আজকের পর্বে লিখছেন শিপ্রা ব্যানার্জি। জন্ম এলাহাবাদে। উচ্চশিক্ষা লাভ করেছেন কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে। ছোটবেলা থেকে একটাই নেশা – নানান ধরণের বই পড়া। কলেজে পড়তে গিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ তৈরী হয়। ৬ বছর সুচিত্রা মিত্রর কাছে তালিম নিয়েছেন। অবশেষে স্যোসাল মিডিয়ার কল্যানে লেখালিখি শুরু। 


(১)

বিকেল চারটে। ব‍্যালকনিতে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন বাসন্তীদি। এই নামেই তিনি পরিচিত অন্তরঙ্গ মহলে। দু কামরার ফ্ল‍্যাটের এই ব‍্যালকনিতেই তাঁর অধিকাংশ সময় কাটে এখন।

বাসন্তী চক্রবর্তী আমার মা| ইনি একজন সাধারন বাঙালী মহিলা। সংসারের হাসি খেলা দায়দায়িত্ব সব সামলে এখন জীবন সায়াহ্ণে| কয়েক দিন ধরেই ইচ্ছে হচ্ছে মায়ের সম্বন্ধে কিছু লিখি। নিতান্তই ব‍্যক্তিগত বাসনা আরকি।

অনেক বছর পিছিয়ে গেলাম‌। ১৯৩৫ – ৩৬ সাল। একটি সপ্রতিভ সদাচঞ্চল বালিকা গ্রামের বাড়ির আঙিনায় দুর্গামঞ্চের সামনে খেলায় মগ্ন। এমন সময় বাড়ির ডাক দুধ খাবার জন্য। বাড়ির কালী গাইএর দুধ। অনিচ্ছুক ভাই (আমার বড়মামা) বোন এক বড় বাটি করে গরম দুধ খেয়ে পড়তে বসলো। একটি আটচালার নিকনো বারান্দায় পড়াশোনার পাট বসতো। পড়াতেন বড় মহাশয় ও ছোট মহাশয়। গ্রামের সব ছোট ছেলেমেয়েরা বই বগলে সেখানে জমায়েত।

এখন গ্রামের কথায় আসা যাক। বাঁকুড়া জেলার বেলিয়াতোড় গ্রামের পাশে ততোধিক ছোট্ট গ্রাম ভট্টপাড়া। কথিত আছে বিষ্ণুপুরের মল্লরাজা রাজসভায় বেদচর্চার জন্য সুদূর দক্ষিণ থেকে কয়েকজন বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণকে এই অঞ্চলে আহ্বান করেছিলেন। তাদের সংসার নির্বাহের জন্য কয়েক একর নিষ্করভূমি দান করা হয়‌। সেখানেই বসবাস শুরু করেছিলেন সেই শ্রদ্ধেয় ব্রাহ্মণগন। পরবর্তী কালে সেই গ্রামটির নাম হয় ভট্টপাড়া।

 

(২)

"মাসিমা, আপনার খাবার ঢাকা দেওয়া আছে। খেয়ে নেবেন। আমার সময় হয়ে গেছে — আমি চললাম।" 
"ঠিক আছে, সাবধানে যেও। আবার কাল এসো।"

বাসন্তী দেবী আবার চেয়ারে বসে থাকেন।

আমার মায়ের গ্রামের নাম কিভাবে ভট্টপাড়া হল উল্লেখ করেছি।যে বালিকাটি বেড়াবিনুনি বেঁধে উঠোনের তেঁতুলগাছের তলায় খেলায় মগ্ন তারই নাম বাসন্তী। তাঁর পিতার নাম পশুপতি ভট্টাচার্য এবং মাতা বীণাপানি দেবী। পিতা কলকাতার রিপন কলেজে শিক্ষা সমাপনান্তে উত্তর প্রদেশের রাজধানী শহর লখনৌতে একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। পূর্বপুরুষগন শোত্রিয় ব্রাহ্মণ — অর্থাৎ বিনা পারিশ্রমিকে বিদ‍্যা দান করতেন। অনেক দরিদ্র মেধাবী ছাত্রের বিদ‍্যালাভ এই গুরুগৃহে থাকা খাওয়া সমেত এবং অবশ্যই বিনা দক্ষিণায়। এই নির্লোভ বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগনের জ্ঞান ও বিদ‍্যাচর্চাই পরম লক্ষ্য ছিল। আমার মাতামহের প্রথম সন্তানের নাম রামশঙ্কর ভট্টাচার্য। তিনি ছিলেন পরম বিদ‍্যানুরাগী ও অসম্ভব মেধাবী। পরবর্তীকালে তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের প্রধান হয়েছিলেন। 

যাই হোক বংশপরিচয়ের ধাক্কায় বাসন্তীর খেলার সময় উত্তীর্ণ হল। ঘরে ফিরে দুই ভাইবোনে ঠাকুমার কাছে আহারাদি সম্পন্ন করে (জ্ঞাতি সম্পর্কের) হরিকাকার কাছে পড়তে বসলো। এইভাবেই দিন গুজরান হয়।

 

(৩)

"মা এই মিস্টিটা কেমন লাগলো খেতে?"
"খুব ভালো ,কোথায় কিনলে?"
"আমাদের বাড়ির কাছেই মৃত‍্যুঞ্জয় সুইটস। ওখান থেকেই আনলাম।"
"এবার অনেক দিন থাকবে কিন্তু।"

এবার পুরনো কথায় ফিরে যাই।কিন্তু সময় এগিয়ে চলে। দু এক বছরবাদে আমার মাতামহ স্ত্রী পুত্র কন‍্যাকে নিয়ে গেলেন নিজ কর্মস্থলে অর্থাৎ লখনৌ তে। সেখানে ভাইবোনে যথাক্রমে Anglo Vernacular school আর জুবিলী গার্লস স্কুলে ভর্তি হল। বংশগত ভাবে মেধাবী এরা। তাই অজ গ্রাম থেকে এসেও সাফল্যের সঙ্গে একের পর এক ক্লাসের সোপান পার হয় অনায়াসে। ইতিমধ্যে ভাইবোনের সংখ‍্যাও বৃদ্ধি হয়েছে গৃহে। বড়কন‍্যা হিসেবে বাসন্তী র দায়িত্ব ও অনেক। সময় সময় ছোট ভাইবোনেদের পরিচর্যা ও সবার রান্নাবান্না করেও তাকে স্কুলে যেতে হতো। কখনো কখনো ১৪বছরের ছোট বোনকে নিয়ে স্কুলে গিয়েছে মা পরীক্ষার সময়। কিন্তু মেধাবী ও বিদ‍্যানুরাগী হওয়ায় সাফল্যের সাথে matriculation with letter marks in compulsory maths and elective .maths and also Sanskrit আর Intermediate Exam প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়।

মোটামুটি জানা গেল বাসন্তী ভট্টাচার্যের পিতৃপরিচয়। এবার আমার দিদিমা বীণাপানি দেবীর কথায় আসি। সেকাল অনুযায়ী তিনি একেবারেই স্বামী পুত্র কন‍্যা প‍রিবৃতা ঘরোয়া এক গৃহবধূ ছিলেন। বহুদিন গ্রাম‍্য পরিবেশে থেকেও অত‍্যন্ত নম্র সভ‍্য ও মৃদুভাষিণী ছিলেন। বাসন্তী ও রামশঙ্কর ছাড়াও আরও চার পুত্র কন্যার জননী ছিলেন তিনি।

 

(৪)

স্কুলে যাবার পর বিদ‍্যাচর্চার সাথে সাথে জ্ঞান সমুদ্রের দ্বার উদ্ঘাটন হচ্ছিল কিশোরী বাসন্তীর জীবনে। মায়ের থেকে তার জীবনধারা এগিয়ে চলেছিল অনেক। তখন শুধুই ইতিহাস, সাহিত্য, ভাষা ( সংস্কৃত, ইংলিশ ও বাংলা ) অঙ্ক ইত‍্যাদি। আগেই বলেছি সমস্ত গৃহকর্ম করে তবেই মা লেখাপড়া করতে পারতো। ফলশ্রুতি হিসেবে পরবর্তী কালে নিজের চার কন‍্যাকে তিনি গৃহকর্ম কিছু করতে দেননি নিতান্ত মধ‍্যবিত্ত হওয়া সত্ত্বেও.

বাসন্তী ভট্টাচার্য যখন B. A. পাঠরতা তখন এলাহাবাদের এক চক্রবর্তী পরিবারে তার বিবাহ হয়। পাত্র (আমাদের বাবা ) Defence Account s এ কর্মরত। নাম শ্রী নন্দকুমার চক্রবর্তী‌। তার পিতা শ্রী শিবেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী। তৎকালীন দাপুটে অফিসার ( Deputy Comptroller of Defence Accounts )।

বিবাহোত্তর পাঁচ ছয় বৎসর চার কন‍্যার জননী হওয়া ব‍্যতীত আর কোনো ঘটনা নেই। ছোট মেয়ের অন্নপ্রাশনের পর স্বামীর বদলীর সূত্রে কলকাতায় বসবাস শুরু। তখন আমার মায়ের বয়স মাত্র পঁচিশ বছর।

 

(৫)

বিবাহোত্তর পাঁচ বছরে মায়ের পড়াশোনার পাট একেবারেই ছিলনা। কলকাতায় এসে আবার লেখাপড়া শুরু করলো মা। ছোট ছোট চার মেয়েকে সামলিয়ে, স‌ংসারের সমস্ত কাজ করে (আক্ষরিক অর্থে) private এ B. A. Exam এর preparation শুরু হল। শুনেছি রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে মা ব‌ই খুলে বসতো। আমার দাদু Lucknow University থেকে migration certificate করে পাঠিয়ে ছিলেন। আমরা যেহেতু অতি সাধারণ মধ‍্যবিত্ত পরিবার আর সালটাও পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে আশেপাশের প্রতিবেশী র কাছে মাকে অনেক ব‍্যঙ্গ বিদ্রুপ সহ্য করতে হয়েছিল‌। শেষ পর্যন্ত জেদ ও মেধাই জয়ী হল। ঠিক সময়ে মা graduate হল, যদিও result খুব একটা আশানুরূপ হয়নি। এই সমস্ত পরিচ্ছেদ যদিও আমার স্মৃতি তে নেই।

ইতিমধ্যে আর্যকন‍্যা বালিকা বিদ‍্যালয়ে মা শিক্ষকতা শুরু করলো। কিন্তু বাচ্চা মেয়েদের দেখাশোনা করার কেউ ছিলোনা তখন। শুধু পরিচারিকার কাছে তাদের রেখে যাওয়া অসম্ভব ছিল। উপায়বিহীন হয়ে মাকে ছাড়তে হয়েছিল তার নিজস্ব কর্ম ক্ষেত্র। এজন্য কিন্তু মায়ের মনে কোন আক্ষেপ ছিলনা। একেবারেই স‌ংসারে মন দিয়েছিল মা। নিজের দায়িত্ব সম্বন্ধে খুব ই সচেতন ছিল মা আর তাতে অবহেলা কোনভাবেই বরদাস্ত করেনি কোনদিন। স্বাধীনচেতা অথচ সংসারী, গৃহকর্মনিপুণা মা-কে ই দেখে আসছি জ্ঞানাবধি। 

বাবার বদলির চাকরি, তাই তিন – চার বছর অন্তর ভারতের নানা জায়গায় ঘুরতে হত তাকে। মা ই সমস্ত দায়িত্ব মাথায় নিয়ে আমাদের মানুষ করেছে। পাইকপাড়ায় একটা বাড়ির একতলায় আমরা চার বোনে থাকতাম মায়ের সঙ্গে‌। সে বড়ই সুখের দিন ছিল।

 

(৬)

আমরা খুব সুস্থ স্বাভাবিক শৈশব কাল কাটিয়েছি। একটি দু কামরার ছোট্ট ফ্ল্যাট সবসময়ই হাসি গল্পে, তর্কে – বিতর্কে, বই – কাগজ – পত্রিকায় মুখর হয়ে থাকতো। এরসঙ্গে মায়ের নানা মখরোচক রান্না, দামী নয় কিন্তু অত‍্যন্ত সুরুচিসম্পন্ন পোষাক আষাক, আমাদের বন্ধু-বান্ধব এমনকি মায়ের বন্ধুরাও বাড়িটাকে হাসি গল্পে মশগুল করে রাখতো। 

এবার আমাদের পাড়া সম্বন্ধে কিছু বলি। পাইকপাড়ার টালাট‍্যাঙ্কের একদম কাছেই আমাদের বাড়ি। শ্রদ্ধেয় সাহিত‍্যিক শ্রী তারাশঙ্কর বন্দোপাধ‍্যায় এর প্রতিবেশী ছিলাম আমরা। এছাড়াও কাজী নজরুল ইসলাম এবং শৈলজারঞ্জন মুখোপাধ‍্যায়ের বাসস্থান ছিল পাইকপাড়া। এই জায়গাটা কলকাতার ভেতর হলেও খুব ফাঁকা এবং সবুজে ঢাকা। বিখ্যাত টালা ঝিল পার্কে প্রচুর লোক ভ্রমণ করে। এখন মা এই পাড়াতেই একটা ফ্ল‍্যাট কিনেছে‌।

আবার মায়ের কথায় আসি। মা শুধু বিদ‍্যানুরাগী নয় এর সাথে সঙ্গীতানুরাগীও। যথাসাধ‍্য মেয়েদের নাচগান শিখিয়েছে‌। এসব শিক্ষা র জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষক, আনুষঙ্গিক যন্ত্র বা বাজনা কোনকিছুর ই ত্রুটি হয়নি কখনো। ব ই খাতা পেন এসবের ও অভাব হতোনা। অসম্ভব প্ল‍্যান করে সংসার চালাতে হতো মাকে। আমি এসব কথা উল্লেখ করছি এই কারণে যে আমার বাবা কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী হলেও অতিরিক্ত অমিতব‍্যায়ী ছিলেন। আয় ব‍্যায়ের কোন সমতা ছিলনা।ফলত, মাকে শারীরিক মানসিক দু রকমের পরিশ্রম ই করতে হয়েছে। নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছে প্রায় সবই বিসর্জন দিতে হয়েছিল তাকে। ছোট বেলায় বুঝিনি কিন্তু পরে বিবাহিত হয়ে নিজে সচ্ছল ভাবে সংসার চালাতে গিয়ে মায়ের অবদান বুঝতে পারি।

 

(৭)

পাইকপাড়ায় আমাদের সবকিছু — মানে বাল‍্যের হুড়োহুড়ি, কিশোরী বেলা র ছুটোছুটি আর যৌবনের মায়াবী হাতছানি সবই। প্রথমে ছোটবেলার কথাই বলি। আমাদের পাড়ায় অনেক গুলো পার্কের মধ্যে একটা লেডিস পার্ক ছিল। সেখানে বেশ কয়েক টা বকুল গাছ আর মালীর যত্নে অনেক সাজানো গোছানো ছিল। এখনো স্মৃতিতে আছে সাহিত‍্যিক তারাশঙ্কর বন্দোপাধ‍্যায় আর ও অনেক সাহিত‍্যিক বন্ধুদের সঙ্গে ওনার বাড়ির সামনে বসে আছেন। ওনার কয়েক জন নাতি আমার বন্ধু ছিল। তাদের ডেকে নিয়ে আমরা এক ছুটে পার্কে চলে যেতাম। তারপর উদ্দাম খেলা। বাড়ি ফিরতাম যখন চুলের রিবন উধাও আবার কখনও বা জুতোর একপাটি খুঁজে পাওয়া যেতনা। 

ছোটরা যখন খেলায় মত্ত আমাদের মায়েরা তখন পার্কের লনে বসে গল্পগুজব করতো। মায়ের হাতে একটা প্ল‍্যাস্টিকের বালতি ব‍্যাগ থাকতো। বিকেল থাকতে থাকতে ই মা ওই বাস্কেট হাতে টালাব্রীজ দিয়ে হেঁটে শ‍্যামবাজারে বাজার করে ফের ওই রাস্তা ধরে সন্ধের মধ্যে বাড়ি ফিরতো। তখন পাইকপাড়ায় বা বেলগাছিয়ায় বিকেলে বাজার বসতো না। বাজার ভর্তি ভারী ব‍্যাগ নিয়ে মা বাসে উঠতে পারতো না। তাই হাটা। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা এসেছে গিয়েছে প্রকৃতির নিয়মে। মা কিন্তু তার দায়িত্বে অনড় ছিল। ছয়ের দশকের প্রথম থেকে আটের শেষ দিক পর্যন্ত এ ব‍্যবস্থার অন‍্যথা হয়নি। আগেই বলেছি আমরা বোনেরা খুব সুস্থ ও নীরোগ ছিলাম। তার অন‍্যতম কারণ মায়ের এই কষ্টসহিষ্ঞুতা। পাড়ার পুরনো লোকজন এখনো এই কথা বলে। 

সন্ধেবেলায় আমরা পড়তে বসতাম মায়ের কাছে। আমাদের কোনো গৃহশিক্ষক ছিলো না। ওই সময়ে খুব ভয় পেতাম মাকে। আমি একটু ফাঁকিবাজ ছিলাম আর অন্য বই পড়ার দিকে মন ছিল খুব। মায়ের মতো মেধাবী না হওয়ায় একটু আধটু বকুনি খেতাম সবাই। 

কালের নিয়মে চার বোনে বড় হলাম ক্রমশ। যার যার মেধানুযায়ী কেউ স্কটিশ কেউ বেথুন। কেউ রবিতীর্থ ( গানের স্কুল ) কেউ কত্থক নাচে তালিম নিচ্ছে।

আপাতদৃষ্টিতে বাসন্তী দেবী একজন সাধারন শিক্ষিতা মহিলা মাত্র। কিন্তু ওনার কাজকর্মের মধ্যে সর্বদাই একটা জীবন প্রবাহ বয়ে চলতো, যাকে বলে সচলতা। হতাশা কে মনে কখনো ই স্থান দেয়নি মা। প্রবাসী হওয়ার সূত্রে বাড়িতে প্রায়ই আত্মীয় স্বজন আসতো। অতিথির খাওয়া শোওয়ার ব‍্যবস্থার কোন ত্রুটি কখনো হয়নি। অত‍্যন্ত গৃহকর্মনিপুণা হয়েও শুধু সংসারে আবদ্ধ থাকেনি মা। অনেক বছর নিখিল ভারত মহিলা সমিতির (AIWC) সম্পাদিকা হিসেবে কাজকর্ম করেছে ।

 

(৮)

ঘর সংসার ছাপিয়ে মায়ের কাছে সুযোগ এল নিজের ব‍্যক্তিত্ব প্রকাশের। পাড়ার ই একজন বয়স্কা মহিলা ( ড: সরলা ঘোষ, তখনকার দিনের গাইনোকলজিস্ট) এই সমিতির সদস‍্য করেছিলেন মা ও তার বন্ধুদের। প্রথমে general member হলেও খুব তাড়াতাড়ি executive body র member এবং আরও শীঘ্র North Calcutta Constituent Branch এর সেক্রেটারি পদ পেল মা। ব‍্যাপারটা এত সহজ ছিলনা মোটেই। আমাদের বাড়িতে ফোন নেই তখন, গাড়ি তো দূরস্ত। পদটি গাল ভরা হলেও একেবারে ই honorary। এই সুবাদে প্রচুর মিটিং এ্যাটেন্ড করতে হত, শুধু পাইকপাড়ায় নয় কলকাতার অন‍্যান‍্য শাখাতেও। সেক্রেটারীর দায়িত্ব হিসাবে মিটিং ডাকতেও হতো মাকে। প্রচুর সময় দিতে হয়েছে মাকে এই সব কাজকর্মে। সবই কিন্তু বাড়ির কাজ সামলে। তখন আমরা বড় হলেও আমাদের পড়াশোনা গানবাজনা টিউশন করা সবই ছিল। তবু আমার দিদি ঘরের কাজে মাকে একটু সাহায্য করতো। ক্রমশ এইভাবে পাড়ায় বাসন্তী চক্রবর্তী একজন মান‍্যগন‍্য মহিলা গন‍্য হয়েছিলেন। আরও অন‍্যান‍্য সদস‍্যাও যথেষ্ট উপযুক্ত এবং সম্মানিতা ছিলেন কিন্তু তারা খুব ই ধনী পরিবারের। শুধু আর্থিক কারণে র জন্য মা কখনো ই হীনমন‍্যতার শিকার হয়নি। একটি ভালো তাঁতের শাড়ি আর হাতখোঁপাতেই বাসন্তীদি ever smart একথাই সবাই বলতো। AIWC র কাজে শুধু কলকাতায় নয় দিল্লি কেরল গুজরাট বম্বে হায়দ্রাবাদ এবং আরও অনেক জায়গায় মাকে যেতে হয়েছে। এই মহিলা সমিতি নানা সমাজকল‍্যাণ মূলক কাজ কর্ম করে।

এর পাশাপাশি মা শাড়ির ব‍্যবসাও শুরু করলো। প্রথমে অল্প হলেও পরে এই ব‍্যবসা বাড়তে লাগলো। এটাও মার একটা সফলতার উদাহরণ। আমার চোখের সামনেই সচ্ছলতা এল বাড়িতে। কত হাজার শাড়ি যে মা তখন বিক্রি করেছে, সবই কিন্তু বাড়িতে ই। সেই সময়ে সংসারের দায়দায়িত্ব থেকে অনেকটা মুক্ত হওয়ায় মা সময় দিতে পারতো সমিতি আর নিজস্ব ব‍্যবসায়। প্রচুর সচ্ছল তখন মা। কিন্তু চালচলনে কোনো বাহ্যিক পরিবর্তন আসেনি। ইতিমধ্যে আমরা চার বোন বিবাহিতা আর আমাদের বাবা গত হয়েছেন।

 

(৯)

সম্পূর্ণ নিজের উপার্জনের অর্থে মা আমাদের পাড়াতেই একটা ফ্ল্যাট কিনতে সক্ষম হল, মেয়েদের সাহায্য ছাড়াই। বলা বাহুল‍্য আমার বাবার কোনো জমানো টাকা ছিলোনা বা তিনি রাখতে পারেন নি। কিন্তু মা এত স্বয়ং সম্পূর্ণা যে তার কোনো প্রভাব ই আমাদের ওপর পড়েনি। 

আমার মায়ের তিন বার সেরিব্রাল এ্যাটাক হয়। প্রথম দুবার সামলে উঠে আগের মতই নিজস্ব কাজ করতে মা সমর্থ হয়েছিল। কিন্তু ৭৬ বছর বয়সে শেষ স্ট্রোক হবার পর ক্রমশ গৃহবন্দী হয়ে গেল মা। এখন সকাল সন্ধে সামনের ব‍্যালকনীতেই দিনের বেশির ভাগ সময় কেটে যায়। একজন মহিলা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মায়ের দেখাশোনা করে। আর মেয়েরা তো আছেই‌। বাসন্তী দি এখন পাঁচ নাতি নাতনির নানি। আমার বোনের মেয়ে খুশি অপেক্ষা করে আছে আমার লেখার কোন পর্বে নাতি-নাতনির কথা আসবে। আমি ওকে বলেছি আগে নানির মত অঙ্ক আর অত সুন্দর সোয়েটার আর কুরুশ বোনা শিখতে। ওর মা মাসিরাও অবশ‍্য জানেনা।

সব খাবার ই যেমন মিস্টি রসগোল্লা পায়েস অথবা কোর্মা পোলাও হয়না কিছু তিক্ত কটু স্বাদের পদ ও থাকে মায়ের চরিত্রেও তা বর্তমান ছিল। আমার লেখার প্রতি সততা রেখেই বলছি যে অনেক চারিত্রিক গুণের অধিকারী হলেও একটু জাতের গোঁড়ামি ছিল মায়ের মনের মধ্যে। অন্তত বিয়ের ব‍্যাপারে মা পুরনো প্রথা মানতো। এজন্য অনেক অবাঞ্ছিত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে আমার মতে যা উচিত ছিলোনা। এই সম্বন্ধে মেয়েদের সঙ্গে মায়ের মতবিরোধ চলতোই‌। 

পরিশেষে বলি মা সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে হয়তো আমি আবেগের বশবর্তী হয়েছি। এটা খুব ই স্বাভাবিক যে সব বাবা মা-ই নিজেদের ক্ষমতা অতিক্রম করে সন্তানদের বড় করে তোলে। বিশেষ করে মা, তাদের অনেক আত্মত‍্যাগ ই অন্তরালে থেকে যায়। এটা প্রতিটি পরিবারেরই ঘটনা। আমার মাকে হয়তো একা এই লড়াইটা করতে হয়েছে।

সম্প্রতি AIWC থেকে বাসন্তী চক্রবর্তী কে তার‍ Life time achievement এর জন্য একটা সম্বর্ধনা জানানো হয়েছে। মায়ের বাড়িতে ই এই অনুষ্ঠানটি হয় । মনে হল বাহির জগত থেকে যখন মা সম্মান পেল তখন মেয়েদের মধ্যে থেকে কেউ কিছু লিখে রাখুক মায়ের কথা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। তাই এই উপস্থাপনা। কথায় আছে মাতৃঋণ অপরিশোধ‍্য – আমি সে চেষ্টাও করছিনা। এটা ঋণস্বীকার মাত্র।

 

বাসন্তীর ইতিকথা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments