এই নভেম্বর মাসের ২০ ও ২১ তারিখ সমস্ত সংবাদমাধ্যম যখন পদ্মাবতীময় তখনই নয়াদিল্লীর রামলীলা ময়দানে সমবেত হয়েছিলেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা তিন লক্ষের বেশী কৃষক। পার্লামেন্ট স্ট্রীটে মহামিছিলেও সামিল হন তাঁরা। তাঁরা এসেছিলেন "কিষাণ মুক্তি সংসদ" এ যোগ দিতে, ১৮৪টি কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগঠনের যৌথ মঞ্চ "অল ইন্ডিয়া কিষান সংঘর্ষ কো-অর্ডিনেশান কমিটি"র ডাকে। দেশের সংসদ তাঁদের কথা শুনছে না, তাই নিজেরাই সংসদ বসালেন কৃষকরা। পার্লামেন্টের ৫৪৫ জন সদস্য সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে ৫৪৫ জন আত্মঘাতী কৃষক পরিবারের সদস্য উপস্থিত ছিলেন সাংসদ হিসেবে। প্রতিটি ধারা ধরে দুদিন আলোচনার পর পাস হল দুটি বিলঃ

(১) কৃষক যেন তাঁর পরিশ্রমের উপযুক্ত পারিশ্রমিক পান তা নিশ্চিত করতে হবে। সমস্ত ফসল, দুধ এবং কিছু বনজ দ্রব্যের মোট উৎপাদন খরচের ৫০% বেশী ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ধার্য করতে হবে এবং উৎপাদক যাতে এই মূল্যে তাঁর পণ্য বিক্রয় করতে পারেন তার ব্যবস্থা করতে হবে।

(২) কৃষককে ঋণের জাল থেকে মুক্ত করার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু ভোটের আগে ঋণ মকুব করা নয়, রাষ্ট্রকে ধারাবাহিকভাবে তার নাগরিকদের অন্নদাতা কৃষকদের পাশে থাকতে হবে। 

 

কৃষক আত্মহত্যা, ঋণের জাল ও স্বামীনাথন কমিশন

এই দুটো দাবী আকাশ থেকে পড়া কিছু নয়, ১০ বছর আগে কৃষিক্ষেত্রের সংকট ও কৃষক আত্মহত্যার কারণ অনুসন্ধানের জন্য গঠিত স্বামীনাথন কমিটির সুপারিশের অঙ্গ এই দুই প্রস্তাব। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি কৃষকদের দেড়গুণ রিটার্ন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কৃষকদের অবস্থা শাঁখের করাতের মত। ফসল উৎপাদন কম হলেও সমস্যা, বিক্রি করে খরচ উঠবে না, আবার বেশী উৎপাদন হলেও দাম পড়ে গিয়ে লোকসান হয়ে যাবে। আমরা বাজার করতে গিয়ে টের পাই আজ আলু ৮ টাকা কেজি তো মাসখানেক বাদেই ২০ টাকা কেজি হয়ে গেল! দাম পড়ে গেলে কৃষকদের সর্বনাশ তো বটেই, দাম বাড়লেও যে তাঁরা খুব লাভবান হন তা নয়। ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ঋণশোধ করার তাগিদে এবং ফসল সংরক্ষণে অপারগতার কারণে তাঁরা ফসল বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। আর দাম বাড়ে বিক্রি করে দেওয়ার পরেই। কৃষকদের দুর্দশার কারণ খুঁজতে গিয়ে স্বামীনাথন কমিটি দেখেছিল ভূমিবন্টনে বীভৎস বৈষম্য, প্রাচীন প্রযুক্তি, সেচ হীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের অপ্রতুলতা ও দীর্ঘসূত্রিতা ইত্যাদি। ঐ কমিটির সুপারিশগুলোর মধ্যে ছিল অসম্পূর্ণ ভূমিসংস্কার সম্পূর্ণ করা, জলসংরক্ষণ ও উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আরো বেশী সংখ্যক জমিকে সেচের আওতায় আনা, সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, কম ঝুঁকিপূর্ণ ও কমদামী প্রযুক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করা, পর্যাপ্ত ঋণ ও বীমার ব্যবস্থা করা, সার্বজনীন গণবন্টন ব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তার জন্য নানাবিধ প্রকল্প যথা স্বাস্থ্যবীমা, বার্ধক্যভাতা ইত্যাদি। ২০০৬ সালে জমা পড়া এইসব সুপারিশ কংগ্রেস সরকারের হিমঘরেই পড়ে ছিল। আর বিজেপি? ৫০% লাভের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে তারা একদিকে সারের দাম বাড়িয়ে চলল অন্যদিকে এমন নিচু হারে সহায়ক মূল্য ধার্য করল যা উৎপাদন খরচের চেয়ে সামান্য বেশী, শস্যবিশেষে কম। দেখা গেছে হরিয়ানার এক চাষী তাঁর আড়াই হেক্টর জমিতে বাজরা চাষ করে যদি সরকার নির্ধারিত সহায়ক মূল্যে তাঁর উৎপাদিত এক কুইন্টাল বাজরা বিক্রি করেন তবে এক মরশুমে তাঁর লাভ দাঁড়ায় ২৯৪০ টাকা! সরকারের আশা এই টাকা দিয়ে তিনি ঋণের সুদ মিটিয়ে সংসার প্রতিপালন করবেন। বাস্তব অবশ্য আরো কঠিন, কারণ তিনি তাঁর ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হন সহায়ক মূল্যের অনেক কম দামে, যার ফলে তাঁর লোকসান দাঁড়ায় ২৮০০ টাকা। এর ফল – সংসার চালানোর জন্যেই এবার তাঁকে ঋণ করতে হয় স্থানীয় মহাজনদের কাছে। ছোট চাষীরা অবশ্য এমনিতেই সরকারি ঋণের তুলনায় মহাজন দের ঋণের ওপরেই বেশী নির্ভরশীল। সরকারি ঋণের ওপর নির্ভর করতে পারেন মূলতঃ ধনী চাষীরা। ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অর্গানাইজেশনের সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে গ্রামীণ ঋণের ৪৪ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক। আর এই অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুদের হার ৩৬% থেকে শুরু করে ১০০% ও হয়ে যায়। পাঞ্জাব ও বিদর্ভের দুটি গ্রামে অজয় দাণ্ডেকর ও শ্রীদীপ ভট্টাচার্যের একটি ফিল্ড ওয়ার্কে দেখা গেছে এমনিতেই ব্যাঙ্ক যা ঋণ দেয় তা ক্রমবর্ধমান চাষের খরচের তুলনায় অপ্রতুল, তার ওপর কৃষকরা ব্যাঙ্কের ঋণ শোধ করার জন্য মহাজনের থেকে বা পরিবারের সদস্যদের থেকে ধার করেন। তাঁদের ধার আবার শোধ করেন ব্যাঙ্ক থেকে প্রাপ্ত পরের কিস্তির ঋণ থেকে। ফলতঃ চাষের খরচ চালানোর জন্য আবার ধার! ফলে শেষপর্যন্ত যা বিকল্প থাকে তা হল চাষের জন্য কিনে রাখা কীটনাশক গলায় ঢেলে দেওয়া। আত্মহননে অবশ্য ঋণের চক্র থেকে বেরিয়ে আসা যায় না। ঋণশোধের দায় এবার এসে পড়ে বাড়ির সদস্যদের ওপর। 

সরকারের তথ্য অনুযায়ীই প্রতি বছর গড়ে ১২ হাজার কৃষক আত্মহননের পথ বেছে নেন। অর্থাৎ প্রতি ৩০ মিনিটে একজন করে কৃষক আত্মহত্যা করেন। এই কৃষক আত্মহত্যার ৮৭.৫% ঘটেছে সাতটি রাজ্যেঃ মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, তেলেঙ্গানা, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তামিলনাড়ু। পিছিয়ে নেই সবুজ বিপ্লবের রাজ্য পাঞ্জাবও। ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ – দশ বছরে ৪৬৮৭ জন কৃষকের আত্মহত্যা নথিভুক্ত হয়েছে এই রাজ্যে। মোদির মডেল রাজ্য গুজরাতে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ১৪৮৩ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের শস্যভাণ্ডার বলে খ্যাত বর্ধমান জেলাতেও এখন কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। শুধু ভাতার থানা এলাকায় ৬ মাসে ১০ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন ঋণের জ্বালায় বা জলের অভাবে ফসল নষ্ট হতে দেখে। এই ঘটনা গুলো এখন এতই "স্বাভাবিক" হয়ে গেছে আমাদের কাছে যে খবরের কাগজের ভেতর দিকের পাতার দু-চার লাইনের বেশী বরাদ্দ হয় না। প্রশাসনিক তরফেও চেষ্টা থাকে ঘটনা অস্বীকারের। ২০১৫ সালের একটি লেখায় পি সাইনাথ দেখিয়েছিলেন ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য জোগাড় ও বিশ্লেষণের পদ্ধতির পরিবর্তনের ফলে ২০১৪ সালে কৃষক আত্মহত্যার সংখ্যা দাঁড়ায় ২০১৩ সালের অর্ধেকেরও কম। কিন্তু ঐ বছরেই ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় "অন্যান্য" কারণে আত্মহত্যার সংখ্যা। ২০০১ সালের অন্ধ্রপ্রদেশ জেলার ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য থেকে দেখা গেছিল আগের তিন বছরে ঐ জেলায় কয়েকশ মানুষ পেটে প্রচণ্ড যন্ত্রণার কারণে অসুস্থ হয়ে মারা যান। পরে জানা যায় ওনাদের পেটের যন্ত্রণার কারণ হল আত্মহত্যার জন্য কীটনাশক খাওয়া!

 

  

 

লড়াইয়ের সংক্ষিপ্ত বৃত্তান্ত 

কিন্তু ভারতীয় কৃষকদের রক্তে নীল বিদ্রোহ, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ওয়াহাবি বিদ্রোহের রক্ত বইছে। তেভাগা, তেলেঙ্গানা, নকশালবাড়ির ইতিহাস যাঁরা রচনা করেছেন, তাঁদের উত্তরপুরুষরা নিজেদের জীবন শেষ করে দিয়ে অদৃষ্টের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন এ হতেই পারে না। লড়াইয়ের জেদ সলতে পাকাচ্ছিল তাঁদের মধ্যে। ২০১৬ সালে বৃষ্টিপাত গত দুবছরের তুলনায় বেড়েছে এবং ২০১৬-১৭র কেন্দ্রীয় বাজেটে আগের তুলনায় কৃষিক্ষেত্রে বরাদ্দও কিছু বেড়েছে। কিন্তু কৃষকদের দুর্দশা লাঘবের জন্য এগুলো নগণ্য। তার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মত নেমে এসেছে গত বছরের নোট বাতিল। বেশীরভাগ লেনদেন নগদ টাকায় হওয়ার কারণে নোটবাতিলের কারণে বড়সড় ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষক রা। এই বছরের মে-জুন মাস থেকেই মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান প্রভৃতি রাজ্যে কৃষক বিক্ষোভ জ্বলে উঠতে থাকে। মহারাষ্ট্রে কিষাণসভার নেতৃত্বে একটা কিছু অঞ্চলে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর সরকারি তরফে কিছু সংগঠনকে ডেকে আলোচনার নামে আন্দোলন ভাঙ্গার চেষ্টা হয়। মধ্যরাতে আলোচনা থেকে বেরিয়ে এসে কিষাণ সভার নেতৃত্ব জানিয়ে দেন ঋণ মকুব ও ন্যায্য দামের দাবীতে আন্দোলন চলবে। আরো ৩২টি সংগঠন সাড়া দেয় তাদের ডাকে। স্বাভিমানী শ্বেতকারি সংগঠনের নেতা রাজু শেট্টি এনডিএ সরকারের ওপর থেকে সমর্থন তুলে নেন। ১লা জুন থেকে সবকটি সংগঠনের যৌথ কমিটির ডাকে কৃষকরা শহরে দুধ সহ কৃষিজাত পণ্য পাঠানো বন্ধ করে "ধর্মঘট" শুরু করেন। দুধ, সবজির দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। জেড ক্যাটাগরির নিরাপত্তা দিয়ে মুম্বাইয়ে দুধ পাঠানো হয়। ষাট হাজার কৃষক মহারাষ্ট্রের কৃষিমন্ত্রীকে ঘেরাও করেন। টানা ১০ দিন ধর্মঘট চলার পর মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ কৃষক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসে ৩৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ মকুবের ঘোষণা করেন। এর মধ্যেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রদেশে। সেরাজ্যের শিবরাজ সিং সরকার মন্দাসৌর জেলায় গুলি চালিয়ে আট কৃষককে হত্যা করলে আন্দোলন হিংসাত্মক চেহারা নেয়। রাজস্থানে অন্যান্য অংশের মানুষ যোগ দেওয়ায় কিষাণ সভার নেতৃত্বে কৃষক আন্দোলন গণ আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে। সেপ্টেম্বর মাসে রাজ্যের প্রত্যেক জেলার প্রশাসনিক অফিসের সামনে মহাপড়াও শুরু হয়। সেপ্টেম্বরের ৭ তারিখে সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। অবশেষে বসুন্ধরা রাজের সরকার আন্দোলনকারীদের বেশীরভাগ দাবী মানতে বাধ্য হয়। 

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে চলা কৃষক আন্দোলনগুলোকে একসুতোয় বাঁধতে জুন মাসের শেষদিকে গঠিত হয় অল ইন্ডিয়া কিষাণ সংঘর্ষ কোঅর্ডিনেশন কমিটি। বামপন্থীদের পাশাপাশি এই কমিটিতে সামিল হয় রাজু শেট্টির স্বাভিমানি শ্বেতকারি সংগঠন, মেধা পাটকরের এন এ পি এম, যোগেন্দ্র যাদবের স্বরাজ্য অভিযান, দক্ষিণ ভারতের ন্যাশনাল সাউথ ইন্ডিয়ান রিভার লিঙ্কিং ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশান সহ ১৮৪ টি সংগঠন। কমিটির উদ্যোগে ১০ হাজার কিলোমিটার পথ হাঁটে কিষাণ মুক্তি যাত্রা। তারপর রাজধানীতে এই সমাবেশ। সমাবেশে বিদর্ভের আত্মঘাতী কৃষকদের সন্তানদের সঙ্গেই ছিলেন পুলিসের হাতে খুন হওয়া মন্দাসৌরের কৃষকদের স্ত্রী রা। যন্তর মন্তরে নগ্নগাত্রে ধর্ণা চালানো তামিলনাড়ুর কৃষকদের সাথে মিলিত হলেন ভাঙড়ের জমি হাঙরদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী কৃষকরা। অবস্থান মঞ্চে সম্বর্ধনা দেওয়া হয় মহারাষ্ট্র ও রাজস্থানের কৃষক আন্দোলনের দুই নেতা রাজু শেট্টি ও অমরা রাম কে। নিজেদের মধ্যে আদর্শগত, শ্রেণীগত ও অঞ্চলগত নানা পার্থক্যকে দূরে সরিয়ে রেখে এভাবে এতগুলো কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগঠনের এক মঞ্চে আসা যেমন নজিরবিহীন, তেমনি অভিনব নিজেরাই প্রতীকি সংসদ বসিয়ে বিল পাস করানো। এই দুটি বিলের কপি পার্লামেন্টের সমস্ত সাংসদের কাছে পাঠানো হবে, পাঠানো হবে কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রকেও। ২৬শে নভেম্বর থেকে ২৬শে জানুয়ারি, ভারতীয় সাধারণতন্ত্রের সংবিধান পাস হওয়া ও লাগু হওয়া কে মনে রেখে, এই দুটি বিল নিয়ে প্রচার চালাবে সংঘর্ষ কমিটি।

 

সরকার ও কর্পোরেট মেসিহা 

আমরা স্কুলে পড়তাম, ভারতবর্ষ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এখানকার ৭০% মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অবস্থাটা খুব একটা বদলায় নি। অথচ কৃষির সংকট নিয়ে আমাদের, শহরের মানুষদের মধ্যে একটা অদ্ভুত ঔদাসীন্য কাজ করে। গুলিচালনা বা হিংসাত্মক ঘটনা না ঘটলে সংবাদমাধ্যমেও জায়গা পান না কৃষক রা। সরকারি প্রতিক্রিয়াও তথৈবচ। খরায় বিপর্যস্ত তামিলনাড়ুর কৃষকরা সরকারি ক্ষতিপূরণের দাবী নিয়ে কয়েকমাস ধরে পড়ে রইলেন দিল্লীর রাস্তায়, আত্মঘাতি হওয়া পরিজনদের মাথার খুলি নিয়ে। স্যোসাল মিডিয়ার কিছু ছবি ছাড়া না তাঁরা পেলেন জাতীয় মিডিয়ার অ্যাটেনশান, না পেলেন কোন সরকারের কোন মন্ত্রীর দেখা। উল্টে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কাছে বিক্ষোভ দেখানোর জন্য পুলিস তাঁদের কয়েকজনকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল। মধ্যপ্রদেশের হত্যাকাণ্ডের পর অনশনে বসলেন মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান, আর কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী রাধারমণ সিং কৃষকদের পরামর্শ দিলেন যোগাসন করতে। শাসকদলের ঘনিষ্ঠ এক হিন্দু ধর্মগুরু ঘোষণা করলেন কৃষকরা আত্মহত্যা করছে আধ্যাত্ম্যিকতার অভাবে। ভারতবর্ষের কৃষকরা শেষ হয়ে গেলেও বোধহয় শাসকগোষ্ঠীর কিছু এসে যায় না। কিংবা ভুল বললাম, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী হয়ত চায় কৃষি অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাক। তাহলেই বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্থাগুলোর হাতের মুঠোয় বন্দী হবেন কৃষকরা। এই নভেম্বর মাসের গোড়াতেই "ওয়ার্ল্ড ফুড ইন্ডিয়া" নামক মেগা ইভেন্টের উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ভারতবর্ষে চুক্তি চাষের বিরাট সম্ভাবনা আছে। কর্পোরেটদের এই সুযোগ নষ্ট না করতে আহবান জানান তিনি। 

বহুজাতিক কর্পোরেটদের হাত পড়লে কৃষির কি সর্বনাশ হতে পারে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে মনসান্টোর উপাখ্যান। স্থানীয় বীজ বৈচিত্র্য কে তছনছ করে জেনেটিকালি মডিফায়েড বিটি তুলো চালু করে কৃষকদের গলা কেটে "রয়ালটি"র টাকা আদায় করছে তারা। বিটি তুলো চালু করা হয়েছিল পোকামাকড়ের উতপাৎ কমানোর কথা বলে। বাস্তবে বিটি তুলোর প্রযুক্তি এমনই যে কিছু নির্দিষ্ট পোকামাকড়ের জন্য তা বানানো যায় এবং এর ফলে অন্য পোকামাকড়ের আক্রমণ বেড়ে যায়। শুধু তাই নয় ঐ নির্দিষ্ট পোকাগুলোও খুব তাড়াতাড়ি নিজেদের জিনে প্রয়োজনীয় মিউটেশন ঘটিয়ে ফের আক্রমণ শুরু করে। তখন আবার আমদানি হয় পরের প্রজন্মের বিটি তুলোর। বিটি তুলো ১ ও ২ এর ব্যর্থতার পর এখন বিটি তুলো ৩ বাজারে আনতে চলেছে মনসান্টো। আর এর মধ্যে কি হয়েছে? ৯৮ এ মনসান্টো এদেশে ব্যবসা শুরু করার পর তুলোর দাম বেড়েছে ৮০ শতাংশ আর লোকসানের বোঝা সামলাতে না পেরে দলে দলে আত্মহত্যা করেছেন কৃষকরা। শুধু তাই নয় দেশীয় বীজ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলোর অভিযোগ মনসান্টো যে রয়ালটি ও প্রযুক্তি ফি-র টাকা নেয় সেটাই বেআইনী। ভারতীয় পেটেন্ট আইন অনুযায়ী প্রাণী উদ্ভিদ বা তাদের কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে জিনগত গবেষণা পেটেন্টের আওতায় পড়ে না। বিষয়টা এখন জাতীয় প্রতিযোগিতা কমিশনের বিচারাধীন।

 

 

এই লেখার কোন উপসংহার টানার মানে হয় না। কৃষকরা কোন পথে তাঁদের আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, তাঁদের মধ্যে ঐক্য অটুট থাকবে কি না, সরকার এর মোকাবিলায় কি পদক্ষেপ নেবে, ধর্মীয় মেরুকরণ বা যুদ্ধোন্মাদনা তৈরী করে আন্দোলনকে ভাঙতে পারবে কি না, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কি ভূমিকা হবে, স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ মানতে সংসদকে বাধ্য করা যায় কি না, সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ তাদের ঔদাসীন্য ঝেড়ে ফেলতে পারে কি না এ সব প্রশ্নের উত্তরই এখনো ভবিষ্যতের গর্ভে।


 
তথ্যসূত্রঃ

১। কৃষক আত্মহত্যা, চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম (১লা জুলাই ২০১৭)
২। Interview with Yogendra Yadav, Indian express, 23rd November, 2017
৩। "Sikar: No Longer Just a Farmers’ Movement, But a People’s Movement for Farmers", News Click, 12th September, 2017
৪। "How Long Can India’s Farmers Subsidise the Nation?", The Wire, 2oth November, 2017
৫। স্বামীনাথন কমিশনের রিপোর্ট, PRSLegislative Researchএর ওয়েবসাইট
৬। Interview with Ajit Nawale on farmers movement in Maharashtra, News Click, 6th October, 2017
৭। গণশক্তির রিপোর্ট, ২১/১১/১৭ ও ২২/১১/১৭
৮। ইন্টারনেট ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে প্রাপ্ত তথ্য।

 

কিষাণ মুক্তি আন্দোলন নিয়ে কিছু কথা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments