পৃথিবীতে আজ দিন নেই, রাত নেই। অদ্ভুত আবছা আঁধার সব সময়। শুনশান ফাঁকা সরীসৃপের মতো পিচরাস্তা। হলুদ চাঁদের ল‍্যাম্পপোস্ট পাহারা দিচ্ছে তার মৃতদেহ। হাওয়ার নামগন্ধ নেই চারপাশে। গাছের পাতা নড়ছে না, কিন্তু গরমও নেই খুব একটা। হঠাৎ করে যেন সব ঘড়ি থেমে গেছে, নিমেষে। একটা অতিবুড়ো ফোকলা তেঁতুল গাছের মগডাল থেকে, কোত্থেকে একটা প‍্যাঁচা উড়ে গেল, ডানা ঝাপটে। আলপিন-পতন নিঃশব্দ একটু হলেও চমকে গেল, মুহূর্তের জন্যে। আবার যেই কে সেই, আগের মতো, দেওয়ালে ঝোলানো ছবির মতো। গাছের নিচু একটা ডালে বসে, পা দোলাতে দোলাতে পুরোনো কথা ভাবছিল, বলরাম সাঁপুইয়ের ভূত। কোন সাল এটা? মনে করতে পারে না। জীবনে একবার করা চোলাইয়ের নেশাটাকে যেন কেউ, মাথার চোরা-কুঠুরীতে আটকে চাবিটা হারিয়ে ফেলেছে। একটা স্বপ্নের ঘুম ভাঙে আরেকটা স্বপ্নে। নাকি এটাই অন‍্য কারও দীর্ঘ না-শেষ স্বপ্নধাঁধা একটা? যেখানে সে ঢুকে তো পড়েছে, কিন্তু বেরোনোর রাস্তা ভুলে মেরে দিয়েছে, বেমালুম।

এতসব গুরুগম্ভীর চিন্তার মাঝে, হঠাৎ মাথার চুলে টান পড়ল বলরামের। উফফ্, চমকে উঠে আরেকটু হলেই নিচে পড়ত, সটাং। পেছন ফিরে দেখে, মধুমিতা। একহাত জিব কাটল তাড়াতাড়ি। দেখেছো, একদম ভুলে মেরে দিয়েছে। কিন্তু, কি যে ছাতার মাথা ভুলেছে, সেটা আর মনে করতে পারছে কই? কেমন মাথার মধ্যেটা, কলকাতার শীতের খুব-সকালের ধো়ঁয়াশাতে হাঁকু-পাকু। মেয়েটার নাম স্পষ্ট ঘাই মেরে উঠল। কিন্তু, তার সাথে কোন জন্মের সম্পর্ক, ভূত-জন্ম, নাকি তার আগের মানুষ-জন্মের? সেটা মনের গলি-ঘুঁজি, তস‍্য কোণঠাসা বাঁক ঘেটেও, মনে করতে পারল না সে।
- সঙের মতো এখানে বসে আছো কোন আক্কেলে, শুনি! পাঁচদিন ধরে বলদ-খোঁজা খুঁজে যাচ্ছি। বলি, শুনতে পাচ্ছো?!
রীতিমতো ঝাঁঝালো মেজাজ‌। এতো বড্ড মুশকিল হল! নাম যখন মনে আছে, ভালোই চেনে, ধরা যায়। অপ্রস্তত হওয়ার থেকে বাঁচতে, ডাল থেকে একলাফে নিচে নেমে লম্বা, সিড়িঙ্গে পা দুটো চালিয়ে হাওয়া হল সেখান থেকে। মরুক গে, পরে মনে পড়লে, সামলে নেওয়া যাবে।

হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে গিয়ে ল‍্যাণ্ড করল, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মাথায়। শ্বেতপাথরের পরীটার কাঁধে ঠ‍্যাং ঝুলিয়ে বসে সতর্ক-দৃষ্টি চালালো চারদিকে। নাঃ, দৃষ্টি-সীমার মধ্যে একটা মানুষের ছায়া নেই। কানাঘুষো শুনতে পায়, মানুষ ব‍্যাপারটাই নাকি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে পৃথিবী থেকে। কি যেন এক ছাতার মাথা, মহামারিতে একের পর এক মরছে টপটপ করে। সবাই যদিও ভূত হয়না, তাও অবস্থা এমনই, চার পাঁচ মাইলে এক-আধজনের সাথে ধাক্কা লেগেই যাচ্ছে। অথচ, কিছুদিন আগে পর্যন্তও অবস্থা এত খারাপ ছিল না। আচ্ছা, পৃথিবীটা কি ভূতের রাজ‍্য হয়ে যাবে এবার? আর মানুষের ভয়ে, গাছের কোটরে পিঁপড়েদের সাথে, কারখানার চিমনিতে কালিঝুলি মেখে, পুরোনো ভুলে যাওয়া ডায়েরির পাতায় চিঁড়ে-চ‍্যাপ্টা হয়ে থাকতে হবে না! বেশ হয় কিন্তু, তাহলে। আনন্দের চোটে, হাওয়ার মধ্যেই চরকি-পাক নেচে নিল বলরাম।

মনের উত্তেজনাটা থিতোলে, চারদিকটা ভালো করে দেখল সে। একটু একটু করে কুয়াশা চিরে রোদ বেরোনোর মত, মনে পড়ছে যেন অনেককিছু। কিন্তু টুকরো ছবি, ছেঁড়া ছেঁড়া। এখানে অনেক লোকজন আসত একসময়। গাড়ি, ঘোড়া, মানুষজনে সব সময় সরগরম থাকতো জায়গাটা‌। চকিতে কয়েকটা স্মৃতি অস্তিত্ব জানান দিল, বায়োস্কোপের মতো। বিয়ের পর নতুন বৌ কে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখাতে এনেছিল সে। গাঁয়ের মেয়ে, বাপের জন্মে কলকাতা শহর চোখে দেখেনি। হাত ধরে রাস্তা পার করাচ্ছে, মাথায় ঘোমটা বোকা হাবা অবাক চোখ মেয়েটাকে। একটু দূরে একটা গঙ্গার ঘাট ও আছে, হাওয়া দিত খুব। বৌ এর মুখটা মনে পড়ছে না তেমনভাবে, কিন্তু ভাব ভালবাসার অভাব ছিল না তখনকার পৃথিবীতে।

হঠাৎ, একটা খিটকেল হাসিতে ঘোর ভাঙে বলরামের। চেয়ে দেখে, এক ফোকলা দাঁত বুড়ো মিচকে হাসছে, তার দিকে তাকিয়ে।
- কি হে সাঁপুইয়ের পো? সেই কখন থেকে পাশটিতে বসে আছি, গেরাহ‍্যিই করছ না তো।
- কি, চিনতে পারলে না তো? না চেনারই কথা। ভাগ্নীটা যখন এসে কেঁদে পড়ল, তুমি নাকি তাকে দেখেই পগারপার দিয়েছ, তখনি বুঝেছি। তা, নিজের দুনিয়া তে থাকলেই হবে? ওদিকে বৌটা যে তোমার চিন্তায় পাগল হওয়ার জোগাড়!

আচ্ছা, মধুমিতাই তাহলে তার বোকা হাবা বৌটা। কিন্তু ঠিক মেলাতে পারছে কই? কাঁচা ঘুম ভাঙা চোখে একটু আগে দেখা স্বপ্ন গুলোর মত জট পাকানো সব।
- বলি, এবার এট্টু সংসারে মন দাও। এই বুড়ো, থুত্থুড়ে পৃথিবীটা আর বেশিদিন নেই। মহামারি গ্রাম শহর সব উজাড় করে ছেড়েছে। যদ্দিন আছ, পুরনো সময়ে আটকে না থেকে, ভূতজীবনটার মজা লোটো।
- চার পাশের অবস্থা তো দেখছ। হাওয়া চলে কিনা বোঝার জো নেই। সূয‍্যি ওঠে না। আবার করে মরার তো ভয় নেই! তালে অত চিন্তা কিসের? অবশ‍্যি, গ্রহটা হুট করে একদিন না থাকলে, আমাদের কি গতি হবে, সেটা তর্কসাপেক্ষ আর ধোঁয়াটে ব‍্যাপার। বলি, কথাগুলো কানে যাচ্ছে?

বুড়োর এই বদঅভ‍্যেস! সুযোগ পেলে জ্ঞান দেবেই। মনে পড়ছে অনেক কিছু। কারখানা লক-আউটের পর যখন না খেতে পেয়ে পথে বসার জোগাড়, কালীঘাটের এই মামাশ্বশুরের কাছেই তার বাবুদের বাড়ি সিঁদ কাটার হাতে খড়ি। বৌ অনেক করে না করেছিল। একদিন বৃষ্টিতে মাঝরাতে চুরি করতে গিয়ে, গোপাল নস্করের বুড়ি মাকে জাগিয়ে ফেলল ভুল করে। বুড়ি তখন চিল-চিৎকার করে পাড়া মাথায় করে আর কি! পালাতে গিয়ে পা পিছলে সোজা ঘোষেদের দীঘির সাইজের পুকুরে! ছোট বেলা থেকে কোনও দিন সাঁতারটা না শেখার জন‍্য, বেশ আফসোস হচ্ছিল ডুবতে ডুবতে।

আকাশের দিকে তাকাল বলরাম। ঈশাণ কোণে বেশ মেঘ জমেছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে থেকে থেকে। বজ্রগর্ভ কয়লা-কালো মেঘে আকাশ টা দেখাচ্ছে একটা উপুড় করা বিশাল কালো পাথরবাটির মত। বৃষ্টি এল চরাচর জুড়ে। ফাঁকা রাস্তার ধারে গাছগুলো উপুর চুপুর ভিজছে, ভালোবেসে। মনে পড়ে, বৌটাও খুব ভালোবাসত ভিজতে। মেঘ ডাকলেই, টানাটানি করত ছাতে যাওয়ার জন্যে। হালকা করে একটা দীর্ঘশ্বাস চাপল, মনে মনে। নাঃ, বুড়ো ঠিকই বলেছে! তারই ভিমরতি ধরেছে। দেখা যাক, সেই পুরনো নতুন বৌটাকে খুঁজে পায় কিনা! নন্দকিশোর এখনও বকে চলেছে, নিজের খেয়ালে, অঝোর বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে। বুড়োর চোখ এড়িয়ে, পরীর মাথার ওপর থেকে, সাট্ করে হাওয়া হল বলরাম সাঁপুই।

ভূত-ভবিষ্যৎ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments