যাত্রা শুরু

একরকম হঠাৎ করেই ঠিক করে ফেললাম প্ল‍্যানটা। অফিসে বেশ কয়েকদিন ধরে খুব চাপ যাচ্ছে। একটু অন‍্যরকম, একটুখানি মুক্তির জন‍্য মনটা হাকুপাকু কদিন ধরেই। ভাবলাম, এই উইকএণ্ডটা পাহাড়ে কাটিয়ে আসি। যেমনি ভাবা, একদিনের মধ্যেই ভলভোর টিকিট, হোটেল সব বুক করলাম। এত জলদি ট্রেনের টিকিট পাওয়া অসম্ভব, ওভার নাইট বাস জার্নিই ঠিক আছে। সব ঠিকঠাক, এমন সময়ে খবর পেলাম, পাহাড়ে বন্ধ্ ডেকেছে গোর্খারা।

শুক্রবার সকাল সকাল অফিস গেলাম। কিন্ত্ত মাথায় চিন্তা ঘুরে চলেছে এটা ওটা। যাওয়াটা আদৌ উচিত হবে কিনা, গেলে কোথায় যাব। কেউ বলছে, পাহাড়ে এইসময় না যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। নেপালের ভূমিকম্পের রেশ কাটেনি এখনো। আবার কারো মতে, শিলিগুড়ি থেকে কোনও গাড়ি পাওয়া যাবে না বন্ধের জন্য। কেউ বলছে, কালিম্পঙটাকে এড়িয়ে চলতে, তো কেউ লাভাতে না করছে। পুরো ঘেঁটে ঘ অবস্থা! দুত্তোর, যা হয় হবে। যা প্ল্যান করেছিলাম, সেই মতোই এগোব ঠিক করলাম। প্রথমে লাভা, ফেরার পথে কালিম্পঙ। দেখা যাক। জয় দুর্গা বলে বেরিয়েই পড়লুম। জলদি বাড়ি ফিরে ব‍্যাগপ‍্যাক গুছিয়ে মেট্রো ধরে সোজা এসপ্ল‍্যানেড। বাসস্ট্যান্ড থেকে শিলিগুড়ির ভলভো।

বাসটা সাধারণত সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায় ছাড়ে। আজ বন্ধের কথা মাথায় রেখে ঘন্টা দুয়েক আগেই ছাড়বে। সেইমত জানিয়েও দিয়েছিল সবাইকে। ব‍্যাগপ‍্যাক টা ওপরে ছু়ঁড়ে দিয়ে, নরম সমুদ্র নীল ভেলভেটের সীটে গা ডুবিয়ে, এসির ঠান্ডা হাওয়া খেতে খেতে দেখলাম, বাস বেশ ফাঁকাই। শেষ মূহুর্তে যাওয়া বাতিল করেছে অনেকেই। এবং আমার পাশের সীটের ভদ্রলোক বা মহিলা তাদেরই একজন। মোটামুটি নির্বিঘ্নে কাটল রাতটা। আধো ঘুমে, জাগরনে, উৎকণ্ঠায়। সাতসকালে শিলিগুড়িতে নেমে কি অবস্থা দেখব, কে জানে!

*****

কালিম্পঙের সেই ছেলেটা ও মেয়েটা

বাস থামল শিলিগুড়ি তেনজিং নোরগে বাসস্ট্যান্ডে, সকাল সাতটা হবে। নামতেই ছেঁকে ধরল শূভানুধ‍্যায়ীর দল – গাড়ি চাই? গাড়ি! একাই আছি এবং লাভা গন্তব্য শুনে, একজন সরকারি বাস নিতে বলল। ভালো বুদ্ধি, নিয়েই নিলাম। আটটা কুড়িতে ছাড়বে। অগত্যা ধূমপান সহযোগে টাইমপাস। কিছু স্ন‍্যাক্সও নিয়ে নিলাম রাস্তার জন্যে। লাঞ্চ কখন জুটবে, আদৌ জুটবে কিনা কোনো ঠিক নেই। পাশের সীটে একজন পাহাড়ি ছেলে, আলাপ হল টুকটাক। বাস ছাড়ল টাইমেই। ভাবলাম, এত সহজে হয়ে যাবে সবকিছু? লোকজন বলছে, পাহাড়ে কোনো বন্ধ্ নেই। কালিম্পঙ থেকে লাভা যাওয়ার শেয়ারের ট‍্যাক্সি পেয়ে যাব সহজেই। মনটা আনন্দে নেচে উঠল। ভাগ‍্যিস শিলিগুড়িতে আংশিক স্ট্রাইক, দোকানপাট বন্ধ বেশিরভাগই, কিন্ত্ত গাড়ি ঘোড়া চলছে রীতিমতো। জানালার পাশের সীট, আর কি চাই! জমিয়ে বসলাম, শহরটাকে দেখতে দেখতে, তখনকার মত বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিয়ে। এমন সময়, পানিট‍্যাংকি বলে একটা জায়গার পর বাস আর নড়ে না! ব‍্যাটারী ডাউন নাকি। আচ্ছা সমস‍্যা তো। পরের বাসটাও এল, উঠে দেখি সব সীট ভর্তি। আড়াই ঘন্টা দাঁড়িয়ে যাওয়ার কোনও মানে নেই। রাস্তায় পাহাড় দেখাও তো মাথায় উঠতে চলেছে।

নেমে পড়লাম। দেখি ওই ছেলেটাও দাঁড়িয়ে। বলল, টিকিট কেটেছি যখন দাঁড়িয়ে কেন যাব? হক কথা। বাস কন্ডাক্টর টাকা ফেরত দিয়ে দিল। পাশেই শেয়ার ট‍্যাক্সি স্ট‍্যান্ড। শুরু হল অপেক্ষা, কখন গাড়ি ভর্তি হবে। একজন একজন করে আসছে ঢিমেতালে। এখানেই দশটা বেজে গেল। রোদ কড়া হতে শুরু করেছে শহরের বুকে। একটু চিন্তাও হতে লাগল, বেশি দেরী হয়ে গেলে ওদিকে গাড়ি পাওয়া না মুশকিল হয়ে যায়! আমার একদিকে একজন পাহাড়ি বৌদি, আরেক দিকে মা ও ছেলে। ছেলেটা আবার গীটার বাজায়, ছাতে তোলা সেটা। সারা গায়ে ট‍্যাটু, রোগা প‍্যাংলা। গাড়ি ছাড়ল সাড়ে দশটার আশেপাশে। পাশের বৌদি বেশ অদ্ভূত, চেয়ে চিন্তে নিল জানলার পাশের সীট, তারপর উঠে থেকেই নাক ডাকাচ্ছে। গাড়ি দুলছে নৌকার মত। এই বাঁকে এদিক, তো ওই বাঁকে ওদিক। পাহাড়ি রাস্তায় যা হয় আরকি, বাঁকের পরে বাঁক। তাও বেশ ঠাণ্ডা উত্তুরে হাওয়া এসে মনটা ক্রমশঃ ভালো করে দিচ্ছে। এসবের জন‍্যেই তো এত কষ্ট করে ছুটে আসা, জুনের কলকাতার প‍্যাচপ‍্যাচে গরম থেকে সাময়িক মুক্তি। আগের অল্প চেনা ছেলেটা সামনের সীটে হাত পা ছড়িয়ে বসে। তার পাশের ভদ্রলোক দুটো সীট বুক করেছেন নিজের জন্যে, তাই অত গাদাগাদি নেই সামনে। এভাবেই একসময় পৌঁছে গেলাম কালিম্পঙ। এখানেও এখন, রোদ বেশ চড়া, কিন্তু সাথে মিঠে নরম ঠাণ্ডা হাওয়াও আছে। চোখের সামনে রাজ‍্যের গাড়ি, মানুষজন। গাড়ির স্ট‍্যান্ডটা বিশাল বড়, অনেকটা সমুদ্রের পাশে জাহাজ নোঙর করার জেটির মত। ওই ছেলেটাকে ভালো বলতে হবে, কিছু চিনিনা শুনে নিজে থেকেই লাভার শেয়ার গাড়ি বুকিং কাউন্টারে পৌঁছে দিল। কথায় কথায় জানলাম, এখানকারই বাসিন্দা ওরা। কুচবিহারে মাস্টার্স করছে ফরেস্ট্রি নিয়ে, বাড়ি ফিরছে ছুটিতে। বাড়িতে বাবা, মা, ছোট একটা বোন। বলল, পাহাড়ের অবস্থা এখন খুব একটা ভালো নয়। কদিন আগেই যেন কারা একজন সাংবাদিককে পুড়িয়ে মেরেছে এদিকটায়, যেটা আগে কখনো ভাবা যেতনা! পলিটিক্স ঢুকে পাহাড়ের শান্ত সুন্দর জীবন আর আগের মত নেই। মনটা খানিক ভারী হয়ে গেল, না চাইতেই। যাইহোক, হাতে সময় আছে বেশ খানিকটা। একটা ভালো মোমোর দোকান দেখিয়ে দিল ছেলেটা। তারপর আস্তে আস্তে রওনা দিল বাড়ির দিকে। ওর মা না খেয়ে বসে আছে এখনো। সত‍্যি, পাহাড়ের বা গ্রামের মত এত সুন্দর, স্বাভাবিক, সহজ মানুষ তথাকথিত শহর কিংবা শহরতলিতে কোথায়!

মোমোর দোকানে ভালোই ভিড়। একতলা একটা বাড়ির ছাদে চেয়ার টেবিল পেতে বসার ব‍্যবস্থা, পাশেই খাদ, তারপরেই পাহাড়। কালিম্পঙ শহরের ব‍্যস্ততা, ভিড়ভাট্টা যেন ছাদটাতে এসে হঠাৎ পথ হারিয়েছে। সবথেকে আকর্ষণের কেন্দ্রে আছে কাউন্টারের বছর পঁচিশের মেয়েটি। মোমো থুপকা সার্ভ করতে করতে রীতিমতো আলাপ জুড়েছে সবার সাথে। কথাবার্তায় আন্তরিকতার ছোঁয়া, মুখে অনাবিল, স্বচ্ছ হাসি। কারো সাথে নিজের রোজনামচার গল্প, তো কারো সাথে জীবনের। কিছু কিছু লাইন তো একদম ফিলোসফির টেক্সট বুকের কান ঘেঁষে বেরোনো। অদ্ভুত প্রাণ ছড়িয়ে দিচ্ছে এ টেবিল থেকে ও টেবিলে, মোমো থুপকার সাথে সাথে। আর মেয়েটা মানিয়ে গেছে ভীষন ভাবে এই পরিবেশের সাথে, পাশের খাদ পাহাড় হাওয়ার মতোই।

*****

নেপালী বুড়ো

একপ্লেট মোমো সাঁটিয়ে নাম্বার খুঁজে উঠে বসলাম গাড়িতে। সামনের সীটে একজন লোকাল কমবয়সী মেয়ে, উদ্ভট উৎকট সাজগোজ, ভঙ্গী, লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রাণান্তকর চেষ্টা আরকি। হয়ত সবে শহরতলীর ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে। স্বাভাবিকের ওপর সহজ আকর্ষণটাই হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ। আরো দুজন, সম্ভবত কলকাতা থেকে, দুভাই ওরা। একজন আমারি বয়সী হবে, ছোটটা স্কুল, বা সবে কলেজ। বাকি সব লোকাল লোকজন। শুরু হল লাভার উদ্দেশ্যে পথ চলা। গাড়ি যত ওপরে উঠছে, আরো বেশি ঠাণ্ডা হাওয়া জানলা দিয়ে ঢুকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। এই মেঘ, এই রোদ্দুর। সেই চিরপুরাতন খেলা, যতবার দেখি পুরোনো হয়না। রাস্তা আগে এত খারাপ ছিলনা, হয়ত বা বৃষ্টির জন্য। এবার আর নৌকা না, নাগরদোলা পুরো। এই বাঁকে ওপরে, তো পরের বাঁকে নীচে। হিন্দি গান বাজছে গাড়িতে। অনুপম রায় এখানেও বিখ্যাত হয়ে গেল, জার্ণী সঙ দিয়ে।

মাঝরাস্তায় উঠল এক নেপালী বুড়ো। তারপর শুরু হল এক নতুন অধ‍্যায়। গাড়িতে উঠেই গাইতে শুরু করল গলা ছেড়ে। নেপালী ভাষায় গান, মাথামুন্ডু বুঝছি না কিছুই। কিসব তিরিমিরি, প্রতিটা ভার্স শেষ করছে ‘আইয়ো’ বলে জোরে চেঁচিয়ে। আর শুধু গান না, রীতিমতো একক পারফরম‍্যান্স। গানের সাথে লোকজনের হাত পা টেনে, পিঠ চাপড়ে চলেছে। গানের গুঁতো বোধহয় একেই বলে। আমাকেও চেষ্টা করেছিল, নেহাত দূরে ছিলাম বলে নাগাল পায়নি। ছোটভাইটা বেশ মজার। বুড়ো টানতে এলেই, নিজে থেকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, বলে, এবার কিন্ত্ত আমি জানলা খুলে বেরিয়ে যাব। কিংবা থেকে থেকেই ‘ভাইয়া, লাভা কিতনা দূর হ‍্যায় অউর?!’ অফুরন্ত এনার্জি বুড়োর। অন‍্য সবাই হাসছে, গানের কথাতে, নাকি বুড়োর রকম সকম দেখে, কে জানে! বুড়ো থেকে থেকেই বলে চলেছে, মানে আন্দাজে বুঝলাম, হাসতে হাসাতে রাস্তা পার করে দেওয়াই তার উদ্দেশ্য, কেউ যেন কিছু মনে না করে। সক্রেটিসের ছোট ভাই পুরো! আমি আগে নামলাম, ভাই দুজনকে বেস্ট অফ লাক জানিয়ে, বাকি রাস্তাটার জন্য।

*****

একদিনের রাজত্ব

চড়াই ভেঙে পৌঁছলাম ওয়েস্ট বেঙ্গল ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের রিশেপসানে। নাম এন্ট্রি করিয়ে সোজা কটেজে গেলাম – ডুপকা ওয়ান নাম। একদম ওপরের দিকে এটা। সব গুলোই পাহাড়ের ধাপে ধাপে বানানো, চারপাশে পাইন, বার্চের জঙ্গল। কটেজটার সামনে একটুকরো খোলা চত্বর। তারপরেই খাদ শুরু, ওপারে মেঘমালা সজ্জিত পর্বতের দল। ব‍্যালকনিতে দাঁড়িয়ে নিজেকে রাজা মনে হল। এই ছোট্ট ঘর, তার বারান্দা, সামনের খোলা জমি, সবকিছুর মালিকানা শুধু একার। শুধু তাই কেন, দূরের পাহাড়, জঙ্গল, আকাশ, মেঘগুলোরও। এ অনুভূতি ঠিক বলে বোঝানো যাবে না। নিজেকে এ সবকিছুর অংশ মনে হতে লাগল। একটু ফ্রেশ হয়ে হাঁটতে বেরোলাম। খিদেও পেয়েছে হালকা। খানিকটা নিচে নেমে মোড়ের মাথার একটা দোকানে ডিম ম‍্যাগী অর্ডার দিলাম। পড়ন্ত রোদ এসে পড়েছে টেবিলে, খোলা কাচদরজা দিয়ে। অসম্ভব ভালো লাগছে। গা শিরশিরে হাওয়া, শেষ বিকেলের রোদ, সাথে ধোঁওয়া ওঠা গরম ম‍্যাগী। তারিয়ে তারিয়ে খেলাম বেশ, ঠাণ্ডা রোদ মাখতে মাখতে। বেশ নীচে একটা মনাস্ট্রি আছে, ঘুরে আসা যাক। উতরাই তে নামতে নামতে ভাবছি, ফেরার সময় চড়াই ভেঙে উঠতে গিয়ে মারা পড়ব একদম। রেগুলার ধূমপানের সৌজন্যে দম বলে বাকি নেই তেমন কিছু।

খুব ছোট্ট সুন্দর একটা মনাস্ট্রি। যেদিকে দুচোখ যায়, থাক থাক মেঘপাহাড়, রোদ মেঘের খুনসুটি, সন্ধ‍্যের আগের হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা হাওয়া। মেরুন আলখাল্লা পরা সব বয়সের অনেক সন্ন্যাসী, কেমন যেন টানতে লাগল এদের জীবন। পারব কিনা জানি না, কিন্তু এই মূহুর্তে ভাবতে ভালো লাগছে, যদি এখানে থেকে যেতে পারতাম। দল বেঁধে নিজেদের কাজ নিজেরাই করছে, হাসি ঠাট্টাও সাথে সাথে, কিন্তু কোনোটাই জায়গাটার ঝিম ধরা শান্ত নির্জনতা নষ্ট করে না। পেছনদিকে চলে এলাম হাঁটতে হাঁটতে। একটা কফিশপও আছে দেখলাম, পাশে একজন গাড়ি ধুচ্ছে। আর অনেকটা খোলা সবুজ ঘাসের প্রান্তর। আকাশের নীলও যেন মেঘছায়া ফেলেছে এখানে। বসলাম গিয়ে হাত পা ছড়িয়ে। রোদ নেই এদিকে, মঠটার জন্যে। তাই ঠাণ্ডা বেশ বেশি। মনে হচ্ছিল, এভাবে অনন্ত কাল কাটিয়ে দেওয়া যায়, জাস্ট এখানে বসে থেকেই।

কতক্ষন ঠিক বসে ছিলাম খেয়াল নেই। একটা ট‍্যুরিস্ট দলের আওয়াজে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। মনে হল কলকাতা থেকেই। ভীষন ন‍্যাকা একটা গ্রুপ। বিরক্ত লাগছে। এখানেও এদের চিৎকার চেঁচামেচি একটু বাদে মাছের বাজার খুলে বসবে পাহাড়ের কোলে। একটা এঁচড়ে পাকা বাচ্চা মেয়ে, মা কে বলছে, ‘এরকম করলে কিন্তু আমি এখান থেকে ঝাঁপ মারব। লাভাতে একটা সুইসাইড পয়েন্ট আছে না? ওটা তো দেখতেই হবে, বহুদিনের ইচ্ছে!’ শুনে হাসব না কাঁদব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এবার ঘরে ফেরা যাক। তার আগে বুদ্ধ-দর্শন।

*****

নির্জন ঘর

সন্ধ‍্যে নামছে আস্তে আস্তে। পাহাড়ের কোলে একটা দুটো করে আলো জ্বলে উঠছে দূরের কাঠের বাড়িগুলোতে। রাস্তায় ভাই দুজনের সাথে দেখা। গ্রুপের বাকি সবাই আগেই চলে এসেছিল। কাল ওরা রিশপ যাচ্ছে এখান থেকে। এত ছোট্ট একটা জায়গা, আবার দেখা না হওয়াটাই অস্বাভাবিক। ক‍্যান্টিনে ডিনার অর্ডার করে খাদের একদম ধারের ওয়াচ টাওয়ার টাতে গিয়ে দাঁড়ালাম। এখান থেকে খুব কাছে লাগে পাহাড় গুলোকে, যেন হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারা যাবে‌। চারদিক একেবারে অন্ধকার হয়ে গেলে, ঘরে ফিরলাম। বেডে কম্বলের তলায় ঢুকে বসলাম, শরদিন্দুর ঐতিহাসিক উপন্যাস সমগ্রটা নিয়ে। সাথে সিগ্রেট, টুকটাক মুখ চালানো, মাঝে মাঝে বাইরে বেরিয়ে প্রকৃতি উদযাপন। সোওয়া আটটার দিকে ডাইনিং হলে গিয়ে রাতের খাওয়ার পাট চুকিয়ে এলাম। রুটি, চিকেন। ক‍্যান্টিনের লোকজনের সাথে বেশ ভাব হয়ে গেছে। একজনকে ডেকে বললাম, রান্না বেশ ভালো হয়েছে। মুখে অনাবিল হাসি খেলে গেল তার। একটা ছোট্ট কথাতেই কি খুশী হয়ে ওঠে মানুষ! বলল, ‘ আরেকটু চিকেন দিই?’

একটু দূরে একটা দল আগুন জ্বেলে গোল হয়ে বসে মাতলামি করছে। গান বাজছে জোর ভলিউমে। বন্ধুদের সাথে বেড়াতে এলে আমিও ওই দলেই থাকতুম। এখন কেমন যেন খাপছাড়া লাগছে দলটাকে। শুধু মাতলামোই করতে হলে, কলকাতা কি দোষ করল! রাতের পাহাড়ের এই নিস্তব্ধতার সাথে ঝিঁঝির ডাক, শুকনো পাইনপাতার মর্মর, গাছের ফাঁকে হাওয়া চলার শব্দ এসবই মানায় শুধু, সম্মিলিত হুল্লোড় না।

ওয়াচ টাওয়ারটায় গিয়ে দাঁড়ালাম। গোটা চরাচর কেমন যেন মেঘলাটে আবছা। এত বাড়াবাড়ি রকমের বেশি মেঘ একসাথে একজায়গায়, দেখেছি কখনও? মনে হয়, না। নীচ থেকে মেঘের দল যেন পাহাড়টাকে একটু একটু করে গিলতে গিলতে ওপরে উঠে আসছে! কেমন যেন গা ছমছম করে উঠল। মেঘ দেখে ভয় করেনি, আগে কখনও।

(ক্রমশঃ..)

পায়ে পায়ে, পাহাড়ে
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments