সুজাতাকে আপনাদের মনে পড়ে? সেই যে নারী কঠোর কৃচ্ছসাধনে অর্ধমৃত শ্রমণ গৌতমকে (তখনও তিনি "বুদ্ধ" হননি) পায়েস খেতে দিয়ে সুস্থ করে তুলেছিলেন? তাঁর জন্যই তো গৌতম হতে পেরেছিলেন বুদ্ধ। সুজাতার প্রসঙ্গ এলেই আমি একটা কথা ভেবে অবাক না হয়ে পারি না। বোধি লাভের পর বুদ্ধ আরও পঁয়তাল্লিশ বছর বেঁচেছিলেন। এর মধ্যে কি আর কখনও সুজাতার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি? ভিক্ষুসংঘ গঠনের পরে যখন সমগ্র মগধ ও কোশল রাজ্য জুড়ে বুদ্ধের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে, স্বয়ং মহারাজ বিম্বিসার ও প্রসেনজিৎ যখন বুদ্ধের পাদপদ্মে নিজেদের সমর্পণ করেছেন, তখনও কি সুজাতার কানে একবারও আসেনি বুদ্ধের কথা? কিংবা বুদ্ধও কি তাঁকে স্মরণ করেন নি? বুদ্ধ যে সুজাতাকে সারাজীবন কৃতজ্ঞচিত্তে মনে রেখেছিলেন, তা তো আমরা জানি। মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও তিনি সুজাতার কথা বলেছেন। সুজাতা না থাকলে বোধি লাভ তো দূরের কথা, তাঁর জীবনটাই যে শেষ হয়ে যেতে পারত, একথা বুদ্ধ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। তাহলে প্রশ্ন হল, সুজাতা কেন বুদ্ধের শরণ নিলেন না? আর বুদ্ধই বা কেন তাঁকে বঞ্চিত করলেন?

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা এই প্রশ্নের কী উত্তর দেবেন আমি জানি না। আমি বরং ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি। ধর্মপ্রচারকদের মধ্যে একটা ব্যাপারে বুদ্ধের স্থান একটু স্বতন্ত্র। সাধারণত ধর্মে অভিজ্ঞতা ও যুক্তির পরিবর্তে বিশ্বাস ও আনুগত্যের উপর বেশি জোর দেওয়া হয়। স্বাধীন চিন্তার সুযোগ ধর্মে বিশেষ দেওয়া হয় না। এই জায়গাতে বৌদ্ধধর্ম একটু আলাদা। সেখানে জোর দেওয়া হয় ব্যক্তিগত অনুভবের উপর। ত্রিপিটকের বিখ্যাত কালাম সুত্তে বুদ্ধ নিজে বলছেন, শুধুমাত্র জনশ্রুতি, পরম্পরা, এমনকি ধর্মগ্রন্থ বা গুরুবাক্যের ভিত্তিতেও কোনোকিছু বিশ্বাস করা উচিত নয়। বরং একজন মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে যে মতকে সত্য ও কল্যাণকর বলে বুঝতে পারবেন, তাঁর উচিত সেই মতটিকেই গ্রহণ করা। আজ পর্যন্ত বৌদ্ধধর্মে এই ব্যক্তিগত অনুভবের ব্যাপারটিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে বৌদ্ধধর্মে যে অন্ধবিশ্বাস একেবারে নেই তা নয়। ধর্মের প্রধানতম অন্ধবিশ্বাস ঈশ্বর বৌদ্ধধর্মে অনুপস্থিত থাকলেও অনেকক্ষেত্রে বৌদ্ধরা স্বয়ং বুদ্ধকেই প্রায় ঈশ্বর বানিয়ে ফেলেছেন। আবার তাঁরা দেবদেবী, স্বর্গনরক কিংবা পুনর্জন্মেও বিশ্বাস করেন। কিন্তু বৌদ্ধধর্মের আদি ইতিহাস ভালো করে বিশ্লেষণ করলে এই ধারণা দৃঢ় হয় যে, এই অন্ধবিশ্বাসগুলি বুদ্ধের মৃত্যুর পরে ধীরে ধীরে তাঁর ধর্মে প্রবেশ করেছে। বুদ্ধের নিজের মতবাদে এসবের কোনও স্থান ছিল না। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা বিশ্বাস করাও কঠিন। এই একবিংশ শতাব্দীতেও আমরা যখন প্রতিনিয়ত নানারকম অন্ধবিশ্বাসের শিকার, তখন খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ এতটা যুক্তিবাদী হতে পারলেন কিভাবে? যেখানে তথাকথিত আধুনিক যুগে বাস করেও আমরা অনেকেই তাঁর মতো আধুনিক হতে পারিনি? এই মুক্তচিন্তা সম্ভব হয়েছিল কিভাবে? শুনতে যতই অবাক লাগুক না কেন, ইতিহাসের অমোঘ নিয়মেই এটা সম্ভব হয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে সব বড়ো বড়ো চিন্তকদের মতো বুদ্ধও আসলে সময়ের ফসল। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকেই বুদ্ধ নামক চিন্তাবিদের জন্ম হবে, আর তা হবে "নাগরিক" আর্যাবর্তেই – কপিলাবস্তুতে, রাজগিরে, কিংবা শ্রাবস্তীতে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের আর্যাবর্তের দিকে তাকালে আমরা কী দেখি? স্থবির, ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে হটিয়ে নতুন, গতিশীল একটা সমাজ গড়ে উঠছে। নতুন নতুন নগর গড়ে উঠছে (ঐতিহাসিকরা ভারতবর্ষের ইতিহাসে এই সময়টাকে চিহ্নিত করেছেন "দ্বিতীয় নগরায়ণের কাল" হিসেবে, প্রথম নগরায়ণ অবশ্যই হরপ্পা সভ্যতা), বণিকের দল দেশবিদেশে বাণিজ্য করতে যাচ্ছেন, যোদ্ধারা রাজ্যজয় করতে ব্যস্ত। সব মিলিয়ে সমাজে একটা প্রাণের স্পন্দন, একটা নতুন গতির সূচনা হয়েছে। সমাজে ব্রাহ্মণদের পরিবর্তে ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদের প্রাধান্য বাড়ছে। মানুষ জাতিভেদপ্রথার কারাগারে আটকে থাকতে চাইছে না, সে তার অন্তর্নিহিত বিপুল সম্ভাবনাকে নানাদিকে বিকশিত করতে চাইছে। সমাজের এই প্রাণচাঞ্চল্যের প্রভাব পড়েছে মানুষের চিন্তার জগতেও। মানুষ আর অর্থহীন যাগযজ্ঞ ও দেবতার স্তুতিতে ভরসা করতে পারছে না। সে প্রশ্ন করছে জীবনের অর্থ সম্পর্কে। সেই চাহিদা পূরণ করার জন্য জন্ম হচ্ছে অসংখ্য দার্শনিকের। তাঁরা প্রত্যেকে নিজের নিজের মত প্রকাশ করছেন মানুষের কাছে। মানুষ প্রত্যেকের মত শুনছে, কিন্তু কারো মত অন্ধভাবে গ্রহণ করতে চাইছে না। সে চাইছে সবকিছুকে নিজের বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে বিচার করতে। এইরকম একটা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বৌদ্ধিক প্রেক্ষাপট যে গৌতম বুদ্ধ নামক intellectual phenomenon এর জন্ম দেবে, তাতে আর আশ্চর্য কী?

কিন্তু এর একটা উল্টোদিকও আছে। পাঠক লক্ষ্য করবেন, আমি "নাগরিক" আর্যাবর্তের কথা বলেছি, "গ্রামীণ" আর্যাবর্তের কথা নয়। এতক্ষণ আমরা চিন্তা ও কর্মের জগতে যে প্রাণস্পন্দনের কথা বললাম, তা মূলত প্রথমটির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল, দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে নয়। রাজগির ও শ্রাবস্তীর ঝলমলে জগতের বাইরের বিস্তীর্ণ গ্রামীণ ভারতবর্ষ কিন্তু আগের মতোই অন্ধবিশ্বাসে আচ্ছন্ন ছিল। সেখানে সেই দারিদ্র্য, সেই জাতিভেদ, আর সেই অন্ধবিশ্বাস। সুজাতাকে আমরা সেই অন্ধকার ভারতবর্ষের প্রতিনিধি হিসেবে ভাবতে পারি। স্মরণ করুন, গাছের তলায় অর্ধমৃত, কঙ্কালসার গৌতমকে দেখে সুজাতা কী ভেবেছিলেন? তিনি ভেবেছিলেন, বৃক্ষদেবতা বসে আছেন গাছের নীচে! কিছুদিন আগে তিনি বৃক্ষদেবতার কাছে মানত করেছিলেন। কামনা পূর্ণ হওয়ায় পায়েস রান্না করে পূজা দিতে এসেছিলেন সেই দেবতার। ঘটনাচক্রে ভাবী বুদ্ধ সেইখানেই কৃচ্ছসাধনা করছিলেন, তাই পায়েসটি তাঁর প্রাপ্য হয়! সুজাতা যদি অন্ধকার, "গ্রামীণ" ভারতবর্ষের প্রতিনিধি হন, তাহলে বুদ্ধ নিঃসন্দেহে ছিলেন আলোকপ্রাপ্ত, "নাগরিক" ভারতবর্ষের যথার্থ প্রতিনিধি। তাঁর জন্ম অভিজাত পরিবারে, কপিলাবস্তু শহরে তাঁর বেড়ে ওঠা। পরবর্তীতে আবার মূলত রাজগির ও শ্রাবস্তীর নাগরিক সমাজে তাঁর ধর্মপ্রচার। অভিজাত রাজন্য, শিক্ষিত ব্রাহ্মণ ও ধনী শ্রেষ্ঠীরা তাঁর প্রধান শিষ্য। এটা ঠিক যে, তিনি রূপোপজীবিনী আম্রপালিকেও শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু তাই বলে আজকের দিনের দরিদ্র, অশিক্ষিত দেহপসারিণীদের সঙ্গে সর্ববিদ্যায় পারদর্শিনী বৈশালীর "নগরসুন্দরী" আম্রপালির কোনও বহুদূরবর্তী তুলনাও চলে না। মোটের উপর গৌতম বুদ্ধ ছিলেন "নাগরিক" ভারতবর্ষের শিক্ষক, তাই তাঁর শিক্ষার চরিত্রও এত "নাগরিক", এত "আধুনিক"। অশিক্ষিত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, "গ্রামীণ" নারী সুজাতা তাই বুদ্ধকে কেবল পায়েস খাওয়াতেই পারলেন, তাঁর ছাত্রী হতে পারলেন না।

উপরে নাগরিক ও গ্রামীণ ভারতবর্ষের যে পার্থক্যের কথা বলা হল, আমার মতে সেটাই আবার পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের বিকৃতির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বুদ্ধের জীবদ্দশায় তাঁর মতবাদ মূলত মগধ ও কোশলের নাগরিক সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও তাঁর মৃত্যুর পর ভিক্ষুরা বৌদ্ধধর্মকে গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সচেষ্ট হন। আর সেটা করতে গিয়ে তাঁরা একধরণের জনমোহিনী বা পপুলিস্ট কৌশলের আশ্রয় নিলেন। বৌদ্ধধর্মকে জনপ্রিয় করার অন্ধ তাগিদে ভিক্ষুরা একে একে স্বর্গ-নরক-পুনর্জন্ম ইত্যাদি ধারণাকে এই ধর্মের মধ্যে ঢোকাতে শুরু করলেন। জাতকের গল্পে দেখি, সুজাতার সেই বৃক্ষদেবতাও ঢুকে গেছেন বৌদ্ধধর্মের মধ্যে। বুদ্ধই নাকি আগের কোনও এক জন্মে একজন বৃক্ষদেবতা ছিলেন! বেচারা সুজাতা! আর কয়েকশো বছর পরে জন্মালে তিনিও তো "বৌদ্ধ" হতে পারতেন!

আবার বুদ্ধের মতবাদের যে "নাগরিক" চরিত্রের জন্য গ্রামীণ ভারতবর্ষ একসময় তাকে বিকৃত করতে বাধ্য হয়েছিল, ঠিক সেই কারণেই কিন্তু তা আধুনিক যুগের মানুষের জীবনে নতুন পথ দেখাতে পারে। বিগত পাঁচশো বছরের মধ্যে ইউরোপের ইতিহাসে কতকগুলি ঘটনা ঘটে গেছে। সেগুলি হল – রেনেসাঁ, রিফর্মেশন, এনলাইটেনমেন্ট ও বৈজ্ঞানিক বিপ্লব। এই ঘটনাগুলোর প্রভাবে একটা যুক্তিবাদের ধারা ইউরোপ থেকে সারা পৃথিবীর শিক্ষিত সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। আধুনিক যুগের এই শিক্ষিত মানুষেরা একদিকে প্রচলিত ধর্মগুলির অযৌক্তিকতার কারণে সেগুলিকে গ্রহণ করতেও পারেন না, আবার অন্যদিকে আধুনিক যুক্তিবাদ সবসময় তাঁদের কোনও বিকল্প জীবনদর্শনেরও সন্ধান দিতে পারে না। ফলে এক গভীর অস্তিত্বের সংকটে ভুগতে হয় আধুনিক যুক্তিবাদী মানুষকে। এই সংকটের চরম নিদর্শন আমরা দেখেছি এযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ যুক্তিবাদী দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের জীবনে। রাসেলের কঠোর যুক্তিবোধ তাঁকে ঈশ্বরে বিশ্বাসী থেকে নিরীশ্বরবাদী হতে বাধ্য করেছে, অথচ কী যন্ত্রণাময় ছিল তাঁর এই মানসিক উত্তরণের পর্যায়! জীবনের কোনও অর্থ খুঁজে না পেয়ে তিনি একসময় এমনকি আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন। ঈশ্বর বা প্রচলিত ধর্মে বিশ্বাস করতে পারলে তিনি নিশ্চয় সান্ত্বনা পেতে পারতেন, কিন্তু তাঁর যুক্তিবোধ তাঁকে সেই সান্ত্বনা পেতে দেয়নি। আধুনিক পশ্চিমী যুক্তিবাদের এই অস্তিত্বমূলক সংকটের আরেকটি নিদর্শন আমরা দেখতে পাই দস্তয়েভস্কির "The Devils" উপন্যাসে। সেখানে কিরিলভ নামে একটি চরিত্র বলছে, "ঈশ্বর আমাদের কাছে প্রয়োজনীয়, তাই ঈশ্বর অবশ্যই থাকা উচিত। অথচ আমি জানি, ঈশ্বর নেই, এবং ঈশ্বর থাকতে পারে না।" এই যন্ত্রণাকাতর আধুনিক যুক্তিবাদী মানুষের কাছে পরম করুণাময় তথাগত বুদ্ধ হয়তো আড়াই হাজার বছর পরেও কোনও সান্ত্বনার বাণী বয়ে আনতে পারেন। তিনি তো মানুষের দুঃখ দূর করার পথই দেখাতে চেয়েছিলেন। সব পেয়েও কেন মানুষ দুঃখী, সেই প্রশ্নের উত্তরই তো তিনি দিতে চেয়েছিলেন। সুজাতা তাঁকে বুঝতে পারেননি। তাঁর হয়তো বোঝার প্রয়োজনও হয়নি কেননা তাঁর বৃক্ষদেবতা ইত্যাদি নিয়েই তিনি সুখী ছিলেন (সত্যিই সুখী ছিলেন কি?)। সুজাতা না বুঝলেও আমরা কি পারব বুদ্ধকে বুঝতে?

বুদ্ধ, সুজাতা ও কিছু প্রাসঙ্গিক ভাবনা
  • 5.00 / 5 5
2 votes, 5.00 avg. rating (94% score)

Comments

comments