১) বৌদ্ধধর্মের অভ্যন্তরীণ অসঙ্গতি ও বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদ জানার প্রয়োজনীয়তা

বৌদ্ধধর্মের মধ্যে একটা অদ্ভূত অসঙ্গতি আছে। অসঙ্গতিটা হল তত্ত্ব ও বাস্তবের অসঙ্গতি। তাত্ত্বিকভাবে বৌদ্ধধর্ম যে প্রতিশ্রুতি আমাদের দেয়, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রতিশ্রুতি পালনে সে ব্যর্থ হয়। তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখতে গেলে, বৌদ্ধধর্ম আমাদের একটা চিন্তার স্বাধীনতা দেয়, যা পৃথিবীর অধিকাংশ ধর্ম দেয় না। ওয়ালপোলা রাহুলা তাঁর বহুপঠিত “What the Buddha Taught” গ্রন্থে বলেছেন, “The freedom of thought allowed by the Buddha is unheard of elsewhere in the history of religions.” (Rahula, p. 2)। এরপর লেখক এই বক্তব্যের সমর্থনে ত্রিপিটকের বিখ্যাত কালাম সুত্তের কথা বলেছেন যেখানে বুদ্ধ জনশ্রুতি, পরম্পরা, গুরুবাক্য, ধর্মগ্রন্থ ইত্যাদির উপরে মানুষের ব্যক্তিগত অনুভবকে স্থান দিয়েছেন। তারপর আবার তিনি মজ্ঝিম নিকায়ের মীমাংসক সুত্তের উল্লেখ করেছেন। সেখানে বুদ্ধ ভিক্ষুদের বলছেন যে, তাঁরা যেন স্বয়ং তথাগতকেও পরীক্ষা করেন। তিনি বুদ্ধ বলেই যে তাঁকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে হবে তা নয়, কেননা অন্যান্য ধর্মের মতো বৌদ্ধধর্মে অন্ধবিশ্বাসের কোনও স্থান নেই। “Almost all religions are built on faith – rather ‘blind’ faith it would seem. But in Buddhism emphasis is laid on ‘seeing’, knowing, understanding, and not on faith, or belief.” (ibid, p. 8)। বুদ্ধ তাঁর ধর্ম সম্পর্কে মানুষকে বলেছিলেন, “এহি পাসসিকো”। অর্থাৎ, এসো, আমার ধর্ম পরীক্ষা করে দেখো। “The teaching of the Buddha is qualified as ehi-passika, inviting you to ‘come and see’, but not to come and believe.” (ibid, p. 9)।

এই তাত্ত্বিক প্রতিশ্রুতি থেকে আমরা আশা করতেই পারি, পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মে ঈশ্বর, দেবদেবী, স্বর্গ-নরক, পুনর্জন্ম ইত্যাদি যেসব অযৌক্তিক ধারণা প্রচলিত আছে, বৌদ্ধধর্মে সেগুলি অনুপস্থিত থাকবে, কেননা এসব ধারণার কোনও অভিজ্ঞতানির্ভর প্রমাণ নেই, এগুলি নিছক বিশ্বাসের ব্যাপার। আর বৌদ্ধধর্মে বাস্তব অভিজ্ঞতাকে বাদ দিয়ে নিছক বিশ্বাসের কোনও স্থান নেই। মজার ব্যাপার হল, বৌদ্ধধর্মের মতবাদ সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নিলেই দেখা যায়, অন্য সব ধর্মের মতো বৌদ্ধধর্মেও অযৌক্তিক বিশ্বাসের কোনও অভাব নেই। বর্তমানে পৃথিবীতে বৌদ্ধধর্মের তিনটি শাখা প্রচলিত আছে। শ্রীলংকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রচলিত আছে থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম (বাংলাদেশের বৌদ্ধরাও এখন সবাই থেরবাদী); চীন, জাপান ও কোরিয়ায় আছে মহাযানী বৌদ্ধধর্ম; আর তিব্বতে আছে বজ্রযানী বা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম (সঠিকভাবে বলতে গেলে, বজ্রযান মহাযানেরই একটি প্রশাখা)। এখন এই তিন প্রকার বৌদ্ধধর্মের প্রত্যেকটিতেই আমরা বিভিন্ন অযৌক্তিক বিশ্বাসের উপস্থিতি লক্ষ্য করি। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, থেরবাদীরা কর্ম ও পুনর্জন্মে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। সেই কারণে আমরা দেখি, ওয়ালপোলা রাহুলা তাঁর বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে চিন্তার স্বাধীনতার সপক্ষে ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে এত বিজ্ঞাপন দিয়েও তৃতীয় অধ্যায়ে এসে দাবি করছেন, মৃত্যুর পরেও মানুষের ইচ্ছাশক্তি, আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি অক্ষুণ্ণ থাকে এবং এগুলি তাকে নতুন একটি জন্মের দিকে টেনে নিয়ে যায়ঃ

“… a being is nothing but a combination of physical and mental forces or energies. What we call death is the total non-functioning of the physical body. Do all these forces and energies stop altogether with the non-functioning of the body? Buddhism says ‘No’. Will, volition, desire, thirst to exist, to continue, to become more and more, is a tremendous force that moves whole lives, whole existences, that even moves the whole world. This is the greatest force, the greatest energy in the world. According to Buddhism, this force does not stop with the non-functioning of the body, which is death; but it continues manifesting itself in another form, producing re-existence which is called rebirth.”

(Rahula, pp. 32-33)

মানুষের ইচ্ছাশক্তির এমনই জোর যে, তা শুধু মানুষকে বারবার জন্মাতে সাহায্য করছে তাই নয়, তা নাকি এই বিরাট বিশ্বকেও চালাচ্ছে! এ তো গেল থেরবাদের কথা। এবার বৌদ্ধধর্মের অন্য দুটি শাখার প্রসঙ্গে আসা যাক। মহাযানী বৌদ্ধধর্মের একটি প্রশাখা হল চীনের Pure land Buddhism। এর অনুসারীরা অমিতাভ বুদ্ধকে তাঁদের পরিত্রাতা রূপে পূজা করেন। তাঁদের বিশ্বাস, প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হলে মৃত্যুর পর তিনি তাঁদের স্বর্গে (Pure land) স্থান দেবেন। স্পষ্টতই, এই অমিতাভ বুদ্ধের সঙ্গে আব্রাহামিক ঈশ্বরের বিশেষ কোনও পার্থক্য নেই। কিংবদন্তী অনুসারে তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হলেন গুরু রিনপোচে। তিব্বতিরা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন, তাঁর কোনও পিতামাতা নেই, তিনি নাকি একটি পদ্মফুল থেকে জন্মেছিলেন। তাই তাঁর অপর নাম পদ্মসম্ভব। যিশুখ্রিস্টের তবু একজন মাতার প্রয়োজন হয়েছিল, এনার তারও দরকার পড়ে নি!

উপরে তিন প্রকার বৌদ্ধধর্ম থেকে মাত্র তিনটি দৃষ্টান্ত দেওয়া হল। এছাড়াও বৌদ্ধধর্মে দেবদেবী, স্বর্গ-নরক, যক্ষ ইত্যাদি হরেকরকম অন্ধবিশ্বাসের কোনও অভাব নেই। এর থেকে একটা ব্যাপার পরিস্কার। বৌদ্ধধর্মে চিন্তার স্বাধীনতা, অভিজ্ঞতার গুরুত্ব ও অন্ধবিশ্বাসের অনুপস্থিতি বিষয়ে তাত্ত্বিকভাবে যে দাবি করা হয়, বাস্তবে বৌদ্ধধর্ম তা পুরোপুরি পালন করতে অপারগ। এখন প্রশ্ন হল, এই মৌলিক অসঙ্গতির কারণ কী? একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এরকম হতে পারে যে, বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদে সত্যিই কোনও রকম অন্ধবিশ্বাসের স্থান ছিল না। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে এসব ধারণা বৌদ্ধধর্মের মধ্যে প্রবেশ করেছে। বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসের দিকে তাকালে এই ব্যাখ্যাকে অসঙ্গত মনে হয় না। মহাযানের উৎপত্তি হয়েছে বুদ্ধের মৃত্যুর প্রায় পাঁচশো বছর পরে, বজ্রযান এসেছে তারও পাঁচশো বা ছয়শো বছর পরে। এমনকি যে থেরবাদকে অনেকে আদি বৌদ্ধধর্ম বলে মনে করেন, ইতিহাসে দেখা যায়, তারও জন্ম হয়েছে বুদ্ধের মৃত্যুর অন্তত দুশো বছর পর (৩য় পরিচ্ছেদে আমরা দেখব, কেন থেরবাদ আদি বৌদ্ধধর্ম নয়)। সুতরাং বৌদ্ধধর্মের অসঙ্গতির কারণ খুঁজতে হলে আমাদের বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদ সম্পর্কে জানতে হবে।

শুধুমাত্র যদি বৌদ্ধধর্মের অসঙ্গতি ব্যাখ্যা করার জন্যই বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদ জানার প্রয়োজন হত, তাহলে তাতে খুব বেশি আগ্রহী হওয়ার তেমন কোনও কারণ ছিল না। বুদ্ধ আসলে কী বলেছিলেন, তা নিয়ে ধর্মপরায়ণ বৌদ্ধরা আগ্রহী হতে পারেন। কিংবা যেসব পণ্ডিতেরা বৌদ্ধধর্ম নিয়ে চর্চা করেন, তাঁরাও আগ্রহী হতে পারেন। কিন্তু এই দুই শ্রেণীর মানুষ ছাড়া অন্যরা একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে খামোকা লৌহযুগের একজন ধর্মপ্রচারকের মতবাদ সম্পর্কে জানতে চাইবেন কেন? বিশেষত আধুনিক যুগে অধিকাংশ চিন্তাশীল মানুষই যখন মনে করেন, ধর্মকে দিয়ে মানবসভ্যতার উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি হয় এবং ধর্মকে একেবারে নির্মূল করতে পারলেই সভ্যতার মঙ্গল, তখন একটি বিশেষ ধর্ম নিয়ে এত চিন্তাভাবনার তাৎপর্য কোথায়?

অভিযোগটি নেহাত অসার নয়। তাই প্রথমেই এর উত্তর দেওয়া জরুরি। প্রথমে দেখা যাক, ধর্মের সম্পর্কে আমাদের এই চরম নঞর্থক মানসিকতার কারণটা ঠিক কী? এর একটা প্রাথমিক উত্তর হল, ধর্ম মানুষে-মানুষে হিংসা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। এটা অবশ্যই অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। অতীতের মতো আজকের পৃথিবীতেও আমরা ধর্মীয় হানাহানির অসংখ্য দৃষ্টান্ত দেখতে দেখতে ক্লান্ত। কিন্তু এই ব্যাপারে আরেকটু গভীরে গিয়ে প্রশ্ন করা যাক, ঠিক কী কারণে ধর্ম মানুষের মধ্যে এত প্রবল হিংসার সঞ্চার করতে পারে? মানুষ কেন ধর্মের দ্বারা এত সহজে হিংসার পথে প্ররোচিত হয়ে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের ধর্মের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কাছে নিয়ে যায়। তা হল ধর্মের অযৌক্তিকতা। মানুষের চিন্তাজগতের আর কোনও ক্ষেত্র নেই যেখানে ধর্মের মতো বাস্তব অভিজ্ঞতা ও যুক্তির এত উপরে অন্ধবিশ্বাসকে স্থান দেওয়া হয়। ধর্মে প্রশ্ন করা বারণ, সেখানে কেবল অন্ধের মতো অনুসরণ করতে বলা হয়। স্বাধীন চিন্তার সেখানে কোনও স্থান নেই। আর যে মানুষ অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করবে, তাকে অন্ধ হিংসার পথে ঠেলে দেওয়াটা খুবই সহজ। ভলতেয়ারের সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে পড়ে, “যে আপনাকে উদ্ভট কিছু বিশ্বাস করানোর ক্ষমতা রাখে, সে আপনাকে দিয়ে যেকোনো অন্যায়ও করিয়ে নিতে পারে।” কাজেই হিংসায় প্ররোচনা দেওয়ার ব্যাপারটা ধর্মের রোগ নয়, রোগের উপসর্গ মাত্র। আসল রোগ হল ধর্মের অন্তর্নিহিত অযৌক্তিকতা। বস্তুত হিংসা ছাড়া ধর্মের অযৌক্তিকতার আরও একটি মারাত্মক উপসর্গ আছে। সেটা হয়তো হিংসার মতো বাইরে থেকে এত সহজে দেখা যায় না, কিন্তু মানুষের জন্য সেটাও কম ভয়ংকর নয়। মানুষের ভেতরে একটা অনুসন্ধিৎসু মন আছে, যে সব ব্যাপারে প্রশ্ন করতে চায়, সবকিছু নিজের বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে চায়। ধর্ম তার অযৌক্তিকতা দিয়ে মানুষের সেই যুক্তিবাদী মনটাকে মেরে ফেলে। আর সেই হত্যা কিন্তু মানুষের শারীরিক হত্যার চেয়ে কম দুর্ভাগ্যজনক নয়।

তাহলে একজন আধুনিক, চিন্তাশীল মানুষের ধর্মের প্রতি খারাপ ধারণার মূল কারণটি হল ধর্মের অযৌক্তিকতা। এখন আমরা বৌদ্ধধর্মের ক্ষেত্রে দেখেছি যে, তা অন্তত খাতায়-কলমে অযৌক্তিক নয়, বরং অভিজ্ঞতা ও যুক্তিকেই তা প্রাধান্য দেয়। বাস্তবে অবশ্য বৌদ্ধধর্মও অন্য ধর্মের মতোই অযৌক্তিক বিশ্বাসে পূর্ণ। কিন্তু লক্ষ্য করুন, আমরা প্রকৃতপক্ষে “বৌদ্ধধর্ম” সম্পর্কে জানতে চাইছি না। আমরা জানতে চাইছি “বুদ্ধের ধর্ম” সম্পর্কে। আর আমাদের অনুমান, বুদ্ধের প্রকৃত ধর্মে বৌদ্ধধর্মের অযৌক্তিক বিশ্বাসগুলি ছিল না। তা শুধু খাতায়-কলমে নয়, বাস্তবেও যুক্তিসঙ্গত ছিল। অবশ্যই আমাদের এই অনুমান ভ্রান্ত হতে পারে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদ আবিষ্কার করতে না পারছি, ততক্ষণ আমরা নিশ্চিতভাবে কিছুই বলতে পারি না। আর নিশ্চিত উত্তর পাওয়ার একটাই উপায় – বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদ খুঁজে বের করা।

কিন্তু এরপরেও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। মেনে নেওয়া গেল যে, বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদে কোনও অযৌক্তিকতা ছিল না, এই আশা নিয়ে আমরা তা খুঁজতে চাইছি। তাই ধর্মের নঞর্থক দিকটা আমাদের উদ্যোগের বেলায় খাটে না। কিন্তু নঞর্থক দিক যদি নাও থাকে, এর সদর্থক দিকটাই বা কী? বুদ্ধের ধর্ম যদি পুরোপুরি যুক্তিসঙ্গতও হয়, তা কি আমাদের আদৌ কোনও কাজে লাগবে? যুক্তিসঙ্গত হোক বা অযৌক্তিক, ধর্ম জিনিসটারই কি আদৌ কোনও প্রয়োজন আছে আমাদের জীবনে? এই প্রশ্নের এককথায় উত্তর হয় না। এটা ব্যক্তিবিশেষের উপর নির্ভর করছে। কারও জীবনে ধর্মের প্রয়োজন হতে পারে, কারও পারে না। কিংবা একই ব্যক্তির হয়তো জীবনের কোনও পর্যায়ে ধর্মের প্রয়োজন হল, আবার কোনও পর্যায়ে হল না। একটা ব্যাপারে আশা করি সবাই একমত হবেন। মানুষ যেহেতু চিন্তাশীল প্রাণী, তাই জীবনে চলার জন্য তার একটা-না-একটা দর্শনের প্রয়োজন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এখন সেই জীবনদর্শন কেউ ধর্ম থেকে নিতে পারেন, কেউ সেকুলার দর্শন থেকে নিতে পারেন, কেউ বা নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তা তৈরি করে নিতে পারেন। আবার কারও জীবনে হয়তো কোনও দর্শনেরই প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে আশপাশে তাকালে এরকম মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে যিনি কোনপ্রকার জীবনদর্শন ছাড়াই সুখী এবং ভালো মানুষ। একজন মানুষের জীবনে যুক্তিসঙ্গত জীবনদর্শনের অভাব থাকলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিচের দুটো ঘটনার মধ্যে যেকোনো একটি ঘটতে পারে। এক, তিনি আমিত্বের বশবর্তী হয়ে অর্থ ও নামযশের ভোগবাদী নেশার পেছনে ছুটতে থাকবেন। অথবা দুই, তিনি কোনও একটি ধর্মীয় বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইবেন। বর্তমান সমাজে এই দুই ধারার উৎকট দিকগুলি আমরা প্রতি মুহূর্তেই দেখতে পাচ্ছি। একদিকে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা মানুষকে ভোগবাদের নাগরদোলায় ঘুরপাক খাওয়াচ্ছে, অন্যদিকে ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসের বাড়বাড়ন্ত তাকে হিংসা ও কুসংস্কারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অবস্থায় একটি যুক্তিসঙ্গত জীবনদর্শন খুঁজে বের করা আমাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই একান্তভাবে প্রয়োজন। বুদ্ধের মতবাদ যদি আমাদের এরকম একটি দর্শনের সন্ধান দেয়, তাহলে মন্দ কী?

২) বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদের প্রাথমিক উৎসঃ পালি ত্রিপিটক

আমরা সবাই জানি, গৌতম বুদ্ধ তাঁর শিষ্যদের মৌখিকভাবে উপদেশ দিতেন। তিনি কোনও বই লিখে যান নি। তাঁর মৃত্যুর পর শিষ্যরা তাঁর উপদেশগুলি ত্রিপিটক নামক গ্রন্থে সংকলন করেন। ত্রিপিটক পালি ভাষায় লেখা এবং এটি মূলত থেরবাদী বৌদ্ধধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ, যদিও মহাযানীরাও ত্রিপিটককে স্বীকার করেন। ত্রিপিটক বৌদ্ধদের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ। ত্রিপিটক ছাড়া বৌদ্ধদের আর যেসব ধর্মগ্রন্থ আছে, সেগুলি সবই ত্রিপিটকের পরবর্তী রচনা। তাই এ ব্যাপারে কোনও দ্বিমত নেই যে, বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদ যদি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়, তবে তা ত্রিপিটকের মধ্যেই পাওয়া যাবে। ত্রিপিটক ছাড়া অন্য কোথাও বুদ্ধকে খোঁজার কোনও অর্থ নেই।

ত্রিপিটকের তিনটি অংশ – বিনয় পিটক, সুত্ত পিটক ও অভিধম্ম পিটক। বিনয় পিটক মূলত ভিক্ষুসংঘের বিভিন্ন নিয়মকানুন ও ভিক্ষুদের দৈনন্দিন আচরণবিধি ও ক্রিয়াকর্মের সংকলন। দুয়েকটি বিক্ষিপ্ত জায়গা ছাড়া বিনয় পিটকে বুদ্ধের ধর্মসংক্রান্ত মতবাদ খুঁজে পাওয়া যায় না। সুতরাং বুদ্ধের মতবাদ জানার জন্য বিনয় পিটক সঠিক স্থান নয়। বুদ্ধের মতবাদ পাওয়া যায় সুত্ত ও অভিধম্ম পিটকে। এর মধ্যে সুত্ত পিটকে মূলত ধর্ম সংক্রান্ত বিষয়গুলিকে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং অভিধম্ম পিটকে সেগুলির বিস্তৃত, দার্শনিক আলোচনা করা হয়েছে।

সুত্ত পিটকের পাঁচটি অংশ। এই অংশগুলি নিকায় নামে পরিচিত। পাঁচটি নিকায় হল – (১) দীঘ নিকায়, (২) মজ্ঝিম নিকায়, (৩) সংযুত্ত নিকায়, (৪) অঙ্গুত্তর নিকায় ও (৫) খুদ্দক নিকায়। প্রথম চারটি নিকায় মূলত গদ্যে লেখা। এগুলিতে বুদ্ধের সঙ্গে তাঁর শিষ্যদের ধর্ম সংক্রান্ত কথোপকথন লিপিবদ্ধ আছে। কখনও শিষ্যরা বুদ্ধকে ধর্মের নানা বিষয়ে প্রশ্ন করছেন এবং বুদ্ধ সেই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। আবার কখনও বুদ্ধ নিজের থেকেই শিষ্যদের কোনও বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছেন। এই কথোপকথনগুলিকে সুত্ত বলা হয়। প্রথম চারটি নিকায়ের প্রত্যেকটি এরকম অনেকগুলি করে সুত্তের সংকলন মাত্র। বড়ো (দীর্ঘ) আকারের সুত্তগুলি রয়েছে দীঘ নিকায়ে। মাঝারি (মধ্যম) আকারের সুত্তগুলি রয়েছে মজ্ঝিম নিকায়ে। আর ছোট আকারের সুত্তগুলি স্থান পেয়েছে সংযুত্ত ও অঙ্গুত্তর নিকায়ে। এর মধ্যে সংযুত্ত নিকায়ে সুত্তগুলিকে সাজানো হয়েছে বিষয় অনুসারে। একই বিষয় সম্পর্কিত সুত্তগুলিকে এক জায়গায় রাখা হয়েছে। অঙ্গুত্তর নিকায়ে আবার সুত্তগুলিকে অদ্ভূত নিয়মে সাজানো হয়েছে। কোনও সুত্তে যদি একটিমাত্র বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাহলে তাকে রাখা হয়েছে প্রথম অধ্যায়ে, দুটি বিষয় হলে দ্বিতীয় অধ্যায়ে, তিনটি বিষয় হলে তৃতীয় অধ্যায়ে, ইত্যাদি। এই নিয়ম অনুযায়ী চার আর্যসত্য সংক্রান্ত সুত্ত স্থান পাবে অঙ্গুত্তর নিকায়ের চতুর্থ অধ্যায়ে, আবার অষ্টাঙ্গিক মার্গ সংক্রান্ত সুত্ত স্থান পাবে অষ্টম অধ্যায়ে। বিষয়বস্তুর দিক থেকে বলতে গেলে ধর্মের গভীরতর দিকগুলি আলোচনা করা হয়েছে মূলত মজ্ঝিম ও সংযুত্ত নিকায়ে, আর তুলনামূলক ভাবে ধর্মের বাহ্যিক দিকগুলি আলোচিত হয়েছে দীঘ ও অঙ্গুত্তর নিকায়ে।

প্রথম চারটি নিকায়ের থেকে খুদ্দক নিকায় অনেকটাই আলাদা। প্রথমত, নামে ক্ষুদ্র হলেও অন্য চারটি নিকায়ের তুলনায় এটি আকারে বহুগুণ বড়ো। দ্বিতীয়ত, এর বেশির ভাগ অংশ গাথা অর্থাৎ পদ্যে লেখা, যেখানে প্রথম চার নিকায় মূলত গদ্যে লেখা। তৃতীয়ত, প্রথম চার নিকায়ে বিষয়বস্তু ও রচনাশৈলীর মধ্যে মোটামুটি আগাগোড়া একটা সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়, যার জন্য এদের প্রত্যেকটিকে একেকটি স্বতন্ত্র বই হিসেবে ধরা যায়। কিন্তু খুদ্দক নিকায় নানা স্বাদের অনেকগুলি বইয়ের সমষ্টি। প্রামাণ্য মতানুসারে খুদ্দক নিকায়ের মধ্যে ছোটবড় আকারের পনেরোটি বই রয়েছে – (১) খুদ্দকপাঠ, (২) ধম্মপদ, (৩) উদান, (৪) ইতিবুত্তক, (৫) সুত্তনিপাত, (৬) বিমানবত্থু, (৭) পেতবত্থু, (৮) থেরগাথা, (৯) থেরীগাথা, (১০) জাতক, (১১) নিদ্দেস, (১২) পটিসম্ভিদামাগ্গ, (১৩) অপদান, (১৪) বুদ্ধবংশ এবং (১৫) চরিয়াপিটক। বিষয়বস্তুর দিক থেকে খুদ্দক নিকায়ে ধর্মের গভীর আলোচনা নেই বললেই চলে। এখানে মূলত গল্প ও কবিতার মাধ্যমে ধর্মের স্থূল বিষয়গুলি বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

ত্রিপিটকের তৃতীয় ও শেষ পিটক হল অভিধম্ম। আগেই বলা হয়েছে, অভিধম্ম পিটকে সুত্ত পিটকে আলোচিত বিষয়গুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অভিধম্ম পিটকের মধ্যে সাতটি বই রয়েছে – (১) ধম্মসঙ্গনি, (২) বিভঙ্গ, (৩) ধাতুকথা, (৪) পুগ্গলপঞঞতি, (৫) কথাবত্থু, (৬) যমক ও (৭) পট্ঠান।

ত্রিপিটক প্রথমে মৌখিকভাবে সংকলিত হয় এবং দীর্ঘদিন তা মৌখিকভাবেই প্রচলিত ছিল। একেকজন ভিক্ষু ত্রিপিটকের একেকটি অংশ মুখস্থ রাখতেন এবং তিনি তাঁর শিষ্যদের সেই অংশটি শিখিয়ে দিয়ে যেতেন। এইভাবে গুরুশিষ্যপরম্পরায় ত্রিপিটক সংরক্ষিত থাকত। অবশেষে শ্রীলঙ্কায় রাজা বট্টগামণি অভয়ের রাজত্বকালে (২৯-১৭ খ্রিষ্টপূর্ব) সর্বপ্রথম ত্রিপিটক লিপিবদ্ধ হয়। আমরা জানি, গৌতম বুদ্ধের মৃত্যু হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৩ সালে। সুতরাং বুদ্ধের মৃত্যুর পর থেকে ত্রিপিটক লিখিত হওয়ার মধ্যে সময়ের ব্যবধান প্রায় সাড়ে চারশো বছর। প্রশ্ন হল, ত্রিপিটকের সম্পূর্ণ অংশই কি বুদ্ধের মৃত্যুর ঠিক পরেই মৌখিকভাবে সংকলিত হয়েছিল, নাকি তা এই সাড়ে চারশো বছর ধরে একটু একটু করে সংকলিত হয়েছিল? যদি প্রথম ঘটনাটি সত্যি হয়, তাহলে ত্রিপিটকের সমস্ত অংশই সমান প্রাচীন এবং বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদ জানার ব্যাপারে সমান নির্ভরযোগ্য। আর যদি দ্বিতীয়টি সত্যি হয়, তাহলে ত্রিপিটকের কিছু অংশ অন্য অংশের তুলনায় বেশি প্রাচীন ও বেশি নির্ভরযোগ্য। সেক্ষেত্রে আমাদের কাজ হবে ত্রিপিটকের প্রাচীনতম অংশটি খুঁজে বের করা, কারণ সেই অংশটিই আমাদের বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদের সন্ধান দিতে পারে। এখন ত্রিপিটকের বিশাল আয়তনের কথা বিবেচনা করলে এটা প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয় যে, এর সবটাই একবারে সংকলিত হয়েছিল। বরং এই বিশাল গ্রন্থ একটু একটু করে সংকলিত হওয়াই স্বাভাবিক। তাহলে ত্রিপিটকের কোন অংশ সর্বপ্রথম সংকলিত হয়েছিল? কিংবা, যেহেতু বুদ্ধের মতবাদ কেবল সুত্ত ও অভিধম্ম পিটকেই পাওয়া যায়, তাই আরও নির্দিষ্ট করে প্রশ্ন করা যাক, সুত্ত ও অভিধম্ম পিটকের কোন অংশ সর্বপ্রথম সংকলিত হয়েছিল? ঘটনা হল, কেবলমাত্র থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম ও পালি ত্রিপিটকের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থেকে আমরা এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাবো না। এর জন্য আমাদের দৃষ্টির ক্ষেত্রটিকে প্রসারিত করা প্রয়োজন।

৩) পালি ত্রিপিটক একমাত্র ত্রিপিটক নয়

একটা প্রচলিত ধারণা আছে যে, থেরবাদই আদি বৌদ্ধধর্ম এবং থেরবাদীদের ত্রিপিটকই একমাত্র ত্রিপিটক। শুধু তাই নয়, অনেকে আবার এও মনে করেন যে, স্বয়ং বুদ্ধ নাকি পালি ভাষায় ধর্মোপদেশ দিতেন। তাই পালি ত্রিপিটকের কথাগুলি একেবারে বুদ্ধের মুখের কথা। এখন আমরা দেখাব যে, এই ধারণাগুলি বহুল প্রচলিত হলেও প্রকৃতপক্ষে ভ্রান্ত। বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদ খুঁজে বের করার জন্য এই ভ্রান্ত ধারণাগুলি আমাদের প্রথমেই ত্যাগ করা প্রয়োজন।

প্রথমত, থেরবাদ কোনভাবেই আদি বৌদ্ধধর্ম নয়। আদি বৌদ্ধধর্ম বলে বর্তমানে আর কোনকিছু অবশিষ্ট নেই। এটা ঠিক যে, থেরবাদ মহাযান বা বজ্রযানের চেয়ে প্রাচীন এবং বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদের বেশি কাছাকাছি। কিন্তু তাই বলে থেরবাদই বুদ্ধের মূল ধর্ম, একথা একেবারেই ঠিক নয়। মহাযানের আবির্ভাবের আগে বৌদ্ধধর্ম অনেকগুলি শাখায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। এই শাখাগুলিই মহাযানীদের কাছে হীনযান নামে পরিচিত ছিল। থেরবাদ হল এইরকমই একটি শাখা। বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে এরকম আঠারোটি শাখার কথা শোনা যায়, কিন্তু এই সংখ্যাটি অনেকটাই প্রতীকী এবং প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি। তবে গুরুত্বপূর্ণ শাখার সংখ্যা চার-পাঁচটির বেশি নয়। বৌদ্ধধর্মের এই বিভিন্ন শাখায় বিভাজনের প্রক্রিয়া বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে চলেছিল এবং এই বিষয়ে ঐতিহাসিক সূত্রের অপর্যাপ্ততা ও অসঙ্গতির জন্য এই প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে আধুনিক পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক আছে। অবশ্য বর্তমান প্রবন্ধের জন্য আমাদের খুঁটিনাটি বিবরণের কোনও প্রয়োজন নেই, কেবল মোটা দাগের বিষয়গুলো জানলেই চলবে। সেই বিষয়গুলি নীচে উল্লেখ করা হল (Conze, pp. 16-24):

(১) বুদ্ধের মৃত্যুর আনুমানিক ১৪০ বছর পরে সঙ্ঘ প্রথম দুভাগে বিভক্ত হয়ঃ স্থবিরবাদ ও মহাসঙ্ঘিক। পরবর্তীকালে মহাসঙ্ঘিক থেকে অনেকগুলি ছোট ছোট শাখার সৃষ্টি হয়। সেগুলি হলঃ একব্যবহারিক, গোকুলিক, লোকোত্তরবাদী, বহুশ্রুতীয়, প্রজ্ঞপ্তিবাদী, চৈতিক, অপরশৈল ও উত্তরশৈল।

(২) এদিকে স্থবিরবাদও কিন্তু অবিভক্ত থাকে না। বুদ্ধের মৃত্যুর আনুমানিক ২০০ বছর পরে স্থবিরবাদ থেকে পুদ্গলবাদ বা বাতসিপুত্রীয় নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা আলাদা হয়ে যায়। পরবর্তীকালে এই পুদ্গলবাদ থেকে আবার চারটি ছোট ছোট শাখার সৃষ্টি হয়ঃ ধর্মোত্তরীয়, ভদ্রযানীয়, সম্মতীয় ও ষণ্ণাগরিক।

(৩) বুদ্ধের মৃত্যুর আনুমানিক ২৪০ বছর পরে সম্রাট অশোকের আমলে স্থবিরবাদ আবার দুটি গুরুত্বপূর্ণ শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়ঃ বিভাজ্যবাদ ও সর্বাস্তিবাদ। পরবর্তীকালে বিভাজ্যবাদ থেকে সৃষ্টি হয় মহীশাসক, ধর্মগুপ্তক ও কাশ্যপীয়। আর সর্বাস্তিবাদ থেকে সৃষ্টি হয় সৌত্রান্তিক, সংক্রান্তিক ও মূলসর্বাস্তিবাদ।

বিভাজ্যবাদ ও সর্বাস্তিবাদের মধ্যে অশোক সম্ভবত প্রথমটিকে সমর্থন করেন এবং তাঁর পুত্র মহেন্দ্র বৌদ্ধধর্মের এই শাখাটি শ্রীলংকায় প্রচার করেন। পরবর্তীকালে শ্রীলংকার বিভাজ্যবাদীরা নিজেদের আদি স্থবিরবাদী হিসেবে দাবি করেন এবং থেরবাদ (সংস্কৃত শব্দ স্থবিরের পালি রূপ হল থের) নাম ধারণ করেন। শ্রীলংকা থেকেই এই তথাকথিত থেরবাদ মায়ানমার ও থাইল্যান্ডে প্রচারিত হয়েছে। হীনযান বৌদ্ধধর্মের মধ্যে বর্তমানে পৃথিবীতে একমাত্র থেরবাদই টিকে আছে। থেরবাদ ছাড়া অন্য সব হীনযান বৌদ্ধধর্ম বর্তমানে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সেগুলি কোনদিনই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। বরং থেরবাদের মতোই হীনযান বৌদ্ধধর্মের অন্যান্য শাখাগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং পালি ত্রিপিটকের মতো এই শাখাগুলির প্রত্যেকের নিজস্ব ত্রিপিটক ছিল। পালি ত্রিপিটকের মতোই সেই ত্রিপিটকগুলিও প্রথমে বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় মৌখিকভাবে সংকলিত হয়েছিল এবং পরে একসময় সেগুলি লিখিত হয়েছিল। তিব্বতি ঐতিহাসিক বু-স্টনের মতে “আঠারোটি শাখার” ত্রিপিটক খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে অথবা তার কিছু আগে লিখিত হয়েছিল (Warder, p. 282)। দুর্ভাগ্যক্রমে সেইসব হীনযান বৌদ্ধধর্ম বর্তমানে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় তাদের কারও সম্পূর্ণ ত্রিপিটক আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। তবে সেইসব ত্রিপিটকের কিছু কিছু অংশের চীনা ভাষায় অনুবাদ আমাদের হাতে পৌঁছেছে।

বিনয় পিটকঃ থেরবাদ ছাড়াও পাঁচটি হীনযান বৌদ্ধধর্মের সম্পূর্ণ বিনয় পিটক চীনা অনুবাদের মাধ্যমে আমাদের সংগ্রহে আছে। এই পাঁচটি শাখা হল – (১) সর্বাস্তিবাদ, (২) ধর্মগুপ্তক, (৩) মহীশাসক, (৪) মহাসঙ্ঘিক এবং (৫) মূলসর্বাস্তিবাদ। এর মধ্যে মূলসর্বাস্তিবাদী বিনয় পিটকের তিব্বতি অনুবাদও আমাদের সংগ্রহে আছে।

সূত্র পিটকঃ আমরা আগে দেখেছি, থেরবাদে সুত্ত পিটকের অংশগুলিকে নিকায় বলা হয়। হীনযান বৌদ্ধধর্মের অন্যান্য শাখায় এই অংশগুলি আগম নামে পরিচিত। থেরবাদীদের দীঘ নিকায়, মজ্ঝিম নিকায়, সংযুত্ত নিকায়, অঙ্গুত্তর নিকায় ও খুদ্দক নিকায় অন্যদের কাছে যথাক্রমে দীর্ঘ আগম, মধ্যম আগম, সংযুক্ত আগম, একোত্তর আগম ও ক্ষুদ্রক আগম নামে পরিচিত। প্রথম চারটি আগমের প্রত্যেকটির চীনা অনুবাদ আছে, কিন্তু সেগুলি একই শাখার নয়। পণ্ডিতদের মতে, চীনা অনুবাদের দীর্ঘ আগম ধর্মগুপ্তক শাখার গ্রন্থ, এবং চীনা অনুবাদের মধ্যম ও সংযুক্ত আগম সর্বাস্তিবাদ শাখার গ্রন্থ। চীনা অনুবাদের একোত্তর আগম কোন শাখার গ্রন্থ, তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। থেরবাদ ছাড়া অন্য কোনও শাখার ক্ষুদ্রক আগম আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি।

উপরে উল্লিখিত চারটি চীনা ভাষায় অনূদিত আগম ছাড়া সর্বাস্তিবাদী দীর্ঘ আগমের একটি প্রাচীন সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি সম্প্রতি আফগানিস্তানে আবিষ্কৃত হয়েছে। ফলে হীনযানী বৌদ্ধধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা সর্বাস্তিবাদের তিনটি আগম এই মুহূর্তে আমাদের হাতে আছে – দীর্ঘ (মূল সংস্কৃত), মধ্যম (চীনা অনুবাদ) ও সংযুক্ত (চীনা অনুবাদ)।

অভিধর্ম পিটকঃ থেরবাদ ছাড়া একটিমাত্র শাখার সম্পূর্ণ অভিধর্ম পিটক চীনা অনুবাদের মাধ্যমে আমাদের হাতে এসেছে। সেটি হল সর্বাস্তিবাদ।

সুতরাং আমরা দেখলাম যে, যদিও বর্তমানে কেবল থেরবাদীদের পালি ত্রিপিটকই সম্পূর্ণরূপে আমাদের হাতে এসেছে, কিন্তু পালি ত্রিপিটক আসলে অনেকগুলি ত্রিপিটকের মধ্যে একটি এবং থেরবাদও হীনযান বৌদ্ধধর্মের অনেকগুলি শাখার মধ্যে একটি। পালি ত্রিপিটক সম্পর্কে দ্বিতীয় যে ভুল ধারণাটি প্রচলিত সেটি হল, বুদ্ধ নিজে নাকি পালি ভাষায় ধর্মপ্রচার করতেন। আগেই বলা হয়েছে, সম্রাট অশোকের পুত্র কুমার মহেন্দ্র থেরবাদ বৌদ্ধধর্মকে শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যান। এখন মহেন্দ্রের মা পশ্চিম ভারতের উজ্জয়িনী অঞ্চলের বিদিশার মেয়ে ছিলেন এবং মহেন্দ্রেরও বিদিশাতেই জন্ম হয়েছিল। বিদিশা থেকেই মহেন্দ্র পাঁচজন ভিক্ষুকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে শ্রীলঙ্কার উদ্দেশে রওনা দেন। সেখান থেকে তিনি সম্ভবত প্রথমে স্থলপথে ভারতের পশ্চিম উপকূলে পৌঁছান এবং সেখান থেকে জাহাজে শ্রীলংকা পৌঁছান। এর থেকে আমরা অনুমান করতে পারি যে, পালি সেইসময় বিদিশা অঞ্চলের ভাষা ছিল। এই অনুমানের সপক্ষে আরও প্রমাণ পাওয়া যায় এই অঞ্চলের গিরনারে অশোকের শিলালিপি থেকে। পণ্ডিতেরা দেখেছেন, গিরনার শিলালিপির ভাষার সঙ্গে ত্রিপিটকের পালি ভাষার যথেষ্ট সাদৃশ্য আছে (Hirakawa, pp. 78, 88, 119)। একদিকে পালি যদি উজ্জয়িনী-বিদিশা অঞ্চলের ভাষা হয়, অন্যদিকে আমরা জানি যে, বুদ্ধ কখনও ওই অঞ্চলে যান নি। বুদ্ধের জন্মভূমি কপিলাবস্তু কোশল রাজ্যের অংশ ছিল এবং বুদ্ধ সারাজীবন কোশল ও মগধের মধ্যেই ধর্মপ্রচার করেছিলেন। বুদ্ধ ঠিক কী ভাষায় কথা বলতেন, তা আমাদের জানার কোনও উপায় নেই। কিন্তু এটাই স্বাভাবিক যে, সেইসময় কোশল ও মগধে প্রচলিত অর্ধমাগধী অপভ্রংশেই তিনি কথা বলবেন। হয়তো অর্ধমাগধীর কোশলীয় উপভাষা বুদ্ধের মাতৃভাষা ছিল। তবে বুদ্ধ যে ভাষাতেই কথা বলুন না কেন, সেই ভাষা যে পালি নয়, তা একপ্রকার নিশ্চিত।

প্রকৃতপক্ষে জন্মলগ্ন থেকেই বৌদ্ধধর্মের কোনও “অফিসিয়াল” ভাষা ছিল না। বুদ্ধ নিজে তাঁর শিষ্যদের প্রত্যেককে নিজের নিজের ভাষায় তাঁর ধর্মোপদেশ মনে রাখতে নির্দেশ দিতেন, বুদ্ধের ভাষায় নয়। পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও ভারতবর্ষের নতুন নতুন অঞ্চলে ধর্মপ্রচার করবার সময় সেই অঞ্চলের স্থানীয় ভাষাই ব্যবহার করতেন। প্রকৃতপক্ষে ভাষা নয়, ভাষার অন্তর্নিহিত অর্থকেই বৌদ্ধধর্মে গুরুত্ব দেওয়া হয় (Warder, p. 200)।

৪) ত্রিপিটকের সংকলনকাল সম্পর্কে প্রচলিত মত ও তার সীমাবদ্ধতা

২য় পরিচ্ছেদের শেষে আমরা প্রশ্ন তুলেছিলাম যে, ত্রিপিটকের সমস্ত অংশই বুদ্ধের মৃত্যুর ঠিক পরেই সংকলিত হয়েছিল, নাকি তা বুদ্ধের মৃত্যুর পর অনেকদিন ধরে একটু একটু করে সংকলিত হয়েছিল? প্রচলিত মতে বুদ্ধের মৃত্যুর ঠিক পরেই রাজগিরে ভিক্ষুদের একটি সভায় সম্পূর্ণ ত্রিপিটক সংকলিত হয়ে গিয়েছিল (এই সভার ব্যাপারে পরবর্তী পরিচ্ছেদে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে)। কিন্তু এই প্রচলিত মতকে সত্য বলে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু সমস্যা আছে। পালি ত্রিপিটকে যেখানে এই সভার বর্ণনা আছে, সেখানে ওই বর্ণনার শেষের দিকে একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। সভা শেষ হওয়ার ঠিক পরে পুরাণ নামে একজন বর্ষীয়ান ভিক্ষু রাজগিরে এসে উপস্থিত হন। তিনি এই সভার খবর জানতেন না। রাজগিরে যখন সভা চলছিল, সেই সময় তিনি তাঁর পাঁচশো জন শিষ্যকে নিয়ে দক্ষিণাগিরিতে পরিভ্রমণ করছিলেন। যাইহোক, তিনি রাজগিরে উপস্থিত হলে সভায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রবীণ ভিক্ষুরা তাঁকে সভার কথা জানান এবং তাঁকে সভায় সংকলিত বিষয়গুলি কণ্ঠস্থ করে নিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু পুরাণ বিনয়ের সঙ্গে জানান যে, সভার ব্যাপারে তাঁর আপত্তি না থাকলেও তিনি সভায় সংকলিত বিষয়গুলি জানতে চান না। তার পরিবর্তে তিনি বুদ্ধের নিজের মুখে যে উপদেশগুলি শুনেছেন, সেগুলিই মনে রাখবেন (Warder, pp. 198-199)।

উপরের ঘটনা থেকে বোঝা যায়, রাজগিরের সভায় সংকলিত “ত্রিপিটককে” সমস্ত ভিক্ষু গ্রহণ করেন নি। সেইসময় পুরাণের মতো আরও অনেক প্রবীণ ভিক্ষু হয়তো রাজগিরের বাইরে ছিলেন। তাঁরা নিজেরা বুদ্ধের কাছে যেসব উপদেশ শুনেছিলেন, সেগুলিই নিজেদের শিষ্যদের শিখিয়ে যান। পরবর্তীকালে এই সুত্তগুলিকেও ত্রিপিটকের অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন অনুভূত হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু এক্ষেত্রে একটি ঝুঁকি ছিল এই যে, এই সংযোজন প্রক্রিয়ার ফলে হয়তো এমন কিছু সুত্তও ত্রিপিটকে ঢুকে পড়তে পারে যেগুলি আদৌ বুদ্ধ বলেন নি। অথচ ওই সুত্তগুলিকে একেবারে বাদ দিয়ে দিলে হয়তো বুদ্ধের অনেক প্রকৃত উপদেশও বাদ পড়ে যাবে। এই অবস্থায় ভিক্ষুদের সামনে একটিই যুক্তিসঙ্গত পথ ছিল – রাজগিরের সভায় যে সুত্তগুলি সংকলিত হয়েছিল, তাদের বক্তব্যের সঙ্গে যে সুত্তগুলি মিলবে, কেবল সেগুলিকেই ত্রিপিটকে স্থান দেওয়া। দীঘ নিকায়ের মহাপরিনিব্বান সুত্তে (১৬) আমরা দেখি, কোনও ভিক্ষু নতুন কোনও সুত্তকে বুদ্ধের উপদিষ্ট বলে দাবি করলে কী করা উচিত সেই বিষয়ে বুদ্ধ আনন্দকে উপদেশ দিচ্ছেন। বুদ্ধের পরামর্শ, এরকম ক্ষেত্রে নতুন সুত্তটিকে বুদ্ধের ধর্ম ও বিনয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। যদি ধর্ম ও বিনয়ের সঙ্গে মেলে, তাহলে সুত্তটি সত্যিই বুদ্ধের উপদিষ্ট। অন্যথায় সেটি বুদ্ধের উপদিষ্ট নয়।

আমাদের মনে হয়, মহাপরিনিব্বান সুত্তের এই অংশটি আদৌ বুদ্ধের দ্বারা কথিত নয়। কেননা এখানে যে সমস্যার কথা বলা হয়েছে, বুদ্ধের জীবদ্দশায় সেই সমস্যার অস্তিত্বই ছিল না। তখন কোনও সুত্ত সম্পর্কে সন্দেহ দেখা দিলে স্বয়ং বুদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেই সেই সন্দেহের নিরসন ঘটে যেত, ধর্ম ও বিনয়ের সঙ্গে মেলানোর কোনও প্রয়োজন হত না। বস্তুত এরকম দৃষ্টান্ত আছে যেখানে বুদ্ধের ধর্মের ব্যাপারে কোনও ভিক্ষুর ধারণা সম্পর্কে সন্দেহ হলে অন্যান্য ভিক্ষুরা সরাসরি বুদ্ধকে সেকথা জানাতেন এবং বুদ্ধ ওই ভিক্ষুকে ডেকে তাঁর ভুল সংশোধন করে দিতেন (অলগদ্দওপম সুত্ত, মজ্ঝিম নিকায় ২২; মহাতনহাসঙ্খয় সুত্ত, মজ্ঝিম নিকায় ৩৮)। কিন্তু বুদ্ধের মৃত্যুর পরে যখন আর সন্দেহ নিরসনের জন্য তাঁর কাছে যাওয়া সম্ভব ছিল না, তখনই ধর্ম ও বিনয়ের সঙ্গে মেলানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। আমাদের মতে বুদ্ধের মৃত্যুর পর ত্রিপিটকে নতুন নতুন সুত্ত সংযোজনের সময় ভিক্ষুরা কোনও নতুন সুত্তকে ধর্ম ও বিনয়ের সঙ্গে মেলানোর এই নীতির উদ্ভাবন করেন এবং একে বৈধতা দেওয়ার জন্য বুদ্ধের মুখে এই কথা বসানো হয়।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, প্রথমের দিকে এই মেলানোর প্রক্রিয়া সহজ হলেও পরবর্তীতে এটি ক্রমশ জটিল হতে থাকে এবং কোনও নতুন সুত্ত বুদ্ধের ধর্ম ও বিনয়ের সঙ্গে আদৌ মেলে কিনা, তা বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হতে থাকে। এর ফলে ভিক্ষুসঙ্ঘ অনেক শাখায় বিভক্ত হতে থাকে এবং অনেক নতুন নতুন তত্ত্ব ত্রিপিটকে ঢুকতে থাকে যেগুলি আদৌ বুদ্ধের বক্তব্য নয় (Warder, p. 199)।

বুদ্ধের মৃত্যুর পরে ত্রিপিটকে যে তাঁর মতবাদের বিরোধী অনেক সুত্ত ঢোকানো হয়েছিল, তার কিছু কিছু প্রমাণও আমরা পাই। বুদ্ধের মৃত্যুর একশো বছর পরে বৈশালির কিছু ভিক্ষুকে বিনয় বহির্ভূত আচরণ করার জন্য সঙ্ঘ থেকে বহিষ্কার করা হয়। শ্রীলংকায় রচিত ইতিহাস দীপবংশ অনুযায়ী, এরপর এই বহিষ্কৃত ভিক্ষুরা মহাসঙ্গীতি নামে একটি সভার আহ্বান করেন। ওই সভায় তাঁরা প্রচলিত ত্রিপিটককে অস্বীকার করে নিজেদের মতো করে ত্রিপিটক সংকলন করেন। তাঁরা বুদ্ধের মতবাদ ও অন্য ধর্মের মতবাদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না। বুদ্ধের কোন বক্তব্যকে আক্ষরিক অর্থে নিতে হবে আর কোন বক্তব্যের ব্যাখ্যা প্রয়োজন, তাও তাঁরা গুলিয়ে ফেলেন। তাঁরা কিছু কিছু সুত্তকে বাদ দিয়ে তার জায়গায় নিজেদের রচিত ভ্রান্ত সুত্তকে ঢুকিয়ে দেন (Hirakawa, p. 108)।

এছাড়া সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে পাটলিপুত্রের সভায় মহাদেব নামে একজন ভিক্ষু কিছু কিছু মহাযানী সূত্রকে ত্রিপিটকে ঢোকানোর চেষ্টা করেন। বিভাষা গ্রন্থে বলা হয়েছে, “বুদ্ধের নির্বাণের পরে সূত্র পিটকে ভ্রান্ত সূত্র, বিনয় পিটকে ভ্রান্ত বিনয় এবং অভিধর্ম পিটকে ভ্রান্ত অভিধর্ম ঢোকানো হয়েছে।” এই প্রসঙ্গে অভিধর্মকোষের রচয়িতা দুঃখ করে বলেছেন, “এতে আমরা কী করতে পারি? প্রভু নির্বাণ লাভ করেছেন, সদ্ধর্মের আর কোনও নেতা নেই। সংঘের অনেক শাখা তৈরি হয়ে গেছে এবং তারা নিজেদের খেয়ালখুশি অনুযায়ী অর্থ ও শব্দের পরিবর্তন করেছে।” (Lamotte, p. 164)

৫) সুত্ত ও অভিধম্ম পিটকের মধ্যে সংকলনের কাল অনুযায়ী তিনটি স্তরঃ প্রথম চার নিকায়, খুদ্দক নিকায় ও অভিধম্ম পিটক

পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে বলা হয়েছে, বুদ্ধের মৃত্যুর ঠিক পরে রাজগিরে ভিক্ষুদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল যেখানে নাকি ত্রিপিটক সংকলিত হয়। বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে এই সভাটি প্রথম সঙ্গীতি নামে বিখ্যাত হয়ে আছে। পালি বিনয় পিটকের অন্তর্গত চুল্লবগ্গ নামক গ্রন্থের শেষের দিকে প্রথম সঙ্গীতির বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, বুদ্ধের মৃত্যুর ঠিক পরের বর্ষাকালে রাজগিরে প্রবীণ ভিক্ষু মহাকাশ্যপের নেতৃত্বে এই সঙ্গীতি অনুষ্ঠিত হয়। পাঁচশো জন অর্হত ভিক্ষু সঙ্গীতিতে অংশগ্রহণ করেন। সঙ্গীতির উদ্দেশ্য ছিল বুদ্ধের উপদিষ্ট বিনয় ও ধর্মের সংকলন করা। সভাপতি মহাকাশ্যপের নির্দেশে প্রথমে উপালি বিনয় আবৃত্তি করেন এবং তারপর আনন্দ পাঁচটি নিকায় আবৃত্তি করেন। অভিধম্মের কোনও উল্লেখ এই বিবরণে নেই।

সমস্যা হল, পালি বিনয় ছাড়া অন্য পাঁচটি বিনয়েও প্রথম সঙ্গীতির বিবরণ আছে এবং সেই বিবরণগুলি পরস্পরবিরোধী। প্রথম সঙ্গীতিতে ত্রিপিটকের কোন কোন অংশ সংকলিত হয়েছিল, সেই বিষয়ে পালি বিনয় ও অন্য পাঁচটি বিনয়ের বক্তব্য নীচে সংক্ষেপে দেওয়া হল (Suzuki):

(১) থেরবাদী (পালি) বিনয় – বিনয় পিটক ও পাঁচটি নিকায়।

(২) মহীশাসক বিনয় – বিনয় পিটক, প্রথম চার আগম ও ক্ষুদ্রক পিটক।

(৩) মহাসঙ্ঘিক বিনয় – বিনয় পিটক, প্রথম চার আগম ও ক্ষুদ্রক পিটক।

(৪) ধর্মগুপ্তক বিনয় – বিনয় পিটক, প্রথম চার আগম, ক্ষুদ্রক পিটক ও অভিধর্ম পিটক।

(৫) সর্বাস্তিবাদী বিনয় – বিনয় পিটক, প্রথম চার আগম ও অভিধর্ম পিটক।

(৬) মূলসর্বাস্তিবাদী বিনয় – বিনয় পিটক, প্রথম চার আগম ও মাতৃকা (Warder, p. 196)।

উল্লেখ্য, মাতৃকা হল অভিধর্মের আদি রূপ।

উপরের তালিকাটি বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি, বিনয় পিটকের ব্যাপারে ছয়টি শাখাই একমত। প্রত্যেকেই মনে করে, প্রথম সঙ্গীতিতে সম্পূর্ণ বিনয় পিটক সংকলিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমাদের কাজ বিনয় পিটক নিয়ে নয়, সূত্র ও অভিধর্ম পিটক নিয়ে। ছয়টি শাখার বক্তব্য অনুযায়ী সূত্র ও অভিধর্ম পিটকের বইগুলিকে নীচের তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়ঃ

(১) প্রথম চার নিকায়/আগমের ব্যাপারে ছয়টি শাখাই একমত যে, এগুলি প্রথম সঙ্গীতিতে সংকলিত হয়েছিল।

(২) খুদ্দক নিকায় বা ক্ষুদ্রক আগমের ব্যাপারে তিন রকম মত পাওয়া যায়। থেরবাদের মতে খুদ্দক নিকায় প্রথম সঙ্গীতিতে সংকলিত হয়েছিল। উল্টোদিকে, সর্বাস্তিবাদ ও মূলসর্বাস্তিবাদের মতে ক্ষুদ্রক আগম প্রথম সঙ্গীতিতে সংকলিত হয়নি। এই দুই মতের মাঝামাঝি জায়গায় আছে মহীশাসক, মহাসঙ্ঘিক ও ধর্মগুপ্তক শাখা। এরা ক্ষুদ্রককে স্বীকার করেছে ঠিকই, কিন্তু তাকে “ক্ষুদ্রক আগম” না বলে “ক্ষুদ্রক পিটক” আখ্যা দিয়েছে। অর্থাৎ এরা প্রথম চার আগমের মতো ক্ষুদ্রককে সূত্র পিটকে স্থান না দিয়ে তাকে নিয়ে একটি নতুন পিটক বানিয়েছে।

(৩) অভিধর্ম পিটকের ক্ষেত্রেও মোটামুটি দুরকম মত পাওয়া যায়। থেরবাদ, মহীশাসক ও মহাসঙ্ঘিকের মতে প্রথম সঙ্গীতিতে অভিধর্ম পিটক সংকলিত হয়নি। অন্যদিকে ধর্মগুপ্তক, সর্বাস্তিবাদ ও মূলসর্বাস্তিবাদের মতে অভিধর্ম পিটক প্রথম সঙ্গীতিতে সংকলিত হয়েছিল। অবশ্য এর মধ্যে মূলসর্বাস্তিবাদ সরাসরি অভিধর্মের উল্লেখ না করে তার আদিরূপ মাতৃকার উল্লেখ করেছে।

এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থেকে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়? এখানে উল্লেখ করা যায়, প্রথম সঙ্গীতির বিবরণে এরকম অসঙ্গতির কিন্তু এখানেই শেষ নয়। উপরোক্ত ছয়টি বিনয় পিটক ছাড়া অন্য অনেক প্রাচীন গ্রন্থেও আমরা প্রথম সঙ্গীতির বিবরণ পাই। একটা বিষয়ে সবাই একমত যে, বুদ্ধের মৃত্যুর এক বছরের মধ্যেই প্রথম সঙ্গীতি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু সঙ্গীতির স্থান ও অংশগ্রহণকারীর সংখ্যার ব্যাপারে আমরা ভিন্নমত লক্ষ্য করি। রাজগিরের পরিবর্তে অনেক গ্রন্থে আমরা কুশীনগর, সাঙ্কাশ্য কিংবা সাহালোক নামক স্থানে প্রথম সঙ্গীতি অনুষ্ঠিত হতে দেখি। আবার রাজগিরে অনুষ্ঠিত হলেও সঙ্গীতির সঠিক স্থান নিয়ে পরস্পরবিরোধিতা লক্ষ্য করা যায়ঃ কারও মতে বেণুবন, কারও মতে গৃধ্রকূট পর্বত, কারও মতে ক্ষত্রিয় গুহা, আবার কারও মতে সপ্তপর্ণী গুহা। অধিকাংশ গ্রন্থে সঙ্গীতিতে ৫০০ জন ভিক্ষুর অংশগ্রহণের কথা বলা হলেও কোনও কোনও জায়গায় ১০০০ বা ৩০০০ জন ভিক্ষুর কথাও পাওয়া যায় (Lamotte, p. 128)।

এইসব পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে অনেকে প্রথম সঙ্গীতির ঘটনাটিকেই অনৈতিহাসিক বলে সন্দেহ করেন। কিন্তু লক্ষণীয়, অনেকগুলি ভিন্ন ভিন্ন উপাদান-গ্রন্থে আমরা এই সঙ্গীতির উল্লেখ পাই। আর তারা সবাই একমত যে, বুদ্ধের মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে এটি অনুষ্ঠিত হয় এবং এখানে বুদ্ধের ধর্ম ও বিনয় সংকলিত হয়। যদি আদৌ এরকম কোনও সভা অনুষ্ঠিত না হত, তাহলে সবাই এর উল্লেখ করত কেন? আমাদের মনে হয়, বুদ্ধের মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে সত্যিই একটি সভা হয়েছিল এবং সেখানে বুদ্ধের ধর্ম ও বিনয় সংকলিতও হয়েছিল। কিন্তু সেই সভার কোনও বিস্তারিত বিবরণ সভার অব্যবহিত পরে তৈরি করা হয়নি। দীর্ঘদিন বৌদ্ধদের স্মৃতিতে এই সভাটির কথা জাগরূক ছিল। কিন্তু এর যে বিস্তারিত বিবরণগুলি আমরা পাই, সেগুলি সংকলিত হয়েছিল সভাটি অনুষ্ঠিত হওয়ার অনেক পরে। ততদিনে বৌদ্ধধর্ম অনেকগুলি শাখায় বিভক্ত হয়ে গেছে এবং প্রত্যেকটি শাখা নিজের নিজের মতো করে ত্রিপিটক সংকলন করেছে। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে প্রথম সঙ্গীতির বিবরণ দিতে গিয়ে স্বভাবতই তারা প্রত্যেকে ত্রিপিটকের যে অংশগুলিকে প্রাচীন তথা প্রামাণ্য বলে মনে করত, সেই অংশগুলিকেই প্রথম সঙ্গীতিতে সংকলিত বলে দাবি করেছে।

প্রথম সঙ্গীতি বুদ্ধের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে অনুষ্ঠিত হলেও প্রথম সঙ্গীতির বিবরণগুলি যে খুব বেশি প্রাচীন নয়, তা বোঝা যায় বিনয় পিটকের মধ্যে চুল্লবগ্গ নামক যে বইতে এই বিবরণ আছে, তার প্রাচীনতা বিবেচনা করলে। বিনয় পিটক থেকে বুদ্ধের মতবাদ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না বলে আমরা এর অন্তর্গত বইগুলির কালানুক্রমিক স্তরবিন্যাস করার চেষ্টা করিনি। কিন্তু পণ্ডিতদের মতে (Rhys Davids, p. 188; Law, p. 66) বিনয় পিটকের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন অংশ হল পাতিমোক্ষ, তারপর সুত্তবিভঙ্গ, এবং তারপর মহাবগ্গ ও চুল্লবগ্গ। বিনয় পিটকের সর্বশেষ সংযোজন হল পরিবার পাঠ। সুতরাং চুল্লবগ্গ বইটি নিঃসন্দেহে বুদ্ধের মৃত্যুর বেশ কিছু পরে সংকলিত হয়েছিল।

উপরের যুক্তি অনুযায়ী প্রথম সঙ্গীতিতে সংকলিত বিষয় সম্পর্কে ছয়টি বিনয় পিটকের বক্তব্য থেকে আমরা এটা জানতে পারি না যে, সত্যিই প্রথম সঙ্গীতিতে ত্রিপিটকের কোন অংশগুলি সংকলিত হয়েছিল। বরং এই বক্তব্যগুলি থেকে আমরা জানতে পারি, প্রথম সঙ্গীতির বিবরণগুলি যখন সংকলিত হচ্ছে, সেই সময় বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন শাখা ত্রিপিটকের কোন অংশকে প্রামাণ্য বলে মনে করত। এভাবে বিচার করলে সূত্র ও অভিধর্ম পিটকের বইগুলিকে আমরা প্রাচীনতা অনুযায়ী নীচের তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করতে পারিঃ

(১) সূত্র ও অভিধর্ম পিটকের মধ্যে প্রথম চার নিকায়/আগম সবচেয়ে প্রাচীন অংশ কেননা ছয়টি বিনয়ের প্রত্যেকেই স্বীকার করে যে, এগুলি প্রথম সঙ্গীতিতে সংকলিত হয়েছিল।

(২) সময়ের বিচারে এর পরের স্তরে থাকবে খুদ্দক নিকায় বা ক্ষুদ্রক আগম। ছয়টি বিনয়ের মধ্যে চারটিই মনে করে যে, এটি প্রথম সঙ্গীতিতে সংকলিত হয়েছিল, যদিও তার মধ্যে মাত্র একটি বিনয় একে প্রথম চার নিকায়ের সঙ্গে সূত্র পিটকে স্থান দিয়েছে। বাকিরা একে সূত্র পিটকের বাইরে একটি পৃথক পিটক হিসেবে বিবেচনা করেছে।

(৩) সর্বশেষ সংযোজন হল অভিধর্ম পিটক। ছয়টি শাখার মধ্যে মাত্র দুটি মনে করে, এটি প্রথম সঙ্গীতিতে সংকলিত হয়েছিল। আরেকটি শাখার মতে প্রথম সঙ্গীতিতে ঠিক অভিধর্ম পিটক সংকলিত হয়নি, তবে এর আদিরূপ অর্থাৎ মাতৃকা সংকলিত হয়েছিল। কিন্তু বাকি তিনটি শাখা অভিধর্ম বা মাতৃকা কোনটিই স্বীকার করেনি।

উপরে বিভিন্ন হীনযান বৌদ্ধধর্মের বিনয় পিটকে প্রথম সঙ্গীতির বিবরণ বিশ্লেষণ করে সূত্র ও অভিধর্ম পিটকের বইগুলির মধ্যে আমরা তিনটি কালানুক্রমিক স্তর দেখতে পেয়েছি। এবার আমরা দেখব যে, বিভিন্ন হীনযান বৌদ্ধধর্মের সূত্র ও অভিধর্ম পিটকের বইগুলির তুলনামূলক আলোচনা থেকেও আমরা একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি।

(১) প্রথম চার আগমঃ আগেই বলা হয়েছে, বর্তমানে আমাদের হাতে প্রথম চার আগমের পালি রূপ ছাড়াও ধর্মগুপ্তক (দীর্ঘ), সর্বাস্তিবাদী (দীর্ঘ, মধ্যম ও সংযুক্ত) এবং একটি অজানা শাখার (একোত্তর) আগম রয়েছে। এই আগমগুলিকে সংশ্লিষ্ট পালি নিকায়ের সঙ্গে তুলনা করলে আমরা যথেষ্ট সাদৃশ্য পাই (যদিও পরে আমরা দেখব, প্রথম চার আগমের সবগুলির ক্ষেত্রে আমরা সমান সাদৃশ্য পাই না)। এই সাদৃশ্য থেকে বোঝা যায়, বিভিন্ন হীনযানী শাখাগুলি সৃষ্টি হওয়ার আগেই প্রথম চারটি আগমের অন্তত কিছু কিছু অংশ সংকলিত হয়ে গিয়েছিল।

(২) ক্ষুদ্রক আগমঃ এক্ষেত্রে সমস্যা হল, একমাত্র পালি খুদ্দক নিকায় ছাড়া অন্য কোনও শাখার ক্ষুদ্রক আগম আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। এর সম্ভাব্য কারণ হল, থেরবাদ ছাড়া অন্য কোনও শাখা কোনদিনই একটি সম্পূর্ণ বা চূড়ান্ত ক্ষুদ্রক আগম তৈরি করে উঠতে পারেনি। প্রথম সঙ্গীতির বিবরণ দেওয়ার সময় বা অন্যত্র যতই তারা ক্ষুদ্রক আগম কিংবা ক্ষুদ্রক পিটকের কথা বলুক না কেন, কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন বই ছাড়া একটি সম্পূর্ণ ক্ষুদ্রক আগম তাদের হাতে কখনোই ছিল না (Lamotte, pp. 162-163)। তবে বিচ্ছিন্নভাবে হলেও তাদের ক্ষুদ্রক আগমের যে বইগুলি আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে, সেগুলির সাথে পালি খুদ্দক নিকায়ের সংশ্লিষ্ট বইগুলির মোটামুটি মিল পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পালি ধম্মপদের সঙ্গে সংস্কৃতে রচিত সর্বাস্তিবাদী গ্রন্থ উদানবর্গের মোটামুটি মিল আছে। এইসব মিল থেকে বোঝা যায়, খুদ্দক নিকায় বা ক্ষুদ্রক আগম প্রথম চার নিকায়ের তুলনায় নবীন হলেও খুব নবীন নয়।

(৩) অভিধর্ম পিটকঃ আগেই বলা হয়েছে, থেরবাদ ছাড়া কেবল সর্বাস্তিবাদের সম্পূর্ণ অভিধর্ম পিটক আমাদের হাতে এসেছে। থেরবাদের মতো সর্বাস্তিবাদী অভিধর্ম পিটকের মধ্যেও সাতটি বই আছে। কিন্তু এই দুই অভিধর্মের মধ্যে সাদৃশ্য এখানেই শেষ। সর্বাস্তিবাদী অভিধর্ম পিটকের সাতটি বইয়ের নাম বা বিষয়বস্তু, কোনটাই পালি অভিধম্ম পিটকের সাথে মেলে না (Warder, p. 212; Law, p. 339)। এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, এই দুটি শাখা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরেই নিজের নিজের অভিধর্ম পিটক সংকলন করেছিল।

প্রথম চার নিকায়ের তুলনায় খুদ্দক নিকায় ও অভিধম্ম পিটক যে নবীনতর, তার সপক্ষে আরও যুক্তি দেওয়া যায়। এবার আমরা সেই যুক্তিগুলি আলোচনা করব।

খুদ্দক নিকায়ের নবীনত্বের সপক্ষে আরও প্রমানঃ

(১) এর আগে বিভিন্ন বিনয়ে প্রথম সঙ্গীতির বিবরণ থেকে আমরা দেখেছি যে, হীনযান বৌদ্ধধর্মের অনেক শাখা ক্ষুদ্রক আগমকে সূত্র পিটকে স্থান না দিয়ে তাকে একটি পৃথক পিটক হিসেবে বিবেচনা করেছে। বিনয় পিটক ছাড়া আরও নানা স্থানে আমরা একইরকম প্রমাণ পাই। আমরা বাহুল্য বিবেচনায় সেগুলি আর এখানে উল্লেখ করছি না। আগ্রহী পাঠক ল্যামোতের বইতে দেখতে পারেন (Lamotte, pp. 151-152)।

(২) পঞ্চম শতাব্দীর প্রখ্যাত থেরবাদী ভাষ্যকার বুদ্ধঘোষ আমাদের জানিয়েছেন, তাঁর সময়ে দীঘভাণকরা (যেসব ভিক্ষুরা দীঘ নিকায় আবৃত্তি করতেন) খুদ্দক নিকায়কে সুত্ত পিটকের পরিবর্তে অভিধম্ম পিটকের অংশ মনে করতেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা খুদ্দক নিকায়ের গ্রন্থতালিকায় চারটি বইকে ধরতেন না। সেই বইগুলি হল অপদান, বুদ্ধবংশ, চরিয়াপিটক ও খুদ্দকপাঠ। অর্থাৎ দীঘভাণকদের মতে এই চারটি বই খুদ্দক নিকায়ের অংশ ছিল না। এখান থেকে অনুমান করা যায়, এই চারটি বই অনেক পরে খুদ্দক নিকায়ে সংযোজিত হয়েছিল (Law, pp. 58-59)। বস্তুত, খুদ্দক নিকায়ের প্রামাণ্যতার ব্যাপারে প্রথম থেকেই একটা সন্দেহের বাতাবরণ ছিল এবং একটি নতুন, সন্দেহজনক বইকে অন্য চার নিকায়ের তুলনায় এই সন্দেহজনক নিকায়ে স্থান দেওয়া অপেক্ষাকৃত সহজতর ছিল। খুদ্দক নিকায়ের বিপরীতধর্মী নামের রহস্যও সম্ভবত এখানেই নিহিত। একদম শুরুতে হয়তো এই নিকায়টি সত্যিই আকারে “ক্ষুদ্র” ছিল। পরে সংযোজন হতে হতে এটি সুত্ত পিটকের মধ্যে বৃহত্তম হয়ে দাঁড়ায়। খুদ্দক নিকায়ের এই নমনীয়তার সুযোগ নিয়ে মায়ানমারের বৌদ্ধরা মিলিন্দপঞহ, সুত্তসংগহ, পেটকোপদেশ ও নেত্তিপকরণ নামে অনেক পরবর্তী চারটি বইকেও খুদ্দক নিকায়ে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে মায়নামারের খুদ্দক নিকায়ে বইয়ের সংখ্যা পনেরোর বদলে উনিশ হয়ে গেছে (Lamotte, p. 159)।

অভিধম্ম পিটকের নবীনত্বের সপক্ষে আরও প্রমানঃ

(১) হীনযান বৌদ্ধধর্মের অনেক শাখা অভিধর্মকে বুদ্ধের বাণী হিসেবে মানত না। যেমন – সৌত্রান্তিক নামে একটি শাখা ছিল, যার এরকম নামকরণের কারণই হল, এঁরা কেবল সূত্র পিটককেই বুদ্ধের বাণী হিসেবে মানতেন, অভিধর্ম পিটককে নয় (Lamotte, p. 181)।

(২) পরবর্তীকালে থেরবাদী ভাষ্য রচনার যুগে অভিধর্মের প্রাচীনত্ব প্রমাণ করার জন্য অনেক উপকথা প্রচার করা হয়। যেমন – বুদ্ধ নাকি ত্রয়স্ত্রিংশ স্বর্গলোকে গিয়ে তাঁর মা মায়াদেবীকে অভিধর্ম শিখিয়েছিলেন। বুদ্ধের প্রধান শিষ্য সারিপুত্তও সেখানেই বুদ্ধের কাছ থেকে অভিধর্মের শিক্ষা লাভ করেন এবং পরে তিনি পৃথিবীতে এসে তাঁর পাঁচশো জন শিষ্যকে তা শেখান। এভাবেই পৃথিবীতে অভিধর্ম প্রচারিত হয় (Lamotte, pp. 182-183)। বলা বাহুল্য, এই ধরণের গল্পকথার কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। কিন্তু এরকম গল্প যে আদৌ প্রচার করার প্রয়োজন হয়েছিল, তার থেকেই বোঝা যায়, অভিধর্ম আসলে ত্রিপিটকের প্রামাণ্য অংশ ছিল না। স্মরণ করা যেতে পারে, মহাযানীরাও বুদ্ধের মৃত্যুর চার-পাঁচশো বছর পরে রচিত মহাযানী সূত্রগুলিকে স্বয়ং বুদ্ধ কর্তৃক কথিত বলে প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে একই রকম গল্পকথার আশ্রয় নিয়েছিল (Warder, p. 4)।

সুত্ত ও অভিধম্ম পিটকের মধ্যে যে তিনটি স্তর আমরা দেখলাম, বৌদ্ধধর্মের ক্রমবিবর্তনের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক আছে।

(১) প্রথম চার নিকায়ঃ বুদ্ধের জীবদ্দশায় বৌদ্ধধর্ম মূলত মগধ ও কোশলের নাগরিক সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বুদ্ধ নিজেও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ছিলেন এবং তিনি সেই সমাজের মধ্যেই মূলত ধর্মপ্রচার করেছিলেন। অভিজাত রাজন্য, শিক্ষিত ব্রাহ্মণ ও ধনী শ্রেষ্ঠীরা ছিলেন তাঁর প্রধান শিষ্য। প্রথম চার নিকায়ে আমরা ধর্মের যে গভীর অথচ নির্মেদ রূপটি দেখি, তা এই শিক্ষিত, নাগরিক সমাজের জন্য উপযুক্ত বলে মনে হয়।

(২) খুদ্দক নিকায়ঃ বুদ্ধের মৃত্যুর পর ভিক্ষুরা নাগরিক ভারতবর্ষের বাইরে বিস্তৃত গ্রামীণ ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মকে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন। অশিক্ষিত, গ্রাম্য মানুষদের কাছে স্বভাবতই ধর্মের গভীর তত্ত্বের কোনও আবেদন ছিল না। ফলে ভিক্ষুরা তাঁদের আকৃষ্ট করার জন্য অন্য পন্থা গ্রহণ করেন। তাঁরা ছন্দোবদ্ধ কবিতা ও আকর্ষণীয় গল্পের মাধ্যমে ধর্মের স্থূল বিষয়গুলি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। খুদ্দক নিকায় তার অসংখ্য গাথা ও গল্প নিয়ে বৌদ্ধধর্মের এই পর্যায়টিকে চিহ্নিত করে।

(৩) অভিধম্ম পিটকঃ বৌদ্ধধর্ম মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়ার সাথে সাথে আরেকটি ঘটনা ঘটে। তা রাজানুগ্রহ লাভ করতে শুরু করে। রাজাদের বদান্যতায় বিহারগুলির সমৃদ্ধি বাড়তে থাকে। আগে ভিক্ষুদের প্রতিদিন ভিক্ষা করে ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে হত। এখন বড়ো বড়ো বিহারে তাঁদের আর সেই দায় ততটা রইল না। ফলে সমৃদ্ধ বিহারগুলিকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধধর্মে একটি পণ্ডিত-সমাজের জন্ম হল। এঁরা বিহারে বসে নিশ্চিন্তে জ্ঞানচর্চা করতে পারতেন। এঁদের হাতে বুদ্ধের ধর্ম একটি সূক্ষ্ম ও জটিল দর্শনে পরিণত হল। অভিধম্ম বৌদ্ধধর্মের এই পর্যায়টির সূচক। বস্তুত পরবর্তীকালে নাগার্জুন ও শঙ্করের যুগে ভারতীয় দর্শন যে বিপুল উচ্চতায় পৌঁছেছিল, তার সূচনা অভিধর্ম থেকেই। তবে দর্শন হিসেবে এর গুরুত্বকে স্বীকার করেও প্রশ্ন করা যায়, বুদ্ধের ধর্মের যা প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল, মানুষের অস্তিত্বের গভীরে নিহিত দুঃখের নিরসন, তা পূরণের জন্য অভিধর্মের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ আদৌ কতটা প্রয়োজনীয়?

৬) খুদ্দক নিকায়ের মধ্যে অত্যন্ত প্রাচীন এবং অত্যন্ত নবীন অংশ

পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে আমরা খুদ্দক নিকায়কে সময়ের বিচারে প্রথম চার নিকায় ও অভিধম্ম পিটকের মাঝে স্থান দিয়েছি। অর্থাৎ খুদ্দক নিকায় প্রথম চার নিকায়ের পরবর্তী এবং অভিধম্ম পিটকের পূর্ববর্তী। একথা খুদ্দক নিকায়ের বেশির ভাগ অংশের ক্ষেত্রে সত্যি হলেও অল্প কিছু ব্যতিক্রম আছে। খুদ্দক নিকায়ের মধ্যে এমন কিছু প্রাচীন অংশ আছে যা প্রথম চার নিকায়ের সমসাময়িক। আবার এমন কিছু নবীন অংশ আছে যা অভিধম্ম পিটকের সমসাময়িক। এই পরিচ্ছেদে আমরা খুদ্দক নিকায়ের এই অত্যন্ত প্রাচীন এবং অত্যন্ত নবীন অংশগুলি চিহ্নিত করব।

প্রথমে নবীন অংশের প্রসঙ্গে আসা যাক। আমরা আগে দেখেছি, বুদ্ধঘোষের সময়ে দীঘভাণকরা খুদ্দক নিকায়কে অভিধম্ম পিটকের মধ্যে স্থান দিতেন। অথচ তাঁরা খুদ্দক নিকায়ের তালিকার মধ্যে অপদান, বুদ্ধবংশ, চরিয়াপিটক ও খুদ্দকপাঠকে রাখেন নি। এর থেকে বোঝা যায়, এই চারটি বই কিছুতেই অভিধম্ম পিটকের চেয়ে প্রাচীন নয়।

খুদ্দক নিকায়ের মধ্যে উপরের বইগুলি যে সবচেয়ে নবীন, তার সপক্ষে আমরা আরও কিছু প্রমাণ পাই। অপদান, চরিয়াপিটক ও খুদ্দকপাঠের বিষয়বস্তু বিবেচনা করলে খুদ্দক নিকায়ের অন্যান্য বইয়ের তুলনায় এদের নবীনত্ব বোঝা যায়। অপদানে বিভিন্ন থের (প্রবীণ ভিক্ষু) ও থেরীদের (প্রবীণ ভিক্ষুণীদের) বর্তমান জীবন ও অতীত জন্মের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এর থেকে বোঝা যায়, এই বইটি খুদ্দক নিকায়ের অন্তর্গত থেরগাথা, থেরীগাথা ও জাতকের পরবর্তী। কেননা থেরগাথা ও থেরীগাথায় প্রবীণ ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের বর্তমান জীবনের কথা পাওয়া যায়। আবার জাতকে আমরা পাই বুদ্ধের অতীত জন্মের কাহিনী। স্পষ্টতই অতীত জন্মের ধারণাটি জাতকের কাছ থেকে নিয়ে থের ও থেরীদের উপর প্রয়োগ করা হয়েছে অপদান গ্রন্থে। সুতরাং অপদান নিঃসন্দেহে একদিকে জাতক এবং অন্যদিকে থেরগাথা ও থেরীগাথার পরবর্তী। একইভাবে চরিয়াপিটকের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি জাতকের পরবর্তী সংকলন। জাতকে যেখানে বুদ্ধের অনেকগুলি অতীত জন্মের কথা সংক্ষেপে ও বিচ্ছিন্নভাবে বলা হয়েছে, সেখানে চরিয়াপিটকে তার মধ্যে কয়েকটি কাহিনীকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে এবং পুরো ব্যাপারটিকে একটি সামগ্রিক কাঠামোর মধ্যে বন্দী করার জন্য পারমি নামক তত্ত্বের অবতারণা করা হয়েছে। সবশেষে খুদ্দকপাঠের সম্পর্কে বলা যায়, এটি বৌদ্ধধর্মের একেবারে প্রাথমিক কয়েকটি বিষয়ের একটি ক্ষুদ্র সংকলন। স্পষ্টতই এটি কোনও মৌলিক রচনা নয়। মূলত কনিষ্ঠ ভিক্ষু ও বালকদের বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে প্রাথমিক পাঠ দেওয়ার জন্য এই বইটি সংকলন করা হয়। এর অন্তর্গত প্রায় সব বিষয়ই খুদ্দক নিকায়ের অন্য অংশে পাওয়া যায়।

বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করে যদি অপদান, চরিয়াপিটক ও খুদ্দকপাঠের নবীনত্ব বোঝা যায়, তাহলে ছন্দ বিশ্লেষণ করে আবার অপদান, বুদ্ধবংশ ও চরিয়াপিটকের নবীনত্ব প্রমাণ করা যায়। এ. কে. ওয়ার্ডার খুদ্দক নিকায়ের বইগুলির ছন্দ বিশ্লেষণ করে সেগুলির আনুমানিক সময়কাল নির্ধারণ করেছেন। তাঁর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অপদান, বুদ্ধবংশ ও চরিয়াপিটক খুদ্দক নিকায়ের মধ্যে পরবর্তী সংযোজন (Warder, p. 286)। সব মিলিয়ে আমরা বলতে পারি, অপদান, বুদ্ধবংশ, চরিয়াপিটক ও খুদ্দকপাঠ খুদ্দক নিকায়ের নবীনতম অংশ এবং এগুলি অভিধম্ম পিটকের পূর্ববর্তী নয়, বরং তার সমসাময়িক।

উপরের চারটি বই যদি অভিধম্ম পিটকের সমসাময়িক হয়, তাহলে খুদ্দক নিকায়ের অপর চারটি বই আবার অভিধম্ম পিটকের চেয়ে সামান্য পূর্ববর্তী। এই চারটি বই হল – বিমানবত্থু, পেতবত্থু, নিদ্দেস ও পটিসম্বিধামাগ্গ।

এ. কে. ওয়ার্ডারের ছন্দ বিশ্লেষণ অনুযায়ী অপদান, বুদ্ধবংশ ও চরিয়াপিটকের মতো বিমানবত্থু ও পেতবত্থুও খুদ্দক নিকায়ের মধ্যে পরবর্তী সংযোজন (ibid)। তবে আমাদের মতে এই দুটি বই পূর্বোক্ত চারটি বইয়ের তুলনায় সামান্য হলেও প্রাচীনতর কেননা দীঘভাণকরা ওই চারটি বইকে খুদ্দক নিকায়ের তালিকায় স্থান না দিলেও বিমানবত্থু ও পেতবত্থুকে স্থান দিয়েছেন। কাজেই এই দুটি বই অভিধম্ম পিটকের পূর্ববর্তী। তবে তারা খুব বেশি পূর্ববর্তী নয়। সম্ভবত এগুলি অভিধম্ম পিটকের সংকলন শুরু হওয়ার ঠিক পূর্বে সংকলিত হয়েছিল। ছন্দ বিশ্লেষণ ছাড়া এই দুটি বইয়ের তুলনামূলক নবীনত্বের সপক্ষে আরও যুক্তি আছে (Law, pp. 60-61)। বিমানবত্থুর মধ্যে সেরীসক বিমানের একটি গল্প আছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই ঘটনাটি রাজন্য পায়াসির মৃত্যুর একশো বছর পরে ঘটেছিল। এখন দীঘ নিকায়ের পায়াসি সুত্ত (২৩) থেকে মনে হয়, রাজন্য পায়াসি বুদ্ধের মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর পরে মারা গিয়েছিলেন। সুতরাং সেরীসক বিমানের ঘটনাটি বুদ্ধের মৃত্যুর আনুমানিক দেড়শ বছর পরে ঘটেছিল। আবার বিমানবত্থুর সংকলন নিশ্চয় এই ঘটনারও বেশ কয়েক বছর পরে হয়েছিল। সুতরাং বিমানবত্থু অন্ততপক্ষে বুদ্ধের মৃত্যুর দুশো বছর পরে, অর্থাৎ সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে সংকলিত হয়ে থাকবে। একইভাবে পেতবত্থুর মধ্যে আমরা একজন “মোরিয়” রাজার উল্লেখ পাই। ভাষ্যকারদের মতে এই রাজা হলেন মৌর্য সম্রাট অশোক। সুতরাং পেতবত্থুও অশোকের রাজত্বকালেই সংকলিত হয়েছিল।

নিদ্দেস ও পটিসম্বিধামাগ্গ গ্রন্থদুটি গদ্যে রচিত হওয়ায় এদের ক্ষেত্রে ছন্দ বিশ্লেষণ খাটে না (খুদ্দক নিকায়ের মধ্যে একমাত্র এই দুটি গ্রন্থই গদ্যে রচিত)। কিন্তু এই দুটি বইয়ের বিষয়বস্তু ও রচনারীতি লক্ষ্য করলে এদের অভিধম্ম পিটকের পূর্বসূরি মনে হয় (Hirakawa, pp. 128-129)। অভিধম্মে যেমন সুত্ত পিটকের বিভিন্ন অংশের বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে, ঠিক সেভাবেই নিদ্দেস গ্রন্থে সুত্ত নিপাতের দুটি অধ্যায়ের ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আবার পটিসম্বিধামাগ্গ গ্রন্থের শুরুতে অভিধম্মের রীতিতে কতকগুলি বিষয়ের একটি তালিকা তৈরি করে তারপর সেই বিষয়গুলির উপর বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সুতরাং এই দুটি গ্রন্থ খুদ্দক নিকায় ও অভিধম্ম পিটকের অন্তর্বর্তী পর্যায়কে চিহ্নিত করে। সেই হিসেবে বিমানবত্থু ও পেতবত্থুর মতো এগুলিও অভিধম্ম পিটকের সংকলন শুরু হওয়ার ঠিক আগের রচনা।

উপরের আলোচনার সারাংশ হিসেবে আমরা খুদ্দক নিকায়ের অন্তর্গত বইগুলিকে নীচের তিনটি স্তরে ভাগ করতে পারিঃ

(১) অভিধম্ম পিটকের অনেক পূর্ববর্তীঃ ধম্মপদ, উদান, ইতিবুত্তক, সুত্তনিপাত, থেরগাথা, থেরীগাথা ও জাতক।

(২) অভিধম্ম পিটকের অব্যবহিত পূর্ববর্তীঃ নিদ্দেস, পটিসম্বিধামাগগ, বিমানবত্থু ও পেতবত্থু।

(৩) অভিধম্ম পিটকের সমসাময়িকঃ অপদান, বুদ্ধবংশ, চরিয়াপিটক ও খুদ্দকপাঠ।

অভিধম্ম সংকলিত হওয়ার আগে বুদ্ধের ধর্ম বলতে বোঝাত সুত্ত পিটককে। সুত্ত পিটককে বর্তমানে পাঁচটি নিকায় বা আগমে ভাগ করা হয়। কিন্তু এই নিকায়ভিত্তিক শ্রেণীবিভাগ খুব বেশি প্রাচীন নয়। ত্রিপিটকের সুত্তগুলির ভেতরে কোথাও পাঁচটি নিকায়ের কোনও উল্লেখ পাওয়া যায় না। বরং ত্রিপিটকের মধ্যে বুদ্ধের ধর্মের অন্য একটি শ্রেণীবিভাগের উল্লেখ অনেকবার পাওয়া যায়। সেটি হল নবাঙ্গ শ্রেণীবিভাগ। এই শ্রেণীবিভাগ অনুযায়ী বুদ্ধের ধর্মের নয়টি অঙ্গ বা অংশঃ সুত্ত, গেয়, ব্যাকরণ, গাথা, উদান, ইতিবুত্তক, জাতক, অদ্ভূতধম্ম ও বেদল্ল। পণ্ডিতেরা মনে করেন, সুত্ত পিটকের সুত্তগুলিকে প্রথমে এই নয়টি অঙ্গে বিভক্ত করা হয়েছিল। পরে কোনও কারণে ভিক্ষুরা নবাঙ্গ শ্রেণীবিভাগ ত্যাগ করে নিকায়ভিত্তিক শ্রেণীবিভাগের প্রচলন করেন। নবাঙ্গ শ্রেণীবিভাগ সম্পর্কে সমস্যা হল, ত্রিপিটকে কেবল নয়টি অঙ্গের নামগুলিই পাওয়া যায়। তাদের বিষয়বস্তু অর্থাৎ কোন অঙ্গে কি কি সুত্ত ছিল, সেই বিষয়ে ত্রিপিটক সম্পূর্ণ নীরব। পরবর্তীকালে ত্রিপিটকের ব্যাখ্যাকাররা এই ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করতে চেয়েছেন বটে, কিন্তু তাঁদের বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রে যুক্তিহীন ও পরস্পরবিরোধী হওয়ায় আধুনিক পণ্ডিতেরা তা পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেন নি। আবার তাঁরা নিজেরাও অঙ্গগুলির বিষয়বস্তু সম্পর্কে কোনও সর্বজনগ্রাহ্য, বিকল্প মত দিতে পারেন নি। ল্যামোতের মতো পণ্ডিত এমন কথাও বলেছেন যে, নবাঙ্গ প্রকৃতপক্ষে ত্রিপিটককে নয়টি পৃথক ও সুস্পষ্ট অংশে বিভক্ত করে না, বরং এটি ত্রিপিটকের মধ্যে নয় প্রকার সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন রচনার ইঙ্গিত দেয়। একই বইয়ের মধ্যে যেমন অনেকগুলি অঙ্গ মিলেমিশে থাকতে পারে, তেমনি কোনও একটি সুত্ত বা গাথা একইসঙ্গে একাধিক অঙ্গের অন্তর্গত হতে পারে (Lamotte, pp. 143-144)। সব মিলিয়ে নবাঙ্গ শ্রেণীবিভাগ কিছুটা ধোঁয়াশায় ঘেরা অবস্থায় রয়ে গেছে। অথচ এটি যেহেতু সুত্ত পিটকের প্রাচীনতম শ্রেণীবিভাগ, তাই এর সম্পর্কে বিশদে জানতে পারলে হয়তো আমরা বুদ্ধের ধর্ম সম্পর্কে আরও পরিস্কার ধারণা লাভ করতে পারব।

সংস্কৃত ত্রিপিটকগুলিতে আবার নবাঙ্গের পরিবর্তে দ্বাদশাঙ্গ শ্রেণীবিভাগ পাওয়া যায়। এই শ্রেণীবিভাগে নবাঙ্গের নয়টি অঙ্গের সঙ্গে আরও তিনটি অতিরিক্ত অঙ্গ রয়েছে। সেগুলি হল নিদান, অবদান ও উপদেশ। আধুনিক পণ্ডিতদের মতে দ্বাদশাঙ্গ শ্রেণীবিভাগ নবাঙ্গ শ্রেণীবিভাগের পরবর্তী। পরবর্তীকালে সুত্ত পিটকে ওই তিনটি অংশ যুক্ত হওয়ায় শ্রেণীবিভাগেও তিনটি অঙ্গ যোগ করার প্রয়োজন হয়। দ্বাদশাঙ্গ শ্রেণীবিভাগের অতিরিক্ত তিনটি অঙ্গের মধ্যে একটি হল অবদান। পালি অপদান গ্রন্থই সংস্কৃতে অবদান নামে পরিচিত। আর আমরা একটু আগেই দেখেছি, অপদান খুদ্দক নিকায়ের মধ্যে পরবর্তী সংযোজন।

সুত্ত পিটকে তিনটি নতুন অংশ যুক্ত হওয়ার ফলে যদি নবাঙ্গ শ্রেণীবিভাগকে বাড়িয়ে দ্বাদশাঙ্গে পরিণত করা হয়ে থাকে, তাহলে এরকম হওয়াও অসম্ভব নয় যে, নবাঙ্গেরও পূর্বে হয়তো আরও কম অঙ্গবিশিষ্ট অন্য কোনও শ্রেণীবিভাগ প্রচলিত ছিল। পরে সুত্ত পিটকে নতুন কিছু গ্রন্থ যুক্ত হওয়ার ফলে সেটিকে বাড়িয়ে নবাঙ্গে পরিণত করা হয়। বস্তুত কয়েকটি প্রাচীন গ্রন্থে আমরা এমন কিছু সংকেত পাই যার দ্বারা মনে হয়, নবাঙ্গের পূর্বে সত্যিই অন্য একটি হ্রস্বতর শ্রেণীবিভাগ প্রচলিত ছিল (Sujato, pp. 72-73):

(১) মজ্ঝিম নিকায়ের মহা শূঞতা সুত্তে (১২২) বুদ্ধের মুখে তাঁর ধর্ম হিসেবে কেবল নবাঙ্গের প্রথম তিনটি অঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়ঃ সুত্ত, গেয় ও ব্যাকরণ। বাকি ছয়টি অঙ্গ সেখানে একেবারে অনুপস্থিত।

(২) সংস্কৃত দীর্ঘ আগমের মহা পরিনির্বাণ সূত্রে দ্বাদশাঙ্গের তালিকায় প্রথম তিনটি অঙ্গের নাম আলাদা আলাদা করে দেওয়া হলেও পরের নয়টি অঙ্গের নামগুলিকে একসঙ্গে একটি দীর্ঘ সমাসবদ্ধ পদ হিসেবে দেওয়া হয়েছেঃ সূত্রং গেয়ং ব্যাকরণং গাথোদাননিদানবদানেতিবৃত্তকজাতকবৈপুল্যাদ্ভূতধর্মোপদেশাঃ। দেখে মনে হয়, প্রথম তিনটি অঙ্গই মূল এবং বাকিগুলি তাদের পরিশিষ্ট হিসেবে পরে সংযোজিত হয়েছে।

(৩) মহাপণ্ডিত অসঙ্গের লেখা মহাযান বৌদ্ধধর্মের বিখ্যাত গ্রন্থ যোগাচারভূমিশাস্ত্রতেও দ্বাদশাঙ্গের তালিকাটি প্রথমে এইভাবেই দেওয়া হয়েছে। এবং তারপর যখনই তালিকাটি দেওয়ার প্রয়োজন হয়েছে, তখন লেখক শুধু প্রথম তিনটি অঙ্গের নাম উল্লেখ করে বলেছেন, তালিকাটি পূর্বের মতো বাড়িয়ে নিতে হবে।

উপরোক্ত তিনটি উল্লেখ থেকে প্রমাণ হয় (ভিক্ষু সুজাতো এরপর আরও কিছু প্রমাণ দিয়েছেন, যেগুলি আমরা বাহুল্য বোধে উল্লেখ করলাম না।), নবাঙ্গ শ্রেণীবিভাগের আগে কেবল সুত্ত, গেয় ও ব্যাকরণ নিয়ে একটি ত্রি-অঙ্গ শ্রেণীবিভাগ প্রচলিত ছিল। স্বাভাবিকভাবে এটাও বোঝা যায় যে, তখন সুত্ত পিটকে কেবল ওই তিনটি অংশই ছিল। পরে বাকি ছয়টি অংশ যুক্ত হওয়ার ফলে ত্রি-অঙ্গ শ্রেণীবিভাগকে টেনে বাড়িয়ে নবাঙ্গে পরিণত করা হয়, ঠিক যেমন আরও পরে নবাঙ্গকে বাড়িয়ে দ্বাদশাঙ্গ করা হবে।

যেভাবে সুত্ত পিটকে নতুন নতুন অংশ যুক্ত হলে সেগুলির জন্য সমসাময়িক অঙ্গ শ্রেণীবিভাগের শেষে নতুন অঙ্গ যোগ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেল, তার থেকে অঙ্গ শ্রেণীবিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য অনুমান করা যায়। তা হল এর কালানুক্রমিকতা। এই বৈশিষ্ট্যটি কিন্তু নিকায় শ্রেণীবিভাগের ক্ষেত্রে নেই। সুত্ত পিটকে প্রথমে দীঘ নিকায় এবং তারপর যথাক্রমে মজ্ঝিম, সংযুত্ত, অঙ্গুত্তর ও খুদ্দক নিকায় আছে বলেই আমরা বলতে পারি না যে, দীঘ নিকায় সর্বপ্রথমে সংকলিত হয়েছিল এবং তারপর যথাক্রমে বাকিগুলি। কিন্তু নবাঙ্গের ক্ষেত্রে সম্ভবত আমরা বলতে পারি, সুত্ত অঙ্গ প্রাচীনতম, তারপর গেয়, তারপর ব্যাকরণ, ইত্যাদি। নবাঙ্গের তালিকায় কোনও একটি অঙ্গ বড়জোর তার পূর্ববর্তী অঙ্গের সমসাময়িক হতে পারে, কিন্তু কখনোই প্রাচীনতর হতে পারে না।

নবাঙ্গের তালিকাটি যদি সম্পূর্ণরূপে কালানুক্রমিক নাও হয়, অন্তত নীচের দুটি অংশ যে কালানুক্রমিক, তা আশা করি আমরা প্রমাণ করতে পেরেছিঃ

(ক) সুত্ত, গেয় ও ব্যাকরণ।

(খ) গাথা, উদান, ইতিবুত্তক, জাতক, অদ্ভূতধম্ম ও বেদল্ল।

এখন আমরা যদি শেষের ছয়টি অংশের দিকে দেখি, তাহলে লক্ষ্য করব, এদের মধ্যে প্রথম চারটির নামে খুদ্দক নিকায়ে পাঁচটি গ্রন্থ আছেঃ থের- ও থেরীগাথা, উদান, ইতিবুত্তক ও জাতক। ত্রিপিটকের প্রাচীন ব্যাখ্যাকারদের অনুসরণ করে আমরা এই অঙ্গগুলির সঙ্গে এই গ্রন্থগুলিকে যুক্ত করতে পারি। এই যোগাযোগ থেকে অনুমান করা যায়, নবাঙ্গের শেষ ছয়টি অঙ্গ খুদ্দক নিকায়ের (কিংবা আরও সঠিকভাবে বললে, খুদ্দক নিকায়ের যে অংশ অভিধম্মের চেয়ে প্রাচীন, সেই অংশের) প্রতিনিধিত্ব করে। যদি তাই হয়, তাহলে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, প্রথম তিনটি অঙ্গ, অর্থাৎ সুত্ত, গেয় ও ব্যাকরণ প্রথম চার নিকায়ের প্রতিনিধি। এই তিনটি অঙ্গ সম্পর্কে আমরা পরে বিস্তারিত আলোচনা করব। এই পরিচ্ছেদে যেহেতু আমাদের আলোচ্য বিষয় ছিল খুদ্দক নিকায়, তাই শেষ ছয়টি অঙ্গের আলোচনাটা সেরে নেওয়া যাক।

গাথাঃ আগেই বলা হয়েছে, গাথা অঙ্গের মধ্যে পড়ে থেরগাথা ও থেরীগাথা। এছাড়া ত্রিপিটকের ব্যাখ্যাকাররা সুত্তনিপাত ও ধম্মপদকেও গাথার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেন (Lamotte, p. 144)।

উদানঃ এই অঙ্গের মধ্যে পড়ে উদান গ্রন্থ।

ইতিবুত্তকঃ এই অঙ্গের মধ্যে পড়ে ইতিবুত্তক গ্রন্থ।

জাতকঃ এই অঙ্গের মধ্যে পড়ে জাতক গ্রন্থ।

এই পরিচ্ছেদের প্রথমের দিকে আমরা খুদ্দক নিকায়ের গ্রন্থগুলিকে কালের বিচারে নীচের তিনটি স্তরে বিভক্ত করেছিলামঃ

(১) ধম্মপদ, উদান, ইতিবুত্তক, সুত্তনিপাত, থেরগাথা, থেরীগাথা ও জাতক।

(২) নিদ্দেস, পটিসম্বিধামাগগ, বিমানবত্থু ও পেতবত্থু।

(৩) অপদান, বুদ্ধবংশ, চরিয়াপিটক ও খুদ্দকপাঠ।

এটা অত্যন্ত সন্তোষজনক যে, এদের মধ্যে প্রথম স্তরের সবকটি গ্রন্থকে আমরা খুদ্দক নিকায়ের প্রতিনিধিত্বকারী ছয়টি অঙ্গের মধ্যে প্রথম চারটির সঙ্গে সংযুক্ত করতে পেরেছি। অর্থাৎ অঙ্গ শ্রেণীবিভাগের কালানুক্রমিকতা এখানেও রক্ষিত হয়েছে। বাকি রয়েছে শেষ দুটি অঙ্গঃ অদ্ভূতধম্ম ও বেদল্ল। আমরা যদি এই দুটি অঙ্গের সঙ্গে দ্বিতীয় স্তরের চারটি গ্রন্থকে (নিদ্দেস, পটিসম্বিধামাগগ, বিমানবত্থু ও পেতবত্থুকে) যুক্ত করতে পারি, তাহলেই সম্পূর্ণ ব্যাপারটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

বেদল্লঃ বেদল্ল শব্দটির অর্থ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। ভিক্ষু সুজাতো অনুমান করেছেন, বেদল্ল শব্দটি এসেছে দল ধাতু থেকে। দল ধাতুর অর্থ হল ভাঙা বা আলাদা করা। ফুলের কুঁড়ি থেকে পাপড়িগুলি আলাদা হয়ে যায় বলে যেমন এদের দলমণ্ডল বলা হয়। সেক্ষেত্রে বিদল শব্দের অর্থ হবে বিশেষ রূপে ভাঙা বা আলাদা করা। বেদল্ল এরই বিশেষ্য রূপ। সেদিক থেকে বেদল্ল শব্দের অর্থ দাঁড়ায় বিশ্লেষণ (Sujato, p. 67)। বিভঙ্গ শব্দটিরও ব্যুৎপত্তি একই রকম। এবং ত্রিপিটকে বিভঙ্গ শব্দটি বিশ্লেষণ অর্থেই ব্যবহৃত হয়। বিনয় পিটকের মধ্যে দুটি বই আছেঃ ভিক্ষু বিভঙ্গ ও ভিক্ষুণী বিভঙ্গ। এই বইগুলিতে যথাক্রমে ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের পালনীয় বিধিগুলির বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়া অভিধম্ম পিটকের মধ্যে একটি বইয়ের নাম হল বিভঙ্গ। নামটি উপযুক্ত কেননা অভিধম্ম পিটকে ধর্মের বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বেদল্ল বলতে যদি অভিধম্মের অর্থে বিশ্লেষণ বোঝায়, তাহলে আমাদের খুদ্দক নিকায়ের দ্বিতীয় স্তরে কিন্তু এইরকম দুটি বই আছে, যেগুলি চরিত্রের দিক থেকে অভিধম্মের সমতুল্য। আমরা একটু আগেই দেখেছি, নিদ্দেস ও পটিসম্বিধামাগগ হল সেই দুটি বই। আশা করি, আমরা এই দুটি বইকে বেদল্ল অঙ্গের মধ্যে ফেলতে পারি।

অদ্ভূতধম্মঃ ব্যাখ্যাকারদের মতে অদ্ভূতধম্ম বলতে বোঝায় অসাধারণ বা বিস্ময়কর কোনও ব্যাপার (Lamotte, p. 144)। এখন খুদ্দক নিকায়ের অন্তর্গত বিমানবত্থু ও পেতবত্থু নামক বইদুটির বিষয়বস্তু সত্যিই অসাধারণ বা বিস্ময়কর – এককথায় “অদ্ভূত”। বিমানবত্থুতে দেখানো হয়েছে, যেসব ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় কোনও পুণ্যকর্ম করেছিলেন, তাঁরা মৃত্যুর পরে পুরস্কারস্বরূপ আকাশে ভাসমান আশ্চর্যজনক প্রাসাদ বা বিমানে জন্মগ্রহণ করে সুখভোগ করছেন। সেইসব বিমানে কী নেই? মনোরম উদ্যান থেকে শুরু করে স্নিগ্ধ নদী, সবই আছে সেখানে। পেতবত্থুতে দেখানো হয়েছে এর বিপরীত অবস্থা। যারা জীবিত অবস্থায় পাপকর্ম করেছিল, তারা মৃত্যুর পরে প্রেতলোকে জন্মে বিচিত্র সব যন্ত্রণা ভোগ করছে। বিমানবত্থু ও পেতবত্থুকে আমরা যদি অদ্ভূতধম্ম অঙ্গের শ্রেণীভুক্ত করি, তাহলে খুদ্দক নিকায়ের যে এগারোটি বই অভিধম্মের পূর্বে সংকলিত, সেগুলি খুব সুন্দরভাবে নবাঙ্গের শেষ ছয়টি অঙ্গের সঙ্গে মিলে যায়।

এই পরিচ্ছেদের শুরুতে আমরা বলেছিলাম, খুদ্দক নিকায়ের মধ্যে কিছু প্রাচীন অংশ আছে, যেগুলি প্রথম চার নিকায়ের সমসাময়িক। আবার কিছু নবীন অংশ আছে, যেগুলি অভিধম্ম পিটকের সমসাময়িক। কিন্তু এতক্ষণের আলোচনা থেকে আমরা খুদ্দক নিকায়কে দুটি অংশে ভাগ করতে পারিঃ

(১) অপদান, বুদ্ধবংশ, চরিয়াপিটক ও খুদ্দকপাঠ – এই চারটি বই নবাঙ্গের বাইরের এবং এগুলি অভিধম্ম পিটকের সমসাময়িক।

(২) ধম্মপদ, সুত্তনিপাত, থেরগাথা, থেরীগাথা, উদান, ইতিবুত্তক, জাতক, নিদ্দেস, পটিসম্বিধামাগগ, বিমানবত্থু ও পেতবত্থু – এই এগারোটি বই নবাঙ্গের শেষ ছয়টি অঙ্গের মধ্যে পড়ে, এবং এগুলি অভিধম্ম পিটকের পূর্ববর্তী ও প্রথম চার নিকায়ের পরবর্তী।

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে, তাহলে আমাদের প্রস্তাবিত খুদ্দক নিকায়ের সেই অংশটি কোথায় গেল, যা কিনা প্রথম চার নিকায়ের সমসাময়িক? ঘটনা হল, খুদ্দক নিকায়ের কোনও সম্পূর্ণ গ্রন্থ প্রথম চার নিকায়ের সমসাময়িক নয়। বরং উপরের দ্বিতীয় শ্রেণীর এগারোটি গ্রন্থের (বা আরও নিখুঁত করে বললে, এদের মধ্যে প্রথম দিককার গ্রন্থগুলির) কিছু কিছু অংশ মাত্র প্রথম চার নিকায়ের সমসাময়িক। প্রশ্ন উঠবে, কোন কোন অংশ?

দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের পুরোপুরি জানা নেই। কেবলমাত্র একটি বইয়ের ক্ষেত্রে আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে, সেই বইটির কিছু নির্দিষ্ট অংশ প্রথম চার নিকায়ের সমসাময়িক। সেই বইটি হল সুত্তনিপাত। সুত্তনিপাত বইটি পাঁচটি অংশে বিভক্ত। এই অংশগুলিকে বগ্গ (বর্গ) বলা হয়। পাঁচটি বগ্গের মধ্যে চতুর্থ ও পঞ্চমটি হল যথাক্রমে অট্ঠক বগ্গ ও পারায়ণ বগ্গ। আমরা জানি, সুত্তনিপাতের এই দুটি বগ্গ প্রথম চার নিকায়ের সমসাময়িক। এরকম সিদ্ধান্তের পেছনে দুটি যুক্তি আছেঃ

(১) প্রথম চার নিকায়ে এই দুটি বগ্গের উল্লেখ আছে। অট্ঠক বগ্গের উল্লেখ আছে সংযুত্ত নিকায়ের ২২:৩ সুত্তে। আর পারায়ণ বগ্গের উল্লেখ আমরা পাই সংযুত্ত নিকায়ের ১২:৩১ সুত্তে এবং অঙ্গুত্তর নিকায়ের ৩:৩২, ৩:৩৩, ৪:৪১, ৬:৬১ ও ৭:৫৩ সুত্তে। স্পষ্টতই, এই দুটি বগ্গ প্রথম চার নিকায়ের পরবর্তী হলে চার নিকায়ের মধ্যে এদের উল্লেখ থাকত না।

(২) অট্ঠক বগ্গ ও পারায়ণ বগ্গের প্রাচীনত্বের আরেকটি প্রমাণ হল খুদ্দক নিকায়ের নিদ্দেস গ্রন্থে এই দুটি বগ্গের বিস্তারিত টীকা রচনা করা হয়েছে। বস্তুত সুত্ত পিটকের মধ্যে এই দুটি বগ্গই একমাত্র অংশ যাদের টীকা আমরা সুত্ত পিটকের মধ্যেই পাই।

এই প্রসঙ্গে দুটো কথা বলা দরকার। প্রথমত, অট্ঠক বগ্গ ও পারায়ণ বগ্গের প্রাচীনতার জন্য সমগ্র সুত্তনিপাত গ্রন্থটিকেই এদের মতো প্রাচীন মনে করবার কোনও কারণ নেই। কারণ প্রথম চার নিকায়ে কোথাও সুত্তনিপাতের কোনও নামোল্লেখ নেই এবং সমগ্র সুত্তনিপাতের কোনও টীকাও ত্রিপিটকের মধ্যে নেই। প্রাচীন অট্ঠক বগ্গ ও পারায়ণ বগ্গের সঙ্গে আরও কিছু সুত্ত যোগ করে পরবর্তীকালে সুত্তনিপাত গ্রন্থটি সংকলন করা হয়। অনেকে অট্ঠক বগ্গ ও পারায়ণ বগ্গের প্রতিফলিত গৌরবে সমগ্র সুত্তনিপাতকেই প্রাচীন মনে করেন। সেই ধারণাটি ঠিক নয়।

দ্বিতীয়ত, পারায়ণ বগ্গে ষোলটি সুত্ত আছে। প্রতিটি সুত্তে একজন করে ব্রাহ্মণ বুদ্ধকে একটি করে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেন এবং বুদ্ধ প্রত্যেকের প্রশ্নের উত্তর দেন। এই ষোলটি সুত্তকে একসঙ্গে গাঁথার জন্য বগ্গের শুরুতে একটি কাহিনীর অবতারণা করা হয়েছে। এই কাহিনীটির নাম বত্থু গাথা। কিন্তু এই বত্থু গাথার কোনও টীকা নিদ্দেস গ্রন্থে নেই। সেখানে কেবল ষোলটি সুত্তের টীকা রয়েছে। সুতরাং বোঝা যায়, মূল পারায়ণ বগ্গে বত্থু গাথাটি ছিল না। পরে সুত্তনিপাত সংকলন করার সময় এটি যোগ করা হয়েছে।

সুত্তনিপাতের ক্ষেত্রে যেমন কিছু প্রাচীন অংশের সঙ্গে আরও কিছু নতুন অংশ যোগ করে গ্রন্থটি সংকলন করা হয়েছে, ঠিক অনুরূপ ঘটনা হয়তো ধম্মপদ, উদান ও ইতিবুত্তকের ক্ষেত্রেও হয়ে থাকবে। তাই এই গ্রন্থগুলির মধ্যেও হয়তো এমন কিছু কবিতা আছে, যেগুলি প্রথম চার নিকায়ের সমসাময়িক। বস্তুত, প্রথম চার নিকায়ের সমকালে হয়তো বৌদ্ধ সমাজের মধ্যে এরকম কিছু কিছু কবিতা “ভাসমান” অবস্থায় ছিল। পরে গ্রন্থাকারে বাঁধার প্রয়োজনে সেগুলির সঙ্গে আরও কিছু কবিতা যোগ করে একেকটি সংকলন প্রস্তুত করা হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, সুত্তনিপাত ছাড়া আর কোনও বইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের হাতে এমন কোনও সংকেত নেই যার সাহায্যে আমরা সেই প্রাচীন কবিতাগুলিকে শনাক্ত করতে পারি। যতদিন না সেরকম কোনও প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, ততদিন আমরা সুত্তনিপাত ছাড়া খুদ্দক নিকায়ের অন্য বইগুলির সম্পূর্ণ অংশকেই প্রথম চার নিকায়ের পরবর্তী হিসেবেই ভাবব।

৭) চার নিকায়ের মধ্যে কালানুক্রমিক স্তরবিন্যাসঃ প্রাথমিক পর্যালোচনা

এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা বুদ্ধের ধর্মের প্রাচীনতম অংশ বলতে প্রথম চার নিকায়ের কথাই বলেছি। কিন্তু প্রথম চার নিকায়ের সবটাই কি সমান প্রাচীন? ৫ম পরিচ্ছেদে আমরা দেখেছি, হীনযান বৌদ্ধধর্মের যে ছয়টি শাখার বিনয় পিটক আমাদের হাতে এসেছে, তাদের প্রত্যেকেই দাবি করেছে, প্রথম চার নিকায়ের সবটাই নাকি বুদ্ধের মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে প্রথম সঙ্গীতিতে সংকলিত হয়েছিল। প্রথম চার নিকায়ের মোট আয়তন বিচার করলে সাধারণ বুদ্ধি বলবে, এত বৃহৎ একটা গ্রন্থ একটিমাত্র সভায় পুরোটা সংকলিত হওয়া অসম্ভব। কিন্তু এ ব্যাপারে সাধারণ বুদ্ধির চেয়েও অকাট্য প্রমাণ আমরা দাখিল করতে পারি। আর সেই প্রমাণ আছে প্রথম চার নিকায়ের ভেতরেই। প্রথম চার নিকায়ে এমন কিছু সুত্ত আছে, যেগুলির অভ্যন্তরীণ ভাষ্যই প্রমাণ করে যে, সেগুলি বুদ্ধের মৃত্যুর পরে সংকলিত হয়েছিল।

(১) দীঘ নিকায়ের শুভ সুত্ত (১০) এবং মজ্ঝিম নিকায়ের গোপক মৌদগল্যায়ন সুত্ত (১০৮), মথুরা সুত্ত (৮৪) ও ঘোটমুখ সুত্তে (৯৪) স্পষ্ট ভাষায় বলা আছে যে, সুত্তগুলির কথোপকথন বুদ্ধের মৃত্যুর পরবর্তীকালীন ঘটনা। শুভ সুত্ত ও গোপক মৌদগল্যায়ন সুত্তের শুরুতেই বলে দেওয়া হয়েছে, সুত্তের ঘটনাটি ঘটছে বুদ্ধের মৃত্যুর “অল্প কিছুদিন পরে”। মথুরা সুত্তে ভিক্ষু মহাকাত্যায়নের ধর্মোপদেশ শুনে মুগ্ধ হয়ে মথুরার রাজা অবন্তিপুত্র তাঁর কাছে জানতে চান, “প্রভু বুদ্ধ বর্তমানে কোথায় আছেন?” এর উত্তরে মহাকাত্যায়ন জানান যে, বুদ্ধ পরিনির্বাণ লাভ করেছেন। একই রকম ব্যাপার লক্ষ্য করা যায় ঘোটমুখ সুত্তেও। এখানে ভিক্ষু উদয়নের ভাষণ শুনে মুগ্ধ হয়ে একজন ব্রাহ্মণ জানতে চান, বুদ্ধ কোথায় আছেন। উত্তরে উদয়ন জানান, তিনি পরিনির্বাণ লাভ করেছেন।

(২) উপরের সুত্তগুলির ক্ষেত্রে কেউ বলতে পারেন যে, বুদ্ধের মৃত্যু এবং প্রথম সঙ্গীতির মাঝে যে কয়েক মাসের ব্যবধান ছিল, সুত্তগুলি সেই সময়ে ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে সুত্তগুলি প্রথম সঙ্গীতিতেই সংকলিত হয়েছিল। কিন্তু মজ্ঝিম নিকায়ের বাকুল সুত্তের (১২৪) ক্ষেত্রে এরকম দাবি করা যাবে না। এই সুত্তে ভিক্ষু বাকুল পরিস্কার জানাচ্ছেন যে, তিনি ৮০ বছর আগে বুদ্ধের ভিক্ষুসঙ্ঘে প্রবেশ করেন। আমরা জানি, বুদ্ধ ভিক্ষুসঙ্ঘ স্থাপনের ৪৫ বছর পরে মারা যান। তাই আমরা যদি ধরেও নিই যে, বুদ্ধের ভিক্ষুসঙ্ঘ স্থাপনের ঠিক পরেই বাকুল নামে ওই ভিক্ষু সঙ্ঘে প্রবেশ করেন, তাহলেও বাকুল সুত্তের ঘটনাটি বুদ্ধের মৃত্যুর অন্তত ৩৫ বছর পরের ঘটনা। সুতরাং এই সুত্তটি কিছুতেই প্রথম সঙ্গীতিতে সংকলিত হতে পারে না।

(৩) আমরা জানি, বুদ্ধের জীবদ্দশায় ভিক্ষু আনন্দ তাঁর সহচর ছিলেন। তখন তাঁর বয়সও কম ছিল এবং সঙ্ঘে তাঁর কোনও স্বাতন্ত্র্যও ছিল না। তিনি বুদ্ধের ছায়ামাত্র ছিলেন। অথচ সংযুত্ত নিকায়ের একটি সুত্তে (১৬:১১) আমরা দেখি, আনন্দ বহুসংখ্যক ভিক্ষুকে নিয়ে দক্ষিণাগিরিতে পরিভ্রমণ করছিলেন। সেখানে তাঁর অধীন কিছু তরুণ ভিক্ষু অসংযমী আচরণ করায় প্রবীণ ভিক্ষু মহাকাশ্যপ তাঁকে “কুমার” বলে সম্বোধন করে কিঞ্চিৎ ভর্ৎসনা করেন। মহাকাশ্যপ অবশ্য আনন্দকে কুমার বলতেই পারেন কারণ তিনি নিজে আনন্দর চেয়ে অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু এরপর আনন্দ তাঁকে উত্তরে যা বলেন, সেটা লক্ষণীয়। তিনি বলেন, তাঁর মাথার চুল পেকে গেল, তবু মহাকাশ্যপের কাছে তিনি কুমারই রয়ে গেলেন! স্পষ্টতই, এই সুত্তটিও বুদ্ধের মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর পরের ঘটনা এবং এটিও প্রথম সঙ্গীতিতে সংকলিত হতে পারে না।

(৪) অঙ্গুত্তর নিকায়ের একটি সুত্তে (৫:৫০) দেখা যায়, ভিক্ষু নারদ পাটলিপুত্রের রাজা মুণ্ডকে তাঁর পত্নীবিয়োগ জনিত শোক থেকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। এখন এই মুণ্ড হলেন অজাতশত্রুর প্রপৌত্র এবং বুদ্ধের মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে তিনি রাজত্ব করেন। সুতরাং এই সুত্তটিও প্রথম সঙ্গীতিতে সংকলিত হয়নি।

এরকম সুত্ত অবশ্য প্রথম চার নিকায়ে খুব বেশি নেই যেগুলি দেখেই বোঝা যাবে যে, সেগুলি প্রথম সঙ্গীতির পরে সংকলিত হয়েছিল। কিন্তু চার নিকায়ে এই সুত্তগুলির উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রমাণ করে। যদি এই সুত্তগুলি প্রথম সঙ্গীতির অনেক পরে চার নিকায়ে ঢুকতে পারে, তাহলে নিশ্চয় অন্য অনেক সুত্তও প্রথম সঙ্গীতির অনেক পরে ঢুকেছে, যদিও সেই সুত্তগুলির বাইরের আবরণে তাদের নবীনত্বের কোনও চিহ্ন নেই বলে আমরা তাদের সহজে ধরতে পারছি না। অর্থাৎ বিভিন্ন বিনয় পিটকের বিবরণে প্রথম সঙ্গীতিতেই চার নিকায়ের সব সুত্ত সংকলিত হয়ে গিয়েছিল বলে যে কাহিনী প্রচার করা হয়েছে, সেটি সত্য নয়। চার নিকায়ের সংকলন প্রথম সঙ্গীতিতে শুরু হলেও তা বেশ কিছুদিন ধরে চলেছিল। তাই চার নিকায়ের মধ্যেও কালানুক্রমিক স্তর আছে। এখন আমরা সেই স্তরগুলিই খোঁজার চেষ্টা করব।

আমরা আগে দেখেছি, চার নিকায় সংকলিত হওয়ার আগে সুত্ত, গেয় ও ব্যাকরণ – এই তিনটি অঙ্গ সংকলিত হয়েছিল। পরে কোনও এক সময় অঙ্গভিত্তিক শ্রেণীবিভাগ ত্যাগ করে নিকায়ভিত্তিক শ্রেণীবিভাগের প্রচলন করা হয়। এই পরিবর্তন দুভাবে হয়ে থাকতে পারেঃ

(১) এমন হতে পারে যে, প্রাচীন তিন-অঙ্গ-সমন্বিত সুত্ত পিটককে চার ভাগে ভাগ করে চারটি নিকায় তৈরি করা হয়। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকটি নিকায়ে আরও অনেক সুত্ত সংযোজিত হয়।

(২) আবার এমনও হতে পারে যে, প্রাচীন তিন-অঙ্গ-সমন্বিত সুত্ত পিটকের তেমন কোনও পরিবর্তন না করে তাকে একটি নিকায় হিসেবে রাখা হয় এবং পরবর্তী সুত্তগুলিকে নিয়ে আরও তিনটি নতুন নিকায় তৈরি করা হয়।

যদি প্রথম ঘটনাটি ঘটে থাকে, তাহলে (ক) চারটি নিকায়ের মধ্যে সবগুলিই সমান প্রাচীন এবং (খ) চারটি নিকায়ের কোনটিতেই আমরা সুত্ত, গেয় ও ব্যাকরণ – এই তিনটি অঙ্গকে আর খুঁজে পাব না।

কিন্তু যদি দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে থাকে, সেক্ষেত্রে (ক) চারটি নিকায়ের মধ্যে একটি প্রাচীনতম এবং (খ) সেই প্রাচীনতম নিকায়টিতে আমরা সুত্ত, গেয় ও ব্যাকরণ – এই তিনটি অঙ্গকে খুঁজে পেতে পারি।

সুতরাং উপরোক্ত দুটি ঘটনার মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোনটি ঘটেছিল, তা জানতে হলে আমাদের দুটি বিষয় জানা প্রয়োজনঃ

(ক) চার নিকায়ের মধ্যে কোনও একটি প্রাচীনতম কিনা,

(খ) চার নিকায়ের মধ্যে কোনোটিতে প্রথম তিন অঙ্গের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় কিনা।

পরবর্তী দুটি পরিচ্ছেদে আমরা এই দুটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব।

৮) চার নিকায়ের প্রাচীনতার তুলনা

আগেই বলা হয়েছে, হীনযান বৌদ্ধধর্মের শাখাগুলির মধ্যে একমাত্র থেরবাদেরই সম্পূর্ণ চারটি নিকায় আমাদের কাছে পৌঁছেছে। তবে হীনযান বৌদ্ধধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা সর্বাস্তিবাদের তিনটি আগমও বর্তমানে আমাদের সংগ্রহে আছে – মূল সংস্কৃত দীর্ঘ আগম এবং চীনা ভাষায় অনূদিত মধ্যম আগম ও সংযুক্ত আগম। সর্বাস্তিবাদের একোত্তর আগম আমাদের হাতে আসেনি। তবে দীর্ঘ, মধ্যম ও সংযুক্ত আগমের প্রত্যেকটির থেরবাদী ও সর্বাস্তিবাদী রূপ যে আমরা পেয়েছি, সেটাও কম কথা নয়। এই তিনজোড়া আগম/নিকায়ের তুলনামূলক আলোচনা করে আমরা অনুমান করতে পারি, এদের মধ্যে কোনটি বেশি প্রাচীন ও কোনটি কম প্রাচীন, কিংবা তিনটিই সমান প্রাচীন কিনা। ধরা যাক, কোনও একটি থেরবাদী নিকায় ও সংশ্লিষ্ট সর্বাস্তিবাদী আগমের গঠনের মধ্যে যথেষ্ট সাদৃশ্য পাওয়া গেল। সেক্ষেত্রে আমরা অনুমান করতে পারি, ওই নিকায়/আগমের সংকলনের প্রক্রিয়া থেরবাদ ও সর্বাস্তিবাদ আলাদা হওয়ার আগেই (৩য় পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য) শেষ হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে, যদি কোনও একটি নিকায়ের গঠন সংশ্লিষ্ট আগমের চেয়ে অনেকটাই আলাদা হয়, তাহলে বুঝতে হবে, ওই নিকায়/আগমের সংকলন দুই শাখার বিভাজনের পরে চূড়ান্ত হয়েছিল।

এখানে আমাদের তুলনার পদ্ধতি সম্পর্কে একটা বিষয় স্পষ্ট না করলে পাঠক হয়তো বিভ্রান্ত হতে পারেন। কোনও একটি নিকায়কে সংশ্লিষ্ট আগমের সঙ্গে তুলনা করার সময় নিছক নিকায়টির কতগুলি সুত্ত আগমের মধ্যে আছে, সেটা আমাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। আমরা বরং এদের গঠনের মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজতে চাইছি। যেকোনো গ্রন্থের মতো নিকায় ও আগমগুলিতে সুত্তগুলিকে বিভিন্ন অধ্যায়ে বা খণ্ডে রাখা হয়েছে। প্রত্যেকটি নিকায় বা আগম কতকগুলি খণ্ড বা অধ্যায়ে বিভক্ত এবং এই অধ্যায়গুলিতে অনেকগুলি করে সুত্ত আছে। কোনও একটি নিকায়কে তার সংশ্লিষ্ট আগমের সঙ্গে তুলনা করার সময় আমরা দেখতে চাই, নিকায়ের অধ্যায়গুলির সঙ্গে আগমের অধ্যায়ের কোনও মিল আছে কিনা। হয়তো কোনও নিকায় ও তার সংশ্লিষ্ট আগমের মধ্যে অনেকগুলি সুত্ত অনুরূপ হতেই পারে, কিন্তু সেই ক্ষেত্রেও নিকায়ের অধ্যায়গুলির সঙ্গে আগমের অধ্যায়গুলি নাও মিলতে পারে। অর্থাৎ নিকায়ে কোনও সুত্ত যে অধ্যায়ে আছে, আগমে সেই সুত্তটি ওই অধ্যায়ের পরিবর্তে অন্য কোনও অধ্যায়ে থাকতে পারে। অধিকাংশ সুত্তের ক্ষেত্রে এরকম হলে নিকায় ও আগমের মধ্যে অনেক সুত্ত অনুরূপ হলেও আমরা নিকায়ের কোনও অধ্যায়ের সঙ্গে আগমের কোনও অধ্যায়কে মেলাতে পারব না। সেক্ষেত্রে আমরা বলব, ওই নিকায় ও আগমের মধ্যে গঠনগত সাদৃশ্য নেই, যদিও তাদের মধ্যে অনেক সুত্ত সদৃশ।

(১) দীর্ঘ আগম ও দীঘ নিকায়ের গঠনের তুলনাঃ

আমরা জানি, পালি দীঘ নিকায় তিনটি খণ্ড বা বগ্গে বিভক্ত। প্রথম খণ্ড শীলখন্ধ বগ্গে আছে ১৩টি সুত্ত, দ্বিতীয় খণ্ড মহাবগ্গে ১০টি সুত্ত এবং তৃতীয় খণ্ড পাটিক বগ্গে আছে ১১টি সুত্ত। মোট ৩৪টি সুত্ত আছে দীঘ নিকায়ে। সর্বাস্তিবাদী দীর্ঘ আগমও তিনটি খণ্ডে বিভক্ত। এক্ষেত্রে খণ্ডগুলিকে নিপাত বলা হয়। প্রথম খণ্ড ষটসূত্রক নিপাতে নামের সঙ্গে মিল রেখে ছয়টি সূত্র আছে। দ্বিতীয় খণ্ড যুগ নিপাতে আছে ১৮টি সূত্র। তৃতীয় খণ্ড শীলস্কন্ধ নিপাতে আছে ২৩টি সূত্র। সব মিলিয়ে সূত্রের সংখ্যা এক্ষেত্রে ৪৭।

দীর্ঘ আগম

নিপাত

দীর্ঘ আগম

সূত্র

দীঘ নিকায়

সুত্ত

দীঘ নিকায়

বগ্গ

(ক) ষটসূত্রক

(১) দশোত্তর

(৩৪) দসুত্তর

(গ) পাটিক

(২) অর্থবিস্তর

 

 

(৩) সঙ্গীতি

(৩৩) সঙ্গীতি

(গ) পাটিক

(৪) চতুষ্পরিষত

 

 

(৫) মহাবদান

(১৪) মহাপদান

(খ) মহা

(৬) মহাপরিনির্বাণ

(১৬) মহাপরিনিব্বান

(খ) মহা

(খ) যুগ

(৭) অপন্নক

 

 

(৮) সর্বেক

 

 

(৯) ভার্গব

(২৪) পাটিক

(গ) পাটিক

(১০) শল্য

 

 

(১১) ভয়ভৈরব

 

 

(১২) রোমহর্ষণ

 

 

(১৩) জিনয়ভ

(১৮) জনবসভ

(খ) মহা

(১৪) গোবিন্দ

(১৯) মহাগোবিন্দ

(খ) মহা

(১৫) প্রাসাদিকঃ

(২৯) পাসাদিক

(গ) পাটিক

(১৬) প্রসাদনীয়

(২৮) সম্পসাদনীয়

(গ) পাটিক

(১৭) পঞ্চত্রয়

 

 

(১৮) মায়াজাল

 

 

(১৯) কামঠিক

 

 

(২০) কায়াভাবনা

 

 

(২১) বোধ

 

 

(২২) শঙ্কর

 

 

(২৩) আটানাট

(৩২) আটানাটিয়

(গ) পাটিক

(২৪) মহাসমাজ

(২০) মহাসময়

(খ) মহা

(গ) শীলস্কন্ধ

(২৫) ত্রিদণ্ডী

 

 

(২৬) পিঙ্গলাত্রেয়

 

 

(২৭) প্রথম লোহিত্য

(১২) লোহিচ্চ

(ক) শীলখন্ধ

(২৮) দ্বিতীয় লোহিত্য

 

 

(২৯) কৈবর্তী

(১১) কেবদ্ধ

(ক) শীলখন্ধ

(৩০) প্রথম মণ্ডীশ

(৭) জালিয়

(ক) শীলখন্ধ

(৩১) দ্বিতীয় মণ্ডীশ

 

 

(৩২) মহল্লী

(৬) মহালি

(ক) শীলখন্ধ

(৩৩) শ্রোণতাণ্ড্য

(৪) সোণদণ্ড

(ক) শীলখন্ধ

(৩৪) কূটতাণ্ড্য

(৫) কূটদন্ত

(ক) শীলখন্ধ

(৩৫) অম্বাষ্ঠ

(৩) অম্বট্ঠ

(ক) শীলখন্ধ

(৩৬) পৃষ্ঠপাল

(৯) পোট্ঠপাদ

(ক) শীলখন্ধ

(৩৭) কারণবাদী

 

 

(৩৮) পুদগল

 

 

(৩৯) শ্রুত

 

 

(৪০) মহল্ল

 

 

(৪১) অন্যতম

 

 

(৪২) শুক

(১০) সুভ

(ক) শীলখন্ধ

(৪৩) জীবক

 

 

(৪৪) রাজা

(২) সামঞ্ঞফল

(ক) শীলখন্ধ

(৪৫) বাসিষ্ঠ

(১৩) তেবিজ্জ

(ক) শীলখন্ধ

(৪৬) কাশ্যপ

(৮) কস্সপসীহনাদ

(ক) শীলখন্ধ

(৪৭) ব্রহ্মজাল

(১) ব্রহ্মজাল

(ক) শীলখন্ধ

দীঘ নিকায়ের এই সুত্তগুলি দীর্ঘ আগমে অনুপস্থিত

 

(১৫) মহানিদান

(খ) মহা

 

(১৭) মহাসুদস্সন

(খ) মহা

 

(২১) সক্কপঞ্হ

(খ) মহা

 

(২২) মহাসতিপট্ঠান

(খ) মহা

 

(২৩) পায়াসি

(খ) মহা

 

(২৫) উদুম্বরিক-সীহনাদ

(গ) পাটিক

 

(২৬) চক্কবত্তি-সীহনাদ

(গ) পাটিক

 

(২৭) অগ্গঞ্ঞ

(গ) পাটিক

 

(৩০) লক্খণ

(গ) পাটিক

 

(৩১) সিগালক

(গ) পাটিক

 

 

উপরের তালিকায় দীর্ঘ আগম ও দীঘ নিকায়ের সূত্রগুলির তুলনা করা হয়েছে (Hartmann)। দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘ আগমের শীলস্কন্ধ নিপাতের সঙ্গে দীঘ নিকায়ের শীলখন্ধ বগ্গের সবচেয়ে বেশি মিল আছে। শীলখন্ধ বগ্গের তেরোটি সুত্তের সবগুলিই শীলস্কন্ধ নিপাতে পাওয়া যায়। এছাড়া শীলস্কন্ধ নিপাতে আরও দশটি অতিরিক্ত সূত্র আছে। এই দশটি সূত্র সম্ভবত থেরবাদ ও সর্বাস্তিবাদের বিভাজনের পরে সর্বাস্তিবাদীরা যোগ করে থাকবেন।

শীলস্কন্ধ নিপাতের ক্ষেত্রে মিল পাওয়া গেলেও অন্য দুটি নিপাতের ক্ষেত্রে কিন্তু দুটি গ্রন্থের মধ্যে বিশেষ মিল পাওয়া যায় না। দীর্ঘ আগমের ষটসূত্রক নিপাতের ছয়টি সূত্রের মধ্যে চারটিকে দীঘ নিকায়ে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু তার মধ্যে দুটি আছে মহাবগ্গে ও দুটি পাটিক বগ্গে। আবার যুগ নিপাতের আঠারোটি সূত্রের মধ্যে মাত্র সাতটি সূত্র দীঘ নিকায়ে আছে। কিন্তু তার মধ্যেও আবার তিনটি মহাবগ্গে ও চারটি পাটিক বগ্গে। উল্টোদিকে মহাবগ্গ ও পাটিক বগ্গের প্রতিটিতে পাঁচটি করে সুত্ত আছে যেগুলি দীর্ঘ আগমে অনুপস্থিত। স্পষ্টতই, দীর্ঘ আগমের শীলস্কন্ধ নিপাত ছাড়া বাকি দুটি নিপাতের কোনটিকেই দীঘ নিকায়ের কোনও বগ্গের সঙ্গে মেলানো যায় না।

দীর্ঘ আগম ও দীঘ নিকায়ের তিনটি খণ্ডের মধ্যে দুটিই যেহেতু অনেকাংশে আলাদা, সুতরাং আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি, এই নিকায়/আগমের সংকলন থেরবাদ ও সর্বাস্তিবাদের বিভাজনের পরে সম্পূর্ণ হয়েছিল। কেবল শীলখন্ধ বগ্গকে এই নিকায়ের মধ্যে তুলনামূলক ভাবে প্রাচীন বলা যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিমলা চরণ ল ১৯৩৩ সালে দীর্ঘ আগমের সাহায্য ছাড়া কেবল দীঘ নিকায়ের তিন খণ্ডের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করেই এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে, এই নিকায়ের মধ্যে শীলখন্ধ বগ্গটি অন্য দুটি বগ্গের চেয়ে প্রাচীনতর (Law, Chap. 1)।

 (২) মধ্যম আগম ও মজ্ঝিম নিকায়ের গঠনের তুলনাঃ

পালি মজ্ঝিম নিকায় তিনটি খণ্ডে বিভক্ত। প্রতিটি খণ্ডে আবার পাঁচটি করে অধ্যায় বা বগ্গ আছে। প্রতিটি বগ্গ দশটি করে সুত্ত নিয়ে গঠিত। তবে তৃতীয় খণ্ডে অবস্থিত চতুর্দশ বগ্গটিতে দুটি সুত্ত বেশি আছে। ফলে মজ্ঝিম নিকায়ে পনেরোটি বগ্গে মোট সুত্তের সংখ্যা ১৫২। অন্যদিকে মধ্যম আগমও তিনটি খণ্ডে বিভক্ত। তবে এক্ষেত্রে প্রতিটি খণ্ডে ছয়টি করে অধ্যায় আছে। প্রত্যেকটি অধ্যায়ে ন্যূনতম দশটি করে সুত্ত আছে। তবে কয়েকটি অধ্যায়ে সুত্তের সংখ্যা দশটির চেয়ে অনেক বেশি। ফলে মধ্যম আগমে আঠারোটি অধ্যায়ে মোট সুত্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২২।

মধ্যম আগম অধ্যায় সংখ্যা

মজ্ঝিম নিকায়

সুত্ত সংখ্যা

১ম অধ্যায়

-

-

-

-

-

-

-

-

২৪

২য় অধ্যায়

-

-

-

৬১

-

-

-

-

১০১

-

৩য় অধ্যায়

-

-

-

-

-

৬৯

৯৭

-

২৮

১৪১

 

 

 

 

 

 

 

 

 

৪র্থ অধ্যায়

১২৩

-

১২৪

-

-

-

-

-

-

-

৫ম অধ্যায়

-

-

-

-

-

-

-

-

-

-

-

-

-

-

-

-

 

 

 

 

৬ষ্ঠ অধ্যায়

-

-

-

-

-

৮১

১৩০

-

-

৮৩

-

-

-

-

 

 

 

 

 

 

৭ম অধ্যায়

১২৮

-

-

১০৬

-

৬৮

৪৯

১২৭

-

১১৯

-

-

-

১১৩

-

 

 

 

 

 

৮ম অধ্যায়

১৫

-

-

-

-

-

৯ম অধ্যায়

-

১০

১৩

১৪

২০

১৯

১১

-

-

১০ম অধ্যায়

১৭

১৭

-

-

-

-

-

-

১৮

-

১১শ অধ্যায়

-

-

-

-

-

-

-

-

-

-

-

-

-

-

৫০

৮২

৫৬

-

-

-

-

-

-

-

-

 

 

 

 

 

১২শ অধ্যায়

-

-

১০৭

১০৮

২৭

-

-

-

৯৬

৯৩

৯৯

৭৫

-

-

-

-

-

-

-

৯১

১৩শ অধ্যায়

১৪০

১৩৭

১৩৮

১৩৩

১৩৪

১৩২

-

১৩৯

১৩৫

১৩৬

১৪শ অধ্যায়

-

১২৬

৪৫

৪৬

-

-

২৫

৭৮

১৪২

১১৫

১৫শ অধ্যায়

৩৯

৪০

৩২

৩১

৪৭

১১২

-

১১৭

১২১

১২২

১৬শ অধ্যায়

৬৬

২১

৬৫

৭০

১০৪

-

১২৫

১২৯

২২

৩৮

১৭শ অধ্যায়

-

৫৪

২৬

৬৪

১৬

৭৭

৭৯

৮০

৪৪

৪৩

১৮শ অধ্যায়

৯০

৮৯

৮৮

-

৮৭

৫২

-

-

-

৬৩

-

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

উপরের তালিকায় মধ্যম আগম ও মজ্ঝিম নিকায়ের সুত্তগুলির তুলনা করা হয়েছে (Analayo)। এই তালিকা থেকে দেখা যাচ্ছে, মধ্যম আগমের প্রথম অধ্যায়ে দশটি সূত্র আছে। তার মধ্যে প্রথম আটটির সঙ্গে মজ্ঝিম নিকায়ের কোনও সুত্তের মিল নেই। নবম ও দশম সূত্রটি হল যথাক্রমে মজ্ঝিম নিকায়ের ২৪-তম (তৃতীয় বগ্গ) ও ২য় সুত্ত (প্রথম বগ্গ)। আবার মধ্যম আগমের দ্বিতীয় অধ্যায়ের দশটি সূত্রের মধ্যেও মাত্র দুটিকে মজ্ঝিম নিকায়ে পাওয়া যায়। সেগুলি হল মজ্ঝিম নিকায়ের ৬১-তম (সপ্তম বগ্গ) ও ১০১-তম সুত্ত (একাদশ বগ্গ)। এরপর মধ্যম আগমের তৃতীয় অধ্যায়ের এগারোটি সূত্রের মধ্যে পাঁচটিকে আমরা মজ্ঝিম নিকায়ে খুঁজে পাই। সেগুলি হল মজ্ঝিম নিকায়ের ৯ম (প্রথম বগ্গ), ২৮-তম (তৃতীয় বগ্গ), ৬৯-তম (সপ্তম বগ্গ), ৯৭-তম (দশম বগ্গ) ও ১৪১-তম সুত্ত (চতুর্দশ বগ্গ)। এইভাবে উপরের তালিকাটি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, একমাত্র মধ্যম আগমের ত্রয়োদশ অধ্যায়ের সঙ্গে মজ্ঝিম নিকায়ের চতুর্দশ বগ্গের যথেষ্ট সাদৃশ্য আছে। এই দুটি অধ্যায়/ বগ্গের মধ্যে নয়টি সুত্ত সাধারণ। এছাড়া মধ্যম আগমের দ্বাদশ ও পঞ্চদশ অধ্যায়ের চারটি করে সূত্রকে যথাক্রমে মজ্ঝিম নিকায়ের দশম ও চতুর্থ বগ্গে পাওয়া যায়। এই তিনটি অধ্যায় ছাড়া মধ্যম আগমের আর কোনও অধ্যায়ের সঙ্গে মজ্ঝিম নিকায়ের কোনও বগ্গকে আমরা মেলাতে পারি না। ফলে দীর্ঘ আগম/নিকায়ের ক্ষেত্রে আমরা যে সিদ্ধান্তে এসেছিলাম, মধ্যম আগম/নিকায়ের ক্ষেত্রেও সেই একই সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য হই – এই নিকায়টির সংকলনও থেরবাদ ও সর্বাস্তিবাদের বিভাজনের পরেই সম্পূর্ণ হয়েছিল।

সর্বাস্তিবাদী দীর্ঘ আগমের ১০টি সূত্রকে আবার আমরা পালি মজ্ঝিম নিকায়ে খুঁজে পাই। অন্যদিকে পালি দীঘ নিকায়েরও ১০টি সুত্তকে খুঁজে পাওয়া যায় সর্বাস্তিবাদী মধ্যম আগমে। নীচের দুটি তালিকায় এই দুটি বিষয় দেখানো হয়েছে (Analayo)। দুটি ভিন্ন আগম/নিকায়ের মধ্যে এই সাদৃশ্য থেকেও বোঝা যায়, এগুলির সংকলন থেরবাদ ও সর্বাস্তিবাদের বিভাজনের পরে সম্পূর্ণ হয়েছিল। দুটি শাখার বিভাজনের পূর্বেও সূত্রগুলি হয়তো বিচ্ছিন্নভাবে প্রচলিত ছিল। কিন্তু তাদের কোনটিকে কোন আগম/নিকায়ে রাখা হবে, সেটা থেরবাদী ও সর্বাস্তিবাদীরা ঠিক করে তাদের বিভাজনের পরে।

দীর্ঘ আগম

মজ্ঝিম নিকায়

 

দীঘ নিকায়

মধ্যম আগম

৬০

১৫

৯৭

১০

১০৫

১৭

৬৮

১১

২১

১৩৪

১২

১২

২২

৯৮

১৭

১০২

২৩

৭১

১৯

৯৫

২৫

১০৪

২০

৩৬

২৬

৭০

২১

৮৫

২৭

১৫৪

২২

১০০

৩০

৫৯

৪৩

৫৫

৩১

১৩৫

 

 

(৩)​ সংযুক্ত আগম ও সংযুত্ত নিকায়ের গঠনের তুলনাঃ

পালি সংযুত্ত নিকায় পাঁচটি বগ্গে বিভক্ত – সগাথা বগ্গ, নিদান বগ্গ, খন্ধ বগ্গ, ষড়ায়তন বগ্গ ও মহা বগ্গ। এই পাঁচটি বগ্গে যথাক্রমে ১১টি, ১০টি, ১৩টি, ১০টি ও ১২টি সংযুত্ত আছে। অর্থাৎ মোট ৫৬টি সংযুত্ত নিয়ে গঠিত সংযুত্ত নিকায়। প্রতিটি সংযুত্ত আবার অনেকগুলি ছোট ছোট সুত্ত দ্বারা গঠিত। অন্যদিকে সর্বাস্তিবাদী সংযুক্ত আগমে সংযুক্তের সংখ্যা ৫১। আর এই ৫১টি সংযুক্ত সাতটি বর্গে বিভক্ত – পঞ্চস্কন্ধ বর্গ, ষড়ায়তন বর্গ, প্রতীত্য সমুৎপাদ বর্গ, শ্রাবকভাষিত বর্গ, মার্গ বর্গ, বুদ্ধভাষিত বর্গ ও অষ্ট পরিষদ বর্গ।

সংযুক্ত আগম

বর্গ

সংযুক্ত আগম

সংযুক্ত

সংযুত্ত নিকায়

সংযুত্ত

সংযুত্ত নিকায়

বগ্গ

(ক) পঞ্চস্কন্ধ

(1) Yin

(২২) খন্ধ

(গ) খন্ধ

(খ) ষড়ায়তন

(2) Ruchu

(৩৫) ষড়ায়তন

(ঘ) ষড়ায়তন

(গ)প্রতীত্য সমুৎপাদ

(3) Yinyuan

(১২) নিদান

(খ) নিদান

(4) Di

(৫৬) সচ্চ

(ঙ) মহা

(5) Jie

(১৪) ধাতু

(খ) নিদান

(6) Shou

(৩৬) বেদনা

(ঘ) ষড়ায়তন

(ঘ) শ্রাবকভাষিত

(7) Shelifu

(৩৮) জম্বুখাদক

(ঘ) ষড়ায়তন

(৩৯) সামণ্ডক

(ঘ) ষড়ায়তন

(২৮) সারিপুত্ত

(গ) খন্ধ

(8) Muqianlian

(৪০) মোগগল্লান

(ঘ) ষড়ায়তন

(১৯) লক্খণ

(খ) নিদান

(9) Analu

(৫২) অনুরুদ্ধ

(ঙ) মহা

(10) Dajiazhanyan

 

 

(11) Anan

 

 

(12) Zhiduoluo

(৪১) চিত্ত

(ঘ) ষড়ায়তন

(ঙ) মার্গ

(13) Nianchu

(৪৭) সতিপট্ঠান

(ঙ) মহা

(14) Zhengduan

(৪৯) সম্মপপধান

(ঙ) মহা

(15) Ruyizu

(৫১) ইদ্ধিপাদ

(ঙ) মহা

(16) Gen

(৪৮) ইন্দ্রিয়

(ঙ) মহা

(17) Li

(৫০) বল

(ঙ) মহা

(18) Juezhi

(৪৬) বোজ্ঝঙ্গ

(ঙ) মহা

(19) Shengdaofen

(৪৫) মাগ্গ

(ঙ) মহা

(20) Annabanna-nian

(৫৪) আনাপান

(ঙ) মহা

(21) Xue

 

 

(22) Buhuaijing

(৫৫) সোতাপত্তি

(ঙ) মহা

(চ) বুদ্ধভাষিত

(23) Luotuo

(২৩) রাধ

(গ) খন্ধ

(24) Jian

(২৪) দিট্ঠি

(গ) খন্ধ

(25) Duanzhi

 

 

(26) Tian

(৩২) বলাহক

(গ) খন্ধ

(27) Xiuzheng

(৩৪) ঝান

(গ) খন্ধ

(৪৩) অসঙ্খত

(ঘ) ষড়ায়তন

(১৩) অভিসময়

(খ) নিদান

(28) Ru-jie-yin

(২৫) ওক্কান্তিকা

(গ) খন্ধ

(২৬) উপ্পাদ

(গ) খন্ধ

(২৭) কিলেস

(গ) খন্ধ

(29) Buhuaijing

 

 

(30) Dajiaxie

(১৬) কস্সপ

(খ) নিদান

(31) Juluozhu

(৪২) গামণি

(ঘ) ষড়ায়তন

(32) Ma

 

 

(33) Mohenan

 

 

(34) Wushi

(১৫) অনমতগ্গ

(খ) নিদান

(35) Pocuozhong-chujia

(৩৩) বচ্চগোত্ত

(গ) খন্ধ

(৪৪) অব্যক্ত

(ঘ) ষড়ায়তন

(36) Waidao-chujia

 

 

(37) Za

 

 

(38) Piyu

(২০) ওপম্ম

(খ) নিদান

(39) Bing

 

 

(40) Yebao

 

 

(ছ) অষ্ট পরিষদ

(41) Biqiu

(২১) ভিক্ষু

(খ) নিদান

(42) Mo

(৪) মার

(ক) সগাথা

(43) Dishi

(১১) সক্ক

(ক) সগাথা

(44) Chali

(৩) কোসল

(ক) সগাথা

(45) Poluomen

(৭) ব্রাহ্মণ

(ক) সগাথা

(46) Fantian

(৬) ব্রহ্ম

(ক) সগাথা

(47) Biqiuni

(৫) ভিক্ষুণী

(ক) সগাথা

(48) Poqishe

(৮) বঙ্গীস

(ক) সগাথা

(49) Zhutian

(১) দেবতা

(ক) সগাথা

(২) দেবপুত্ত

(ক) সগাথা

(50) Yecha

(১০) যক্ষ

(ক) সগাথা

(51) Lin

(৯) বন

(ক) সগাথা

সংযুত্ত নিকায়ের এই সংযুত্তগুলি সংযুক্ত আগমে অনুপস্থিত

 

(১৭) লাভসক্কার

(খ) নিদান

 

(১৮) রাহুল

(খ) নিদান

 

(২৯) নাগ

(গ) খন্ধ

 

(৩০) সুপণ্ণ

(গ) খন্ধ

 

(৩১) গন্ধব্ব

(গ) খন্ধ

 

(৩৭) মাতুগাম

(ঘ) ষড়ায়তন

 

(৫৩) ঝান

(ঙ) মহা

 

 

উপরের তালিকায় সংযুক্ত আগম ও সংযুত্ত নিকায়ের তুলনা করা হয়েছে (Sujato, p. 47; Choong 2000, pp. 16-23, 243-251)। দেখা যাচ্ছে, সংযুক্ত আগমের ৫১টি সংযুক্তের মধ্যে ৪০টিকেই সংযুত্ত নিকায়ে পাওয়া যায়। তার মধ্যে ৭ম, ২৭-তম ও ২৮-তম সংযুক্তের প্রত্যেকটি সংযুত্ত নিকায়ের তিনটি করে সংযুত্তের সমতুল্য। আবার ৮ম, ৩৫-তম ও ৪৯-তম সংযুক্তের প্রত্যেকটি সংযুত্ত নিকায়ের দুটি করে সংযুত্তের সমতুল্য। ফলে সংযুক্ত আগমের ৪০টি সংযুক্ত আসলে সংযুত্ত নিকায়ের ৪৯টি সংযুত্তের প্রতিনিধিত্ব করে। সংযুত্ত নিকায়ের বাকি ৭টি সংযুত্ত সংযুক্ত আগমে অনুপস্থিত। সুতরাং সংযুত্তের দিক দিয়ে বিচার করলে দীঘ বা মজ্ঝিম নিকায়ের তুলনায় সংযুত্ত নিকায়ের ক্ষেত্রে থেরবাদী ও সর্বাস্তিবাদী গ্রন্থদুটির মধ্যে অনেক বেশি সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।

বর্গের দিক থেকে দেখলে অবশ্য এই সাদৃশ্য আপাতভাবে কিছুটা কম বলে মনে হয়। সংযুত্ত নিকায়ে যেখানে পাঁচটি বর্গ, সেখানে সংযুক্ত আগমে বর্গের সংখ্যা সাত। কিন্তু দুটি অতিরিক্ত বর্গ শ্রাবকভাষিত ও বুদ্ধভাষিতকে বাদ দিলে সংযুক্ত আগমের বাকি পাঁচটি বর্গ সংযুত্ত নিকায়ের পাঁচটি বর্গের সঙ্গে মোটামুটি মিলে যায়। সংযুক্ত আগমের পঞ্চস্কন্ধ বর্গ, ষড়ায়তন বর্গ, প্রতীত্য সমুৎপাদ বর্গ, মার্গ বর্গ ও অষ্ট পরিষদ বর্গ যথাক্রমে সংযুত্ত নিকায়ের খন্ধ বগ্গ, ষড়ায়তন বগ্গ, নিদান বগ্গ, মহা বগ্গ ও সগাথা বগ্গের সঙ্গে মেলে। শ্রাবকভাষিত ও বুদ্ধভাষিত বর্গের সূত্রগুলিকে সংযুত্ত নিকায়ে নিদান, খন্ধ, ষড়ায়তন ও মহা বর্গের মধ্যে স্থান দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী পরিচ্ছেদে আমরা দেখব, এই পার্থক্যও যত বেশি মনে হচ্ছে, আসলে তা নয়।

আরেকটি ব্যাপার লক্ষণীয়। সংযুত্ত নিকায়ের ২১-তম সংযুত্ত ভিক্ষু সংযুত্ত নিদান বগ্গে আছে। কিন্তু সংযুক্ত আগমে এর সমতুল্য Biqiu সংযুক্ত (41) স্থান পেয়েছে অষ্ট পরিষদ বর্গে। এক্ষেত্রে মনে হয় সর্বাস্তিবাদীরাই সঠিক কারণ সগাথা বগ্গের সমস্ত সংযুত্তের মতো ভিক্ষু সংযুত্তের সুত্তগুলিও গাথা ও গদ্যের সংমিশ্রণে রচিত। একমাত্র ব্যতিক্রম হল শুরুর দুটি সুত্ত। এগুলি পুরোপুরি গদ্যে রচিত। কিন্তু এই দুটি সূত্র আবার Biqiu সংযুক্তে অনুপস্থিত। ভিক্ষু বোধির অনুমান, কোনও এক সময় থেরবাদীরা ওই দুটি গদ্যে রচিত সুত্ত ভিক্ষু সংযুত্তের শুরুতে যোগ করে এবং ফলস্বরূপ সংযুত্তটিকে সগাথা বগ্গ থেকে নিদান বগ্গে সরাতে বাধ্য হয় (Bodhi 2000, p. 532)।

মোটের উপর বলা চলে, দীঘ নিকায়/ দীর্ঘ আগম, মজ্ঝিম নিকায়/ মধ্যম আগম এবং সংযুত্ত নিকায়/ সংযুক্ত আগম এই তিনটি জোড়ের মধ্যে তৃতীয় জোড়ের সদস্য দুটির মধ্যে সাদৃশ্য প্রথম দুটি জোড়ের তুলনায় অনেক বেশি। এর থেকে সিদ্ধান্ত করা যায়, সংযুক্ত আগম/নিকায়ের সংকলন থেরবাদ ও সর্বাস্তিবাদের বিভাজনের আগেই মোটামুটি সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ ও মধ্যম আগম/নিকায়ের সংকলন সম্পূর্ণ হয় এই বিভাজনের পরে। তাই এদের মধ্যে গঠনগত সাদৃশ্য এত কম। অর্থাৎ দীঘ, মজ্ঝিম ও সংযুত্ত নিকায়ের মধ্যে সংযুত্ত প্রাচীনতম। কিন্তু প্রথম চার নিকায়ের মধ্যে এই তিনটি নিকায় ছাড়া আরও একটি নিকায় আছে। সেটি হল অঙ্গুত্তর নিকায়। এই নিকায়ের সংশ্লিষ্ট সর্বাস্তিবাদী আগম আমাদের হাতে না থাকায় আমরা এর প্রাচীনতার ব্যাপারে এখনও পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারি নি। কিন্তু আমরা যদি সংযুত্ত নিকায় ও অঙ্গুত্তর নিকায়ের মধ্যে তুলনা করি, তাহলে দেখব, সংযুত্ত নিকায় অবশ্যই অঙ্গুত্তরের চেয়ে প্রাচীন। এই দুটি নিকায়েই ছোট ছোট আকারের সুত্তগুলিকে সংকলন করা হয়েছে। কিন্তু সংযুত্ত নিকায়ে যেখানে সুত্তগুলিকে সুন্দরভাবে বিষয় ধরে ধরে সাজানো হয়েছে, সেখানে অঙ্গুত্তরে সুত্তগুলিকে অদ্ভূতভাবে সংখ্যা অনুযায়ী সাজানো হয়েছে (২য় পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য)। এর কারণ হল, অঙ্গুত্তর নিকায়ের সুত্তগুলির মধ্যে তেমন কোনও বিষয়গত ঐক্য নেই। এদের চরিত্র বিবিধ। এখন একজন লেখক যখন কোনও বই লেখেন, তখন তিনি প্রথমে একেকটি বিষয়কে ধরে ধরে একেকটি অধ্যায় লেখেন এবং তারপর বিচ্ছিন্ন বিষয়গুলিকে সবার শেষে বিবিধ অধ্যায়ে স্থান দেন। একইভাবে বলা যায় যে, ভিক্ষুরা আগে সংযুত্ত নিকায় সংকলন করেন। তারপর যে ছোট ছোট সুত্তগুলিকে সংযুত্ততে স্থান দেওয়া যায়নি, সেগুলিকে নিয়ে অঙ্গুত্তর নিকায় সংকলন করেন।

এখনও পর্যন্ত এই পরিচ্ছেদে আমরা নিম্নলিখিত দুটি বিষয় প্রমাণ করেছিঃ

(১) থেরবাদী ও সর্বাস্তিবাদী গ্রন্থগুলির গঠনের তুলনা করে আমরা দেখেছি, সংযুত্ত নিকায় দীঘ ও মজ্ঝিম নিকায়ের চেয়ে প্রাচীন।

(২) পালি সংযুত্ত নিকায় ও অঙ্গুত্তর নিকায়ের মধ্যে তুলনা করে আমরা দেখেছি, সংযুত্ত নিকায় অঙ্গুত্তর নিকায়ের চেয়ে প্রাচীন।

এই দুটি সিদ্ধান্তকে একসাথে করলে দাঁড়ায়, প্রথম চার নিকায়ের মধ্যে সংযুত্ত নিকায় প্রাচীনতম। সবার প্রথমে সংযুত্ত নিকায় সংকলিত হয়, তারপর বাকি তিনটি নিকায় সংকলিত হয়।

৯) সংযুত্ত নিকায়ের মধ্যে সূত্র, গেয় ও ব্যাকরণ অঙ্গ

৭ম পরিচ্ছেদে আমরা দুটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলামঃ

(ক) চার নিকায়ের মধ্যে কোনও একটি প্রাচীনতম কিনা,

(খ) চার নিকায়ের মধ্যে কোনোটিতে সূত্র, গেয় ও ব্যাকরণ অঙ্গের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় কিনা।

প্রথম প্রশ্নটির উত্তর আমরা ৮ম পরিচ্ছেদে খোঁজার চেষ্টা করেছি। এই পরিচ্ছেদে আমরা দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর খুঁজব। চার নিকায়ের মধ্যে দীঘ, মজ্ঝিম ও অঙ্গুত্তর নিকায়ে সূত্র, গেয় ও ব্যাকরণ অঙ্গের কোনও চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু তাইওয়ানের ভিক্ষু য়িন শান বিস্তারিত গবেষণার দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে, সংযুত্ত নিকায়ের মধ্যে এই তিনটি অঙ্গ প্রচ্ছন্ন রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে য়িন শান তিনটি অঙ্গকে শনাক্ত করেছেন সংযুক্ত আগমে, সংযুত্ত নিকায়ে নয়। কিন্তু যেহেতু পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে আমরা দেখেছি, সংযুক্ত আগম ও সংযুত্ত নিকায়ের আদিরূপ একই ছিল, তাই তাঁর সিদ্ধান্ত সংযুত্ত নিকায়ের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য। য়িন শানের কাজ সম্পর্কে সমস্যা হল, তিনি ইংরেজিতে কিছু লেখেন নি, লিখেছেন চীনা ভাষায়। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত “Yuanshi Fojiao Shengdian Zhi Jicheng” (The Formation of Early Buddhist Texts) নামক গ্রন্থে তিনি পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ সহযোগে সংযুক্ত আগমের মধ্যে সূত্র, গেয় ও ব্যাকরণ অঙ্গকে শনাক্ত করেন। এরপর ১৯৮৩ সালে তিন খণ্ডে প্রকাশিত “Za-ahan Jinglun Huibian” (Combined Edition of Sutra and Sastra of the Samyukta Agama) নামক গ্রন্থে তিনি সংযুক্ত আগমের এই তিনটি অঙ্গ সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করেন (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডে সূত্রাঙ্গ অংশ সম্পর্কে এবং তৃতীয় খণ্ডে গেয় ও ব্যাকরণ অঙ্গ সম্পর্কে)। দুঃখের বিষয়, চীন ও জাপানে য়িন শানের এই মূল্যবান গবেষণা যথেষ্ট সাড়া ফেললেও কেবলমাত্র ভাষার সমস্যার জন্য বহির্বিশ্ব তাঁর কাজ সম্পর্কে প্রায় অজ্ঞ। যতদিন না কোনও চীনা ব্যক্তি তাঁর বইগুলি ইংরেজিতে অনুবাদ করছেন, ততদিন আমরা তাঁর কাজ সম্পর্কে বিশদে জানতে পারব না। এখনও পর্যন্ত আমরা তাঁর গবেষণা সম্পর্কে যেটুকু জানতে পেরেছি, তা মূলত চুং মুন-কীট নামে অন্য একজন চীনা ভিক্ষুর ইংরেজি লেখালেখি থেকে। নীচে আমরা চুং মুন-কীটের লেখা থেকে সংযুক্ত আগম সম্পর্কে য়িন শানের সিদ্ধান্ত সংক্ষেপে বিবৃত করব (Choong 2000, pp. 7-11; Choong 2010)।

পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে আমরা দেখেছি, সংযুক্ত আগম সাতটি বর্গে বিভক্ত – পঞ্চস্কন্ধ বর্গ, ষড়ায়তন বর্গ, প্রতীত্য সমুৎপাদ বর্গ, শ্রাবকভাষিত বর্গ, মার্গ বর্গ, বুদ্ধভাষিত বর্গ ও অষ্ট পরিষদ বর্গ। য়িন শান দেখিয়েছেন, বিখ্যাত মহাযানী গ্রন্থ যোগাচারভূমিশাস্ত্রের অন্তর্গত বস্তু-সংগ্রহাণি অধ্যায়ে সংযুক্ত আগমের সাতটি বর্গকে নীচের তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছেঃ

(১) কে বলছেনঃ শ্রাবকভাষিত বর্গ ও বুদ্ধভাষিত বর্গ;

(২) কী বলা হচ্ছেঃ পঞ্চস্কন্ধ বর্গ, ষড়ায়তন বর্গ, প্রতীত্য সমুৎপাদ বর্গ ও মার্গ বর্গ;

(৩) কাকে বলা হচ্ছেঃ অষ্ট পরিষদ বর্গ।

য়িন শানের মতে উপরের তিনটি অংশই আসলে তিনটি অঙ্গ। লক্ষণীয়, উপরের ৩য় অংশ অর্থাৎ অষ্ট পরিষদ বর্গের সূত্রগুলি গাথা ও গদ্যের সংমিশ্রণে রচিত (সংযুত্ত নিকায়ে সংশ্লিষ্ট বগ্গটির নাম সগাথা বগ্গ।)। য়িন শানের মতে এই বর্গটি হল গেয় অঙ্গ। উপরের ২য় অংশে যে চারটি বর্গকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, বস্তু-সংগ্রহাণির মধ্যে সেই বর্গগুলির বিস্তারিত ভাষ্য রচনা করা হয়েছে। বস্তু-সংগ্রহাণির এই অংশটির নাম হল সূত্র-মাতৃকা। উপরের ১ম ও ৩য় অংশের কোনও ভাষ্য বস্তু-সংগ্রহাণির মধ্যে নেই। য়িন শানের মতে, ২য় অংশের এই চারটি বর্গই হল সূত্র অঙ্গ এবং এটিই সূত্র পিটকের প্রাচীনতম অংশ। এবার বাকি থাকে উপরের ১ম অংশ, অর্থাৎ শ্রাবকভাষিত বর্গ ও বুদ্ধভাষিত বর্গ। য়িন শান এই দুটি বর্গকে ব্যাকরণ অঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদে আমরা দেখেছি, অঙ্গগুলি কালানুক্রমিক। সেই হিসেবে সংযুক্ত আগমের মধ্যে সূত্রাঙ্গ অংশটি, অর্থাৎ পঞ্চস্কন্ধ বর্গ, ষড়ায়তন বর্গ, প্রতীত্য সমুৎপাদ বর্গ ও মার্গ বর্গ সর্বপ্রথম সংকলিত হয়েছিল। তারপর গেয় অঙ্গ অর্থাৎ অষ্ট পরিষদ বর্গ সংকলিত হয়। সবশেষে সংকলিত হয় ব্যাকরণ অঙ্গ, অর্থাৎ শ্রাবকভাষিত বর্গ ও বুদ্ধভাষিত বর্গ। ব্যাকরণ অঙ্গে সূত্রাঙ্গ অংশের সূত্রগুলিকেই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে (এখানে ব্যাকরণ অর্থে ব্যাখ্যা বা exposition, grammar নয়)। এদিক থেকে দেখলে সংযুক্ত আগম ও সংযুত্ত নিকায়ের মধ্যে বর্গ পর্যায়ে যে সামান্য পার্থক্য আছে (পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য), তাকেও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয় না। সংযুক্ত আগমে যেখানে সূত্রাঙ্গ অংশের চারটি বর্গের ব্যাখ্যার জন্য নতুন দুটি বর্গ তৈরি করা হয়েছে, সেখানে সংযুত্ত নিকায়ে এই ব্যাখ্যাগুলিকে সংশ্লিষ্ট নিকায়ের শেষেই যোগ করে দেওয়া হয়েছে।

য়িন শানকে অনুসরণ করে এতক্ষণ আমরা সংযুক্ত আগমের মধ্যে সূত্র, গেয় ও ব্যাকরণ অঙ্গকে শনাক্ত করেছি। এবার সংযুত্ত নিকায়ের মধ্যে ওই তিনটি অঙ্গকে চিনে নেওয়া যাক। পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে সংযুক্ত আগম ও সংযুত্ত নিকায়ের যে তুলনামূলক তালিকা দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকে দেখা যায়ঃ

(ক) সংযুত্ত নিকায়ের মধ্যে সূত্র অঙ্গঃ

সংযুক্ত আগমের সূত্রাঙ্গ অংশ অর্থাৎ পঞ্চস্কন্ধ বর্গ, ষড়ায়তন, প্রতীত্য সমুৎপাদ ও মার্গ বর্গের সংযুক্তগুলির অনুরূপ সংযুত্ত নিকায়ের সংযুত্তগুলি হল – নিদান বগ্গের অন্তর্গত (১২) নিদান সংযুত্ত, (১৪) ধাতু সংযুত্ত; খন্ধ বগ্গের অন্তর্গত (২২) খন্ধ সংযুত্ত; ষড়ায়তন বগ্গের অন্তর্গত (৩৫) ষড়ায়তন সংযুত্ত, (৩৬) বেদনা সংযুত্ত; মহা বগ্গের অন্তর্গত (৪৫) মাগ্গ সংযুত্ত, (৪৬) বোজ্ঝঙ্গ সংযুত্ত, (৪৭) সতিপটঠান সংযুত্ত, (৪৮) ইন্দ্রিয় সংযুত্ত, (৪৯) সম্মপপধান সংযুত্ত, (৫০) বল সংযুত্ত, (৫১) ইদ্ধিপাদ সংযুত্ত, (৫৪) আনাপান সংযুত্ত, (৫৫) সোতাপত্তি সংযুত্ত ও (৫৬) সচ্চ সংযুত্ত।

(খ) সংযুত্ত নিকায়ের মধ্যে গেয় অঙ্গঃ

সংযুক্ত আগমের গেয় অঙ্গ অর্থাৎ অষ্ট পরিষদ বর্গের সংযুক্তগুলির অনুরূপ সংযুত্ত নিকায়ের সংযুত্তগুলি হল – সগাথা বগ্গের অন্তর্গত (১) দেবতা সংযুত্ত, (২) দেবপুত্ত সংযুত্ত, (৩) কোসল সংযুত্ত, (৪) মার সংযুত্ত, (৫) ভিক্ষুণী সংযুত্ত, (৬) ব্রহ্ম সংযুত্ত, (৭) ব্রাহ্মণ সংযুত্ত, (৮) বঙ্গীস সংযুত্ত, (৯) বন সংযুত্ত, (১০) যক্ষ সংযুত্ত, (১১) সক্ক সংযুত্ত; নিদান বগ্গের অন্তর্গত (২১) ভিক্ষু সংযুত্ত।

(গ) সংযুত্ত নিকায়ের মধ্যে ব্যাকরণ অঙ্গঃ

সূত্র অঙ্গের ১৫টি সংযুত্ত ও গেয় অঙ্গের ১২টি সংযুত্ত ছাড়া সংযুত্ত নিকায়ের বাকি ২৯টি সংযুত্ত ব্যাকরণ অঙ্গের অন্তর্ভুক্ত।

এখানে একটি ব্যাপার লক্ষণীয়। পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে আমরা সংযুক্ত আগম ও সংযুত্ত নিকায়ের মধ্যে সংযুক্ত পর্যায়ে যে সামান্য পার্থক্য লক্ষ্য করেছি, তার অধিকাংশই ব্যাকরণ অঙ্গের ক্ষেত্রে। দুটি গ্রন্থের সূত্র ও গেয় অঙ্গ প্রায় মিলে যায়। সংযুক্ত আগমের সূত্র অঙ্গে রয়েছে ১৬টি সংযুক্ত। এর মধ্যে কেবল Xue সংযুক্ত ছাড়া বাকি ১৫টিকেই সংযুত্ত নিকায়ে পাওয়া যায়। সংযুক্ত আগমের গেয় অঙ্গের ১১টি সংযুক্তের সবগুলিকেই আমরা সংযুত্ত নিকায়ে পাই। অবশ্য এর মধ্যে Zhutian সংযুক্তকে সংযুত্ত নিকায়ে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে – দেবতা সংযুত্ত ও দেবপুত্ত সংযুত্ত। ফলে এক্ষেত্রে গেয় অঙ্গে সংযুত্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২। অন্যদিকে সংযুক্ত আগমের ব্যাকরণ অঙ্গের ২৪টি সংযুক্তের মধ্যে কেবল ১৪টিকে আমরা সংযুত্ত নিকায়ে খুঁজে পাই। এটা অবশ্য স্বাভাবিক কেননা ব্যাকরণ অঙ্গ সংকলিত হয়েছিল সূত্র ও গেয় অঙ্গের পরে। তাই এই অঙ্গের মধ্যে সাদৃশ্য তুলনায় কম।

পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদ ও এই পরিচ্ছেদে আমরা দেখলাম,

(ক) চার নিকায়ের মধ্যে সংযুত্ত নিকায় প্রাচীনতম,

(খ) চার নিকায়ের মধ্যে একমাত্র সংযুত্ত নিকায়েই সূত্র, গেয় ও ব্যাকরণ অঙ্গকে খুঁজে পাওয়া যায়।

সুতরাং ৭ম পরিচ্ছেদের যুক্তি অনুসারে আমরা বলতে পারি, বুদ্ধের মতবাদকে প্রথমে সূত্র অঙ্গের মধ্যে সংকলন করা হয়। তারপর সংকলিত হয় গেয় অঙ্গ। তারপর সূত্র অঙ্গের ব্যাখ্যা হিসেবে সংকলিত হয় ব্যাকরণ অঙ্গ। কিন্তু ব্যাখ্যার যেহেতু কোনও শেষ নেই, তাই ব্যাকরণ অঙ্গের আকার অস্বাভাবিক ভাবে বাড়তে থাকে। একদিকে যেমন সুত্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে, তেমনি অন্যদিকে অনেক বড়ো বড়ো সুত্তও সংকলিত হয়। তখন ব্যাকরণ অঙ্গ থেকে কিছু কিছু সুত্তকে নিয়ে দীঘ, মজ্ঝিম ও অঙ্গুত্তর এই তিনটি নিকায় তৈরি করা হয়। আর মূল গ্রন্থটির নাম দেওয়া হয় সংযুত্ত নিকায়। অর্থাৎ চার নিকায়ের মধ্যে নিম্নলিখিত তিনটি কালানুক্রমিক স্তর বিদ্যমানঃ

(১) সূত্র অঙ্গঃ সংযুত্ত নিকায়ের ১৫টি সংযুত্ত,

(২) গেয় অঙ্গঃ সংযুত্ত নিকায়ের ১২টি সংযুত্ত,

(৩) ব্যাকরণ অঙ্গঃ সংযুত্ত নিকায়ের বাকি ২৯টি সংযুত্ত এবং তার সাথে সমগ্র দীঘ, মজ্ঝিম ও অঙ্গুত্তর নিকায়।

সবশেষে গেয় অঙ্গ সম্পর্কে একটি কথা উল্লেখ করা উচিত। আগেই বলা হয়েছে, গেয় অঙ্গের সুত্তগুলি গাথা ও গদ্যের সংমিশ্রণে রচিত। এখন প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থের ইতিহাসের একটি সাধারণ ধারা হল, গাথা ও গদ্যের সংমিশ্রণে রচিত গ্রন্থগুলির ক্ষেত্রে সাধারণত গাথা অংশটি প্রথমে রচিত হয়। পরে অমুক ব্যক্তি অমুক প্রসঙ্গে গাথাগুলি বলেছিলেন, এরকম কিছু কাহিনী গদ্যের আকারে যোগ করা হয়। উদাহরণ হিসেবে খুদ্দক নিকায়ের ধম্মপদের কথা বলা যেতে পারে। ধম্মপদের কেবল গাথা অংশগুলিই ত্রিপিটকের মধ্যে স্থান পেয়েছে। বর্তমানে গাথাগুলির সঙ্গে গদ্যে যে প্রসঙ্গকথা পাওয়া যায়, সেগুলির উৎপত্তি ধম্মপদের অট্ঠকথা (অর্থকথা) অর্থাৎ ব্যাখ্যাগ্রন্থে, যা পরবর্তীকালে রচিত। একইভাবে জাতকেরও কেবল গাথাগুলিই ত্রিপিটকের অন্তর্গত, গদ্য অংশগুলির উৎপত্তি জাতক অট্ঠকথায়। একই যুক্তিতে বলা যায়, সংযুত্ত নিকায়ের গেয় অঙ্গের ক্ষেত্রেও গাথাগুলি প্রথমে রচিত হয় ও গদ্যে প্রসঙ্গকথাগুলি পরে যুক্ত হয়। কিন্তু গেয় অঙ্গ যেহেতু ত্রিপিটকের একেবারে প্রথমের দিককার রচনা, তাই এর প্রসঙ্গকথা অংশটিও ত্রিপিটকে ঠাঁই পেয়ে গেছে। আমরা গেয় অঙ্গের গদ্য অংশটিকে ব্যাকরণ অঙ্গের সমসাময়িক ধরতে পারি।

১০) সংযুত্ত নিকায়ের সূত্রাঙ্গ অংশের প্রাচীনত্বের আরও প্রমাণ

পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে, সমগ্র ত্রিপিটকের মধ্যে সংযুত্ত নিকায়ের সূত্রাঙ্গ অংশটি প্রাচীনতম। এখন আমরা এই অংশের প্রাচীনত্বের সপক্ষে আরও কিছু যুক্তি উপস্থাপন করব।

(১) সূত্রাঙ্গ অংশে বৌদ্ধধর্মের সমস্ত মৌলিক বিষয়গুলি আলোচিত হয়েছে।

সূত্রাঙ্গ অংশ যদি সত্যিই সর্বপ্রথম সংকলিত হয়, তাহলে আমরা অবশ্যই আশা করব যে, বৌদ্ধধর্মের সমস্ত মৌলিক বিষয়গুলি এই অংশে আলোচিত হবে। যদি কোনও গুরুত্বপূর্ণ, মৌলিক বিষয় এই অংশে না থাকে, তাহলে এর প্রাচীনতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এখন সূত্রাঙ্গ অংশের পনেরোটি সংযুত্ত আগাগোড়া পড়লেই দেখা যায়, বৌদ্ধধর্মের সমস্ত মৌলিক বিষয়ই এর মধ্যে আলোচিত হয়েছে। যেমন – চার আর্যসত্য, অষ্টাঙ্গিক মার্গ, প্রতীত্য-সমুৎপাদ, পঞ্চস্কন্ধ, ষড়ায়তন, সপ্ত বোজ্ঝঙ্গ, সাঁইত্রিশ বোধিপক্ষীয় ধর্ম ইত্যাদি বিষয়সমূহ সূত্রাঙ্গ অংশে যথাযথভাবে আলোচিত হয়েছে।

(২) সূত্রাঙ্গ অংশের গঠন চার আর্যসত্যের অনুসারী

চার নিকায়ের যেকোনো একটি পড়তে গিয়ে প্রথমেই যে ব্যাপারটি চোখে পড়ে সেটি হল, নিকায়ের মধ্যে সুত্তগুলির বিশৃঙ্খল অবস্থান। সুত্তগুলিকে বিষয় ধরে ধরে সুন্দরভাবে না সাজিয়ে এলোমেলোভাবে রাখা হয়েছে। সাধারণভাবে একটি সুত্তের সঙ্গে তার পূর্ববর্তী বা পরবর্তী সুত্তের কোনও মিল নেই। ১ম সুত্তকে ২১-তম স্থানে কিংবা ২১-তম সুত্তকে ৫৯-তম স্থানে সরিয়ে দিলেও নিকায়ের গঠনের কোনও ইতরবিশেষ হবে না। বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন বিষয়গুলি যেখানে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, সেখানে ধর্মগ্রন্থের এই বিশৃঙ্খলতা যেন একটি রহস্য। অথচ বৌদ্ধধর্মের মধ্যেই একটি মৌলিক বিষয় আছে, যার সাহায্যে ধর্মের সমস্ত বক্তব্য অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ভাবে পরিবেশন করা যায়। সেই বিষয়টি হল চার আর্যসত্য – দুঃখ, সমুদয় (অর্থাৎ দুঃখের উৎপত্তি), (দুঃখের) নিরোধ এবং (দুঃখ নিরোধের) মার্গ। এই চারটি বিষয়ের সাহায্যে বৌদ্ধধর্মকে খুব সুন্দরভাবে বর্ণনা করা যায় বলে অনেক আধুনিক লেখক তাঁদের বইতে এগুলিকে ব্যবহার করেন। এই প্রবন্ধের শুরুতে উল্লিখিত Walpola Rahula রচিত “What the Buddha Taught” বইতেও প্রথম অধ্যায়ে বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক আলোচনার পরে চারটি অধ্যায়ে পরপর চারটি আর্যসত্যের আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু বৌদ্ধধর্মের প্রাচীন “লেখকরা” এই ছককে ব্যবহার না করার ফলে নিকায়গুলির বিশৃঙ্খল অবস্থা।

এই বিশৃঙ্খলতা সবচেয়ে বেশি আছে দীঘ, মজ্ঝিম ও অঙ্গুত্তর নিকায়ে। তুলনায় সংযুত্ত নিকায় অনেকটাই সুশৃঙ্খল। আবার সংযুত্ত নিকায়ের সূত্রাঙ্গ অংশটি আরও সুশৃঙ্খল। পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে আমরা দেখেছি, সূত্রাঙ্গ অংশের মধ্যে চারটি বগ্গে মোট পনেরোটি সংযুত্ত আছে। তার মধ্যে নিদান বগ্গের অন্তর্গত নিদান ও ধাতু সংযুত্তের আলোচ্য বিষয় হল দুঃখের সমুদয় ও নিরোধ, অর্থাৎ দ্বিতীয় ও তৃতীয় আর্যসত্য। তারপর খন্ধ বগ্গের অন্তর্গত খন্ধ সংযুত্ত ও ষড়ায়তন বগ্গের অন্তর্গত ষড়ায়তন ও বেদনা সংযুত্তের আলোচ্য বিষয় হল দুঃখ অর্থাৎ প্রথম আর্যসত্য। সবশেষে মহা বগ্গের অন্তর্গত দশটি সংযুত্ত নানাভাবে দুঃখ নিরোধের মার্গ অর্থাৎ চতুর্থ আর্যসত্যকে ব্যাখ্যা করেছে।

সংযুত্ত নিকায়ে চারটি আর্যসত্যের ক্রম পুরোপুরি রক্ষিত হয়নি। প্রথম আর্যসত্য দ্বিতীয় ও তৃতীয় আর্যসত্যের পরে এসেছে। কিন্তু আমরা যদি সর্বাস্তিবাদী সংযুক্ত আগমের সূত্রাঙ্গ অংশটি দেখি, তাহলে এই অসঙ্গতিও থাকে না। সেখানে সবার প্রথমে আছে পঞ্চস্কন্ধ ও ষড়ায়তন বর্গ, অর্থাৎ প্রথম আর্যসত্য। তারপর আছে প্রতীত্য-সমুৎপাদ বা নিদান বর্গ, অর্থাৎ দ্বিতীয় ও তৃতীয় আর্যসত্য। এবং সবশেষে আছে মার্গ বর্গ, অর্থাৎ চতুর্থ আর্যসত্য। সম্ভবত আদি সংযুক্তে বর্গগুলি এই ক্রমেই ছিল, থেরবাদীরা পরে নিদান বর্গকে এগিয়ে এনেছেন।

সূত্রাঙ্গ অংশ যে চার আর্যসত্যের ধাঁচে রচিত, এই ঘটনা থেকেও এর প্রাচীনতা বোঝা যায়। চার আর্যসত্যের সাহায্যে বুদ্ধের মতবাদকে সুশৃঙ্খল ভাবে প্রকাশ করা যায়, এই ব্যাপারটা যে শুধু আধুনিক লেখকরাই বুঝেছেন, এমন ভাবার নিশ্চয় কোনও কারণ নেই। প্রাচীনকালেও এটা জানা ছিল। নেত্তি ও পেটকোপদেশ নামে প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে বলা হয়েছে, কোনও সুত্তের সম্যক অনুধাবন করতে হলে তাকে চার আর্যসত্যের আলোকে পরীক্ষা করা প্রয়োজন (Sujato, p. 50)। আবার মজ্ঝিম নিকায়ের মহাহত্থিপদওপম সুত্তে (২৮) বুদ্ধের প্রধান শিষ্য সারিপুত্ত বলছেন, সমস্ত কুশল ধর্মই চার আর্যসত্যের অন্তর্গত। সুতরাং বুদ্ধের মৃত্যুর ঠিক পরে তাঁর মতবাদ সংকলন করতে বসে ভিক্ষুরা যে চার আর্যসত্যকেই কাঠামো হিসেবে ব্যবহার করবেন, এটাই স্বাভাবিক। সংযুত্ত নিকায়ের সূত্রাঙ্গ অংশ যে চার আর্যসত্যের ধাঁচে রচিত, এই ঘটনাটি তাই পরোক্ষভাবে এর প্রাচীনতাকেই সমর্থন করে।

(৩) বুদ্ধের “প্রথম তিন উপদেশের” প্রতিটিই সূত্রাঙ্গ অংশে আছে

বিনয় পিটকের অন্তর্গত মহাবগ্গ (সংযুত্ত নিকায়ের মহা বগ্গের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা চলবে না) নামক গ্রন্থের শুরুতে বুদ্ধের বোধি লাভের ঠিক পর থেকে শুরু করে ভিক্ষুসঙ্ঘ গঠন পর্যন্ত কিছুদিনের বিবরণ আছে। এখানে বুদ্ধ কর্তৃক কথিত প্রথম তিনটি সুত্ত পাওয়া যায়। এগুলি হল – (১) ধর্মচক্রপ্রবর্তন সুত্ত, (২) অনাত্তালক্ষণ সুত্ত ও (৩) আদিত্যপরিয়ায় সুত্ত। এদের মধ্যে প্রথম দুটি উপদেশ বুদ্ধ সারনাথে তাঁর প্রথম পাঁচজন শিষ্যের উদ্দেশ্যে দিয়েছিলেন এবং তৃতীয়টি দিয়েছিলেন গয়াতে হাজার জন শিষ্যকে উদ্দেশ্য করে (ততদিনে ভিক্ষুসঙ্ঘের আকার অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে)। এখন এই তিনটি সুত্ত সত্যিই বুদ্ধের প্রথম তিন উপদেশ কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে কেননা আমরা ৫ম পরিচ্ছেদেই দেখেছি, বিনয় পিটকের মধ্যে মহাবগ্গ বইটি খুব প্রাচীন নয়। তাই কেবল মহাবগ্গের সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে উপরে উল্লিখিত তিনটি সুত্তকে নিশ্চিতভাবে বুদ্ধের প্রথম তিন উপদেশ বলা যায় না। তবে এগুলি বুদ্ধের প্রথম তিন উপদেশ হোক আর নাই হোক, এই সুত্তগুলি যে রীতিমতো প্রাচীন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মহাবগ্গ রচনার সময় নিশ্চয় এদের প্রাচীনতা অবিসংবাদিত রূপে স্বীকৃত ছিল। সেইজন্যই মহাবগ্গের রচয়িতারা এগুলিকে বুদ্ধের প্রথম তিন উপদেশের মর্যাদা দিয়েছিলেন। আরেকটি কারণেও এদের প্রাচীনতা প্রতিপাদিত হয়। ভিক্ষু সুজাতো এই কারণটির প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন (Sujato, pp. 23-24)। বৌদ্ধ সঙ্ঘে বিভাজনের অনেক আগে থেকেই (হয়তো বুদ্ধের জীবদ্দশা থেকেই) ভিক্ষুদের মধ্যে দুটি বিশেষজ্ঞ দলের সৃষ্টি হয়। একদল ভিক্ষু বিনয়ের ব্যাপারে পণ্ডিত ছিলেন, অন্যদল ধর্মের ব্যাপারে। এঁরা যথাক্রমে বিনয়ধর ও ধর্মধর নামে পরিচিত ছিলেন। এর আগে আমরা প্রথম সঙ্গীতির বিবরণে দেখেছি যে, সেখানে উপালি বিনয় আবৃত্তি করেন এবং আনন্দ ধর্ম আবৃত্তি করেন। অর্থাৎ এঁরা দুজন এই দুটি বিষয়ের সবচেয়ে বড়ো বিশেষজ্ঞ ছিলেন। পরবর্তীকালেও বিনয় পিটকের বইগুলি যাঁরা সংকলন করেন, তাঁরা নিশ্চয় বিনয়ের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তার মানে কি তাঁরা সুত্ত সম্পর্কে কিছুই জানতেন না? নিশ্চয় জানতেন, তবে কেবল প্রধান প্রধান গুরুত্বপূর্ণ সুত্তগুলিই তাঁরা ভালো করে জানতেন (একইভাবে নিকায়ের সংকলকরাও প্রধান প্রধান বিনয়ের নিয়মগুলি নিশ্চয় জানতেন)। সুতরাং বিনয় পিটকের মধ্যে আমরা যদি কোনও সুত্তকে আবিষ্কার করি, তাহলে বুঝতে হবে, ওই সুত্তটি নিশ্চয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল – এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে বিনয়ের বিশেষজ্ঞরাও সেটি জানতেন। সেই হিসেবে উপরে উল্লিখিত তিনটি সুত্ত নিশ্চয় অত্যন্ত প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ।

এখন সংযুত্ত নিকায়ের সূত্রাঙ্গ অংশ যদি বুদ্ধের মতবাদের প্রাচীনতম সংকলন হয়, তাহলে এটা আশা করা অন্যায় হবে না যে, বুদ্ধের এই “প্রথম তিন উপদেশ” তার মধ্যে থাকবে। এক্ষেত্রেও সূত্রাঙ্গ অংশ সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয় কারণ ওই তিনটি সুত্তের প্রত্যেকটিকেই আমরা সূত্রাঙ্গ অংশের মধ্যে খুঁজে পাই। ধর্মচক্রপ্রবর্তন সুত্ত আছে সংযুত্ত নিকায়ের মহা বগ্গের মধ্যে (৫৬:১১), অনাত্তালক্ষণ সুত্তকে পাওয়া যায় খন্ধ বগ্গের মধ্যে (২২:৫৯), আর আদিত্যপরিয়ায় সুত্তের অবস্থান হল ষড়ায়তন বগ্গে (৩৫:২৮)। লক্ষণীয়, সূত্রাঙ্গ অংশের চারটি বগ্গের মধ্যে তিনটিতে এই তিনটি সুত্ত আছে। বাকি থাকে নিদান বগ্গ। বিনয় পিটকের মহাবগ্গের শুরুতে বোধি লাভের ঠিক পরেই বুদ্ধ যে প্রতীত্য-সমুৎপাদ তত্ত্বের কথা চিন্তা করেন, সেটি আবার রয়েছে এই নিদান বগ্গে। বস্তুত নিদান বগ্গের প্রথম সুত্তের (১২:১) সঙ্গে মহাবগ্গের শুরুর ওই অংশটি প্রায় হুবহু মিলে যায়। সুতরাং এমনটা অনুমান করা অসঙ্গত হবে না যে, মহাবগ্গের সংকলকরা সূত্রাঙ্গ অংশের চারটি বগ্গ থেকে চারটি প্রতিনিধিত্বমূলক সুত্তকে নিয়ে বুদ্ধের বোধিলাভের পর প্রথম উপলব্ধি ও তাঁর প্রথম তিন উপদেশ রচনা করেন।

১১) উপসংহার

এই প্রবন্ধে বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদ খোঁজার উদ্দেশ্যে আমরা ত্রিপিটকের (সঠিকভাবে বললে, সুত্ত ও অভিধম্ম পিটকের) কালানুক্রমিক স্তরবিন্যাস করার চেষ্টা করেছি। এখন সেই স্তরবিন্যাসের সারাংশ লিপিবদ্ধ করা যাক। আমরা দেখেছি, সুত্ত ও অভিধম্ম পিটকের কালানুক্রমিক স্তরগুলি নবাঙ্গের অনুসারী। তাই এই স্তরগুলিকে নবাঙ্গ অনুযায়ী সাজানো যাক।

(১) সূত্র অঙ্গ – সংযুত্ত নিকায়ের ১২, ১৪, ২২, ৩৫, ৩৬, ৪৫, ৪৬, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫১, ৫৪, ৫৫ ও ৫৬ তম সংযুত্ত। খুদ্দক নিকায়ের অন্তর্গত সুত্ত নিপাতের অট্ঠক বগ্গ ও পারায়ণ বগ্গ (বত্থু গাথা বাদে) গাথা অঙ্গের অন্তর্গত হলেও সংকলনের দিক থেকে এরাও সূত্রাঙ্গের সমসাময়িক।

(২) গেয় অঙ্গ – সংযুত্ত নিকায়ের ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১ ও ২১ তম সংযুত্ত। এর অন্তর্গত সুত্তগুলির গাথা অংশ প্রথমে সংকলিত হয়, পরে গদ্যে প্রসঙ্গকথা যোগ করা হয়।

(৩) ব্যাকরণ অঙ্গ – সংযুত্ত নিকায়ের বাকি ২৯টি সংযুত্ত এবং সমগ্র দীঘ, মজ্ঝিম ও অঙ্গুত্তর নিকায়।

(৪) গাথা অঙ্গ – খুদ্দক নিকায়ের অন্তর্গত ধম্মপদ, সুত্ত নিপাত, থেরগাথা ও থেরীগাথা।

(৫) উদান অঙ্গ – খুদ্দক নিকায়ের অন্তর্গত উদান।

(৬) ইতিবুত্তক অঙ্গ – খুদ্দক নিকায়ের অন্তর্গত ইতিবুত্তক।

(৭) জাতক অঙ্গ – খুদ্দক নিকায়ের অন্তর্গত জাতক (কেবল গাথা অংশ)।

(৮) অদ্ভূতধম্ম অঙ্গ – খুদ্দক নিকায়ের অন্তর্গত বিমান বত্থু ও পেত বত্থু।

(৯) বেদল্ল অঙ্গ – খুদ্দক নিকায়ের অন্তর্গত নিদ্দেস ও পটিসম্বিধামাগ্গ।

এরপর সংকলিত হয় নীচের বইগুলি যেগুলি নবাঙ্গের অন্তর্ভুক্ত নয়ঃ

(১০) খুদ্দক নিকায়ের অন্তর্গত অপদান, বুদ্ধবংশ, চরিয়া পিটক ও খুদ্দক পাঠ এবং সমগ্র অভিধম্ম পিটক।

উপরের কালানুক্রমিক স্তরবিন্যাস থেকে বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদ খোঁজার চেষ্টা করা যেতে পারে। উপরের তালিকায় যে স্তরটি যত প্রাচীন, তার মধ্যে বুদ্ধের প্রকৃত বক্তব্য পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি। সেই হিসেবে প্রাচীনতম স্তর সংযুত্ত নিকায়ের সূত্রাঙ্গ অংশে বুদ্ধের প্রকৃত বক্তব্য পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এই স্তরের মধ্যেও পরবর্তীকালে অল্প কিছু প্রক্ষিপ্ত অংশ ঢুকে যাওয়ার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যেহেতু এই স্তরটি সবচেয়ে প্রাচীন, তাই এটি নিশ্চয় বুদ্ধের মৃত্যুর ঠিক পরেই সংকলিত হয়েছিল। কিন্তু আমরা আগেই দেখেছি, বুদ্ধের মৃত্যুর প্রায় সাড়ে চারশো বছর পরে ত্রিপিটক প্রথম লিপিবদ্ধ হয়। এই দীর্ঘ সময়ের মৌখিক পরম্পরায় দুয়েকটি সুত্ত সামান্য বিকৃত হওয়া কিংবা দুয়েকটি বিকৃত সুত্ত যুক্ত হওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়। স্মর্তব্য, ৪র্থ পরিচ্ছেদে আমরা ত্রিপিটকের বিকৃতির কিছু কিছু প্রমাণ পেয়েছি। কাজেই সূত্রাঙ্গ অংশের প্রাচীনতাকে স্বীকার করেও বলা যায়, এর প্রতিটি বাক্যকে চোখ বন্ধ করে বুদ্ধের বক্তব্য বলে গ্রহণ করা উচিত হবে না। তবে আশা করা যায়, একটু বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিচার করলে এর কোন সুত্তগুলি প্রাচীন এবং কোনগুলি প্রক্ষিপ্ত, তা বোঝা সম্ভব।

সূত্রাঙ্গ অংশ থেকে আমরা উপরের তালিকা ধরে যত নীচের দিকে নামব, ততই আমরা বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদ থেকে দূরে সরে যাব। কিন্তু এই পরবর্তী অংশগুলিও দুটি কারণে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এই অংশগুলির সব সুত্ত অবশ্যই বুদ্ধের মতবাদের বিরোধী নয়। এখানেও বেশ কিছু সুত্ত বা গাথা আমরা নিশ্চয় পাব যেগুলি বুদ্ধের মতের অনুসারী। সেই অংশগুলিকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে আমরা ৪র্থ পরিচ্ছেদে উল্লিখিত মহাপরিনিব্বান সুত্তের উপদেশ গ্রহণ করতে পারি। অর্থাৎ যে সুত্ত বা গাথাগুলির বক্তব্য সূত্রাঙ্গ অংশের সঙ্গে মিলবে, সেগুলিই বুদ্ধের বক্তব্য। আর সূত্রাঙ্গ অংশের বিরোধী সুত্ত বা গাথাগুলি বুদ্ধের বক্তব্য নয়। দ্বিতীয় যে কারণে ত্রিপিটকের পরবর্তী অংশগুলি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সেটি হল, এই অংশগুলি ধারাবাহিক ভাবে বিশ্লেষণ করলে বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদ কিভাবে বিকৃত হয়েছিল তা হয়তো আমরা বুঝতে পারব।

এই প্রবন্ধের দ্বিতীয় পর্বে আমরা উপরের বিষয়গুলি বিশ্লেষণ করে বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদ ও তার সম্ভাব্য বিকৃতির কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করব।

তথ্যসূত্রঃ

Analayo, Comparative Notes on the Madhyama-agama

Bodhi, Bhikkhu, The Connected Discourses of the Buddha, A Translation of the Samyutta Nikaya, Wisdom Publications, Boston, 2000

Bodhi, Bhikkhu, The Numerical Discourses of the Buddha, A Translation of the Anguttara Nikaya, Wisdom Publications, Boston, 2012

Choong, Mun-keat, The Fundamental Teachings of Early Buddhism, A comparative study based on the Sutranga portion of the Pali Samyutta-Nikaya and the Chinese Samyuktagama, Harrassowitz Verlag, Wiesbaden, 2000

Choong, Mun-keat, Problems and Prospects of the Chinese Samyukta-agama: Its Structure and Content. In: Konrad Meisig (Ed.), Translating Buddhist Chinese, Problems and Prospects, Harrassowitz Verlag, Wiesbaden, 2010

Conze, Edward, Buddhism, A Short History, Oneworld, Oxford, 2008

Hartmann, Jens-Uwe, Contents and Structure of the Dirghagama of the (Mula-) Sarvastivadins, Annual Report of the International Research Institute for Advanced Buddhology at Soka University 7, 2004, 119-137

Hirakawa, Akira, A History of Indian Buddhism, From Sakyamuni to Early Mahayana, University of Hawaii Press, 1990

Lamotte, Etienne, History of Indian Buddhism, From the Origins to the Saka Era, Institut Orientaliste Louvain-la-Neuve, 1988

Law, Bimala Churn, A History of Pali Literature, Indica Books, 2000

Nanamoli, Bhikkhu & Bodhi, Bhikkhu, The Middle Length Discourses of the Buddha, A Translation of the Majjhima Nikaya, Wisdom Publications, Boston, 2009

Rahula, Walpola, What the Buddha Taught, Grove Press, New York, 1974

Rhys Davids, T. W., Buddhist India, T. Fisher Unwin, London, 1911

Sujato, Bhikkhu, A History of Mindfulness, How insight worsted tranquillity in the Satipatthana Sutta, Santipada, 2012

Suzuki, Teitaro, The First Buddhist Council, The Monist, Vol. 14, No. 2 (January, 1904), pp. 253-282

Walshe, Maurice, The Long Discourses of the Buddha, A Translation of the Digha Nikaya, Wisdom Publications, Boston, 1995

Warder, A. K., Indian Buddhism, Motilal Banarsidass, Delhi, 2004 

বুদ্ধের প্রকৃত মতবাদের সন্ধানেঃ প্রথম পর্ব
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments