দিদা বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হত একশো বছর। বাবার মা কে ঠাকুমা বলারই চল আছে। কেন জানি না আমি আর দাদা দুজনেই তাঁকে দিদা বলেই ডাকতাম। দাদু যখন মারা যান তখন আমার বয়স মেরেকেটে নয়। তাছাড়া শেষ কয়েকটা বছর তিনি ভীষণ অসুস্থ আর শয্যাশায়ী ছিলেন। কাজেই দাদুর স্মৃতি আমার কাছে খুব একটা নেই। কিন্তু ছোটবেলার অনেকটাই কেটেছে দিদার স্নেহচ্ছায়ায়। বাবা মা দুজনেই স্কুলে চাকরি করতেন। ফাইভ অবধি সকালের স্কুল করে এসে তো দিদার কাছেই থাকতাম। তখন মোড়ে মোড়ে মিষ্টির দোকান গজিয়ে ওঠেনি। দুপুর বেলায় রাস্তা থেকে হাঁক শোনা যেতঃ খাবাআআআর। আর শুনেই একদৌড়ে দরজার বাইরে। বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা মাথার ঝাঁকা সামনের রোয়াকে নামাতেন আর তার মধ্যে থেকে বেরতো সন্দেশ, গজা, নিমকি আরো কত কি। দিদা আঁচলের গিঁট খুলে পয়সা বের করার আগেই তার বেশ কয়েকটা চালান হয়ে যেত আমার মুখে। তখনো অবশ্য জানতাম না দিদা কতটা বড় মাপের মানুষ। তবে বাড়িতে লোকজনের আনাগোনা লেগেই থাকত। দূর দূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজনরা যেমন আসতেন তেমনি আসতেন এলাকার নানা মানুষ, দল ও মহিলা সমিতির কর্মীরা। আজও লোকে আমায় চেনে "দয়াল মাস্টার" আর "মুক্তাকাকিমার নাতি হিসেবেই"। 

দিদার জন্ম ১৯১৭ সালের ভাদ্রমাসে, বর্ধমানের একটা সম্পন্ন পরিবারে। তখন তাঁর নাম ছিল হরিমতী। দাদাদের থেকেই স্বদেশী হাওয়ায় প্রভাবিত হয়েছিলেন। মাত্র ১১ বছর বয়সে দয়াল কুমারের সঙ্গে বিয়ে হয়। "মুক্তা" নামটা দাদুই দিয়েছিলেন। তারপর, দিদার নিজেরই কথায়, দেশপ্রেমের আবেগকে শ্রেণিচেতনার আবেগে সেঁকে নেওয়া, দাদুর প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নেমে, দ্রোহমূলক গান কবিতা লিখে রাজরোষে পড়ে প্রথমে ব্রিটিশ তারপর স্বাধীন ভারতের কারাগারে অন্তরীণ হওয়া। দিদার যুদ্ধ, দাঙ্গা, মহামারীর সময় মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির মাধ্যমে ত্রাণ ও সেবাকার্য সংগঠিত করা। সুইজারল্যান্ডের লুসান শহরে বিশ্ব মাতৃ সন্মেলনে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করা। আর এসবের সঙ্গেই প্রবল অনটনের মধ্যে দশ ছেলেমেয়েকে মানুষ করে তোলা।

তখন সম্ভবতঃ ফাইভে পড়ি। এক লোডশেডিং এর রাতে আমি আর দাদা হঠাৎ ঠিক করলাম একটা হাতে লেখা পত্রিকা বের করব। বাবা-কাকা-পিসি রা তাদের ছোটবেলায় বাড়ির সবার লেখা দিয়ে ঐরকম একটা হাতে লেখা পত্রিকা করেছিল। সেটা দেখেই হয়ত এমন ভাবনা। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। পর পর পাঁচ মাস ধরে বেরলো সেই "ছোট্ট পত্রিকা"। প্রথম সংখ্যার কয়েকটা ফাঁকা পাতা রাখা হয়েছিল যাতে বড়রা মতামত জানাতে পারে। সেই পাতায় দিদা লিখেছিলেনঃ 

এতদিন আমার মনের মাঝে যে বীজ বপন করা ছিল, তোমাদের উদ্যোগে ছোট্ট পত্রিকা প্রকাশনার মধ্যে অঙ্কুরিত হতে দেখে আশান্বিত হলাম। উত্তরোত্তর শাখাপ্রশাখা পল্লবিত হয়ে উঠুক। — দিদা, ডিসেম্বর ১৯৯৬

পত্রিকার শেষ তথা শারদ সংখ্যায় স্বাধীনতার ৫০ বছর উপলক্ষে তিনি একটা ছোট্ট প্রবন্ধও লিখলেন। আরো বছর পাঁচেক পরে বন্ধুরা মিলে যখন "অভিযান" পত্রিকা বের করলাম তখনও তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, "তোকে সায়েন্স নিতে হবে না, তুই আর্টস নিয়ে পড়বি।" তাঁর কথা অবশ্য রাখতে পারিনি। দিদার মৃত্যুর কয়েকমাস পরেই আমি মাধ্যমিক দিলাম। তারপর "অভিযান" পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় স্বাধীনতার ৫০ বছরের সেই লেখাটা আবার ছাপা হল। একটা সুন্দর হেডপিস এঁকে দিয়েছিল সমদা (স্মিতধী গাঙ্গুলী)। স্বাধীনতার ৭০ বছর পূর্তির প্রাক্কালে সমদার হেডপিস সহ পুরো লেখাটাই দিয়ে দিলাম। 

 

শারীরিক অসুস্থতার কারণে বেশ কিছুদিন কলকাতার কসবায় ছোট ছেলের চিকিৎসাধীনে ও তত্ত্বাবধানে ছিলাম। সেই সময়ের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়ে গেল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। তখন শুয়ে শুয়ে সম্পূর্ণ বিশ্রামের মধ্যে অন্য কিছুই করতে পারতাম না। সময়মত ঝর্ণা রেডিওটা খুলে দিয়ে যেত, শুনতাম। গত একবছর ধরেই প্রচারমাধ্যমে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর নানা অনুষ্ঠানের কর্মসূচী শুনে আসছি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে কোন স্তরে কোন সাড়াই যেন পেলাম না – একমাত্র প্রচারমাধ্যমে কিছু কিছু শুনলাম। সমস্ত এলাকাটাই যেন নিস্তব্ধ। এই নিরিবিলি বিশ্রামের মাঝে পঞ্চাশ বছর আগের সেই প্রথম স্বাধীনতা দিবসের স্মৃতি মনকে আলোড়িত করে তুলতে লাগল। 

সেই দিনের প্রাক্কালে পাড়ায় এবং বাড়িতে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। অজয় বলে একটি ছেলে বাড়ি থেকে চলে এসে আমাদের পরিবারের সঙ্গে প্রায় একাত্ম হয়ে গিয়েছিল। দয়াল কুমারের নির্দেশনায় ছোট বড় অশোক চক্রের ব্লক অজয় নিজেই তৈরী করেছিল। তারপর কয়েকদিন ধরে পতাকা সেলাই করতে লেগেছিল। ছোট-বড়, ছেলে-বুড়ো সবাই মিলে বাড়িতেও একটা উৎসব করার মতলব ভাঁজা হচ্ছে। সকলের ভাবনা এটাই যে, দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শোষকদের হাত থেকে স্বাধীনতা উদ্ধার হবে ১৫ই আগষ্ট। সমস্ত ভারতবাসী খেতে পাবে, পড়তে পাবে, কাজ পাবে এই আশায় সর্বস্তরের ও সব বয়সেরই মানুষ যেন অজানা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল। সারা রাত্তির ধরে পতাকা তৈরী হয়েছে, বাড়ির সবাই যোগান দিয়েছে। ভোরবেলাতেই ছনি পরিমল এদের নেতৃত্বে জাতীয় সঙ্গীতের প্রভাতফেরি সারা অঞ্চলটাকে স্বাধীনতা দিবসের আনন্দে উদ্ভাসিত করে তুলল। ভোর হতেই ছোট ছোট পতাকা হাতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে পড়ল এবং বড়রা পতাকা নিয়ে গেল বাড়িতে লাগাবে বলে। আমারও উৎসবের আনন্দে রান্নায় মন লাগছিল না। বারবার সদরে বেরিয়ে এসে কিশোর বাহিনী ও অন্যান্যদের উচ্ছাস ও আনন্দ দেখছিলাম। 

সেদিনের স্বাধীনতার আনন্দ ও আশা আর পঞ্চাশ বছর পর এই দিনটিতে মানুষের উচ্ছাস ও আবেগের আকাশ পাতাল তফাত। যে আশা নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত হয়েছিলাম তার বেশীরভাগই আজ অসম্পূর্ণ, অপূর্ণ। আজ সমস্ত দিকে নির্লিপ্ততা ও শূন্যতার মাঝে মনের মধ্যেও শূন্যতা ও বিষাদ অনুভব করছি। আশা এই যে সমাজ ব্যবস্থার সততই পরিবর্তন হয়। আজ আমি বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কাছে এই প্রত্যয় রাখছি তারা সকলের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষার সংগ্রাম করে যাবে এবং অদূর ভবিষ্যতে সকলের জন্য একটা সুখী সমাজ কাঠামো গড়ে তুলবে। 

সুবর্ণজয়ন্তীর শুভলগ্নে আমার জীবনসন্ধ্যার প্রাক্কালে এই আশা রাখছি। 

মুক্তা কুমার, ছোট্ট পত্রিকা এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments