আমার মা সব কথাতেই বলে রান্নাটা নাকি জিনের ব্যাপার। জিন কি ভূত কি জিনি তা বলতে পারব না, তবে একথা সত্যি বটে আমার দিদা এবং মা-র হাতের রান্নার জুরি মেলা ভার। ছোটবেলায় যখন সবাই আমাকে জিজ্ঞাসা করত, আমার প্রিয় খাবার কি, চোখ বন্ধ করে এক বাক্যে বলতাম, দিদার হাতের যেকোন রান্না। দিদার হাতেরই একটা অদ্ভুত গুণ ছিল। শুকনো লঙ্কা ভাজার তেল, মুড়ি, পিঁয়াজ দিয়ে পান্তাভাত মাখা থেকে কচু বেগুন দিয়ে ইলিশ মাছের ঝাল – সবকিছুই আমার কাছে ছিল অমৃত সমান। দিদা দুবছর হল চলে গেছে, কিন্তু মায়ের কথায় ঐ জিনের জন্যেই হয়ত তার রান্নার সিকিভাগ গুণ আমার মধ্যেও এসে পৌঁছেছে। নতুন রান্না যাইই করি না কেন সাবেকি রান্নার নিয়ম কানুন দিদা দিদিমণির অনুসরণে না করা ছাড়া গতি নেই। যেটুকু পারি, যেটুকু করি, যেটুকু শিখেছি সবই মা-র থেকে। আর মা শিখেছে দিদার থেকে। তাই সাবেকি রান্না করার জন্য, ঐ স্বাদ আবার ফিরে পাওয়ার জন্য দিদার রন্ধন প্রণালীই শেষ কথা।

আজ যে দুটো রান্না সবার সাথে ভাগ করব, বলাই বাহুল্য সে দুটো ভায়া মা, দিদার থেকেই শেখা। হাতেকলমে কোনদিনও শেখার সুযোগ পাইনি, মায়ের মুখে শুনে আর মুখে লেগে থাকা সেই স্বাদের অনুসরণেই হঠাৎ করেই বানিয়ে ফেলেছিলাম এই দুই পদ।

 

  

 

কচুর শাক ঝাল

 

আমার দিদা নিজের মতন করে কচুর শাক রান্না করতো ৷ এত্তো ভালো খেতে হতো যে বলে বোঝাতে পারব না ৷ রান্নার যে বাঙাল ঘটি বলে কিছু হয় না তা দিদার রান্না খেয়েই বুঝতাম ৷ বলাই বাহুল্য মা-ও একইরকম অসাধারণ করে ঐ রান্নাটা ৷ আমি কেমন করি ঠিক জানিনা তবে দেখি বাড়ির সবাই তৃপ্তি করে খাচ্ছে, এটুকুতেই আমার পরিতৃপ্তি ৷

 

টুকটাক যা লাগবেঃ

(i) কচুর শাক (এক আটি বা একটি গাছ)
(ii) কালো সরষে (ছোট এক চামচ)
(iii) রাই সরষে মানে সাদা সরষে (ছোট এক চামচ)
(iv) পোস্তো (ছোট দুই চামচ)
(v) আদা বাটা (ছোট চামচের অর্দ্ধেক)
(vi) রসুন (এক কোয়া)
(vii) কাঁচালঙ্কা (১টা চাইলে বেশি দিতেই পারেন)
(viii) চেরা কাঁচালঙ্কা (২-৩ টে)
(ix) সরষের তেল 
(x) পাতিলেবু (৪-৫ টুকরো বা একটা গোটা)
(xi) নুন 
(xii) চিনি
(xiii) কালো জিরে (ছোট এক চামচ)
(xiv) জিরে (হাফ ছোট চামচ)
(xv) নারকোল কোরা (২ চামচ)

 

রান্না শুরুঃ

কচুর শাকের গা ছাড়িয়ে, টুকরো করে, ধুয়ে জল ঝরিয়ে, কড়ায় সেদ্ধ হতে দিতে হবে৷ শাকটা কড়ায় দিয়ে, একটু নুন দিয়ে, একটা চাপা দিয়ে মিনিট ৪-৫ রাখলেই শাক সেদ্ধ হয়ে যাবে৷ একটা ঝাঁঝরি তে ঢেলে, শাকের extra জল টা চাপ দিয়ে বার করে দিতে হবে৷

এবার বেশ খানিকটা সরষের তেল গরম করে, তাতে কালোজিরে ফোড়ন দিয়ে একটু ভেজে শাকটা দিতে হবে৷ একটু নাড়াচাড়া করে পরিমাণ মতন নুন, মিষ্টি (সামান্য taste balance এর জন্য) লেবুর রস দিয়ে ভাজতে হবে৷

সরষে, রাই সরষে, পোস্ত, আদা, জিরে, রসুন, কাঁচা লঙ্কা একসাথে বেটে রাখতে হবে৷

শাক একটু ভাজা হলে ঐ বাটনা আর চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে, মিশিয়ে, কষিয়ে, তেল ছেড়ে আসলে ওপরে নারকোল কোরা ছড়িয়ে দিলেই, কচুর শাক ঝাল, গরম ভাতের পাতে দোসর হওয়ার জন্য রেডি৷

 

বিঃ দ্রঃ

(i) কচুর শাকে ভীষণ হাত কুট কুট করে তাই যতটা কম পারবেন হাত ব্যবহার করবেন৷ শাক কুটে ঝাঁঝরিতে রেখে জলে তলায় রেখে ধুয়ে দিন, ঝাঁঝরি ধরে শাক কড়ায় ঢেলে দিন৷ একটি হাতার উল্টো দিক দিয়ে চেপে সেদ্ধ কচুর শাকের extra জল বের করুন৷
(ii) যদি হাত কুটকুট করে, লেবুর রস বা টক জাতীয় কিছু হাতে মেখে নিন৷
(iii) অনেকে কচুর শাকে চিনি দেন না৷ চাইলে নাও দিতে পারেন৷
(iv) কচুর শাক কাঁচা অবস্থায় অনেক বেশি মনে হয় .কিন্ত রান্না হলে অনেকটা কমে যায় তাই নুনের পরিমাণ বুঝে দেবেন৷ আর নিজের পরিবারের জন্য কতটা পরিমাণ রান্না করবেন সেটাও খেয়াল রাখবেন৷

 

 

পুঁই পিঁয়াজ পোস্ত

 

খুব সহজে চটপট হয়ে যায় অথচ রান্নার স্বাদও হয় অপূর্ব – এই ম্যাজিক বোধহয় মা-দিদার রেসিপিতেই সম্ভব। চিরপরিচিত পুঁইশাক দিয়ে সেরকমই এক ভিন্ন স্বাদের রান্না পুঁই পিঁয়াজ পোস্ত।

 

টুকটাক যা লাগবেঃ 

(i) ছোট করে কাটা পুঁইশাক (একটা বড় গাছ, ছোট করে কাটলে বর জামবাটির এক বাটি)
(ii) কুচনো পিঁয়াজ (২টো বড়)
(iii) পোস্ত বাটা (৪ বড় চামচ)
(iv) পাঁচফোড়ন (১ বড় চামচ)
(v) সরষের তেল (৩ বড় চামচ)
(vi) নুন (স্বাদমতন)
(vii) চিনি (স্বাদমতন)
(viii) চেরা কাঁচালঙ্কা (২টো)
(ix) শুকনো লঙ্কা (১টা)

 

রান্না শুরুঃ 

কড়ার মধ্যে সরষের তেল গরম করে পাঁচফোড়ন, শুকনো লঙ্কা দিয়ে একটু নড়াচড়া করে পিঁয়াজ কুচনো যোগ করতে হবে। পিঁয়াজ ভাজা হলে একটা জায়গায় তুলে রেখে ঐ তেলেই পুঁইশাকটা দিয়ে তার মধ্যে নুন ও চিনি দিয়ে নাড়া চাড়া করে ঢিম আঁচে চাপা দিয়ে রাখত হবে মিনিট ১৫-২০ মত যাতে শাক এবং ডাঁটা নরম হয়ে যায়। যদি ১৫ মিনিট পরও নরম না হয় তাহলে আরো কিছু সময় একই ভাবে রাখতে হবে। শাক এবং ডাঁটা সেদ্ধ হয়ে গেলে ওর মধ্যে পোস্ত আর এগে ভেজে তুলে রাখা পিঁয়াজ মিশিয়ে দিতে হবে। পুঁই, পোস্ত, পিঁয়াজ ভালোভাবে মিশে গিয়ে জল পুরোপুরি শুকিয়ে গেলে চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে নেড়েচেড়ে ভাজা ভাজা করে নামিয়ে নিলেই তৈরী "পুঁই পিঁয়াজ পোস্ত"।

বিঃ দ্রঃ 

(i) পুঁইশাকের ডাঁটাগুলো দিয়ে ভালো করে গা ছাড়িয়ে, মাঝখান থেকে দুই টুকরো করে দেবেন। এতে ডাঁটা তাড়াতাড়ি সেদ্ধ হবে।
(ii) এই পদটায় হালকা একটা মিষ্টি স্বাদ ভালো লাগে। তবে অনেকে পোস্তয় মিষ্টি মোটেই পছন্দ করেন না। তাঁরা চিনি ছাড়াই করতে পারেন। শুধুমাত্র পিঁয়াজ ভাজার সময় এক চিমটে দেবেন। এতে পিঁয়াজ ভাজার রং ভালো হয়।
(iii) "পুঁই পিঁয়াজ পোস্ত" গরম ভাতে সবচেয়ে ভালো জমে।

 

দিদার দুই রেসিপি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments