হিমশিম খাচ্ছে তখন ওপরমহল থেকে আদেশ আসে বাংলা, ওড়িশা বা আসামের মতো ভার্জিন টেরিটোরিগুলোতে আঘাত হানার। একসাথে অত কিছু করা যায়না, দুম দাম করে স্বায়ত্বশাসিত কলিঙ্গ ও অহম রাজ্য কে বাগে আনা তো একেবারেই যায়না। তাই সুলাইমান এবার নিজ মগজপ্রসূত পিসমিল সল্যুশনের শরণাপন্ন হলো-সে আঘাত হানলো বাংলায়-এই ভেবে যে বাদশা আকবর বহুত খুশ হবে ,ইনাম দেবে। ওদিকে আকবর তো তলে তলে আফগান জেনারেলের হ্যাবিচুয়াল বেট্রায়াল সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিলই। তাই সে গজপতি মুকুন্দ কে গুপ্ত চিঠিতে জানালো যে,”ওই পাঠান গাম্বাটটাকে আমি বাংলার ত্রিবেণী আক্রমণ করতে বলেছি,ওকে সেটা করতে দিও, কিন্ত যেই তুমি ওর হাবে ভাবে আমার বিরুদ্ধ কিছু এদিক সেদিক দেখবে, পুরো ছুট রইলো, ডান বাম না দেখে সপাটে কেলিয়ে পাট করে দিও ওই আফগান বাচ্চাটাকে। ” দিল্লি দরবারের ফরমান অনুযায়ী কলিঙ্গরাজ গজপতি মুকুন্দদেবে অলরেডি ভূরিশ্রেষ্ঠ ভূপতি রুদ্রনারায়নের সাথে প্যাক্ট করে তৈরীই ছিল, কার্রানির অপেক্ষায়, ত্রিবেণীর যুদ্ধ প্রান্তরে। সেনাপতিত্ব করতে গিয়ে তলোয়ার সামলাচ্ছিলো বঙ্গ বারেন্দ্রিয় সন্তান রাজীব লোচন রায়। গো হারা হারলো কার্রানি ও তার আফগান সেনা। কার্রানি বুঝলো রুদ্রনারায়ণ বা মুকুন্দদেব নয়. ওকে ধুলিস্মাৎ করেছে ওই রাজীব লোচন। অপমানের হিসেব ভুলে গিয়ে সে এই বঙ্গসন্তানকে সাদর আমন্ত্রণ জানালো নিজের ডেরায় ও নিজের দৌহিত্রাকে লেলিয়ে দিলো তাকে সিডিউস করতে। মেয়ে নিজের কাজে পারদর্শিতা দেখাতেই হাফ কেল্লা ফতেহ হয়েই গেলো। রাজীব লোচন কার্রানির কন্যাকে হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে নিয়ে এসে বিবাহ করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু নিজের এলাকায় এনে এরকম বড়-বকরা এ ভাবে কে আর ছাড়ে? কার্রানি রাজীব লোচন কে পাম্প খাইয়ে তার মেয়ের পাণিপ্রার্থী হিসেবে তার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করানোটাকেই জায়েজ হিসেবে প্রতিপন্ন করলো। রাজীব লোচনের সাবেকি নাম হলো মূহাম্মদ ফরমালি আর ডাক নামটা যদিও আমাদের সবার জানা – কালাপাহাড়।
হানিমুন কেটে যাওয়ার পরেই কালাপাহাড় কার্রানির জিঘাংসাকে বাস্তবায়িত করতে ঝাঁপিয়ে পড়লো গজপতি মুকুন্দদেবের ওপর তছনছ করলো কোনারকের সূর্য মন্দির, জাজপুর, হিজলি। বাদ পড়ল না কটক,সম্বলপুর ও পুরি। এদিকে যখন সদ্য কনভার্টেড কালাপাহাড় কলিঙ্গদেশে মূর্তি দেখলেই ভেঙে গুড়িয়ে দিচ্ছে , কোচ অধিপতি বিশ্ব সিংহ তার সুপুত্র ও চিলের থেকেও ক্ষিপ্র চিল্লারাইকে পাঠালো ওই কালাপাহাড়কে কেঁটে ছেঁটে ফিক্স করতে। কিন্ত পরিনাম হলো উল্টো , কালাপাহাড় চিল্লা রাই কে বন্দি বানিয়ে ফেললো ও ক্রমশ কলিঙ্গ থেকে কোচবিহার পুরোটাই নিজের দখলে রাখলো। কালাপাহাড় ইসলামে প্রস্তরপূজার রীতিকে খণ্ডন করা হয়েছে জেনে তামাম পূর্বভারতের অনেক মন্দির ভাঙলেও তমলুকের বর্গভীমা মন্দির দেখে সে প্রথম থমকিয়ে যায়। তরবারি খচিত রক্তের জায়গায় তার কলম থেকে উঠে আসে কালো কালিতে লেখা কিছু প্রশস্তিমূলক শব্দগুচ্ছ। কোনো ঐতিহাসিক স্ক্রিপ্টে এর উল্লেখ নেই, থাকলে আমি বুঝতে পারতাম যে সাদামাটা এক মেদিনীপুরে মন্দির দেখে ওই ফুল-বাঙালি ও হাফ-উড়ে–ইসলামিক হিংস্র বারবারবারিয়ানটার মনে কেন এতো কবিত্ব জাগ্রত হলো ? যাই হোক এর মধ্যে কালাপাহাড় কখন যে মারপিট করতে করতে হাওয়া হয়ে যায় তা বোধকরি মোঘলরাও জানতে পারেনি।কার্রানি আগেই গত হয়েছিল। কালাপাহাড় উবে যেতেই চিল্লারাই তার কোচ নৃপতি নরনারায়নের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে কামাতাপুরি রাজ্যের বিস্তার প্রস্তার করার জন্য উঠে পরে লাগে। মোঘলদের বিরুদ্ধে তার গেরিলা যুদ্ধের জ্ঞান সে ছড়াতে থাকে সীমান্ত সামলানো কোচ রাজবংশীয় সৈনিকদের মাঝে। এর মাঝে ব্রহ্মপুত্র ভ্যালি নিয়ে কোচদের সাথে অহমদের কিঞ্চিৎ খটোমটো লেগেছিলো বৈকি, তা ও যাউকগা।ও ভালো কথা, একটু পিছিয়ে যাই, ১৩শো শতাব্দীদে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ গৌড় দখল করেছিলেন বটে কিন্তু তার দৌড় কোচ রাজত্ব অব্দি পৌঁছনোর আগেই বারো ভূইয়াঁদের বিদ্রোহের জেরে থেমে গিয়ে অবশেষে ভূপাতিত হয়ে যায় ।ফিরে আসি কোচ-অহম-মুঘলদের নতুন সমীকরণে। অহমরা মূলত পাটকাই মরুশ্রেণীর ওপারে থাকা ‘তাই’ প্রজাতির গোষ্ঠীভুক্ত যাদের সাথে মূল মধ্যবর্তের চেয়ে সিয়ামদেশ(থাইল্যান্ড) কিংবা খ্মের(কাম্বোডিয়া) দেশের মানুষের মিল বেশি। এদের ভাষা ,সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্রবোধ এখনো, এবং তখনও ছিল বেজায় স্বাবলম্বী। সুদূর মং মাও থেকে সেনা ঠেলতে ঠেলতে শেষে প্রাগ্জ্যোতিসে যখন সুখপা প্রথম পদার্পন করেন তখন ব্রহ্মপুত্রের কিনারা ফাঁকা বললেই চলে।এদের রাজত্বকালেই বর্বরুয়া, বৰগোহাঁই, বৰফুকন ইত্যাদি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ পোস্ট তৈরী করা হয়। মং গোত্রীয় ভাষা যাতে রাষ্ট্রগঠনের মাঝে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় তাই এই ‘তাই’ বংশিদ্ভুতরা সাবেকি সংস্কৃত ধাঁচে দেশীয় টাচ দিয়ে ফেললো তাদের নামের ক্ষেত্রেও – যেরকম ১৬০৩ খ্রিস্টাব্দে সুসেঙফাকে সবাই বুঢ়া রাজা নাম ডাকতে লাগলো, সাবেকি নাম হলো স্বৰ্গদেউ প্রতাপ সিংহ। এর পরে সুজিনফা হয় সুর সিংহ , সুদোইফা হলো তেজ সিংহ, সুলিখপা- রত্নধ্বজ সিংহ আর সুপ্পাৎফা হয়ে গেলো গদাধর সিংহ।
১৬৮১ খ্রিস্টাব্দে অহম রাজা গদাধর সিংহ যখন গদি সামলান তখন তাদের সবথেকে বড় শত্রূ…. আর পারছিনা ..বহুত ঘুম পেয়েছে মাইরি….ইটাখুলি আর সরাইঘাটে মোঘল বনাম অহমদের যুদ্ধের কাহিনী নয় কাল অব্দি তোলা থাক।

ৰক্তাত লুইত (রক্তাত ব্রহ্মপুত্র) – I
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments