কুমারের কপচানি 

বেড়ানো অনেক রকমের হয়। কেউ যান দুর্গম গিরি কান্তার মরু পেরিয়ে অজানা দেশের সন্ধানে। কেউ চান প্যাকেজ ট্যুরে যাবতীয় দর্শনীয় স্থান দেখে নিতে। কারো পছন্দ আবার স্রেফ শহরের কোলাহল, ব্যস্ততা ভুলে দুটো দিন নিভৃতে নির্জনে কাটাতে। আমরা আবার কোন ব্যাপারেই কট্টরপন্থী নই। তাই ভ্রমণের সবরকম স্বাদই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিতে চাই। হিলে-ভার্সের সাড়ে চার কিলোমিটার ট্রেক, খাবার ও জলের অপ্রতুলতা, বিদ্যুৎ, নেট ও নেটওয়ার্ক হীনতা – এগুলো উপভোগ করিনি বললে ভীষণ ভুল হবে। তেমনি ছোট্ট একখানি নীড়ের জন্য ভেতো বাঙালী মনটা টান দিচ্ছিল তা-ও অস্বীকার করতে পারিনা। 

  

তাই এঁকাবেঁকা পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে আমাদের গাড়ি যখন ছবির মত সানবার্ড হোমস্টের সামনে এসে দাঁড়ালো আর লাল টুকটুকে দুই নেপালি ছোকরা পেমা আর নিমো আমাদের ব্যাগগুলো ছোঁ মেরে নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরে উঠে গেল আর লজের মালিক পেমা সিরিং শেরপা আমাদের হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানিয়ে ঘরে নিয়ে গেলেন তখন মনে হল আহ এটাই স্বর্গ! ছোট্ট ঘর, বাইরে একটা ব্যালকনি। জানলার ওপারে দেখা যাচ্ছে বিস্তীর্ণ পাহাড়ের সারি। পাহাড়ের গা কোথাও নেড়া, বেশীরভাগ জায়গাতেই সবুজে ঢাকা। আরো ভালো করে তাকালে দেখা যাবে আনেক জায়গাতে ধাপ কেটে চাষ হচ্ছে, তার মধ্যে ছোট্ট একটা কুঁড়েঘর। কোথাও আবার গ্রাম ধরণের, খেলনাবাড়ির মত অনেকগুলো ঘর। আর এর মধ্যে সাপের মত এঁকেবেঁকে রাস্তাটা ছোট হতে হতে দূরে হারিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে গাছপালা, পাহাড়ের মধ্যে রাস্তাটা চাপা পড়ে গেছে, আবার কিছুদূরে গিয়ে উদয় হয়েছে।

   

বোঝা গেল এই ঘর বাড়ির লোকেরাই ব্যবহার করেন, আমরাই প্রথম অতিথি। পেমাদাজু বিছানাপত্র ঠিক করতে করতে বললেন, "এসব কাজ নতুন করছি, ভুল হয়ে গেলে মাফ করবেন!" সরকারের থেকে লীজ নিয়ে এই লজটা তাঁরা চালু করেছেন মাত্র ২ মাস আগে। ভার্সের গুরস কুঞ্জের সর্বেসর্বা পাসাং শেরপা এনারই দাদা। পাসাং-এর গাইডেন্সেই উনি এই হোমস্টেটা চালাচ্ছেন। সরু চালের ভাত, তরকারি আর ডিমের ঝোল দিয়ে লাঞ্চ করতে করতে কথা হচ্ছিল পেমা সিরিং এর স্ত্রী ফুর্বা ডিকি শেরপার সঙ্গে। ভদ্রমহিলা গ্যাংটক থেকে ২১ কিমি দূরে নামথাং এ কৃষি দফতরে চাকুরিরতা। সপ্তাহান্তে ওখরেতে এসে স্বামীকে সাহায্য করেন। তাঁদের ন মাসের ফুটফুটে গোলগাল মেয়ে ছিমি সোরেং তো শ্রীরূপার কোল ছেড়ে নামতেই চায় না। ফুর্বা ডিকি বলছিলেন, "সংসার আর কাজের অ্যাত টানাপোড়েন, মাঝে মাঝে মনে হয় চাকরি ছেড়ে দিই।" শ্রীরূপা বলল, "সব জায়গাতেই মেয়েদের এই সমস্যা।" চমৎকার লাঞ্চের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তাঁকে আবদার করে এলাম, "কাল কিন্তু আপনার হাতে গড়া সিকিমি মোমো খাচ্ছি!" 

  

ভার্সের তুলনায় ওখরে অনেকটা নিচে হলেও সেদিন প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির কারণে ঠাণ্ডাটা ভালোই ছিল। এই আবহাওয়ায় বেরনোর প্রশ্ন নেই। তাছাড়া গত দুদিন হিলে, ভার্সে তে ঠিকমত ঘুম হয়নি। তাই একটার ওপর একটা কম্বল চাপা দিয়ে ভাতঘুমটা সেরে নিলাম। ঘুম ভাঙল পেমাজির শ্যালিকার ডাকে। আমাদের জন্য গরম গরম পকোড়া আর চা নিয়ে এসেছেন তিনি। বৃষ্টি তখনো পড়ছে, তবে বেগ কমেছে। দিনের আলো কমে এসেছে। পাহাড়ের গায়ে বাড়িগুলোয় আলো জ্বলে উঠতে দেখা যাচ্ছে। অনির্বান, বব, পল্লব গোর্খে গেছে, এই বৃষ্টিতে ঠিকমত পৌঁছাল কি না চিন্তা হচ্ছিল, কিন্তু তিনজনের ফোনেই বারবার চেষ্টা করেও লাইন পেলাম না। ওখরে নেটওয়ার্ক দুনিয়ার মধ্যে, গোর্খে নয়। বার বার কারেন্ট চলে যাচ্ছিল। একটা ফাঁকা মদের বোতলের মুখে মোমবাতি বসানো ছিল। সেটা জ্বালিয়ে মোবাইলে ডাউনলোড করে রাখা সানডে সাসপেন্স চালিয়ে দিলাম। মোমবাতির আলোয় বর্ষণস্নাত পাহাড়ি গ্রামে সিকিমি চা-এর সঙ্গে জমে উঠল শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক গল্প।

  

পরের দিনটা ছিল রবিবার। এখানে এসে অবশ্য বার তারিখ কিছুরই হিসেব রাখার দরকার ছিল না। টিভি-কাগজ-ইন্টারনেট হীন এক নতুন রাজ্যে যেন বাস করছিলাম। সকালবেলায় আকাশ একদম পরিস্কার। অনির্বান ঠিকই বলেছে, "প্রেমিকার মতন পাহাড়েরও মন বোঝা দায়, খামখেয়ালি কিন্তু বড়ই প্রিয়!" (পাহাড়ের ডায়েরি ৩)। সানবার্ড লজের আতিথেয়তার জবাব নেই। আমরা ঘুম থেকে উঠেছি টের পেয়েই হাসিমুখে ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে এল পেমা। পেমা আর নিমা – পেমা সিরিং এর দুই আসিস্ট্যান্টের মুখে হাসি ছাড়া কিছু দেখিনি। সকালটা ঘরে বসে নষ্ট করার মানে হয়না। তাই চা খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম। একটা অদ্ভুত পরিবেশ। চারদিকে নানারকম গাছ, তাদের কতরকম পাতা, ফুল। পাথরের গায়ে ফুটে আছে ফার্ন জাতীয় গাছ, বুনোফুল। সকালের নরম রোদ উঁকি মারছে পাতার ফাঁক দিয়ে। চারদিক নিস্তব্ধ, খালি কিছু পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। দূরের কোন পাহাড়ি গ্রাম থেকে একটা কুকুরের ডাক পাওয়া যাচ্ছে। মাঝে মাঝে গাড়ির আওয়াজ আসছে অনেক অনেক দূর থেকে। তারপর আওয়াজটা জোর হতে হতে আমাদের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।     

  

দুপুরের মধ্যেই তিনমূর্তি ফিরে এল গোর্খে থেকে। লাঞ্চ করতে করতে ওদের গোর্খে ট্রেকের গল্প শুনলাম। সেসব গল্প আপনারাও নিশ্চয়ই শুনে ফেলেছেন পাহাড়ের ডায়েরি (৩) এ? সন্ধ্যায় চা আর মোমো খেয়ে লজের সামনের লনে কাঠে আগুন জ্বালিয়ে ক্যাম্প ফায়ার হল। গল্প আড্ডার পর শুরু হল গানের লড়াই। খানিকবাদে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন পেমা সিরিং। কথায় কথায় জানা গেল তিনি বাঁশি বাজাতে পারেন। নিজে নিজেই বই-টই পড়ে শিখছেন দু বছর ধরে। আমাদের উপরোধে জনপ্রিয় নেপালি গান "রেশম ফিরি রে"র সুর তুললেন বাঁশিতে। তারপর মোবাইলে আরেকটা নেপালি গানের সঙ্গে শুরু হল নাচ। প্রেম সিরিং এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নেচে গেল পল্লব। ক্রমশ আগুন নিভে এল। আমরা উঠে পড়লাম। ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিতে হবে। সকালেই রওনা দেবো এনজেপির উদ্দেশ্যে। সিকিম ভ্রমণ এবারের মত সাঙ্গ হল।

রাত্রে খাওয়ার জন্য ডাইনিং এ এসে দেখি পাসাং বসে আছেন। মাথায় ডেভি'স ল্যাম্পের মত আলো সমেত বেল্ট, সামনের টেবিলে মদের গ্লাস। তখন দশটা বাজে। বললেন এখান থেকে উঠেই ভার্সে যাবেন। কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতে বললেন, "এভরিথিং ইজ ফাইন, হোয়েন অন দা টেবল দেয়ার ইজ আ গ্লাস অফ ওয়াইন!"

  

অনির বচন

মেঘপিওনের ব্যাগের ভিতর মনখারাপের দিস্তা 
মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়, ব্যাকুল হলে তিস্তা
মন খারাপের খবর আসে বনপাহাড়ের দেশে 
চৌকোন সব বাক্সে যেথায় যেমন থাক্ সে, 
মনখারাপের খবর পড়ে দারুণ ভালোবেসে…

 

সত্যি হয়ত আমাদের সাথেসাথে পাহাড়েরও মনখারাপ, নাহলে বেলাশেষে এত কুয়াশা সারা ওখরে জুড়ে! তিনজনে গোরখে থেকে ফিরেছি দুপুরবেলায়। ঠিক ছিল একটু রেস্ট নিয়েই ওখরেটা বিকেলের মধ্যেই দেখে নেব। পল্লব বলেছিল ওখরেতে মনেস্ট্রীটা অ্যাট লীস্ট দেখতেই হবে। সেইমত ঠিক হল চারটে নাগাদ পাঁচজনেই বেরোবো। অতনু শ্রীরূপা আগেরদিনই এসে গেছে তাই ওরা ওখরের ব্যাপারে আমাদের চেয়ে একটু বেশি ইনফর্মড। ওরাই বলল মনেস্ট্রী যাওয়ার দুটো ওয়ে আছে একটা তিনশ সিঁড়ি চড়াই আরেকটা শর্টকাট। আর স্বাভাবিকভাবেই আমরা শর্টকাটটাই বেছে নিলাম।

দুপুরের ওয়েদার ছিল একদম পরিষ্কার কিন্তু বেলা বাড়তেই দেখলাম খারাপ হতে শুরু করেছে। সানবার্ড হোমস্টে থেকে ভিউ চমৎকার । জানালা দিয়েই দেখা যায় সিঙ্গালীলা রেঞ্জের প্যানারোমিক ভিউ। বাঁদিক ঘেঁষে সিঙ্গালীলার হায়েস্ট পয়েন্ট সান্দাকফু তারপর ফালুট, শ্রীখোলা, গোরখে আর একদিকে রিম্বিক আর ঠিক তার পিছনেই "অতিধীর, গুরুগম্ভীর" হিমালয়। হোমস্টের ডরমিটরির কাঁচের বিশাল জানালা দিয়েই দেখতে পেলাম কুয়াশার মতন মেঘ ভেসে আসছে আমাদের দিকে।

  

শর্টকাটটা হোমস্টে থেকে বেড়িয়ে বাঁদিকে । সেই দিকে কিছুক্ষণ হাঁটার পরও আমরা কোনো রাস্তা পেলামনা তারপর আরেকটু এগোতেই চোখে পড়ল ডান দিকের পাহাড়ের গায়ে কিছু ফুটস্টেপস্। সিঁড়ি বা রাস্তা বলে কিছু নেই বরং সেই ফুটস্টেপস্ গুলোই খাঁড়া উঠে গেছে উপরেরদিকে। কোথায় গেছে নীচ থেকে ঠাওর করা যাচ্ছেনা। শর্টকাটের এমন বহর দেখে অতনু শ্রীরূপা রনে ভঙ্গ দিল বলল ওরা নীচেই ঘুরে কাটবে বিকেলটা সম্ভব হলে তিনশ সিঁড়িযুক্ত পথটা ধরবে। শেষঅবধি আমরা তিন বাঙলা মায়ের দামাল ছেলে আবার পাহাড় চড়া শুরু করলাম। ডেস্টিনেশন ওখরে মনেস্ট্রী।

ওঠার পথ বলতে কিছুই নেই।সেই দিয়েই কোনোরকমে তিনজনে উপরে উঠলাম। দুপুরের ওইরকম জম্পেশ্ খাওয়ার পর এই চড়াই ভাঙার জন্য রীতিমত কসরত করতে হল তিনজনকেই। উপরে উঠে পাকদন্ডী বেয়ে একটু গিয়ে যখন পাকা রাস্তা পেলাম তখন আমাদের চারপাশে এক কুয়াশাচ্ছন্ন বিকেল। এইসব দিকে লোকজন অনেকটা কম, তাই মনেস্ট্রীটা কোনদিকে জানার জন্য লোক পাচ্ছিলামনা তার উপর এমন মেঘ যে দশহাত ডিসটেন্সও পুরো ব্লাইন্ড। পলু ভরসা । ও ওর ইনবিল্ট জিপিএস নেভিগেট্ করে ডান দিক ধরে হাঁটতে শুরু করল ,আমরাও ওর পিছু নিলাম। মেঘের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খালি মনে হচ্ছিল যেন সময় থেমে গেছে। এখানে সময় থেমে থাকে পাহাড়ের গায়ে, নাম না জানা পাখিদের গলায়, পাইনের শ্যাওলা-ধরা কান্ডে, যে লোকগুলো মাথায় কিলোকিলো সামান চাপিয়ে টুকটুক করে এগিয়ে আসে তাঁদের পায়েপায়ে। সময় থেমে থাকে।

  

পলুর আন্দাজ একদম ঠিকঠাক। কিছুটা গিয়েই আবছা চোখে পড়ল একটা ঘর আর দুটো স্তুপ। অনেকগুলো লম্বাটে পতাকা উড়ছে। আসার সময়ই জেনে ছিলাম এই পতাকাগুলোতে লেখা থাকে সম্ভবত টিবেটিয়ান ভাষায়। মনেস্ট্রীর নাম "দি উরগেন থং মনলিং মনেস্ট্রী"। ১৯৫২ তে দরজী লামা এটি তৈরি করেন এবং ১৯৬৬ তে দুক্পা লামা দায়িত্বে এসে এখানে একটি ছেলেদের মনেস্টিক স্কুল স্থাপন করেন যেটি আজও চলছে। বর্তমানে ৪৫ জন বৌদ্ধ ভিক্ষু আছেন এই মনেস্ট্রীতে। "মঙ্ক " থেকেই এসেছে "মনেস্ট্রী" আর "মঙ্ক "এসেছে "মনো" থেকে। অ্যালোন। বৌদ্ধইসম্ এর তত্ত্বীয়ভাব বোধিলাভ। কে জানে হয়ত একাকীত্বই বোধলাভের একটা পথ!

বাইরের ঘিরে থাকা প্রেয়ার হুইল ঘুরিয়ে তিনজনে ঢুকে গেলাম মনেস্ট্রীর ভেতরে । ভিতরে দুজন লামা ছিলেন । একজন একটা বই পড়ছিলেন ঠিক যেমনটি আমরা পাঁচালি পড়ি তেমনটি , আরেকজন একটি ছবি পরীক্ষণ করছিলেন। মনেস্ট্রীর ভেতরে অদ্ভুত এক অ্যাম্বিয়েন্স। ববের একদম শান্তভাব আর পলু চারদিকে ঘুরে ঘুরে মোবাইলে ছবি তুলতে লাগল। ভিতরের দেওয়াল আর ছাদ কাঠের আর তার উপর অদ্ভুত কারুকার্য করা। "ওয়ার্ক অব্ আর্ট"। মনেস্ট্রীর উপাস্য দেবতাটিও অদ্ভুতদর্শন। পলু জিগ্গাসা করাতে জানা গেল নাম গুরু রিন্পোচে। তাঁর এক পাশে বুদ্ধের ইন্কারনেশন্। এছাড়াও আরো অনেক কিছু যেমন দুটো শাঁখ যাকে বলে "কারদুং", দুটো বড় (দুংচেন) আর দুটো ছোট(কাংলিং) ট্রাম্পেট জাতীয় বাজনা, কয়েকটা বই, কাঠের বাঁশি জাতীয় একটা বাজনা (গিয়ালিং) আর কিছু লাল শালুজাতীয় কাপড়।

  

কিছুক্ষণ থেকে আমরা বেড়িয়ে এলাম। বব একদম নেতিয়ে গেছল। বেড়িয়ে এসে বললাম "ওম মনি পদ্ মে হুম", পলু জবাব দিল "হুমম্"। মনে হল ববেরই যেন এই ক'মিনিটে বোধিলাভ হয়ে গেছে। বেড়িয়ে দেখলাম তখনো আলো আছে। পলু ওখানেই একটি কালো তুলতুলে কুকুরছানাকে চট্ করে দিব্যি আদর করে নিল। তারপর আমরা ফেরার পথ ধরলাম, সামনে সেই তিনশ সিঁড়ির উতরাই।

মেঘ তখন একটু পাতলা হয়ে এসেছে আমরা পাইনবনে ঘেরা আঁকাবাঁকা সিঁড়িপথ দিয়ে এসে নামলাম পাকা রাস্তায়। মাইলস্টোনে লেখা টেন মাইল। বুঝলাম আমরা সানবার্ড থেকে এক মাইল দূরে আছি কারন ওটা ইলেভেন মাইলে। পাহাড়ের রাস্তা ধরে গোধূলিকালীন আলোতে ফেরার অনুভূতি আলাদা। পাকদন্ডী পথ। আমরা এগিয়ে চলেছি হোমস্টের দিকে। দুপাশে গাছেদের সারি পাহাড় থেকে নেমে এসেছে রাস্তার ধারে। দুটো বাঁক নিতেই চোখে পড়ল আমাদের আস্তানাটা। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে। মনে হল এই তো এসে গেছি কিন্তু আসছে কোথায়? পাহাড় হল মেয়েদের মন ,মনে হয় নাগালের মধ্যেই তো আছে কিন্তু যত কাছে যাওয়া যায় ততই দূরে সরে যায়। বড়ই কঠিন বাস্তব।

তিনজনে এগিয়ে চললাম। বব রাস্তায় শুয়ে পোজ্ দিয়ে খানকতক ছবি তুলে নিল। হঠাৎ ববের মাথার কাছদিয়ে চৌকো ঘুড়ির মত কি একটা উড়ে এ গাছ থেকে ওগাছে চলে গেল। "জায়েন্ট ফ্লাইং স্কুইরল্" গ্লাইড করে চলে গেল আমাদের সামনে দিয়ে। ঠিক যেন একটা বাদামী রঙের খোলা বই উড়ে গিয়ে পড়ল। তিনজনে দেখলাম একটা গাছের ডালে গিয়ে আটকে রইল চুপচাপ। এ ও এক দেখা।

  

পাক্কা আড়াই ঘন্টা লাগল। চারটে তে বেড়িয়ে ফিরলাম সাড়ে ছটায়। পেমাজিকে বলে একটা ক্যাম্পফায়ার অ্যারেঞ্জ করা হল। শ্রীরূপা আগে ফিরেই মোমোর ব্যাবস্থা করে রেখেছিল ,এসব ব্যাপারে ও ঠিক "মায়ের মতন ভালো"। সান্ধ্যভোজ সেরে আমরা চললাম ক্যাম্পফায়ার করতে। পলু শ্রীরূপা আর বব গাইবে আমি আর অতনু বেসুরো (বরং অসুর বলা ভালো) তাই আমরা শ্রোতা। অদ্য শেষ রজনী , তাই শেষটুকু চেটেপুটে নেওয়া আর কি! কাল ভোরেই তো ফেরা।
মনে পড়ে যাচ্ছে "তিতলির" সেই গান যেটা দিয়ে শুরু করেছিলাম ,

…মেঘের ব্যাগের ভেতর ম্যাপ রয়েছে, 
মেঘপিওনের পাড়ি,
পাকদন্ডী পথ বেয়ে তার 
বাগানঘেরা বাড়ি 
বাগান শেষে সদর দুয়ার 
বারান্দাতে আরামচেয়ার 
কালচে পাতা বিছানাতে ছোট্ট রোদের ফালি 
সেথায় এসে মেঘপিওনের সমস্ত ব্যাগ খালি…

কিন্তু আমাদের ব্যাগ খালি নেই বরং ভরে উঠেছে দারুন এক ঘোরার আনন্দে,অনন্য অভিজ্ঞতায়….!!

 

পেমা সিরিং এর বাঁশিতে "রেশম ফিরি রে" শুনুন এই ভিডিও তে।

 

ওখরে সানবার্ড লজের ডিটেলসঃ

Sunbird Lodge
Okhrey, West Sikkim – 737121
P. T. Sherpa. (Phone – 9647811674)
pema.ribdi@gmail.com

  

 

অন্যান্য পর্বের লিঙ্কঃ

পাহাড়ের ডায়েরি (১)

পাহাড়ের ডায়েরি (২)

পাহাড়ের ডায়েরি (৩)

পাহাড়ের ডায়েরি (৫)

 
পাহাড়ের ডায়েরি (৪)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments