- এই যে, এদিকে।
- অবশেষে এলি। সেই কখন থেকে ঠায় দাঁড়িয়ে! ক্ষমা চা।
- ঠিক আছে, আর হবেনা, প্রমিস!
- ঠিক? যতবার দেখা করেছি আমরা, একদিন বাদে সবসময় আগে এসে ওয়েট করেছি তোর জন্য!
- হ‍্যাঁ, কৃতজ্ঞতা। তবে ওই একদিনটা ভুলিনি এখনও। কি কাঁচুমাচু মুখ করে অলমোস্ট দৌড়াতে দৌড়াতে এসেছিলি!
- কি করব? লেট করাটা তো তোমার মত অভ‍্যেস করে ফেলিনি! হতচ্ছাড়া জ‍্যামে ফেঁসে গেছিলাম সেদিন। কোন সিনেমা ছিল বলতো?
- সব চরিত্র কাল্পনিক। সিটি সেন্টারে। টেস্ট নিচ্ছিস, মনে রেখেছি কিনা?
- না, তা কেন? আমিও তো ভুলে যেতে পারি..
- বাজে বকিস না। যদ্দুর চিনেছি, কিছুই ভুলিসনা তুই! এই যে এতগুলো বছর কেটে গেছে, ভুলতে পেরেছিস আমাকে?

- ভুলতে চাইনি বলেই হয়তো..
তুই ভুলে গেছিস, সবকিছু?
- জানি না! মনে হয় গতজন্মের গল্প। কিছু পরিস্কার, কিছু ধোঁয়াশা। সেদিন জানিস, কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না, তোর সেই জোনাকি-রঙা তিলটা কাঁধের ঠিক কোনদিকে..
- আমার কিন্তু সব মনে আছে। সেই ক‍্যাবলা কলেজ বেলার প্রপোজ থেকে তোর প্রথম চাকরির সুখবর। তুই গেছিস ক‍্যাম্পাসিংএ, আর চিন্তায় মরছি আমি। মোবাইলটার দিকে চেয়ে বসে আছি। মা কিন্তু সব বুঝতে পারত। বলে, ইন্টারভিউটা তোর, না ওর? শেষে রাত দশটায় ফোন। মনখারাপ গলাতে বললি, লাস্ট রাউন্ডে আর সিলেক্টেড হোসনি। ভেতরে খুব খারাপ লাগলেও সবে তোকে সান্ত্বনা দিতে শুরু করেছি, অমনি জোরে চেঁচালি, পেয়ে গেছি চাকরিটা!! জানিস, আনন্দে চোখে জল এসে গিয়েছিল…
- সত্যি, কত গল্প। তোর দেওয়া শার্ট পরে জয়েন করেছিলাম, তোর জবরদস্তিতে। শ‍্যাওলা সবুজ শার্টটা তোলা আছে কোথাও, আলমারির কোনও কোণে। কিছুই ফেলিনি।

- আচ্ছা, তোর সেই অর্পনকে মনে আছে? সেদিন দেখা হল, মেট্রোতে। দেশে ফিরেছে কদিন আগে।
- মনে থাকবে না আবার? ওকে নিয়ে তোর আমাকে এপ্রিল ফুল করা, হারামিপনাতে তুইও কম যাসনা কিন্তু!
- কি করলাম আমি?
- আমাকে বললি, অর্পন তোকে প্রপোজ করেছে। অথচ কলেজ সুদ্ধু সবাই জানে, আমি তোর অফিসিয়াল বয়ফ্রেন্ড। শুনে সত্যি বলতে, ভীষন রাগ হয়েছিল। তক্ষুনি অর্পনকে ফোন করে, ঝাড় দিলাম। ও তো কিচ্ছু না বুঝে তোতলাচ্ছে জাস্ট্! তখন হাসতে হাসতে ফোন কেটে দিয়ে বললি, মজা করছিলি। কি সাংঘাতিক!
- ইশশ্, পরে ওকে ফোন করে স‍্যরিও বলেছিলাম মনে আছে। সুপর্না শুনে বলে, করেছিস কি। অর্পন কিন্তু তোকে সত্যিই ভালোবাসে! নেহাত কোনও সীন নেই, তাই বলেনি কখনও কিছু। কেলেঙ্কারির একশেষ! খুব পজেসিভ ছিলি না, আমাকে নিয়ে? অথচ সেই তুই কেমন পাল্টে গেলি আস্তে আস্তে…
- তাই কি? সত্যিই কি আমরা কেউ পাল্টে যাই? নাকি সময়, সময়ে সময়ে এক এক রকম চশমা পরিয়ে রাখে? সেজন্য আশেপাশের মানুষগুলোকে দেখি বিভিন্ন ভাবে… কখনও রঙিন, কখনও ধূসর..

- কেন পাল্টায় সময়? রূপকথার শেষে যেমন থাকে, and they lived happily ever after.. ওখানেই কেন শেষ হয়না আমাদের গল্পগুলো? ভাব, সেই বেপোরোয়া লাগামছাড়া কলেজ বেলার দিনগুলো… কোনো চিন্তা নেই, ভাবনা নেই, একসাথে ক্লাস বাঙ্ক করা, তোর পক্ষীরাজে চড়ে তেপান্তরের মাঠ, একসাথে বৃষ্টি-আদর.. আকাশে মেঘ দেখলেই তুই ঘাবড়ে যেতিস..
- সাইনাসের প্রবলেম থাকলে তুইও তাই করতিস। ঠান্ডা লেগে যাওয়ার ভয়ে ফ্রীজ থেকে জল অব্দি খেতাম না।
- হমম, খুব ঠাণ্ডা বাতিক তোর। গরমকালে কেউ হালকা চাদ‍র গায়ে ঘুমোয়, তোকে দেখেই জেনেছিলুম। কিন্তু, কতবার বৃষ্টিতে ভিজেছি আমরা, বল? প্রথম প্রথম ন‍্যাকামি করতিস, পরে কখনো না করিসনি।
- না করলে শুনতিস তুই? আগের জন্মে ময়ূর বা ব‍্যাঙ ছিলি নিশ্চিত!

কোথায় হারিয়ে গেলি? এই থেকে থেকে হারানোর অভ‍্যেসটা এখনও যায় নি দেখছি..
- নাঃ, ভাবছিলাম দিনগুলো… সেদিন দেখলাম, শিমুলতলার মসজিদ লাগোয়া সেই দাঁত বেরোনো পোড়ো বাড়িটা ভাঙা হচ্ছে, জানিস.. ফ্ল‍্যাটবাড়ি উঠবে কোনও। আগে থেকে জানলে, ছাদটা দেখে আসতাম একবার। মনে আছে বাড়িটা?
- ভূতের বাড়ি তো? লোকজন যেতনা খুব একটা ওদিকে, আমরা ছাড়া।
- আর ছাদে শুয়ে তারা গুনতাম আমরা..
- ওটা তোর ডিপার্টমেন্ট ছিল। আমি যেতাম হাওয়া খেতে। যা ঠান্ডা হাওয়া দিত চারতলার ওপর.. লোডশেডিং হলে ছাদ থেকে সার সার বাড়িগুলোকে অদ্ভুত মায়াবী লাগত। বিশেষ করে বৃষ্টি থামার পর… যেন জলের মাঝে মাঝে জেগে থাকা দ্বীপ কয়েকটা..কোথাও কোন শব্দ নেই, মাঝে মাঝে পাতা বেয়ে ঝরে পড়া বৃষ্টির টুপটাপ শুধু। যেন সাত-সন্ধ‍্যেতেই মাঝরাত নেমেছে রাস্তায়।
- আমার অন্য সময়ও বেশ লাগত বাড়িটাকে, জানিস..চারদিকের শিমুলতলা আলোয় আলোময়, পথ-আলো, ঘর-আলো, দূরে ছোট্ট স্টেশন, মাঝে মাঝে ট্রেনের আলো..আর কত রকম দূর থেকে ভেসে আসা আবছা শব্দ…সব যেন বুড়ো বাড়িটাতে এসে পথ হারাতো… আমরাও হারাতাম, নিজেদের..
- হমম, সময় খেয়াল থাকত না ওখানে গেলে। একবার মনে আছে? শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখছিলাম চুপ করে, কানে অর্ধেক হেডফোনে বাজছে, লগ যা গলে কি ফির ইয়ে হাসিন রাত হো না হো.. বাকি অর্ধেক তোর কানে…মাঝে মাঝে তুই হাবি জাবি বকে চলছিস নীচু গলায়… শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, খেয়ালও নেই ! তুই বেশ খানিকখন বাদে টের পেয়েছিলি।
- বাব্বা, পারিস বটে। তবে, ওদিনই বুঝেছিলাম, ঘুমোলে তোকে কি সুন্দর লাগে দেখতে… সারাদিন এর ওর লেগপুল করছিস, আমার ওপর হম্বিতম্বি করছিস, অবুঝের মত ঠোঁট ফোলাচ্ছিস কখনও অকারণে.. অথচ ঘুমোলে ছোট্ট বাচ্চা একটা…এত সরল, নিষ্পাপ লাগে তোকে, কি বলব… মনে হয়েছিল, এই ছেলেটাকে মনে হয় একেবারে চিনিনা আমি। ডাকতে ইচ্ছে করেনি…নেহাতই ভুতে ভীষন ভয় পাই, তাই…।
- ভুতে ভয় পাওয়ার কি আছে! ভুত মানে তো অতীত… সেরকম দেখতে গেলে সব মানুষের পাস্টই তার ভুত একরকম। আজ যেমন তোকে সেই সময়ের ভুতে পেয়েছে!
- আর তোকে পায়নি? সেই কখন এসছিস, একবারও জানতে চেয়েছিস, কেমন আছি আমি আজকাল?
- কি হবে? ভালো খারাপ থাকাটা তো যে যার মত, আবার প্রাসঙ্গিক শুধু মূহুর্ত্তে। সবাই নিজের মত করে ভালো থাকতেই চায়। তুই চাস না?…
- খুব চাই। কিন্তু পারি কই? তোর ওপর নির্ভর করতে করতে আমি কেমন ডানা ছাঁটা পাখি হয়ে গেছি, জানিস…তুই ছিলি আমার অ্যাভেঞ্জার, অরন্যদেব! যেকোনো সমস‍্যায় তোকে বলেছি, সামলে দিয়েছিস হেলায়। তাই তোর অভাবটা বড় বেশি করে ধরা পড়ে। কেন চলে গেলি এভাবে? চাকরির ট্রেনিং পিরিয়ডে যখন শিমুলতলা ছাড়লি, হাওড়া স্টেশনে ট্রেন ছাড়বে ছাড়বে…বাইরে তুমুল নিম্নচাপ, তিনদিন টানা বৃষ্টি হয়ে চলেছে… আর আমার মনের মধ্যেও ঘূর্ণি.. জড়িয়ে ধরলি শেষ বারের মত..অনেক কষ্টে কান্না চেপে রেখেছি, যাওয়ার আগে তোর মন খারাপ হবে নয়তো… তুই ট্রেনে উঠলি, ছাড়ার সিগন্যাল হল.. দেখলাম, তোর চোখের কোণেও চিকচিক করছে জল। আর পারিনি আটকাতে… বাঁধভাঙা জল এল গাল বেয়ে।ফেরার পথে ভিজতে ভিজতে এসেছিলাম, আর সারা রাস্তা কেঁদেছিলাম… শহর, আকাশ সবাইকে পাশে নিয়ে। আমার তো সব রইল…চেনা সবকিছু! কিন্তু তুই? একা একা অচেনা জায়গায় চলে গেলি আমার সবটুকু নিয়ে…

- ইতু, ইতুউউউ, কি করছিস বাবু অন্ধকারে একা একা দাঁড়িয়ে? দেখেছো মেয়ের কাণ্ড, না জ্বেলেছে আলো, না চালিয়েছে এসি! কখন ফিরেছিস অফিস থেকে, খাবি তো কিছু? নিচে আয় ফ্রেশ হয়ে, আমি খাবার বাড়ছি।

- কোথায় লুকোলি মাকে দেখে? ভয় নেই, নিচে চলে গেছে।
- এই তো, আছি। একটা কথা জিজ্ঞেস করি? সত্যি কেমন আছিস তুই?
- তুইই তো বললি, সবাই ভালো থাকতে চায়। আমিও ব‍্যতিক্রম নই। ভাবিস না, ভালো আছি, এভাবেই। তুই আছিস তো! প্রথম কদিন খুব কষ্টে ছিলাম… তুই নেই ভাবলেই মাটি টলে যেত, চোখে অন্ধকার দেখতাম। আস্তে আস্তে তোর এভাবে পাশে থাকাটাই অভ‍্যেস হয়ে যাচ্ছে…

ওইদিন সকাল থেকেই কেমন একটা অদ্ভুত ফীল হচ্ছিল, বমি বমি ভাব, খেতে ইচ্ছে করছিল না কিছু! তোর সাথে দুদিন ঠিক করে কথা হয়নি, এগ্জামের প্রেশার চলছে ট্রেইনিং এ। তুই পূজোতে বাড়ি ফিরবি, সেটাও মাসদুয়েক বাকি… ভাল্লাগছে না কিছুই… অফিসে মন বসছে না, বাড়িতে টিকতে পারছিনা… বই, গান কিছুই মন ভোলাতে পারছে না, অদ্ভুত চাপ!

সন্ধ‍্যেবেলা তোর রুমমেট সায়নের ফোন এল। তোর আ্যক্সিডেন্ট হয়েছে… অফিস ক‍্যাবে একাই ছিলি, একটা হাইস্পিড বাসের সাথে কলিশন। তুই আর ক‍্যাব ড্রাইভার, দুজনেই স্পট ডেড। প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। সকাল থেকে অস্বস্তিটা তলপেট থেকে বমি হয়ে উঠে এল। চোখ জ্বলছে মরুভূমির মত, একফোঁটা জল নেই।

জানিস, আমি শুনতে পাই নিচ থেকে বাবা মার রাতজাগা দুশ্চিন্তা। বলি, চিন্তা কোর না, কে শোনে কার কথা। আমি নাকি স্বাভাবিক হতে পারিনি তোর চলে যাওয়ার পর! তুই বুঝছিস কিছু ডিফারেন্স? অদ্ভুত সবাই! মাঝে মাঝে ভাবি, এ কোন্ পৃথিবী আমাদের? জীবন আর মৃত্যুর কোনও সীমারেখা আর নেই বোধয়…এসবই যার যার মত, এবং প্রাসঙ্গিক শুধু মূহুর্তে, তাই না?

শুনেছিলাম তোকে হিমঘরে রেখেছিল পুরো একটাদিন। আমি চিন্তায় মরছি এদিকে। তোর তো ঠান্ডা লাগার ধাত… খুব শীত করছিল, না রে? আমারো জানিস ইদানীং খুব শীত করে…বেশি বেশি করে শীত… মা বলছিল না, এসি চালাইনি কেন? ঠান্ডা লাগে আমার, সবসময়! আর ভিজি না বৃষ্টিতে… পরের জন্মে হবে নয়? যদি ময়ূর বা ব‍্যাঙ না হয়ে, মানুষ হয়ে জন্মাই, তবেই!
চুপ করে মন দিয়ে কি শুনছিস বলত তখন থেকে? এত চুপচাপ তো থাকিস না তুই! শোন, এবার মা চেল্লাবে। ফিরছি এখুনি, থাক প্লিজ, চলে যাস না….জানিসই তো, খুব ভুতের ভয় আমার! আসি, কেমন?..

ভালো থেকো, ভালোবাসা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments