কুমারের কপচানি

চোখে আলো এসে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল। বাইরে বেরিয়ে এলাম। দূরে পাহাড়ের মাঝ দিয়ে উঠে আসছে সূযযিমামা। আকাশে হালকা মেঘ রয়েছে। ঠাণ্ডা ভালোই, কিন্তু পাতলা রোদ আবহাওয়াটাকে আরামদায়ক করে দিয়েছে। আর্মি ক্যাম্পের জওয়ানরা প্রাতঃকালীন শরীরচর্চায় ব্যস্ত। দুজন দেখলাম জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলেন কাঁধে কাঠকুটো নিয়ে। এখানে রান্নাবান্না চলে কাঠের উনুনেই। পাশেই একটা একটু বড় তাঁবু থেকে মাঝে মাঝেই মেয়েলি গলায় হিন্দি গানের কলি ভেসে আসছিল। ওখানেই বোধহয় রান্নার কাজ চলছে। ট্রেকার্স হাটের হোস্টরা তাঁদের কাজকর্ম শুরু করে দিয়েছেন। একে একে দলের অন্যরাও উঠে পড়েছে। ম্যাগি আর চা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে রেডি হয়ে নিলাম। আমাদের গাইড নিম দরজিও এসে গেছেন। সবার জন্য বাঁশের লাঠিও তৈরী হয়ে গেল। এবার শুরু হবে ট্রেকিং।

 লাল রডোডেনড্রন। 

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে হিলের উচ্চতা ৯০০০ ফুট আর ভার্সের ১০০০০ ফুট। অর্থাৎ হিলে থেকে ভার্সে এক হাজার ফুট উঁচুতে। আর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পায়ে চলা পথে দুরত্ব সাড়ে চার কিলোমিটার। ক্যালকুলেটার খুলে বসলে সহজেই বের করে ফেলতে পারবেন এই পথের গড় নতি কত। তবে করে লাভ নেই। কারণ Welcome to Barsey Rhododendron Sanctuary লেখা গেট দিয়ে ঢুকলে ঐসব অঙ্ক মাথা থেকে বেরিয়ে যাবে। একদিকে উঠে গেছে পাহাড়, অন্যদিকে নেমে গেছে খাদ। দুধারে পাইন, বাঁশের আর কত নাম না জানা গাছের বন। পাহাড়ের গা বেয়ে ছোটো ছোট ঝোরা নেমে এসেছে। পাতা খসে যাওয়া বাদামি পাইন গাছ, হলদে সবুজে মেশানো বাঁশঝাড়, পাথরের গায়ে  গজিয়ে ওঠা ফার্ণ জাতীয় উদ্ভিদের সবুজ পাতা, নানা রঙের বুনো ফুল আর পাতার ফাঁক দিয়ে গলে আসা সূর্যের রশ্মি – সব মিলিয়ে একটা অপরূপ ক্যানভাস প্রকৃতি সাজিয়ে রেখেছে পদযাত্রীদের জন্য। যত ওপরে ওঠা যাচ্ছে ততই সেই ক্যানভাসে ফুটে উঠছে থরে থরে সাজানো রডোডেনড্রন। তাদের রঙ কখনো  টকটকে লাল, কখনো গোলাপি, কখনো ফ্যাকাশে লাল আবার কখনো বা ধপধপে সাদা। কোথাও কোথাও জঙ্গল একটু পাতলা, একধারে খাদের বদলে বিস্তীর্ণ ঘাসের উপত্যকা। তার মধ্যে রডোডেনড্রনের গুচ্ছ, পেছনে পাহড়ের সারি। পথের ধারে ধারে বন দফতরের সাইনবোর্ড জানাচ্ছে এই অরণ্য হিমালয়ান রেড পাণ্ডাদের আবাসস্থল। বাঁশপাতা ভোজী এই লাজুক বেড়ালটা পৃথিবীর বিপন্ন প্রাণীদের তালিকায় অন্যতম। এছাড়া আছে জায়েন্ট স্কুইরেল বা উড়ুক্কু কাঠবেড়ালি।  

 গোলাপি রডোডেনড্রন। 

আমাদের মধ্যে অনির্বাণ ট্রেকিং এ অভিজ্ঞ, আর ববের ফিটনেস, এনথু দুটোই অপরিসীম। ওরা এগিয়ে যাচ্ছিল লাফিয়ে লাফিয়ে। আমি আর শ্রীরূপা যাচ্ছিলাম থামতে থামতে, ছবি তুলতে তুলতে। পল্লবও আমাদের সঙ্গেই যাচ্ছিল। আর নিম দরজি তো একটা পা গলানো চটি আর হাতকাটা জ্যাকেট পরে, কাঁধে দুটো কম্বল নিয়ে হাঁটছিলেন। রাস্তার বাঁকে বাঁকে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। রাস্তায় প্রচুর লোক ট্রেক করছিল আমাদের আগে-পরে, বুঝলাম ভার্সে হিলের মত জনমানবশূণ্য হবে না। দমদম থেকে এক বাঙালী ভদ্রলোক স্ত্রী ও শ্যালক কে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি আগে অনেক ট্রেক করেছেন। আমাদের বললেন, ''আপনাদের তো পাক্কা ট্রেকার মনে হচ্ছে!" আমরা তো শুনে হাঁ! এটা আমাদের প্রথম ট্রেক শুনে অবাক হলেন। "আসলে যারা নতুন ট্রেক করে তারা তড়বড় করে এগিয়ে যায়। আর পাকা ট্রেকাররা সময় নিয়ে চারপাশ টা দেখতে দেখতে যায়!" চড়াই উৎরাই থাকলেও এমনিতে রাস্তাটা কঠিন কিছু নয়। দশ বছরের বাচ্ছা থেকে ষাট বছরের বৃদ্ধ সকলেই যেতে পারবেন – যদি শরীর সুস্থ থাকে, শ্বাসকষ্টর সমস্যা না থাকে। স্থানীয় মানুষের কাছে তো এগুলো কোন ব্যাপারই নয়। নিম দরজি বললেন এই রাস্তাটা হাঁটতে ওনার একঘন্টা লাগবে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে একটা শর্টকাট রুট দেখালেন, যেটা দিয়ে চটপট সোমবেরিয়া যাওয়া যায়। সোমবেরিয়া এ অঞ্চলের নিকটবর্তী গঞ্জ টাইপের জায়গা। আমরা যেতে পারব কি না জিজ্ঞেস করতে হেসে মাথা নাড়লেন। তবে এখানে চিতাবাঘ আছে। তাই রাতের দিকে একা কেউ চলাফেরা করে না। 

 সাদা রডোড্রেনড্রন। 

আমরা যখন পাহাড়ের মাথায় পৌছলাম তখন বারোটা বেজে গেছে। রাতে আমাদের মাথা গোঁজার জায়গা হল "গুরস কুঞ্জ"এ। তবে ঘরে নয় তাঁবুতে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। "গুরস" রডোডেনড্রনের নেপালি প্রতিশব্দ। নেপালি সংস্কৃতিতে রডোডেনড্রনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। নেপালের জাতীয় ফুল যেমন রডোডেনড্রন, ভারতের সিকিম রাজ্যের প্রাদেশিক বৃক্ষও তেমনি রডোডেনড্রন। আগেই বলেছি রডোদেনড্রন নানা রঙের হয়। এর হাজারের কাছাকাছি প্রজাতি আছে। এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকার নানা জায়গায় পাওয়া গেলেও প্রজাতির বৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশী হিমালয় পর্বতমালা অঞ্চলে। বিভিন্ন প্রজাতির আলাদা আলাদা নেপালি নাম আছে কি না জানিনা। তবে সাদা সাদা রডোডেনড্রনের নেপালি নাম শুনলাম "চিমল"। ফুলের শোভা মন ভরে দেখতে গেলে পাহাড়ের ওপর উঠতেই হবে। রডোডেনড্রন ছাড়াও নাম না জানা নানা রঙের ফুলের মাঝে এই লজটির "গুরস কুঞ্জ" নাম তাই এক্কেবারে সার্থক। 

 নাম না জানা ফুল। 

সে দিনটা গুডফ্রাইডের ছুটি ছিল। তাছাড়া আকাশ একদম পরিস্কার। প্রচুর লোক ঘুরতে এসেছেন। বাঙালী যেমন আছে তেমনি সিকিমের স্থানীয় মানুষও আছে। এনাদের বেশীরভাগই দিনের বেলাটা কাটিয়ে নেমে যাবেন, বাকিরা এখানেই রাত্রিবাস করবেন। একজন দক্ষিণ ভারতীয় হাতে বিশাল লম্বা একটা ক্যামেরা নিয়ে ঘুরছিলেন। পল্লব বলল উনি পক্ষীবিদ। এত লোকের কলরবে পাখি পাওয়া যাবে না বুঝে তিনি জঙ্গলের দিকে চলে গেলেন। মোটা চালের ভাত, বরবটির তরকারি আর ডিমের ঝোল দিয়ে লাঞ্চ সেরে সামনের খোলা জায়গায় ঘাসের ওপর এলিয়ে পরলাম। ঠাণ্ডার মধ্যে রোদ পোহানোর মজা আর কিছুতে নেই। একদল স্থানীয় ছেলেমেয়ে নেপালি গান বাজিয়ে নাচছে, এক বৃদ্ধও যোগ দিয়েছেন তাদের সঙ্গে। বাঙালী ট্যুরিস্টরা কেউ ক্যামেরা নিয়ে ঘুরছে, কেউ দল পাকিয়ে গুলতানি মারছে। এক সদ্যবিবাহিত দম্পতি নিজেরাই তাঁবু খাটানো শুরু করে দিয়েছে। অনির্বাণ পড়ে আছে গুরস কুঞ্জের ম্যানেজার পাসাং শেরপার পেছনে। আমাদের তাঁবুগুলোও এইবেলা খাটিয়ে নিতে হবে।

 কোথাও কোথাও জঙ্গল একটু পাতলা, একধারে খাদের বদলে বিস্তীর্ণ ঘাসের উপত্যকা। তার মধ্যে রডোডেনড্রনের গুচ্ছ, পেছনে পাহড়ের সারি। 

পাসাংএর বাড়ি নেপাল সীমান্তের কাছে বস্তিতে। তিনি কলকাতায় এসে হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের কোর্স করে গেছেন। বললেন, "হাওড়া স্টেশনে নেমে তো 'যাত্রীগণ কৃপেয়া ধ্যান দে' আর 'for your kind attenstion please' শুনে তো কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়! আর কত লোক, বাপরে!!" গুরস কুঞ্জে তাঁর অতিথিও অবশ্য কম নয়। তাদের একেক জনের একেক রকম চাহিদা সামলাতে গিয়ে নাজেহাল হচ্ছিলেন। শেষে বলেই বসলেন, "আপনাদের সমতলের লোকেদের সবাইকে তো একই রকম দেখতে, তাই গুলিয়ে ফেলছি!" আমরা যে উত্তরপূর্ব ভারতের মানুষদের চীনেদের মত দেখতে বলি এটা কি তারই পালটা ভাষ্য? জিজ্ঞাসা করা হল না। বিকেলের আগেই তাঁবু রেডি হয়ে গেল। আমদের দুজনের জন্য একটা ছোট্ট তাঁবু খাটানো হল গুরস কুঞ্জের চত্বরে। ওদের তিনজনের তাঁবুটা একটু বড়। পাসাংজি সেটা খাটিয়ে দিয়ে এলেন চত্বরের বাইরে বন দফতরের এলাকায়।

 

 যত উঁচুতে উঠছি তত ফুলের সংখ্যা বাড়ছে। প্রকৃতির ক্যানভাস। 

সূর্য ডুবতেই ঠাণ্ডাটা জাঁকিয়ে বসল। সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। হাতে গ্লাভস, পায়ে মোজা, তবু হাত পা যেন অসাড় হয়ে যাচ্ছে।এই ফুলটার নাম স্নেক লিলি। পাসাং দেখালেন, একটা রডোডেনড্রন গাছের তলায় ফুটে ছিল। একেবারে ফণা তোলা সাপের মত দেখতে। শ্রীরূপা দুটো সোয়েটারের ওপর অনির্বাণের একটা কম্বল চাপিয়ে বসল। সবচেয়ে ছড়িয়েছে পল্লব। একটা ফিনফিনে পাঞ্জাবী পরে সে পাহাড়ে পয়লা বৈশাখ উদযাপন করতে এসেছে। ব্যাগে নিয়েছে একটা সোয়েটার আর একটা মাফলার। শেষে অনির্বাণের একটা জ্যাকেট আর আমার একটা হনুমান টুপি পড়ে সামাল দিল। যারা ছিলাম সবাই গুরস কুঞ্জের বড় ডাইনিং হলে এসে আশ্রয় নিলাম। এখানে ইলেকট্রিসিটির কোন গল্প নেই। কেবল সূর্যাস্তের পর থেকে রাতের খাওয়াদাওয়া হওয়া পর্যন্ত ঘন্টা তিনেকের জন্য জেনারেটর চালানো হয়। এদিকে মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে এসেছে। টর্চও বিগড়ে গেছে। রাত্রে কি হবে ভেবে হাড় হিম হয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় এক বাঙালী ভদ্রমহিলা খবর দিলেন জেনারেটর থেকেই মোবাইল চার্জের ব্যবস্থা হবে। শুনে অনির্বাণ বলল "যাই ব্যাগ থেকে চার্জারগুলো নিয়ে আসি।" গেলো বটে, কিন্তু ফিরে এলো চার্জার ছাড়াই, "বব, টেন্টের মধ্যে তো ব্যাগ ট্যাগ কিচ্ছু নেই!" আসার আগের দিন অনির্বাণকে ছোট্ট করে একটু বোকা বানানো হয়েছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম সেটারই শোধ তুলছে হয়ত। তারপর বুঝলাম না, ব্যাপারটা সিরিয়াস। গুরস কুঞ্জে হুলুস্থুল পড়ে গেল। সবাই টর্চফর্চ যা আছে হাতে নিয়ে ছুটল। এরকম ঘটনা নাকি এখানে কোনদিন ঘটেনি! তাঁবুর ভেতর আলো ফেলে দেখা গেল পরিপাটি করে বিছানা পাতা কিন্তু ব্যাগপত্র হাওয়া। হঠাৎ পল্লব বলল, "আচ্ছা আমরা তো বিছানা পেতে যাইনি?" কি কাণ্ড! চোর শুধু ব্যাগ চুরি করে বিছানা পেতে দিয়ে গেছে – এমন ঘটনা ভার্সে কেন, ভূভারতে কোনদিন ঘটেছে বলে মনে হয়না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি এমন সময় "ইয়ে আপকা সামান হ্যায় না? মিসটেক হো গিয়া" বলে সাদা জ্যাকেট পরা একজন এসে ব্যাগগুলো তাঁবুর মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। জানা গেল তিনি পুসাই, কোন ট্যুরিস্ট পার্টি তাদের মালপত্র তাঁবু থেকে নিয়ে আসতে বলেছিল। উনি অন্ধকারে তাঁবু চিনতে না পেরে আমাদের ব্যাগগুলোই উঠিয়ে নিয়েছিলেন! আমাদের সবাইকে নিজের কার্ডও দিয়ে দিলেন তিনি।

 

 পাসাং শেরপার সঙ্গে। 

এদিকে গুরস কুঞ্জে আরেক ক্যাচাল শুরু হল। সেদিনটায় হঠাৎ করে অনেক লোক চলে আসায় লজের কর্মীরা বিপদে পড়ে গেলেন। অতজনকে খাওয়ানোর রসদ তাঁদের ছিল না। আর এটা কোন শহর নয় যে টাকা ফেললেই দোকান থেকে খাবারদাবার কিনে আনা যাবে! কোনরকমে তিনটে মুরগী জোগাড় করা গেল। ভাত, ডাল আর ছোট ছোট দুটো টুকরো সমেত মাংসের ঝোল দিয়ে ডিনার সারলেন ৬৫ জন ট্যুরিষ্ট। কিন্তু এখানেও শেষ হয়নি। তাঁবুতে ঢুকে পড়ার পর একটা হল্লা শুনলাম। আরো দশ বারো জনের একটা দল ঐ রাত্তিরে এসে হাজির। তাঁদের আগে থেকেই বুকিং ছিল। খাবারের জোগাড় নেই কেন এই নিয়ে প্রবল তর্কাতর্কি। মালদা থেকে একটা বড় গ্রুপের সঙ্গে এসেছিলেন ফাল্গুনিদা। শেষে তিনিই ব্যাপারটা সামলালেন। মাংস না থাকলেও ডিম ছিলো। আবার উনুন জ্বেলে ডিমের ঝোল রান্না হল। তাই দিয়ে ভাত খেলেন নিশিকুটুম্বরা। 

 আড্ডা @ গুরস কুঞ্জ। 

আমি ভার্সে বলছি বটে কিন্তু সঠিক উচ্চারণটা হবে বার্সে (Barsey)। বর্ষা থেকেই এই নাম। তাই বার্সেতে এলে বর্ষা না পেলে কিছু একটা বাকি থেকে যেত! রাতে প্রবল ঝড়বৃষ্টি হল, বজ্রবিদ্যুৎ সহ। সকালের আবহাওয়া আগেরদিনের চেয়ে এক্কেবারে আলাদা। ভীষণ কুয়াশা, বারে বারে বৃষ্টি নামছে -এই অবস্থায় নিচে নামা সম্ভব নয়। সবাই রেনকোট, ছাতাটাতা নিয়ে রেডি, কারো মাথায় প্লাস্টিকের প্যাকেট। ওয়েদার একটু ভালো হলেই বেরোতে হবে। এদিকে রাত্রের মত সকালেও ৭০ জনের ব্রেকফাস্ট তৈরী করতে নাজেহাল করছিলেন লজের কর্মীরা। দেখলাম আমাদের নিম দরজিও লুচি বেলতে চলে গেছেন। একপ্লেট জলখাবার রেডি হতেই কাড়াকাড়ি পরে যাচ্ছে। মুশকিল আসান হলেন ফের ফাল্গুনিদা। কিচেনের দরজা বন্ধ করে জানলার একটা কাঁচ ভাঙা ছিল, সেটাকে কাউন্টার বানিয়ে তার বাইরে দাঁড়ালেন এবং নিজের দলের সদস্যদের জলখাবার একে একে পাস করে দিলেন। তারপর সে জায়গাটা ছেড়ে দিলেন আমাদের টিমলিডার অনির্বাণকে।

 ফেরার পথে। 

জলখাবার শেষ করে  হাত ধুচ্ছি, এমন সময় অনেকগুলো কন্ঠে উল্লাস শুনে দৌড়ে বাইরে এলাম। কুয়াশা অনেকটা কেটে গেছে, আকাশ থেকে মেঘ সরে সরে যাচ্ছে। আর তার পেছন দিয়ে ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করছে মাউন্ট কাঞ্চনজঙ্ঘা। সে দৃশ্য বর্ণনা করার বৃথা চেষ্টা করছি না। আর তা লেন্সবন্দী করার মত ক্যামেরাও আমাদের কারো কাছে ছিল না। তাই চোখ দিয়ে মনের ক্যামেরাতেই গেঁথে রাখলাম। ভার্সে ট্রেক সার্থক।

 নতুন ক্যানভাস। 

এবার ফেরার পালা। ভার্সেকে বিদায় জানিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। আবহাওয়া অনেকটা ভালো হয়েছে, কিন্তু মাঝে মাঝে বৃষ্টি আসছে। কিছুটা শিলাবৃষ্টিও পেলাম। ওঠার দিন ছিল ঝকঝকে রোদ্দুর। আজ ভেজা রাস্তা, গাছের পাতা থেকে টুপটাপ জল পড়ছে, ঝোরাগুলোর তেজও বেড়ে গেছে। কখনো কখনো হাঁটতে হচ্ছে কুয়াশার মধ্য দিয়ে। পাঁচ হাত দূরের মানুষকেও দেখা যাচ্ছে না। এর মধ্যে বব আর পল্লব পাকড়াও করেছে একটা পাহাড়ি কুকুরকে। এখানে অনেকরকম লোমশ কুকুর দেখলাম, যাদের কলকাতাতেও দেখতে পাওয়া যায়, বকলস পরা অবস্থায়, বড়লোকদের ড্রয়িংরুমে। এখানে  তারা স্বাধীন। অবশ্য পল্লবের কাছে যেভাবে চোখ বুজে আদর খাচ্ছিল তাতে ওকে বাড়ি নিয়ে গেলেও বোধহয় আপত্তি করত না। বব ব্যাগ থেকে একটা ক্রীমরোল বের করে অফার করতেই একটা আশ্চর্য ঘটনা প্রত্যক্ষ করলাম। কুকুরটা রোলটাকে মুখে ধরে উল্টোদিকে মুখ ঘুরিয়ে জঙ্গলের মধ্যে ছুট লাগালো। তারপর একটা জায়গায় থাবা দিয়ে গর্ত খুঁড়ে রোলটাকে রেখে আবার মাটি চাপা দিয়ে দিল। পাহাড়ের মানুষ যেমন কঠিন জীবনসংগ্রামে অভ্যস্ত তেমনি কুকুররাও জানে দুবেলা খাওয়ানোর মত পশুপ্রেমিক এখানে নেই। নিজের রসদ নিজেকেই সঞ্চয় করে রাখতে হয়। 

 পাহাড়ি বন্ধু। 

নামার সময় হিলে পৌঁছতে সময় লাগল অনেকটা কম, প্রায় দুঘন্টা। এইবার দলটা দুভাগে ভাগ হয়ে গেল। আমি আর শ্রীরূপা যাব ওখরে তে। অনির্বাণ, বব আর পল্লব যাবে ভোরেং এ। সেখান থেকে আরেকটা ট্রেক করে যাবে গোর্খে। পরের দিন ওখরে তে এসে আমাদের সঙ্গে মিট করবে।

  

অন্যান্য পর্বের লিঙ্কঃ
পাহাড়ের ডায়েরি (১)
পাহাড়ের ডায়েরি (৩)
পাহাড়ের ডায়েরি (৪)
পাহাড়ের ডায়েরি (৫)

পাহাড়ের ডায়েরি (২)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments