নবম শতাব্দীর বৌদ্ধ ভিক্ষু লিন চি নাকি বলেছিলেন, “যদি তোমাদের পথে বুদ্ধের সঙ্গে দেখা হয়, তাহলে তাঁকে হত্যা কোর।” অধিকাংশ জেন গল্পের মতো এই কথাটিকেও একদিক থেকে একটু বেশিই চটকদার মনে হয়, কিন্তু অন্যদিকে এটা একটা মূল্যবান শিক্ষাও দেয়। সেটা হল, বুদ্ধকে যদি আমরা ধর্মীয় উন্মাদনার বিষয়ে পরিণত করি, তাহলে আমরা তাঁর শিক্ষার মূল সুরটিকেই হারিয়ে ফেলব। একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীকে বৌদ্ধধর্ম কী দিতে পারে সেকথা মাথায় রেখে আমার প্রস্তাব, আমাদের লিন চি-র সতর্কবাণীটিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। বুদ্ধের শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের বৌদ্ধধর্মকে পরিহার করা উচিত।

এই কথার অর্থ এই নয় যে, বৌদ্ধধর্মের পৃথিবীকে কিছুই দেওয়ার নেই। কেউ অবশ্যই দাবি করতে পারেন যে, পৃথিবীর সমস্ত সভ্যতার মধ্যে বৌদ্ধধর্মের সামগ্রিক ধারাটিই ধ্যানমূলক প্রজ্ঞার সবচেয়ে সমৃদ্ধ উৎস। আমাদের পৃথিবী যেখানে দীর্ঘদিন ধরে অন্তরীক্ষবাসী ঈশ্বরকেন্দ্রিক ধর্মগুলোর ভ্রাতৃঘাতী সন্ত্রাসে সন্ত্রস্ত, সেখানে বৌদ্ধধর্মের উত্থান হলে তা নিঃসন্দেহে একটা স্বাগত জানানোর মতো ব্যাপার হবে। কিন্তু সেটা ঘটবে না। এরকম ভাবার একেবারেই কোনও কারণ নেই যে, খ্রিস্টধর্ম ও ইসলামের অবিশ্রান্ত প্রচারণার সঙ্গে বৌদ্ধধর্ম সফলভাবে পাল্লা দিতে পারবে। বৌদ্ধধর্মের সেই চেষ্টাও করা উচিত নয়।

বুদ্ধের প্রজ্ঞা বর্তমানে বৌদ্ধধর্মের শৃঙ্খলে বন্দী হয়ে আছে। এমনকি পশ্চিমে যদিও আজকাল বিজ্ঞানীরা বৌদ্ধ ধ্যানের চর্চাকারীদের সহযোগিতায় মানব-মস্তিস্কে ধ্যানের প্রভাব সম্পর্কে গবেষণা করছেন, কিন্তু সেখানেও বৌদ্ধধর্মকে একটি নিতান্ত গণ্ডিবদ্ধ বিষয় হিসেবেই দেখা হয়। যাঁরা বৌদ্ধধর্মের চর্চা করেন, তাঁদের মধ্যে অনেকে দাবি করেন যে, “বৌদ্ধধর্ম আদৌ কোনও ধর্ম নয়”। এটা যেমন একদিকে যথেষ্ট সত্যি, তেমনি আবার এটাও সত্যি যে, পৃথিবী জুড়ে অধিকাংশ বৌদ্ধরা আর পাঁচটা ধর্মের মতোই অর্বাচীন, প্রার্থনামূলক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন পদ্ধতিতে বৌদ্ধধর্মের চর্চা করেন। বলা বাহুল্য, যাঁরা বৌদ্ধ নন, তাঁরা সবাই বৌদ্ধধর্মকে একটি ধর্ম হিসেবেই দেখেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা আবার মোটামুটি নিশ্চিত যে, বৌদ্ধধর্ম ভ্রান্ত ধর্ম।

সেইজন্য “বৌদ্ধধর্ম” নিয়ে কথা বললে অন্যদের মনে বুদ্ধের শিক্ষা সম্পর্কে অনিবার্যভাবে একটা ভ্রান্ত বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা “বৌদ্ধ” হিসেবে আমাদের আলোচনা চালাতে থাকছি, ততক্ষণ আমরাই এটা নিশ্চিত করে দিচ্ছি যে, বুদ্ধের প্রজ্ঞা একবিংশ শতকে মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে কোনও সদর্থক ভূমিকা গ্রহণ করতে পারবে না।

এর একটা আরও খারাপ দিক আছে। বৌদ্ধদের সঙ্গে বৌদ্ধধর্মকে এক করে রাখার অর্থ হল আমাদের পৃথিবীতে যে ধর্মীয় বিভাজন আছে, তাকে নীরবে সমর্থন জানানো। ইতিহাসের এই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে এটা নৈতিক বা বৌদ্ধিক, কোনও দিক থেকেই সমর্থনযোগ্য নয় – বিশেষ করে বিত্তবান, সুশিক্ষিত পশ্চিমীদের কাছ থেকে, চিন্তার বিস্তারে যাঁদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। একথা বললে খুব বেশি অতিরঞ্জন হবে না যে, যিনি এই প্রবন্ধটি পড়ছেন, তিনি ইতিহাসের গতিপথকে প্রভাবিত করার ব্যাপারে ইতিহাসের যেকোনো ব্যক্তির চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন। ধর্ম যে মাত্রায় এখনও মানুষের মধ্যে সংঘাতের প্রেরণা দিচ্ছে এবং প্রকৃত জ্ঞানানুসন্ধানকে ব্যাহত করছে, সেক্ষেত্রে আমি মনে করি, যে মুহূর্তে আপনি নিজেই নিজেকে “বৌদ্ধ” হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন, সেই মুহূর্তেই আপনি পৃথিবীর হিংসা ও অজ্ঞানতার জন্য মারাত্মক মাত্রায় দায়ী হয়ে পড়ছেন।

এটা সত্যি যে, বৌদ্ধধর্মের অনেক প্রচারক, বিশেষ করে দলাই লামা, আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে জগত সম্পর্কে তাঁদের ধারণাকে সমৃদ্ধ করতে (এমনকি কাটছাঁট করতেও) লক্ষণীয়ভাবে আগ্রহী। দলাই লামা মানবমনের চরিত্র সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য নিয়মিতভাবে পশ্চিমী বিজ্ঞানীদের সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, বৌদ্ধধর্ম, কিংবা তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম, কিংবা নিদেনপক্ষে দলাই লামার নিজের পরম্পরাও ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে মুক্ত। বস্তুত, বৌদ্ধধর্মের ভেতরে কিছু কিছু ধারণা আছে যেগুলো এতই অবিশ্বাস্য যে, তাদের সঙ্গে তুলনায় কুমারীর জন্মদানের মতবাদকেও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। যে চিন্তাধারায় এইসব প্রাক-সাক্ষর যুগের ধারণাকে মানবমন সম্পর্কে আমাদের বিকাশমান চিন্তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে দেখা হয়, তার দ্বারা কারও কোনও উপকার হবে বলে মনে হয় না। পশ্চিমী বৌদ্ধদের মধ্যে এমন অনেক কলেজ-শিক্ষিত পুরুষ ও মহিলা আছেন যাঁরা স্পষ্টত বিশ্বাস করেন যে, গুরু রিনপোচে সত্যিই একটি পদ্মফুল থেকে জন্মেছিলেন। এটা নিশ্চয় সেই আধ্যাত্মিক বিপ্লব নয় যার জন্য মানবসভ্যতা এতগুলি শতাব্দী ধরে প্রতীক্ষা করছে।

কেননা ঘটনা হল, একজন ব্যক্তি অপর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের উপর ভিত্তি করে কোনকিছু বিশ্বাস না করেই বুদ্ধের শিক্ষাকে জীবনে গ্রহণ করতে পারে। এমনকি সে একজন খাঁটি বৌদ্ধ ধ্যানীও হতে পারে (এবং আমরা অবশ্যই ধরে নেব, সে একজন বুদ্ধও হতে পারে)। বিশ্বাস-নির্ভর ধর্মের ক্ষেত্রে এমনটা বলা যায় না। বৌদ্ধধর্ম অনেক দিক থেকে অনেকটাই বিজ্ঞানের মতো। আমরা এই স্বীকার্য থেকে শুরু করি যে, মনঃসংযোগকে নির্দেশিত পথে ব্যবহার করলে (সমাধি) এবং কিছু আচরণকে গ্রহণ অথবা বর্জন করলে (শীল) প্রতিশ্রুত ফল (প্রজ্ঞা ও মানসিক সুখ) পাওয়া যাবে। এই অভিজ্ঞতাবাদী মেজাজ বৌদ্ধধর্মের মধ্যে একটা অনন্য মাত্রার প্রাণসঞ্চার করে। এই কারণে, আমরা যেখানে মানুষের ব্যক্তিক অনুভবকে বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছি, সেখানে বৌদ্ধধর্মের নিয়মপ্রণালীকে তার ধর্মীয় বোঝা থেকে মুক্ত করে নিলে তা আমাদের একটা অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হতে পারে।

ধর্মের সমস্যা

কতকগুলি পরস্পরবিরোধী ধর্মীয় মতবাদ আমাদের পৃথিবীকে ভিন্ন ভিন্ন নৈতিক সম্প্রদায়ে বিভক্ত করে দিয়েছে এবং এই বিভাগগুলি বিরামহীন রক্তপাতের উৎস হয়ে গিয়েছে। বস্তুত, অতীতের যেকোনো সময়ের মতো এখনও ধর্ম হিংসার একটা জীবন্ত ঝর্ণাধারার মতো কাজ করছে। এই হিংসার মাত্র কয়েকটি সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত হল প্যালেস্টাইন (ইহুদি বনাম মুসলিম), বালকান অঞ্চল (খ্রিস্টান অর্থোডক্স সার্বিয়ান বনাম ক্যাথলিক ক্রোয়েসিয়ান; কিংবা অর্থোডক্স সার্বিয়ান বনাম বসনিয়ান ও অ্যালবানিয়ান মুসলিম), উত্তর আয়ারল্যান্ড (প্রোটেস্ট্যান্ট বনাম ক্যাথলিক), কাশ্মীর (মুসলিম বনাম হিন্দু), সুদান (মুসলিম বনাম খ্রিস্টান ও সর্বেশ্বরবাদী), নাইজেরিয়া (মুসলিম বনাম খ্রিস্টান), ইথিওপিয়া ও ইরিট্রি (মুসলিম বনাম খ্রিস্টান), শ্রীলংকা (সিংহলি বৌদ্ধ বনাম তামিল হিন্দু), ইন্দোনেশিয়া (মুসলিম বনাম টিমোরিজ খ্রিস্টান), ইরান ও ইরাক (শিয়া মুসলিম বনাম সুন্নি মুসলিম), এবং ককেশাস অঞ্চল (অর্থোডক্স রাশিয়ান বনাম চেচেন মুসলিম; মুসলিম আজেরবাইজানি বনাম ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স আর্মেনিয়ান)। এইসব স্থানে সাম্প্রতিক দশকগুলিতে আক্ষরিক অর্থে লক্ষ লক্ষ মৃত্যুর সুস্পষ্ট কারণ হল ধর্ম।

ধর্ম কেন হিংসার এরকম একটা শক্তিশালী উৎস হিসেবে কাজ করে? ধর্ম ছাড়া চিন্তার আর কোনও ক্ষেত্র নেই যেখানে মানুষ পরস্পরের বিভেদকে এত সম্পূর্ণরূপে ও স্পষ্টরূপে প্রকাশ করে, কিংবা সেই বিভেদকে চিরস্থায়ী শাস্তি ও পুরস্কারের দ্বারা চিহ্নিত করে। ধর্ম হল একমাত্র ব্যবস্থা যেখানে আমরা-ওরার বিভাজনমূলক চিন্তা একটা সীমাহীন তাৎপর্য লাভ করে। আপনি যদি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে, ঈশ্বরকে সঠিক নামে ডাকাটাই চিরন্তন সুখ ও চিরন্তন দুঃখের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, তাহলে আপনার পক্ষে অবিশ্বাসী বা ভিন্নমতে বিশ্বাসীদের সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করাটা যুক্তিসঙ্গত হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের ধর্মীয় বিভেদের ঝুঁকিটা নিছক জাত্যভিমান বা রাজনৈতিক কারণে জাত বিভেদের চেয়ে মাত্রাতিরিক্ত রকম বেশি।

ধর্ম আবার চিন্তার একমাত্র ক্ষেত্র যেখানে মানুষকে তার দৃঢ়ভাবে লালিত বিশ্বাসের সমর্থনে সাক্ষ্যপ্রমাণ দেওয়ার দায় থেকে সুপরিকল্পিতভাবে রক্ষা করা হয়। অথচ, এই বিশ্বাসগুলিই প্রায়শ ঠিক করে দেয়, মানুষ কিসের জন্য বাঁচবে, কিসের জন্য মরবে, এবং অনেক ক্ষেত্রেই, কিসের জন্য মারবে। এটা একটা সমস্যা, কেননা যখন ঝুঁকি খুব বেশি, তখন মানুষের সামনে দুটো স্পষ্ট বিকল্প থাকে। একটা হল আলাপ-আলোচনা, আর অন্যটা হিংসা। সামাজিক স্তরে এই বিকল্পদুটি হল আলাপ-আলোচনা আর যুদ্ধ। আর আমরা যাতে পরস্পরের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে পারি, সেটা নিশ্চিত করবার একটাই উপায় আছে। আমাদের অন্তর থেকে যুক্তিপরায়ণ হওয়ার চেষ্টা করতে হবে – নতুন সাক্ষ্যপ্রমাণ ও নতুন যুক্তিতর্কের আলোয় জগত সম্পর্কে নিজের বিশ্বাসকে পুনর্বিবেচনা করার জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে। বিনা সাক্ষ্যপ্রমাণে নিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে এবং তাকে অমানুষে পরিণত করতে বাধ্য।

সুতরাং একবিংশ শতাব্দীর মানবসভ্যতার কাছে একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ হল, মানুষকে তার গভীরতম ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা সম্পর্কে কথা বলতে শিখতে হবে। কথা বলতে শিখতে হবে নৈতিকতা, আধ্যাত্মিক অনুভূতি এবং মানবিক দুঃখের অনিবার্যতা সম্পর্কে। এবং সেই কথার সুর যেন একেবারে স্পষ্টভাবে অযৌক্তিক না হয়। এই উদ্যোগের পেছনে সবচেয়ে বড়ো বাধা হল ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি আমাদের বিপুল শ্রদ্ধা। এটা ঠিক যে, যুক্তিবাদী ব্যক্তিরা সবসময় একমত হবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু যুক্তিহীন ব্যক্তিরা তাদের যারযার গোঁড়ামি নিয়ে যে সর্বদাই ভিন্নমত হবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

এটা মূলগতভাবেই অসম্ভব বলে মনে হয় যে, পৃথিবীর ধর্মীয় বিভেদকে আমরা কেবল সর্বধর্ম বৈঠকের সংখ্যা বাড়িয়েই নিরাময় করতে পারব। সুস্পষ্ট যুক্তিহীনতার প্রতি পারস্পরিক সহনশীলতা সভ্যতার চরম লক্ষ্য হতে পারে না। সর্বধর্ম-সমন্বয়ের আলোচনায় সব পক্ষই কতকগুলি বিষয়গুলিকে হাল্কাভাবে নেওয়ার ব্যাপারে একমত হয় কারণ সেই বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দিয়ে বিচার করলে জগত সম্পর্কে বিভিন্ন ধর্মের ভাবনা পরস্পরবিরোধী হয়ে পড়বে। অথচ ঠিক সেই বিষয়গুলিই আবার বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের কাছে বিভ্রান্তি ও অসহিষ্ণুতার চিরন্তন উৎস হয়ে দাঁড়ায়। এরকম পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকার মানসিকতা কখনোই মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার স্থায়ী ভিত্তি হতে পারে না। দাসত্ব ও নরমাংস ভক্ষণের কথা যেমন এখন আমরা ভাবতেই পারি না, ঠিক সেই রকম যদি ধর্মীয় যুদ্ধেরও অবলুপ্তি ঘটাতে হয়, তাহলে তার উপায় একটাই – বিশ্বাসের গোঁড়ামি বর্জন করা।

একটি ধ্যানমূলক বিজ্ঞান

এই মুহূর্তে পৃথিবীতে যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হল মানুষকে বোঝানো যাতে সে সমগ্র মানবজাতিকে তার নৈতিক সম্প্রদায় হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। তার জন্য আমাদের এমন একটা পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে হবে যা দলাদলির একেবারে ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের অনুভব তথা আকাঙ্ক্ষার সমগ্র পরিসরটির কথা বলতে পারবে। নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার এমন একটা চিন্তাধারা আমাদের প্রয়োজন যা বিজ্ঞানের মতোই সবরকম গোঁড়ামি ও সাংস্কৃতিক প্রেজুডিস থেকে একেবারে মুক্ত। প্রকৃতপক্ষে আমাদের যা দরকার তা হল একটি ধ্যানমূলক বিজ্ঞান – মানসিকভাবে আমরা কিভাবে ভালো থাকতে পারি তা সমূলে অনুসন্ধান করার জন্য একটি আধুনিক পন্থা। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, “আমেরিকান বৌদ্ধধর্ম” বা “পশ্চিমী বৌদ্ধধর্ম” কিংবা “সমাজমুখী বৌদ্ধধর্ম” প্রচার করার চেষ্টা করে এরকম একটি বিজ্ঞান আমরা উদ্ভাবন করতে পারব না।

বৌদ্ধধর্মের নিয়মপ্রণালী (নৈতিক আচরণবিধি এবং ধ্যান) মানবমন ও দৃশ্যজগত সম্পর্কে শূন্যতা, অনাত্ম এবং অনিত্যর মতো খাঁটি সত্য আবিষ্কার করলেও এই সত্যগুলি কোনভাবেই “বৌদ্ধ” নয়। সন্দেহ নেই, অধিকাংশ নিষ্ঠাবান ধ্যানচর্চাকারী এই ব্যাপারটা উপলব্ধি করেন, কিন্তু অধিকাংশ বৌদ্ধ আবার তা করেন না। ফলস্বরূপ, যদিও বা কোনও ব্যক্তি বৌদ্ধ গ্রন্থে বর্ণিত ধ্যানসঞ্জাত অন্তর্দৃষ্টির শাশ্বত ও স্বতন্ত্র চরিত্র সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাঁর বৌদ্ধ পরিচয় অন্যদের কাছে বিষয়টিকে গুলিয়ে দিতে চাইবে।

যদিও পদার্থবিদ্যা বলতে আমরা যা জানি, তা খ্রিস্টানরা আবিষ্কার করেছিলেন এবং বীজগণিত মুসলিমরা আবিষ্কার করেছিলেন, কিন্তু আমরা যে “খ্রিস্টান পদার্থবিদ্যা” বা “মুসলিম বীজগণিত” বলি না, তারও কারণ আছে। আজ যদি কেউ পদার্থবিদ্যার খ্রিস্টান শিকড় বা বীজগণিতের মুসলিম শিকড়ের উপর বেশি জোর দেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে লোকে বলবে, তিনি ওই বিষয়গুলি আদৌ বোঝেন নি। একই রকম ভাবে, আমরা যখনই ধ্যানমূলক জীবনদর্শনের একটি বৈজ্ঞানিক রূপ নির্মাণ করে ফেলব, তখনই সেটা তার ধর্মীয় পরিচিতিকে সম্পূর্ণ অতিক্রম করে যাবে। যখন চিন্তাজগতে এরকম একটা বিপ্লব ঘটে যাবে, তখন কেউ “বৌদ্ধ” ধ্যানের কথা বললে বুঝতে হবে, মানবমন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন ঘটে গেছে, তা অনুধাবন করতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।

মানুষ হিসেবে আমাদের অস্তিত্বের অর্থ ঠিক কী, তা এখনও পর্যন্ত নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি, কারণ আমাদের সংস্কৃতির প্রতিটি দিকেই – এমনকি আমাদের জৈবিক গঠনেও – এখনও অনেক নতুন ধারা ও নতুন চিন্তা প্রবর্তিত হতে পারে। আমরা জানি না, আজ থেকে হাজার বছর পরে আমরা কী হবো। কিংবা আমাদের বহু বিশ্বাসের প্রাণঘাতী অযৌক্তিকতার কথা মাথায় রেখে বলতে হয়, আমরা জানি না, হাজার বছর পরে আদৌ আমরা থাকব কিনা। কিন্তু আমাদের জন্য যে পরিবর্তনই অপেক্ষা করে থাকুক না কেন, একটা বিষয় পরিবর্তিত হবে বলে মনে হয় না – যতদিন পর্যন্ত আমাদের অনুভবশক্তি অক্ষুণ্ণ থাকবে, ততদিন সুখ ও দুঃখের পার্থক্য আমাদের প্রধানতম ভাবনার বিষয় থাকবে। সেইজন্য যেসব জৈব-রাসায়নিক, ব্যবহারতাত্ত্বিক, নৈতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া সুখ ও দুঃখের পার্থক্য সম্পর্কে আলোকপাত করতে পারে, সেগুলি আমরা বুঝতে চাইব। এইসব প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোনরকম চূড়ান্ত ধারণা আমাদের এখনও তৈরি হয়নি, কিন্তু অনেক ভ্রান্ত ধারণাকে বর্জন করার মতো যথেষ্ট জ্ঞান আমরা অর্জন করেছি। বস্তুত, এই মুহূর্তে এটুকু বলার মতো যথেষ্ট জ্ঞান আমাদের আছে যে, আব্রাহামিক ঈশ্বর শুধু সৃষ্টির বিশালতার পক্ষেই নয়, তিনি এমনকি মানবতার পক্ষেও অনুপযুক্ত।

মানবমনের প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের আরও অনেক কিছু আবিষ্কার করতে বাকি আছে। বিশেষ করে বলতে গেলে, নিছক রাগ, দ্বেষ ও মোহের আধার থেকে আমাদের মন কিভাবে প্রজ্ঞা ও করুণার হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে, সেই ব্যাপারে আমাদের আরও অনেক কিছু বুঝতে বাকি আছে। এই ক্ষেত্রে আমাদের জ্ঞানকে অগ্রসর করার ব্যাপারে বুদ্ধের শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন, কিন্তু বৌদ্ধধর্ম বর্তমানে আমাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

মূল রচনাঃ Sam Harris, “Killing the Buddha”, Shambhala Sun, March 2006

“বুদ্ধকে হত্যা কোর”
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments