শ্রী-তনু-র শেষকথা

সাড়ে নটা বেজে গেল কিন্তু সাগরভাই বা তার গাড়ির দেখা না পেয়ে সবারই কপালে চিন্তার ভাঁজ। এন জে পি তে ট্রেন বিকেল ৬টায়। এমনি তে ৭ ঘন্টার রাস্তা। কিন্তু অনি বলেছে যতটা পারা যায় সময় হাতে নিয়ে বেরোতে হবে। পাহাড়ি রাস্তা কখন কোথায় ধ্বস টস নেমে বন্ধ হয়ে যায় তার ঠিক থাকে না। আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম ওখরের সানবার্ড লজের সামনে। সিকিম ভ্রমণ সাঙ্গ করে এবার আমাদের ফেরার পালা। গতকাল পূর্বা ডিকি দিদির হাতে গড়া সিকিমি মোমো আর আড্ডা, ইয়ার্কি, নাচ, গান, নেপালি বাঁশির সুরে ক্যাম্প ফায়ারের মাধ্যমে জমে উঠেছিল সিকিম ট্রিপের অন্তিম রজনী। এত আনন্দের মাঝেই মনখারাপের মেঘ ঘনিয়ে আসছিল। কাল সকাল থেকেই আবার যে যার জীবনে ফিরে যাব। মনের মেঘ কাটাতে তাই বেশী করে করে পরের ট্রিপের প্ল্যান এর দিকে মনোনিবেশ করছিলাম। 

  

সাগরভাইয়ের দেখা পাওয়া গেল তখন ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁই ছুঁই। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পেমা সিরিং এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মালপত্তর নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম। ঠাণ্ডা হাওয়া তখনও হাড় কাঁপাচ্ছিল। মনে মনে ভাবলাম আর কিছুক্ষণ, তারপরেই এই এক দমক ঠাণ্ডা হাওয়ার জন্য মনটা হু হু করে উঠবে। এঁকা বেঁকা রাস্তা দিয়ে গড়ি ছুটছিল। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে ধাপ কাটা উপত্যকা। কোথাও নদী আবার কোথাও বা গভীর খাদ। মনে হচ্ছিল কোন video যেন rewind করছি। ঠিক যেমন যেমন হচ্ছিল আসার দিন, আজও ঠিক একই রকম সবকিছু। সেই রাস্তা, সেই প্রকৃতি, সেই সাগরভাইয়ের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন জিনিস পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব, সুন্দরী মেয়েদের লিফট দেওয়া, গাড়ীর অডিও জ্যাকে আমাদের মোবাইল গুঁজে চিরপরিচিত গান। তফাৎ শুধু একটাই – যাওয়ার দিন মনে ছিল অসম্ভব একটা আনন্দ, curiosity, excitement আর এখন মনে পরিতৃপ্তির স্বাদ আর অল্প অল্প মনখারাপ।

  

২টোর সময় যখন শিলিগুড়ির কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামের সামনে নামলাম তখন মনে হল যেন স্বর্গ থেকে নরকে নেমে এসেছি। গাড়ির জ্যাম আর প্রচণ্ড গরমে মনে হচ্ছিল শিলিগুড়ি নয়, কলকাতার এম জি রোডে দাঁড়িয়ে আছি! বব চটপট সবার জন্যে আখের রস এনে দিল। ছায়ায় দাঁড়িয়ে সেটা শেষ করার আগেই দেখি দলনেতা অনির্বান সামনের দিকে হাঁটা লাগিয়েছে। অনির্বানকে নেতার পদে পেতে হলে এটা মেনে নিতেই হবে। ও কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে কোন প্রশ্ন করা চলবে না। শুধু বাধ্য সৈনিকের মত অনুসরণ করতে হবে। তবে অনুসরণ করে পস্তেছি বলা যাবে না। এবার যেমন অনির্বানের পিছু পিছু গিয়ে দাঁড়ালাম "হোটেল নন্দিতা"র সামনে। হোটেল দেখেই খিদেটা চাগাড় দিয়ে উঠল। মধ্যাহ্নভোজ শেষ করে উঠে অনির্বান বলল, "পান খাবি তো? চকোলেট পান?" একে পান, তার ওপর চকোলেট! এ লোভ কি সামলানো যায়! আবার সকলে লিডারকে অনুসরণ করলাম।

  

এতদিন লালরঙের ভিজে কাপড় দিয়ে পানপাতা চাপা দেওয়া গুমটি থেকে ৬ টাকার পান কিনে খেয়েছি। শিলিগুড়ির পান প্যালেসে এসে চমকে চ! কাঁচে ঘেরা শীততাপনিয়ন্ত্রিত দোকান। একদিকে নানা ধরণের তামাক আর পানীয় রয়েছে। চাইলে হুঁকোও খাওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে বিভিন্ন রকম পান আর আইসক্রিমের সম্ভার। চটপট চকোলেট পান চলে এল সাদা প্লেটে করে। সাধারণ পানের দ্বিগুণ। ওপরে চকোলেটের কোটিং তার ওপর একটা লাল চেরী বসানো। বেশ কসরত করে কামড় দিলাম। চকোলেট, মিঠা পাতা পান আর হরেক রকম ড্রাই ফ্রুটসের অংশবিশেষ স্বাদকোরক ছুঁতেই অদ্ভুত একটা স্বর্গীয় শান্তি অনুভব করলাম। একে পান বললে ভুল হবে, একটা গোটা মিলের সমান! অনি যদি আগে বলত লাঞ্চ টা স্কিপ করে পানভোজন করেই কাটিয়ে দিতাম। এই চকোলেট পান দলনেতার তরফ থেকে আমাদের ট্রিট। পান খাইয়ে ট্রিট দেওয়া শুনে যাঁরা ভুরু কোঁচকাচ্ছেন তাঁদের জানিয়ে রাখা যাক আমরা যে চকোলেট পানগুলো খেলাম তার এক একটার দাম ১৩৫ টাকা। দেয়ালে টাঙানো রেট চার্ট দেখে আরো জানা গেল ঐ দোকানের সবচেয়ে দামী পানের দাম ৭০০ টাকা! 


   

উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস এনজেপি ঢুকলো আধঘন্টা দেরিতে। আমাদের সবারই সিট একসঙ্গে পড়েছিল। খালি পল্লবের একটু দূরে। এক্সচেঞ্জ করার লোক খুঁজে খুঁজে যখন হাল ছেড়ে দিলাম তখনই জানলার ধার থেকে একটা দাড়িওলা ছেলে গোঁফের তলা দিয়ে হাসতে হাসতে বলল, ''চিন্তা করবেন না, আমি ঐ সিটটায় চলে যাব।" হাতে একটা বই নিয়ে বসে সে আমাদের কার্যকলাপ দেখছিল। কিন্তু তাকে আর ছাড়া গেল না। কারণ কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই সুজন বণিক আমাদের গ্রুপে একদম খাপে খাপ হয়ে মিশে গেল। ডিটেকটিভ গল্প থেকে ফুটবল, বেড়ানো থেকে খাওয়াদাওয়া আড্ডা আর হাসিঠাট্টায় তুফান তুলে অন্য সহযাত্রীদের যথেষ্ট বিরক্তি উৎপাদন করে যখন শোয়ার তোড়জোড় করলাম তখন আর খেয়াল করা হল না কে কার সিটে শুচ্ছে! 

  

আগামীকাল ভোরের আলো ফোটার আগেই যে যার গন্তব্যে নেমে পড়ব। কিছু কিছু সময় থাকে যেখানে আমরা আটকে যাই। এই ৫ দিন ঠিক তেমনি। অসাধারণ অবাক করা প্রকৃতি আর আমরা ৫ জন এমন বন্ধু যারা শুধু বন্ধু নয়, একটা পরিবারের অংশ। আড্ডা, গল্প, হাসি, ইয়ার্কি, অ্যাডভেঞ্চার – প্রকৃতির এক অদ্ভুত কম্বিনেশন। আজও ওখানেই আটকে আছি। রোজই স্বপ্ন দেখি কোন এক অজানা রাস্তায়, অপরিচিত পরিবেশে আমরা পাঁচজন খিল্লি করতে করতে হেঁটে চলেছি।

অপেক্ষা নেক্সট ট্রিপের।

  


ট্যুর প্ল্যানঃ

ট্রেনযাত্রা বাদ দিয়ে এই ট্রিপটা পাঁচদিনের। প্রথমদিন  সকাল সকাল নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নামুন। শেয়ারে বা রিজার্ভ করে গাড়ি নিয়ে ১৩০ কিলোমিটার দূরে ওখরে বা আরো ১০ কিলোমিটার এগিয়ে হিলে তে চলুন। ৭-৮ ঘন্টা লাগবে। হিলে তে একটি মাত্র ট্রেকার্স হাট। থাকার ব্যবস্থা আরামদায়ক নয়। ওখরে তে অনেক ভালো লজ/ হোমস্টে পাবেন। কিন্তু ওখরে তে থাকলে পরদিন সকালে গাড়ি করে হিলে যেতে হবে। দ্বিতীয়দিন ২-৩ ঘন্টা ট্রেক করে ভার্সে যান। ভার্সেতে গুরস কুঞ্জ বা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লজে থাকুন। তৃতীয়দিন  সকালে ট্রেক করে হিলেতে নামুন। সেখান থেকে ২ ঘন্টা গাড়িতে ভোরেং যান। ভোরেং থেকে আবার ঘন্টা দুয়েকের ট্রেক করে গোর্খে পৌছন। ইডেন লজে রাত্রিবাস করুন। চতুর্থদিন আবার ট্রেক করে ভোরেং আসুন। ভোরেং থেকে গাড়িতে ওখরে। বিকেলের দিকে ওখরে মনাস্ট্রি দেখে নিতে পারেন। পঞ্চমদিন সকালে গাড়ি করে নিউ জলপাইগুড়ি আসুন। 

বিঃ দ্রঃ রডোডেনড্রনের বাহার দেখতে হলে মার্চ মাসের শেষদিক থেকে মে মাসের প্রথমদিকে মধ্যে যেতে হবে। ভোরেং থেকে থেকে গোর্খে ট্রেকটা একটু কঠিন হলেও হিলে-ভার্সে ট্রেকটা খুব বাচ্ছা বা বৃদ্ধ ছাড়া যেকোন সুস্থ মানুষ করতে পারবে।

দরকারি ফোন নম্বরঃ
1. Dipankar Dey (Majestic Himalayan Treks & Tours): 9749061941, 9733828481
2. Raj Nambang (Hilley Tour & Travel): 9733271137, 9593980310
3. Gopal Thapa (Pusai) (Barsey Home Stay): 9733412807, 9547219305
4. P. T. Sherpa (Sunbird Lodge Okhrey): 9647811674

অন্যান্য পর্বের লিঙ্কঃ
পাহাড়ের ডায়েরি (১)
পাহাড়ের ডায়েরি (২)
পাহাড়ের ডায়েরি (৩)
পাহাড়ের ডায়েরি (৪)

 

  

পাহাড়ের ডায়েরি (৫)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments