আমার ছোটবেলার পাড়ায় একটা পাগলী ছিল- নিদ্রা পাগলী। গায়ে ময়লা, চুলে জট, ফ‍্যালফ‍্যালে চাউনি, কারো সাথে কথা বলত না, যত কথা শুধু নিজের সাথে। খালি পায়ে পাড়া বেড়াত, খুব খুশী থাকত সবসময়। কোথা থেকে এত সুখ পেত, আজও বুঝি না। বৃষ্টিতে ভিজত, রোদে পুড়ত, শীতে কাঁপত, কিন্তু জ্বর জ্বালা সর্দি গর্মির বালাই ছিলনা কোনও। গায়ে কাপড়ের ঠিক থাকতনা, পূর্ণিমার রাতগুলোতে বিশেষ করে। নদীতে জোয়ারের জল বাড়ার সাথে সাথে নিদ্রার আনন্দ বাড়ত। জ‍্যোৎস্না মেখে ঝুম হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত ভুতের মত। দুহাত সামনে বাড়িয়ে খিলখিলিয়ে হাসত, যেন নতুন বিয়ের সোহাগে মেতে চাঁদের সাথে।

অদ্ভুত অভ‍্যেস ছিল একটা, কাগজ কুড়োনো। মন দিয়ে রাস্তা থেকে তুলে নিত ছেঁড়া টিকিট, বাজারের ফর্দ, আনকোরা প্রেমিকের চিঠি, সব! ওর বস্তাতে বোঝাই হত সেসব। বসে বসে পড়ত নিজের মনে বকবক করে, হেসে উঠত হঠাৎই। এক দুর্সম্পর্কের কাকা দয়াবশতঃ ঠাঁই দিয়েছিল পুরোনো না ব‍্যবহৃত গোয়াল ঘরে। সেই ঠিকানায় উঁকি দিয়ে দেখেছিলাম, বস্তা বস্তা পুরোনো বাতিল কাগজের সাম্রাজ‍্য‌। কি খুঁজত এত দিনরাত?

আমরা ছোটরা একটু ভয়ই খেতাম তাকে। এড়িয়ে চলতাম পারতপক্ষে। একদিন মাঠে খেলতে খেলতে দেখলাম, এক অদ্ভুত করুণ চোখে তাকিয়ে আছে নিদ্রা পাগলী আমাদের দিকে। কি যেন একটা ছিল সেই দৃষ্টিতে, অজানা আশঙ্কায় গা ছমছম করে উঠল। পরদিন দীঘিপুকুরে সাঁতার কাটতে কাটতে জলে তলিয়ে যায় আমার খেলার সাথী হারুন। কেউ বুঝতে পারেনি। খোঁজ শুরু হওয়ার পরে, সবাই যখন দীঘিপুকুর তোলপাড় করছে, হারুনের মাই প্রথম জলের তলা থেকে তুলে আনে ছেলের নিথর দেহ। তার বুক চাপড়ানো হাহাকারের সাথে কেমন যেন মিশে যায় আগের দিন সন্ধেবেলার মাঠে দেখা নিদ্রাপাগলীর অন্ধকার চোখ।

চৈত্রমাসের শেষদিনে রক্ষাকালী পুজো হত প্রতি বছর আমাদের গ্রামে। ওই খেলার মাঠেই বড় করে মেলা বসত, লোকজন, হইচই, বেগুনি, পাঁপড়ভাজা, মাটির পুতুল, যাত্রা, রকমারি আনন্দ আয়োজন। দশ ফুট উঁচু ভয়াল মূর্তি, শোলার গয়নার সাজ। তিনদিন তিনরাত ধরে চলত ফূর্তি। ক্লাস ফাইভে পড়ি তখন, কালবৈশাখী একটু আগেভাগে হানা দিয়েছে সেবছর। ঠাকুর বিসর্জনের তোড়জোড় চলছে, বাইরে মেঘ গুড়গুড়, থেকে থেকেই বিদ্যুৎ ফালাফালা করে দিচ্ছে আকাশ। মণ্ডপ থেকে ঠাকুর বের করতে গিয়ে সমস‍্যায় লোকজন, কিছুতেই একচুল নড়ানো যাচ্ছেনা প্রতিমাকে। পিছনে গিয়ে দেখা গেল আসল কারণ। নিদ্রা পাগলী প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে আছে কাঠামো। চুল শাড়ি উড়ছে হাওয়ায়, রণরঙ্গিনী মূর্তি। হইচই পড়ে গেল চারিদিকে। এ কেমন পাগলামি! অনেক কষ্টে সবাই মিলে বুঝিয়ে, জোর করে সরিয়ে নিয়ে গেল তাকে। তবে হল ঠাকুর ভাসান। তার ঠিক দুদিনের মাথাতেই মারা যায় নিদ্রা। কোথাও কিছু নেই, একরকম হুট করেই। সেদিনও কালবৈশাখী দাপাচ্ছিল চরাচর জুড়ে, প্রচণ্ড আক্রোশে।

গাঁয়ের বুড়োবুড়িরা বলত, বয়সকালে ডাকসাইটে সুন্দরী ছিল নিদ্রা। বিয়েও হয়েছিল দেখেশুনে। বর ঘরে নেয়নি, কেন কেউ জানে না। অষ্টমঙ্গলায় সেই যে বাপের বাড়ি পাঠাল, আর নিয়ে গেল না। শোনা যায়, জামাই আবার বিয়ে করেছে ছমাস না ঘুরতেই। আর কোনও আশা রইল না মেয়েকে শ্বশুর বাড়ি পাঠানোর, সেই দুঃখেই কিনা কে জানে, নিদ্রার মা দিনদিন শুকিয়ে যেতে থাকল‌, মরেও গেল একদিন। বউ মারা যাওয়ার পর সনাতনও কেমন ভেবলে গেছিল, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত, সাত প্রশ্নে রা কাড়ত না। এরকম এক সময়ে, শীতের কাকডাকা ভোরে কুয়াশা ভেজা আলের ওপর, নিদ্রাকে পড়ে থাকতে দেখা যায় নগ্ন, ধর্ষিতা। দুদিন পর জ্ঞান ফেরার পর থেকে শেষ দিন অব্দি, সে আর অন্য মানুষের সাথে কথা বলেনি কখনও। নিজের মনেই বকে গেছে সারাটা জীবন।

চন্দ্রাহতা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments