ঝড়বৃষ্টি হয়ে ওয়েদারটা বেশ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তেতলায় চিলেকোঠার ঘরে চিৎ হয়ে শুয়ে ফেসবুকে কি স্ট্যাটাস দেওয়া যায় ভাবছিলাম। হঠাৎ জানলা দিয়ে খচমচ করে কি যেন ঘরে এসে পড়ল। পাশের আমগাছ টা কদিন ধরেই হনুমানদের দখলে। তারাই কেউ ঢুকে পড়ল না কি ভেবে ধড়মড় করে উঠে বসে দেখি, হনুমান তো নয়, ইয়াব্বড় শিংওলা একটা গরু লগবগ করতে করতে ঠ্যাং ছড়িয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। গল্পের গরু গাছে ওঠে বলে জানি, কিন্তু তিনতলায় ওঠা গরুর কথা তো আগে শুনিনি। আরেকটু হলেই ভির্মি খেতাম, কিন্তু গরুটা এমন মানুষের গলায় কথা বলে উঠল, যে ভির্মি খাওয়া ভুলে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম।

"মুখ বন্ধ কর, গলায় মশা ঢুকে যাবে। অত অবাক হওয়ার কি আছে শুনি? গরু দেখোনি না কি?"
"নাআআ কিন্তু …" কথা বলব কি, গলা আটকে যাওয়ার জোগাড়।
"আরে বাবা দিদির খোঁজে এসেছিলাম। তা দিদি তো শুনলাম দ্যুলোকে পাড়ি দিয়েছেন। কোথায় যাব ভাবছিলাম, তারপর জানলা দিয়ে তোমায় দেখে বোকাসোকা ভালোমানুষ মনে হল তাই ঢুকে পড়লাম।"
"দিদি ???"
"দিদি মানে তোমরা যাঁকে মহাশ্বেতা দেবী বল। পাশে সন্দেশ পত্রিকাটা ওল্টানো রয়েছে দেখতে পাচ্ছি, অথচ আমায় চিনতে পারছ না?"
"ন্যা ন্যা ন্যা …"
"এই তো মাথা খুলেছে, গলাটা খুলছে না কেন। হ্যাঁ আমিই ন্যাদোশ। যাক গে শোন আমি গোলোক থেকে আসছি। গোলোক বোঝ তো? তুমি আবার যা হাঁদাগঙ্গারাম! মানুষ মরলে যেমন দ্যুলোকে যায়, গরু মরলে তেমনি গোলোকে যায়।"
বোতল থেকে দু-ঢোক জল খেয়ে আর ঘাড়ে মাথায় একটু ছিটিয়ে খানিকটা ধাতস্থ হয়ে বললাম, "হ্যাঁ জানি বইকি। সন্দেশে পড়েছি। তুমি মহাশ্বেতা দেবীর পোষা গরু ছিলে। তুমি না কি মাছ মাংস খেয়ে গিনেস বুকে নাম তুলেছিলে?"

"সেসব দিনের কথা আর বোলো না। গো-লোকে এখন মাছ মাংসের সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেছে। কতদিন যে বীফ খাইনি!" উদাস চোখে জানলা দিয়ে তাকিয়ে বলল ন্যাদোশ।
"তুমি বীফ খেয়েছো? এটা তো একরকমের ক্যানিবলিজম! গরু হয়ে গরুর মাংস খাওয়া!"
"আরে রাখো তোমার ইজমের কচকচি। গো-লোকে ক্যানিবলিজম, ন্যাশনালিজম কোন ইজমই নেই। আরে বাবা যে গরুর মাংস খেয়েছি সে তো মরে গিয়ে আমাদের সঙ্গেই যোগ দিয়েছে, না কি?"
মাথা চুলকে বল্লুম, "হুম্ম। ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে দেখছি"
"গোলমেলে আবার কিসের? তোমরা মানুষরা বড্ড বেশী ভাবো। ঐজন্যেই তোমাদের মাথা আউলায়ে যায়। এই তোমাদের জন্যেই মর্ত্য থেকে মাংস রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। এখন অবশ্য গো-লোকে কাউলেস বীফ আসছে।"

"কাউলেস বীফটা আবার কি?"
ন্যাদোশ দাঁত খিঁচিয়ে উঠল, "ক্যাশলেস ইকনমি বোঝ আর কাউলেস বীফ বোঝ না? কাউলেস বীফে মানুষের মাংস থাকে। যেসব মানুষ খাঁটি দেশপ্রেমিক নয় তাদের মাংস। ভালোই খেতে। সে যাক, যেজন্যে মর্ত্যে এসেছিলাম সেটা বলি। ভূলোকে নাকি আজকাল গরু খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে? আর গরুরা সব গোমাতা হয়ে যাচ্ছে?"
"হ্যাঁ সে তো ভালোই।"
"ভালো আবার কোথায় পেলে এর মধ্যে? পৃথিবীতে গরু মরছে না বলে তো গোলোকে পপুলেশন কমে যাচ্ছে। যে কটা গরু মরছে তারা গোলোকে না এসে গোমালোকে চলে যাচ্ছে। এরকম চলতে থাকলে তো গোলোক পুরো ফাঁকা হয়ে যাবে!!"
"গোমালোক?"
"গোমাতা দের লোক আর কি!"
"ও আচ্ছা। তা গোলোক ফাঁকা কেন হবে বুঝলাম না। যারা এখনো গোলোকে আছে তারা তো আর দ্বিতীয়বার মরবে না?"

"তোমার দেখছি বিদ্যেবুদ্ধি কিস্যু নেই। বলি বিগ ব্যাং থিয়োরির কথা জানো? ইউনিভার্স যে এক্সপ্যান্ড করছে সে খবর রাখো? দ্যুলোক, গোলোক সবই তো ইউনিভার্সের গায়ে চাদরের মত জড়িয়ে আছে। তাই ইউনিভার্সের সঙ্গে সেগুলোও এক্সপ্যান্ড করছে। এখন নতুন গোরুরা ভূলোক থেকে না গেলে গোলোক ফাঁকা হয়ে যাবে না?"
মাথাটা আরো ঘুলিয়ে গেল। কিন্তু এর যা রকম সকম দেখছি বেশী প্রশ্ন করতে গেলে ঐ শিং দিয়ে গুঁতিয়ে না দেয়! তাই তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বললাম, "ও আচ্ছা আচ্ছা বুঝেছি।"

"এ আর না বোঝার কি আছে! যাই হোক আগে তো এসব সমস্যার কথা দিদিকে এসে বলতাম। দিদি অনেকবার দুঃখ দুর্দশার কথা কাগজে লিখেছেন। এখন দিদি নেই। তোমাকে পেলাম তাই বলে গেলাম। তোমাদের ঐ ফেসবুক না কি যেন আছে তাতে ছাপিয়ে দিও। আমি মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারি বলে গো-লোকের গোরুরা আবার আমাকেই প্রতিনিধি করে পৃথিবীতে পাঠায়।"
"মহাশ্বেতা দেবী তো দ্যুলোকে আছেন। তোমরা ওখানে গিয়ে ওনার সঙ্গে দেখা করতে পারো না?"
"আগে পারতাম। এখন আর পারি না। আমাদের আধার কার্ডের ব্যবস্থা হচ্ছে। ওটা হয়ে গেলেই যেতে পারব। তাছাড়া উনি তো নাস্তিক! দ্যুলোকে আছেন কি না তাও জানি না। তাই বলছি এসব কথা তোমাকেই লিখতে হবে।"
"নিশ্চয়ই। লিখবো তো বটেই। তোমার থুরি আপনার আদেশ কি অমান্য করতে পারি? গোমাতা বলে কথা!"
যেই না বলেছি, গরুটা বিষম রেগে শিং নেড়ে তেড়ে এলো, "গোমাতা বলে গাল দিচ্ছিস কেন রে? আমি গোমাতা নই, ন্যাদোশ" বলেই পেটে মারল এক গুঁতো।

চোখ মেলে দেখি গিন্নি পেটে খোঁচা দিচ্ছে আর চেঁচাচ্ছে, "ওঠো ওঠো। ভরসন্ধেবেলায় চারটে মোটা মোটা বই আর মোবাইল নিয়ে নাক ডাকাচ্ছে। কি ঘুমোতেই না পারে লোকটা!"

  

ছবিটা "সন্দেশ" পত্রিকা থেকে নেওয়া। মহাশ্বেতা দেবীর "গল্পের গরু ন্যাদোশ" গল্পে সত্যজিৎ রায়ের অলঙ্করণ।

 

ন্যাদোশের নালিশ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments