দিনশেষের তীব্র খুনখারাপি আকাশের গায়ে দুটি তিনটি করে নক্ষত্র ফুটতে শুরু করেছে সবে। বিরাট অসীমের পানে চেয়ে চেয়ে পথ চলছি দুই নিতান্তই সদ্য তরুণ। বিশ্ববিদ‍্যালয়ে ঢুকেছি, ছ’মাস ও কাটে নি। নবলব্ধ বন্ধুটির বুড়ো সাইকেল টি আমাদের তৃতীয় সঙ্গী, এই অভিযানের। কলেজের ছাত্রাবাসে এক অলস দুপুরে গুলতানি মারতে মারতে হঠাৎ জেদ চাপল, দূরের রেললাইন পেরিয়ে ঘন বনের মধ্যে ঈশান কোণ বরাবর গেলে যে পার্বত্য পথের শুরু, সে পথের শেষ দেখতে হবে। অনির্বান ও তার সাইকেল কে সঙ্গী করলুম, একরকম জোর করেই। আকাশের প্রশান্ত মুখটি দেখে তখনও ঘূণাক্ষরে সন্দেহ করিনি, হঠাৎ করে চারদিক ঘিরে ফেলা মেঘবাহিনীর ঝটিতি আক্রমন হবে।

শাল, পিয়াল, তমাল, শিমুল আগলানো অগোছালো পথটি শেষ হবে হবে, এমন সময় তার না পাঠানো অতিথির মত সদলবলে মেঘবাবাজির আবির্ভাব। দেখতে দেখতে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা, তীরের মত ত্বক ভেদ করে মর্মস্থল বিঁধছে যেন। দিনের আলোও হঠাৎ যেন ঝড়ের হাওয়ায় নিভু নিভু পিদিমের মত নিজেকে সসংকোচে গুটিয়ে নিচ্ছে একেবারে নিভে যাওয়ার প্রস্তুতিতে। অস্বাভাবিক জোর ঝোড়ো হাওয়ায় নিজেদের সোজা রাখাই দায়। তার মধ্যে অনি কে সামলাতে হচ্ছে সাইকেলটিও। খাড়াই পার্বত্য পথ শুরু এবার। এতটা এসে ফিরে যেতে মন চাইছে না। সেই পুরনো চেনা পথে আবার দৌড়নোর মজা কই, তার থেকে সামনে চলাই শ্রেয়। শেষ পর্যন্ত আর না পেরে সাইকেলটাকে রাস্তার ধারে বিশ্রাম দেওয়ানো হল। শুরু হল সামনে থেকে শোঁ শোঁ শব্দে আসা জোলো ঝোড়ো বাতাস কেটে ওপরে ওঠার অধ্যায়।

প্রচন্ড শব্দে বাজ পড়ছে। সঙ্গীটি একটু ভীতু প্রকৃতির। প্রত‍্যেকবার চমকে চমকে উঠছে নতুনভাবে‌। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই আপাতত‌। অসম্ভব ভালো লাগছিল নিজেকে সবকিছুতে মিশিয়ে দিতে দিতে। পাশের খাদ, গাছপালা, কুয়াশা, মেঘ, বৃষ্টি, আমরা সব মিশে এক চমৎকার জলছবি আঁকা হয়ে চলেছে চোখের সামনে‌‌। জানিনা, এ রাস্তায় ঘোর বর্ষাতে ধ্বস নামে কিনা! ভেবেও লাভ নেই। অনেকটাই উঠেছি, হঠাৎ অদ্ভুত সুন্দর হালকা অস্পষ্ট প্রার্থনা সঙ্গীত ভেসে এল ওপর থেকে, বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে।

প্রচন্ড হাওয়া কেটে আর সামনে এগনোই যাচ্ছে না প্রায়, কি করি! এমন সময় পিছন থেকে গাড়ির শব্দ, যেন আমাদের বাস্তবের মাটিতে ফিরিয়ে আনল। একটা জীপ উঠে আসছে ওপর দিকে। কিছু বলার আগে ড্রাইভার নিজেই প্রস্তাব দিল, ওর সাথে সওয়ারি হওয়ার। ওপরে কোনও মিলিটারি বেস ক‍্যাম্পে যাচ্ছে সে। হাসি খুশি ছোটো খাটো চেহারা, নেড়া মাথার পিছনের দিকে এক টিকি। প্রাথমিক আলাপ পর্ব শেষ হলে, আমাদের নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য নেই শুনে বলল, আরো কিছুটা ওপরে একটা মনাস্ট্রি আছে। সেখানে আমরা অপেক্ষা করতে পারি, বৃষ্টি থামা পর্যন্ত। তারপর, অদ্ভুত সুরের নেপালী গানে, হাসি ঠাট্টায় ভরিয়ে রাখল পুরোটা সময়। গোমড়া মুখ অনির্বানের চোখেও তখন হাসির ঝিলিক, বাইরের প্রতিকূল পরিবেশ ভুলে গিয়ে। বেশ লাগছিল পুরো ব‍্যাপারটা। একটা বাঁক হঠাৎ শেষ হতেই, চোখের সামনে জেগে উঠল মঠের তোরণদ্বার। এক দৌড়ে জীপ থেকে নেমে ঢুকে পড়লাম, তার ভিতর। নামার আগে, আবার করে ধন্যবাদ জানালাম, টিকিওয়ালা নেপালী ঈশ্বরকে।

খসড়া
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments