সেবার মধ্যপ্রদেশ যাচ্ছিলাম চারজনে মিলে। শিপ্রা এক্সপ্রেস যখন সাতনা স্টেশনে থামল তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেলে ঢলতে আরম্ভ করেছে। সাতনা নিয়ে খুব একটা প্ল্যান ছিল না। পরের দিন খাজুরাহো যাওয়ার কথা। চিত্রকূট পাহাড়ের কথা শুনেছিলাম, কিন্তু হাফবেলায় চিত্রকূট অভিযান সম্ভব ছিল না। ট্রেনে এক মাড়োয়ারি ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। খাসা লোক। জেনেরেটরের ব্যবসা। সেই কাজেই সাতনা যাচ্ছেন। শ্রীরূপার সঙ্গে খাঁটি হিন্দিতে গপ্পো জমিয়ে দিলেন। মেয়ে জামাই কুয়েত না ইউএই কোথায় যেন থাকে। ছেলে আছে। ছেলের বৌ একটা ইংরেজি স্কুলে পড়ায়। পুত্রবধুর চাকরি করাটাকে তিনি বেশ সহজভাবেই মেনে নিয়েছেন। নিজের স্ত্রীকে বলেছেন "ও যদি সংসারের কাজ গুছিয়ে চাকরি করতে পারে তোমার অসুবিধে কি? তুমি ধর্মকর্ম নিয়ে থাকো।" আমাদের মিষ্টি অফার করলেন, "মারোয়াড়ি মিষ্টি টেস্ট করে দেখুন?" উনি একটু বাথরুমে যেতেই তন্ময় বলল "মিষ্টিটা ফেলে দে। রেলের নোটিশ দেখিসনি, অপরিচিত ব্যক্তির হাত থেকে খাবার খাবেন না?" আমি তো জাতপেটুক, তাই ওসব সতর্কবাণীতে কান দিলাম না। আর সৌম্য আপার বাঙ্কে চাদর চাপা দিয়ে নাক ডাকাচ্ছিল। মিষ্টি খেয়ে আবার উঠে নাক ডাকাতে লাগল। তো সেই মাড়োয়ারি ভদ্রলোক বলেছিলেন, "সাতনায় যখন নামছেন, মাইহারের সারদা মন্দির অবশ্যই দেখবেন। ভীষণ জাগ্রত।" ভক্তিভাব কারোরই প্রবল না হলেও শেষমেশ মাইহার যাওয়াই মনস্থ করলাম। একটা হোটেলে অতিকষ্টে "পিওর ভেজ থালি" খেয়ে এসে ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে খোঁজ করে গণেশ প্রজাপতি নামে এক ছোকরা কে তন্ময়ের পছন্দ হল। সে ট্যাক্সি চালানোর পাশাপাশি একটা কলেজে বিটেক করছে। ঠিক হল মাইহার তো ঘুরিয়ে আনবেই, পরের দিন আমাদের খাজুরাহোতেও ছেড়ে আসবে। 

মাইহার সাতনা স্টেশন থেকে প্রায় ৪৫ কিমি দূরে। পৌঁছতে সন্ধ্যে হয়ে গেল। গাড়ী দাঁড়ালো পাহাড়ের নিচে। তারপর রোপওয়ে করে প্রায় ৫০০ মি উঁচু পাহাড়ের ওপর চড়া। দড়ির লাইন বেয়ে একটা বাক্সে চারজন উঠলাম। নিচের দিকে ক্রমশঃ ছোট হয়ে আসা শহর ও জঙ্গল দেখে বুক কেঁপে উঠল। বিশেষতঃ যখন বাক্সটা লোহার রেলিং দিয়ে দিক বদলাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল এই বুঝি দড়ির বাঁধন ত্যাগ করে দেশলাই বাক্সটা খাদের পথে যাত্রা করে! যত ওপর দিকে উঠছি, নীচের শহর ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হচ্ছে আর অন্ধকার গাঢ় হওয়ার সাথে সাথে তলায় বিন্দু বিন্দু আলোর ফুলকি জ্বলে উঠছে। রোপওয়ে আমাদের নিয়ে গেল পাহাড়ের একদম মাথায়, মন্দিরের সামনে। মন্দিরের মধ্যে একটা সরু রাস্তা দিয়ে লাইন দিতে হল সারদা ওরফে দুর্গা মা কে দেখার জন্য। দেখি সে লাইন আর নড়ছেই না। আমাদের কারোরই ভক্তিভাব নেই, পাহাড়ে চড়তেই এসেছিলাম, মাতাজিকে দর্শন দেবার বিশেষ আগ্রহ ছিল না। শ্রীরূপা বলল চলো ফিরে যাই। কিন্তু ফেরার রাস্তা বন্ধ, আমাদের পেছনে তখন প্রচুর লোক লাইন দিয়েছেন। একজন পুরোহিতকে সামনে পেয়ে বললাম আমার স্ত্রীর শরীরটা ভালো লাগছে না, ফিরে যাব। তিনি বললেন, মাতাজি কে দর্শন না করে ফেরা যাবে না। আরেকজন পুরোহিতকে ডেকে আমাদের দেখিয়ে কিছু বললেন, সম্ভবত আমরা যাতে পালাতে না পারি সেইদিকে নজর রাখতে বললেন। আরেকটু এগোতেই দেখলাম আরেকটা রাস্তা দিয়ে লোক পিলপিল করে লোক ঢুকছে। কপালে গেরুয়া ফেট্টি বাঁধা। হাতে লাঠি, মুখে উন্মত্ত স্লোগান, "মাতাজি কি জ্যেএএএ"। এরা সবাই হেঁটে পাহাড়ে উঠছে।  চোখে ভেসে উঠল টিভিতে দেখা কুম্ভমেলা বা মক্কায় তীর্থযাত্রীদের পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ছবি। মনে পড়ল মধ্যপ্রদেশ দীর্ঘদিনের বিজেপি শাসিত রাজ্য। প্রাণ নিয়ে বাঁচতে পারলে হয়! তন্ময় খেয়াল করল রোপওয়ের দিকে লাইন একটু হালকা হয়েছে। চারজন চটপট ঘুরে উল্টোদিকে দৌড় দিলাম। এক পুরুত বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তাকে এড়িয়ে আমরা কোনরকমে গিয়ে রোপওয়েতে বসলাম। যে বিপদ থেকে পালিয়েছি, সেটার কথা ভেবেই বোধহয় ফেরার সময় রোপওয়ে নিয়ে কোন আর ভয় রইলনা। 

সেদিনটা ছিল দুর্গাপুজোর দশমী। ফেরার পথে কয়েকটা দুর্গাঠাকুর দেখলাম, ভাসানের জন্য বেরিয়েছে। লক্ষ্য করলাম এই দুর্গাঠাকুরের দুটো মাত্র হাত, সঙ্গে তাঁর ছেলেমেয়েরাও নেই। ডান হাতে ত্রিশূল থাকলেও বাঁহাত শঙ্কাহরণ করে না। "ললাটনেত্র আগুণবরণ" বটে কিন্তু "দুই নয়নে স্নেহের হাসি" নেই। বুঝলাম এই সারদা মাতাজি আমাদের গিরিকন্যা উমা নন। কার্তিক-গণেশ-লক্ষী-সরস্বতীর স্নেহময়ী মা-দুর্গা নন। ব্যোম ভোলানাথের দশভূজা পার্বতীও নন। বরের ওপর রাগ করে বাপের বাড়ি চলে আসার মানুষোচিত চপলতা তাঁর মানায় না। ছেলেমেয়েদের নিয়ে বিউটি পার্লারে যাওয়ার স্বাধীনতা তাঁর নেই। তিনি শুধু মহিষাসুরকে বধ করেন।

ফেরার সময় গণেশজি জানালেন মাতাজিকে দর্শন না করে পিঠ দেখিয়ে চলে আসলে মৃত্যু অনিবার্য। দুবছর হতে চলল, আমরা সবাই অক্ষতদেহে বেঁচে আছি। তবু গণেশজি যখন বলেছেন, মৃত্যু নিশ্চয়ই অবধারিত! তাই আর দেরি না করে সেদিনের অভিজ্ঞতার কথা লিখে ফেললাম। 

সাতনায় সাবধান
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments