গল্পটা খুব ছোটবেলায় বড়মার মুখে শোনা। বড়মা, মানে বাবার ঠাকুমা। আমি সেই ভাগ্যবানদের দলে পড়ি, যাদের বাবার দাদু ঠাকুমাকে কাছ থেকে দেখার দুর্লভ সৌভাগ্য হয়েছিল! মায়ের সাথে আমার বয়েসের পার্থক্য মেরেকেটে বছর কুড়ি। গ্রামের বাড়িতে শ্বশুর, শাশুড়ি, স্বামী, দেওর, স্বামীর দাদু ঠাকুমা নিয়ে এত বড় সংসারের হেঁশেল সামলে, মা খুব একটা সময় পেত না আমাকে আলাদা করে দেওয়ার। ওই রান্নার সাথে সাথে পড়ানোর সময়টুকু ছাড়া। বড়মা ছিল বাড়ির তৎকালীন কর্ত্রী। তাই জন্মানো ইস্তক আমি তার কুক্ষিগত। সমস্ত অন‍্যায় আবদার, দুষ্টুমি, এমনকি বাবার শাসন পালানোর নিশ্চিন্ত আশ্রয় ছিল বড়মার আঁচল। বড়মা ঊর্মিমালা তখনকার দিনের ক্লাশ ফোর পাশ, ভালো গল্প বলিয়ে। সত্যি মিথ্যা জানিনা, কিন্তু হাঁ করে গিলতাম গল্পগুলো ওই বয়সে, সেটা মনে আছে! মেদিনীপুরের প্রত‍্যন্ত গ্রাম, তখনও ইলেকট্রিসিটি আসেনি। অন্ধকার নামলে হ‍্যারিকেন, লন্ঠনই ভরসা। নটা বাজতে না বাজতেই আনন্দপুরে মধ্যরাত্রি নামত, অন্ধকারের ডানায় ভর করে। এরকমই এক মাঘমাসের বৃষ্টি ভেজা সন্ধেতে ঢুলতে ঢুলতে কোনও রকমে হোমওয়ার্কের পাট চুকিয়ে, খিচুড়ি ডিমভাজা সাঁটিয়ে, লেপের তলায় গিয়ে ঢুকলাম। বড়মার পাশে শুতাম আমি। পড়তে যেহেতু হচ্ছেনা, নিদ্রাদেবীও ধারে কাছে ঘেঁষছেন না তেমনভাবে আর। অতএব প্রাত‍্যহিক পাওনাগণ্ডা বুঝে নিতে চেয়ে, বড়মাকে গল্প শোনানোর আবদার। বাইরে ঝম ঝম করে বৃষ্টি পড়ছে, শীতটা বেড়ে গেছে কয়েকগুণ, লেপটা ভালো করে জাপটে মন দিলাম গপ্পে। কিন্তু কয়েক লাইন শুনেই বুঝে গেলাম, ও হরি, এ তো আগে শোনা। সঙ্গে সঙ্গে হাত পা ছুঁড়ে প্রতিবাদ! তখন বড়মা বলল, তাহলে আমার নিজের একটা গল্পের মতো অভিজ্ঞতা শোন!

আনন্দপুরে আমাদের আটপুরুষের বাস। ঊর্মিমালার বাপের বাড়ি পাশের গ্রাম, সহজপুরে। বাবা নামকরা হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ে হয় তেইশ বছরের প্রাইমারি ইস্কুল শিক্ষক সদানন্দের সাথে। বেশ অবস্থাপন্ন পালটি ঘর, মা বাবা ছাড়া ছেলের আর কেউ নেই। চাষবাস কেন্দ্রিক গ্রামে একমাত্র শিক্ষিত পরিবার, বেশ মাণ‍্যিগন‍্যি করে লোকে। ঊর্মির শাশুড়ি সন্ধ্যামণি ছিলেন গ্রামের মুখিয়া ধরনের, খুব দাপট তখন। শরিকি পুকুরে মাছ ধরা হলে, সবার জন্যে সেই মাছ ভাগ থেকে শুরু করে বিচার সালিশি পর্যন্ত। গ্রামের আর পাঁচটা লোক আসত শলা পরামর্শ নিতে, যেকোনো সমস্যায়। সে ক্ষমতার হস্তান্তর আমি দেখেছি জ্ঞান হওয়া থেকেই, বড়মার মধ্যে। বিয়ের পর মাস ছয়েক কেটে গেছে। ছোট্ট সংসারে মানিয়ে গুছিয়ে নিচ্ছে আস্তে আস্তে। বর সদানন্দ, শ্বশুর নন্দগোপাল মাটির মানুষ, কারও সাতে পাঁচে নেই, পড়াশোনা নিয়েই থাকে। সন্ধ‍্যামণি বাইরে কঠোর হলেও, মনটা ভালোই। সদানন্দ ইস্কুলের কাজে কলকাতায় কয়েক দিন যাবৎ, এমন সময় এক দুরসম্পর্কের দেওরের বিয়ের নেমন্তন্ন এল পাশের গ্রাম হরিহরপুর থেকে। নন্দগোপাল ইচ্ছা প্রকাশ করলেন, বৌমাও চলুক তাঁর সাথে। বাচ্চা মেয়ে, বিয়ের পর অষ্টমঙ্গলায় বাপের বাড়ি ছাড়া আর কোথাও যায়নি বিশেষ। তারও একটু ভালো লাগবে আলো, লোকজন দেখলে। সন্ধ্যামণি যেতে চাননা বড় একটা কোথাও, তাই তিনি রইলেন বাড়ি জেগে, আপত্তিও করলেন না বৌমার যাওয়াতে। সকাল থেকেই ঊর্মি খুশিতে ডগমগ। দুপুর থেকে সেজেগুজে তৈরী! এক বাক্স গয়না নিয়ে এসেছে বাপের বাড়ি থেকে, সেগুলো কাজে এল আজ। নতুন শাড়ি, গয়নায় নিজেকে মুড়ে মাথায় ঘোমটা টেনে কাপড়ের পুঁটলি হয়ে নন্দগোপালের পিছু পিছু চলল সে। বেশ জাঁকজমক করে বিয়ে। হরেক আতসবাজির রোশনাই দেখল হাঁ করে। চারদিক ফুল, শাড়ি, গয়নায় ঝলমল, পোলাও মাংসের সুগন্ধে ভুরভুর। ফিরতে মন চাইছিল না তার এসব ছেড়ে।

খাওয়া দাওয়ার পাট সেরে রওনা হবে হবে, এমনসময় কনের জ‍্যাঠামশায়ের বুকে ব‍্যাথা শুরু হল। চারদিকে হইচই। তক্ষুনি সদর হাসপাতালে না নিয়ে গেলেই নয়। নন্দগোপাল দেখলেন, সে দায়িত্ব তাঁকেই নিতে হবে‌। অনেক নিমন্ত্রিতই ততক্ষনে বাড়ির পথে। ওদিকে সন্ধ্যামণি বাড়িতে একা। তিনি কখন ফিরতে পারবেন, তার নেই ঠিক। রাত আটটা পেরিয়ে গেছে ঘড়ির কাঁটা। দুজনেই না ফিরলে চিন্তায় হার্ট আ্যটাক্ করবে সন্ধ্যা, সে আরেক কেলো হবে। ঊর্মিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, একা বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা। ছোট থেকেই ডাকাবুকো স্বভাব তার। রাতবিরেতে সহজপুরের ঘোষালদের আমবাগানের চৌকিদারকে সাদা থান পরে ভয় দেখানো থেকে শুরু করে, কাক ভোরে মল্লিকদের বাগানের ফুলচুরি, কি করেনি বিয়ের আগে! ভয়ডর নেই তার খুব একটা। একা ফেরার নামে সে একপায়ে খাড়া। রাস্তা চেনে ভালো ভাবে, কোনও ব‍্যাপারই না! বিয়েবাড়ি থেকে খাবারের পুঁটলি বাঁধা হয়েছে সন্ধ্যামণির জন্যে। সেটি বগলদাবা করে দুগ্গা দুগ্গা করে বেরিয়ে পড়ল সে। নন্দগোপাল শেষ চেষ্টা করলেন একটা কাউকে সঙ্গে দেওয়ার, কিন্তু কাউকেই পাওয়া গেল না সেই হট্টগোলের মাঝে।

হরিহরপুর থেকে আনন্দপুর ফেরার রাস্তা দুটো। একটা ভদ্র সভ‍্য, লোকালয়ের মাঝবরাবর, কিন্তু অনেকটাই ঘুরপথ। আরেকটি প্রথমে কংসাবতী নদীর বাঁধ বরাবর, পরে খানিকটা বনজঙ্গল ভেঙে সরুপথ, বাঁশবন, তারপর ক্ষেতজমির মাঝে আলপথ দিয়ে খানিকটা গেলেই লোকালয়, মানে আনন্দপুর শুরু। ঊর্মি ঘুরপথে সময় নষ্ট না করে শর্টকাট নেওয়াই শ্রেয় মনে করল। বসন্ত কাল। পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে মাথার ওপর, জ‍্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। মৃদুমন্দ সুবাসিত সমীরণে মাতাল প্রকৃতি। দিনের বেলা এ রাস্তা দিয়ে গেছে ঊর্মি, বরের সাথে। সরু জঙ্গুলে ঝোপঝাড়ের মাঝে, পায়ে চলা পথ তার রাস্তা খুঁজে নিয়েছে, কত রকমের গাছ দুধারে, বট, অশ্বত্থ, তেঁতুল, হোগলা, আরো কত কী! বিভূতিভূষণ মনে পড়ে যায় তার এখানে এলে। তবে সে ছিল দিনের আলোয়। এখন এই মূহুর্ত্তে যে তার একটু গা ছমছম করছে না, তা নয়। তবে হরেন ডাক্তারের মেয়ে সে। যে কিনা একবার শুধু লাঠি হাতে চার পাঁচজনের ডাকাতদলকে ঘায়েল করেছিল, জ্ঞান হওয়া ইস্তক সে গল্প শুনে আসছে সহজপু্রের লোকের মুখে। টর্চ আছে একটা হাতে, দরকার পড়েনি জ্বালানোর। গা ছমছমকে পাত্তা না দিয়ে রীতিমতো নাচতে নাচতে চলল ঊর্মি বড়বাঁধ বরাবর। রূপোর থালার মত গোল চাঁদটা, কাঁসাই নদীর জলে কুচি কুচি হয়ে চোখে ঝিলমিল লাগিয়ে দিচ্ছে। বহুদূরে মাছধরা নৌকায় কুপির আলো। আর খুব একটা ভয় করছেনা তার। এমন মায়াবী একটা সন্ধ্যায় খারাপ কি আর হতে পারে! তবে বড্ড নিস্তব্ধ চারপাশটা, একটা জনমনিষ‍্যি নেই বাঁধের ওপর। শুধু তার পায়ের শব্দ। হঠাৎ সরসর করে কি একটা যেন নদীর ঢালে নেমে গেল। তখনি, আরেকটা পায়ের শব্দে চমকে উঠল সে। অথচ পিছন ফিরে দ‍্যাখে কেউ নেই। বড়বাঁধটা আগের মতোই ফাঁকা, শুনশান। অনেক খানি চলে এসেছে, ফিরেও যেতে পারবে না। তবে শব্দটাও নেই আর এখন। মনের ভুল? হবে হয়তো। রাতে হাওয়ার শব্দে কতকিছু শোনা যায়… বড় বড় পণ্ডিতেরও রজ্জুতে সর্পভ্রম হয়! জোর করে মন ঘুরিয়ে সামনের রাস্তায় মন দিল ঊর্মি। ওই তো দূরে দেখা যাচ্ছে ঝাঁকড়া তেঁতুলগাছটা, অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে যেখানে। ওখান থেকেই রাস্তা নিচে নেমে গেছে। অর্ধেক রাস্তা চলেই এল। হাওয়ায় ঠাণ্ডা ভাবটা কেমন বেড়ে গেল কী? নদী থেকে বয়ে আসা হিমেল ঠাণ্ডাটা যেন তাকেই বিঁধছে সোজা এসে। গায়ে মাথায় কাপড়টা জড়িয়ে নিল ভালো করে‌। দূরে কোথাও শেয়াল ডেকে উঠল। এই তো, একেবারে শব্দশূণ‍্য নয় তাহলে এ পৃথিবী! বাঁধের ঢাল বেয়ে আলপথ নিল সে তেঁতুলতলায় এসে।

একটু আগের মারকাটারি নিস্তব্ধতাটা এখন আর নেই। রাস্তার দুপাশের ঝুপসি গাছগুলোর ফাঁকফোকর গলে চাঁদ-আলো মাটিতে নকশিকাঁথা বুনেছে যেন। আর, পাতার ফাঁকে হাওয়া চলার শব্দ যেন ছোটবেলায় বুড়ো গ্রামোফোনে শোনা বাখ্ এর অর্কেস্ট্রা। কত রকমের আওয়াজ। রাতজাগা পাখি ডেকে উঠছে থেকে থেকে, অদ্ভুত কর্কশ স্বরে। প্রথম বার শুনে তো চমকে টর্চ আর খাবারের পুঁটলিটা ফেলেই দিচ্ছিল হাত থেকে। আবার, আবার সেই পায়ের শব্দ! এবারে যেন আরও কাছে, ঠিক পিছনে। বিদ্যুৎ গতিতে পিছনে ফিরল ঊর্মি। কেউ নেই, আগের মতোই। এমনকি পায়ের শব্দটাও। পেছনে ফেরার সাথে সাথেই যেন ভোজবাজির মত গায়েব। ভয়টা কেমন হঠাৎ জাঁকিয়ে বসল। দুধারের সমস্ত অরণ‍্যাণী যেন হাহা শব্দে ব‍্যঙ্গ করছে তার সাহসকে! সামনে ফিরে যেই চলা শুরু, অমনি যেই কে সেই। অবয়বহীন শব্দটা আরো জোরে, আরও কাছে। আর কিছু না ভেবে দৌড়াতে শুরু করল ঊর্মি। পায়ের শব্দটাও দৌড়োচ্ছে পিছু পিছু। কোত্থেকে কুয়াশা এসে ভিড় করেছে আলপথে। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না সামনে‌। কুয়াশা মাখা সার সার ঝাঁকড়া গাছগুলো যেন হাওয়ার সাথে ষড়যন্ত্র করছে, ফিসফিসিয়ে, ভয়ংকর কিছু ঘটানোর জন্যে! কেন যে মরতে একা ফিরতে রাজী হয়েছিল, কেনই বা শর্টকাট নিতে গেছিল, মনে মনে নিজের চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করছে ঊর্মি এখন। আর সামনে দৌড়চ্ছে, আশেপাশে কিছু না দেখে। বাঁশবন এসে গেছে। আর বেশি দূর না। হঠাৎ দ‍্যাখে, একটা বাঁশ মাটিতে শুয়ে রাস্তার মাঝে। শেষমূহুর্ত্তে সামলে নিল নিজেকে, কি মনে করে। আর তখুনি, সটান উঠে মাথার ওপরে সোজা হয়ে গেল বাঁশগাছটা! বুকটা হাঁপরের মত উঠছে নামছে‌। আরেকটু হলেই…!

শীতটা বেড়ে গেছে, পায়ের শব্দটাও। এখন আরো কাছে, আরও স্পষ্ট। যেন কোথাও পৌঁছনোর নেই শব্দটার, শুধু তাকে অনুসরণ করে চলেছে। এ ছোটা যেন শেষ হওয়ার নয়। আর পেরে উঠছে না ঊর্মি। অদ্ভুত একটা ক্লান্তি সারা শরীর জুড়ে। ভয় উৎকণ্ঠা বোধগুলো অবশ এখন‌, পা চলছে না সামনে। মনে হচ্ছে, আশেপাশের বাঁশবন, ঠাণ্ডা কুয়াশা, ওই পায়ের শব্দ… সব যেন তাকে গিলে নিচ্ছে। তারও বাধা দিতে ইচ্ছে করছে না আর। কতবার আছাড় খেয়েছে ইয়ত্তা নেই। টর্চ, খাবারের পুঁটলি কখন পড়ে গেছে হাত থেকে, ঘোমটাও। আঁচল লুটোচ্ছে মাটিতে, চুল এলোমেলো। ওই তো, দূরে একটা আলো দেখা যাচ্ছে না! বাঁচার আশা ঝিকিয়ে উঠল মনের কোণে। নাহ, এভাবে হেরে গেলে চলবেনা! যতটুকু জোর অবশিষ্ট ছিল, একসাথে করল সে। ওই টিম টিমে আলোটা ডাকছে তাকে। হাতপা ছড়ে জ্বালা করছে, কোনো হূঁশ নেই। বাঁশগাছগুলো দুলছে হাওয়ায় পাগলের মত, ঝড় উঠেছে যেন, মহাপ্রলয়ের। আলপথটাও ছুটছে তার সাথে, শেষ হতে না চেয়ে। পারতেই হবে তাকে! এতটা তো চলেই এসেছে, আরেকটুখানি যেতে পারলেই…‌

ঠিক কতক্ষণ এভাবে ছুটেছিল, খেয়াল নেই। পরে শুনেছে, ওই টিমটিমে লন্ঠন জ্বলা কুঁড়েঘরের সামনে হুড়মুড়িয়ে এসে পড়েই জ্ঞান হারায় সে। বাড়ির কর্তা সবে বিছানায় যাচ্ছিল তখন। মাস্টারের নতুন বৌকে ওভাবে এসে মূর্চ্ছা যেতে দেখে হইচই পড়ে যায়। ছোটছেলেটাকে কাঁচাঘুম ভাঙিয়ে, সন্ধ্যামণিকে খবর পাঠায়। পুরো একদিন জ্ঞান ফেরেনি ঊর্মির। সবাই খুব চিন্তায় ছিল। সন্ধে নামার পর ওই রাস্তা মাড়ায় না কেউ কখনও। অনেক গল্প ছড়িয়ে আছে এদিক, ওদিক। বছর তিনেক আগেও হরি গোয়ালার জোয়ান ছেলেটা বন্ধুদের সাথে বাজী ধরে নিশুতি রাতে ওই আলপথে গিয়ে, আর ফিরে আসেনি। এসবের কিছুই জানত না ঊর্মিমালা। সবাই বলাবলি করে, নতুন বউয়ের ভাগ্য ভালো, যে বেঁচে ফিরেছে‌!

লেখাটা শেষ করে বাইরে তাকালাম। জার্মানির লোকহাম গ্রামেও তখন অন্ধকার নেমেছে। দূর থেকে কানে আসছে গরুর গলার ঘন্টার টুঙ টুঙ। মাঝে মাঝে দূরের হাইওয়ে দিয়ে দু একটা গাড়ি।তাছাড়া আর কোনো শব্দ নেই খুব একটা। এই শান্তশিষ্ট গ্রামের বাড়িটাতে একাই থাকি এখন। দিনের আলো থাকে সন্ধে নটা অব্দি, তারপর চারদিকটা বড্ড চুপচাপ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকটা ফার্ম আছে, সেগুলোও অন্ধকারে ঝুম হয়ে থাকে এখন‌। হঠাৎ করে খুব বড়মাকে মনে পড়ছে, আমার কলেজে পড়াকালীনই নিরানব্বই বছর বয়সে স্বাভাবিক মৃত্যু। খুব ভালোবাসত ছোট থেকেই। শেষের দিকে তো কাউকে চিনতেও পারতনা, কিন্তু আমাকে ভোলে নি কখনও। গলার কাছে কেমন যেন একটা দলা পাকাচ্ছে। যাইহোক, এবার ডিনার সারতে হবে, টায়ার্ডও লাগছে খানিকটা। কাল আবার সকাল সকাল অফিস। সাতপাঁচ ভাবছি এইসব জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে, হঠাৎ ব‍্যলকনির দিক থেকে সাঁৎ করে একটা কিছু সরে গেল যেন! চমকে উঠলাম। সারা বাড়িতে আর কেউ থাকার কথা নয়। কেমন একটা গা ছমছম করে উঠল। তাড়াতাড়ি বাইরে এসে আলোটা জ্বেলে দিলাম। কেউ কোত্থাও নেই। হাওয়াও চলছে না খুব একটা। চারদিকটা বেশিরকম চুপচাপ, ঠাণ্ডাটাও বেড়ে গেছে হঠাৎ করে। পাশের মাঠে কুয়াশার রাজ‍্য, জমাট বেঁধে আছে সাদা অন্ধকার। কিন্তু কি দেখলাম তখন! মনের ভুল?

***

অশরীরী
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments