[ভূমিকা: চর্যাপদের পাঠকদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। ভুলেই গিয়েছিলাম যে এই লেখাটা পোস্ট করছিলাম ধারাবাহিকভাবে। তাই পুরো লেখাটাই দিয়ে দিলাম একবারে]

 

'স্যর, পঞ্চাননতলা, ফাঁসিতলা, দুদিকেই বিশাল জ্যাম। ব্রিজে গাড়ি তুলব কী করে?' প্রশ্নটা শুনে চটক ভাঙল অরিজিতের। ও হ্যাঁ! তাই তো! আজ তো কী সব মিটিঙ আছে। ওদিকে ট্যাক্সিড্রাইভার বোকার মতো তাকিয়ে আছে। তাকে স্যর অনিচ্ছা সত্তেও ইন্সট্রাকশন দিলেন, 'এক কাজ করো, শরৎ সদন দিয়ে গাড়ীটা ঘুরিইয়ে নিয়ে কোর্টের পাশ বরাবর হয়ে রামকৃষ্ণপুর ঘাট হয়ে চলো।'
সাধারণতঃ এই র‍্যূটটা অরিজিৎ বরাবর এড়িয়ে চলেন আজ বছর পাঁচেক তো হলই। আজ আর কোনো উপায় নেই বলে যেতে হচ্ছে তাঁকে। গাড়িতে যাওয়ার সময় এসি গাড়ি হলেও কাচ নামিয়ে রাখেন, গাড়িটা যখন দেখলেন শরৎ সদনের দিকে ঢুকছে, হঠাতই সব কাচ তুলে দিয়ে এসি চালিয়ে দিলেন তিনি। গাড়ীটা বেশ। কাচগুলো কালো। তাই বাইরেটা দেখা যাচ্ছে না। এই অঞ্চলটা অরিজিতের হাতের তালুর মতো চেনা। তবু কাচটা তুলে দেওয়ায় স্বস্তি পেলেন তিনি। আর যাই হোক মনের মধ্যে সেই অসাধারণ বন্ধুত্বের, সম্পর্কের স্মৃতিটা মনের মধ্যে রোমন্থিত হলেও সেই পরিবেশটা না দেখতে হলে তাঁকে অতটাও কষ্ট পেতে হবে না। হাওড়া স্টেশনে এমনিতেই অনেক কষ্ট অপেক্ষা করছে, আর না। চোখ বন্ধ করে রামকৃষ্ণপুর ঘাট, রেলওয়ে মিউজিয়াম এসব জায়গাতে সেই প্রিয় মানুষটাকে পিক আপ করা, ড্রপ করে দেওয়া, কত বোকাবোকা প্রেমিকমার্কা ফিলোসফি বলে নিজেই হেসে ফেলা, সব মনে করতে লাগলেন অরিজিৎ। বা বলা ভাল মনে পড়তে লাগল তাঁর।
অরিজিৎ চ্যাটার্জী। যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে জন মিলটনের ওপর রিসার্চ ওয়ার্ক করে ইংলিশ ক্রিটিক জগতে এক কিংবদন্তী। পেশায় যাদবপুরেরই মাস্টার্স কোর্সের লেকচারার। বর্তমানে তিনি ফরাসী ফোনেটিকসের ওপর রিসার্চ করছেন, ফরাসী ভাষার প্রভাব ইংরেজি সাহিত্য এবং বাংলা সাহিত্যে ঠিক কতটা, সেটা নিয়েই তাঁর কাজ। অবশ্য এ কাজে তাঁর সহকারী আছে। বা বলা ভালো তিনি তাঁর এক ছাত্রের পথপ্রদর্শক এই কাজে। অর্ক খুব ব্রাইট স্টুডেন্ট। সাধারণতঃ অরিজিৎ কাউকে কোনো রিসার্চ ওয়ার্কে গাইড করেননা। কিন্তু একে করছেন। ছেলেটার পরিশ্রমের ওপর কীরকম মায়া পড়ে যাওয়ায় অর্কের অনুরোধটা তিনি ফিরিয়ে দেন নি। কিন্তু এত ব্যস্ত মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তিনি খুব একটা কারুর সঙ্গে মেশেন না। আজ চোখ বন্ধ করে তিনি এরকম পালটে যাওয়ার কারণটা ভাবছিলেন। সত্যিই এরকম হতে পারে? ব্যাপারটা তো তাঁর কলেজ জীবনের প্রথম দিকের ঘটনা! ব্যাপারটা যে তাঁর মধ্যে এভাবে দাগ ফেলবে তিনি ভাবতে পারেননি। যে জন্যে তিনি যেসব জায়গার সঙ্গে তাঁর সেই কষ্টকর স্মৃতি জড়িয়েছিল, সেই জায়গাগুলোকে আজও তিনি এড়িয়ে চলেন। এমনকি অর্কর সঙ্গে ফীল্ডওয়ার্কে কাজ করার সময়ও তিনি সযত্নে এড়িয়ে গেছেন। সাধারণতঃ কোনো বড় অ্যাসাইনমেন্ট থাকলে গাইডরা সঙ্গে থাকেন স্টুডেন্টের বা খুব বাজে পরিস্থিতি হলে গাইডরা নিজেরাই ক্রেডিট নিয়ে নেন কাজটা সফল করার। কিন্তু এক্ষেত্রে সেটা ঘটেনি।
অর্ক একদিন হঠাতই তাঁর অফিসে এসে বলেছিল, 'স্যর এক ভদ্রলোকের সন্ধান পেয়েছি। ক্রুশিয়াল লীড দিতে পারবেন তিনি। যাবেন?' লাফিয়ে উঠেছিলেন অরিজিৎ। কোথায় থাকেন সেই ভদ্রলোক, কিছু না জিজ্ঞাস করেই বেরিয়ে পড়েছিলেন অর্কের ঠিক করে আখা ট্যাক্সিতে। গড়ী যখন রাসেল স্ট্রীটে ঢুকছে, তখন অরিজিতের প্রশ্নে অর্কে জবাব দেয় তাঁর বাড়ি পার্ক স্ট্রীটের গোরস্থানের পাশে। অরিজিৎ আর যেতে চাননি। ট্যাক্সি থেকে নেমে, অর্ককে কী কী প্রশ্ন করতে হবে বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ী ফিরে গেছিলেন। অর্ক বোকার মতো তাকিয়েছিল। ব্যাপারট থেকে সত্যিই একটা ক্রুশিয়াল লীড পাওয়া গেছিল। অর্ক কাল অফিসে এসে বলেছিল চন্দননগর যেতে হবে। শুনেই অরিজিতের মুখটা কেমন থমথমে হয়ে যায়। তারপরেই তিনি বলেন, 'ফরাসডাঙা তো যেতেই হবে। বাংলায় ফ্রেঞ্চের এফেক্ট তো ওখানেই বেশি। কিন্তু ওখানে গিয়ে কার সঙ্গে যোগাযোগ করবে?'
'স্যর সেসব হয়ে যবে। আপনি যাবেন তো? আমি আজই যাচ্ছি। আপনি কাল এলেও হবে।'
মাথার মধ্যে আবছা হয়ে আসা কিছু কথা, কিছু স্মৃতি ফুটে ঊঠছিল অরিজিতের। তবু তিনি রাজী হলেন।
'ঠিক আছে স্যর। বিকেল চারটে চল্লিশে হাওড়া স্টেশন থেকে বিশ্বভারতী প্যাসেঞ্জার ছাড়ে। ওটাতে চলে আসুন। তাড়াতাড়ী হবে।।'
চারটে চল্লিশ? বিশ্বভারতী? অরিজিতের মনে পড়ে যায় প্রিয় মানুষটার তাড়াহুড়ো এই ট্রেনটার জন্যে। হঠাত করে যে কী হয়ে গেল!
'স্যর, যাবেন তো?'
'অ্যাঁ? হ্যাঁ, যাবো। তুমি স্টেশনে থেকো।'
'শিওর স্যর।'
এসব ভাবতে ভাবতেই কখন হাওড়া এসে যায়। যথারীতি অ্যারাইভাল ডিপার্চার স্ক্রীন দেখেন অরিজিৎ। নাঃ, টাইম শুধু না, প্ল্যাটফর্মটাও পালটায় নি। সেই দশ নম্বর। মনের মধ্যে আবার ভীড় করতে থাকে সেই 'প্ল্যাটিনাম ভ্যালুড' কয়েকটা মাসের স্মৃতি। ভাবতে ভাবতেই কখন পৌঁছে গেলেন তিনি চন্দননগর। অর্ক ছিল স্টেশনে। আর চন্দননগরের ফটকগোড়া? সে তো মেমোরির ডিপো। তাই স্টেশনে নেমে থেকেই তিনি একটু চুপচাপ ছিলেন। অর্ক অনেক কিছু বলছিল, কানে ঢুকছিল না অরিজিতের। হঠাৎই সামান্য দূরে একজনকে দেখে অরিজিৎ অবাক হয়েই ডেকে উঠলেন, 'প্রশান্তকাকু!'

 যাঁকে ডাকা হল, তাঁর বয়স দেখে মনে হয় অন্ততপক্ষে ষাট। বয়সের ভারে একটু কুঁজো হয়ে গেলেও হাঁটাচলা দেখে বোঝা গেল যে এখনও দেহমনের দিক থেকে যথেষ্ট সুস্থ তিনি। অরিজিতের ডাকটা শুনে তিনি থামতেই অরিজিৎ প্রায় দৌড়ে গিয়ে তাঁকে প্রণাম করলেন। একটু ইতস্তত করে বৃদ্ধ বললেন, 'থাক থাক, কিন্তু তোমায় তো ঠিক চিনতে পারলাম না!'
অরিজিৎ তাতে একটুও দমলেন না। বরং যেন কতদিনের চেনা, এভাবে উৎফুল্ল হয়ে বললেন, 'না চেনারই কথা। মৌ — ইয়ে, মানে মধুপর্ণার সাথে একবারই আপনার বাড়িতে গেসলাম। সেও বহুদিন আগের কথা। তখন আমি ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট। তবে হ্যাঁ, আমার নামটা আপনার মনে থাকা উচিত। আমাকে নিয়ে বেশ খানিকটা গোলমাল হয়েছিল বটে।'
'কী নাম বলোতো?'
'অরিজিৎ। অরিজিৎ চ্যাটার্জী।'
বৃদ্ধের চোখ দেখে বোঝা গেল স্মৃতির অতলে ডুব দিয়েছেন তিনি। যদি কেউ থট রিডিং পারত, তাহলে হয়তো দেখতে পেত বৃদ্ধের মনে পড়ছে অনেক অশান্তি, অনেক ঝগড়া, মারপিট, এবং পরবর্তীকালে অরিজিতের হঠাৎ কোনো খবর না পাওয়া থেকে ব্যাপারগুলো আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়েছিল। সেকেন্ড দশেক এভাবে চিন্তার মধ্যে থাকার পর তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, মনে পড়েছে। তা হঠাৎ এখানে?'
'এখানে এসেছি কাকু একটা জরুরী কাজে। জাস্ট এলাম। আজকের রাতটা থাকব, এখানে এক পরিচিত আছেন। কাল কাজ শেষ করে ফিরে যাবো।'
'তা বেশ তো, রাতের খাওয়াটা না হয় আমাদের এখানে—'
'থাক কাকু, আমার বলা হয়ে গেছে আমার রিলেটিভের বাড়িতে। কেন খামোকা অসুবিধে পোয়াবেন আমার জন্যে?'
'আচ্ছা বেশ। কিন্তু তুমি এখন কী করছ সেটা বললে না তো?'
'আমি এখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার।'
'তোমার তো খুব লিটারেচারের প্রতি টান ছিল। রিসার্চ করবে বলেছিলে কিছু লেখা নিয়ে, তা সেটা হয়েছে?'
অরিজিৎ ছোট্ট করে হেসে বললেন, 'হ্যাঁ, করেছি একটা ছোট কাজ।'
এতক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে অর্ক দেখছিল। স্যরের ক্ষ্যাপামোর সব সহ্য হয়, শুধু এও এক্সট্রীম মডেস্টিটা বাদে। তাই এবার সে মুখ খুলল, 'অরিজিৎ স্যর জন মিলটনকে নিয়ে রিসার্চ ওয়ার্ক করে সারা পৃথিবীর সেরা ক্রিটিকদের মধ্যে একজন এখন।'
বৃদ্ধ অবাক। অরিজিৎ অপ্রস্তুত। তাই একটু হেসে তিনিই বললেন, 'ওঃ! আলাপ করানোই হয়নি। কাকু, এ আমার ছাত্র অর্ক, বর্তমানে এরই একটা রিসার্চে আমি সাহায্য করছি। ফোনেটিকস সংক্রান্ত। সেই সূত্রেই এখানে আসা। অর্ক, ইনি আমার এক কলেজমেটের বাবা, প্রশান্ত বোস।'
বৃদ্ধ এতক্ষণ অরিজিতের উন্নতিতে হতবাক হয়ে গেছিলেন। এবার তিনি বললেন, 'বাঃ বাঃ, মধুপর্ণাও তো কীসব ভাষা নিয়ে কাজ—'
'কাকু, এবার আমায় যেতে হবে। আসি?' বৃদ্ধকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বললেন অরিজিৎ।
'হ্যাঁ হ্যাঁ, এসো। সময় থাকলে একটু আসার চেষ্টা কোরো।'
'নিশ্চয়ই।' বলে অরিজিৎ অর্ককে প্রায় টেনে নিয়ে গিয়ে একটা টোটোতে উঠলেন, বললেন, 'স্ট্র্যান্ডের কাছে কোনো হোটেল থাকলে নিয়ে চলুন।'

***

টোটো চলছে তার রাস্তায়। অর্ক সবে মাত্র 'স্যর' কথাটা বলেছে, অরিজিৎ বলে উঠলেন, কেন, কী ব্যাপার, মিথ্যের কারণ কী, কিচ্ছু জিজ্ঞাসা করবে না। কারণ এখন আমি উত্তর দেব না। যদি কোনো দিন মনে হয় যে তোমার জানা উচিত এটা কী ঘটল, তবে বলব। অরিজিৎ তাঁর কথা শেষ করা মাত্র তাঁর ফোনে 'ডিড ইউ ডু ইট' বেজে উঠল। অরিজিতের এই ক্ষ্যাপামিটা স্যরের অদ্ভূত লাগে। যেটা মানুষের বাড়ির কলিং বেল হয়, সেটা কিনা নোটিফিকেশনটোন! অরিজিতের যদিও নোটিফিকেশন দেখে ভুরু কুঁচকে গেছে। অর্ককে ফোনটা দিয়ে বললেন, 'যতক্ষন না আমি হাওড়ায় পৌছচ্ছি, ফোনটার দায়িত্ব তোমার। যা কিছু নোটিফিকেশন, এস এম এস, ফোন কল, সব তুমি হ্যান্ডল করবে।'
'কী ব্যাপার স্যর?'
'আরে নিশি। লাইসিডাস নিয়ে কাজ করবে বলে পাগল করে দিচ্ছে, ওকে বুঝিয়ে পারছি না যে ওটা থেকে নতুন করে কিছু আর বের করার নেই। গত একমাস শান্ত ছিল। কাল থেকে আবার পোকাটা নড়েছে। ফোন, এস এম এস, সবই দেখবে নিশিরই আসবে আজ আর কাল। তুমি একটু হ্যান্ডল কোরো ভাই।'
অর্ক রাজি হয়ে গেল। ইতিমধ্যে হোটেল এসে গেছে। অর্ককে অরিজিৎ ২০০০টাকার একটা নোট ধরিয়ে বললেন, 'তুমি যেখানে উঠেছো, সেখান থেকে চেক আউট করে এখানে চেকইন করো। তোমার নামে ঘর বুক করিয়ে রাখছি। তুমি এগুলো সারো, ততক্ষন আমি একটু গড়িয়ে নিই।'
সেদিন আর বিশেষ কিছু কাজ হল না। অরিজিৎ এখানে অর্কের প্রোগ্রেসটা শুনলেন, কাল ওর সঙ্গে গিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে একটু নতুন করে দেখা করবেন ঠিক করলেন।

***

পরদিন সব কাজ শেষ হতে হতে প্রায় বারোটা বেজে গেল। খাওয়াদাওয়া শেষ করে মৃত্যুঞ্জয়ের দোকানে যখন দুজনে দাঁড়িয়ে দই খাচ্ছেন, তখন হঠাতই 'এই যযাঃ' বলে অর্ক জিভ কাটলো।
'কী হল?'
'স্যর আর একজনের সঙ্গে মীট করতে হবে। আপনি আসার জন্যে ওয়েট করছিলাম। আমি একা দেখা করতে সাহস পাইনি। সরি স্যর। আর একটু ছুটতে হবে।'
অরিজিতের এই ভুলোমন অভ্যেসটা খুব ভালো লাগে। তিনি হেসে বললেন, 'আচ্ছা চলো।'
টোটো যখন চন্দননগর বঙ্গ বিদ্যালয়ের সামনে এসে থামল, তখন অর্ক দেখল অরিজিতের ভুরু কুঁচকে গেছে। অর্ককে পেমেন্ট করতে না দিয়ে অরিজিৎ টোটোওয়ালাকে টাকা দিয়ে দেওয়ার পর জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমরা কার কাছে এসেছি অর্ক?'
'এখানকার হেডমিস্ট্রেস — মধুপর্ণা বোস। তিনি ফ্রেঞ্চ লেক্সিস নিয়ে রিসার্চ করেছেন, ইনিও একটা ক্রুশিয়াল লীড অ্যান্ড কনক্লুডিং।'
'বেশ। তাহলে তুমি যাও। আমি যাবো না।'
'স্যর?'
অরিজিৎ হেসে বললেন, 'কাজটা তো তোমার। তুমিই যাও। আমি বাইরে আছি। বেরোলেই আমায় দেখতে পাবে। তুমি আমার এনকোয়ারী স্টাইল জানো। অ্যাপ্লাই দ্যাট!'
অর্ক চলে গেল। চারতলায় হেডমিস্ট্রেসের অফিস। তাঁকে নিজের পরিচয় দিতে হেডমিস্ট্রেস সবেমাত্র কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছেন, অরিজিতের ফোনটা বেজে উঠল অদ্ভূত রিঙটোনে, ' আজগুবি চাল বেঠিক বেতাল, মাতবি মাতাল রঙ্গেতে, আয়রে তবে ভুলের ভবে অসম্ভবের ছন্দেতে।' অর্ক ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল নিশি। এবার নিশিকে বেশ একটু কড়া করেই শুনিয়ে দিল অর্ক। কাল থেকে সাত বার ফোন করেছে। ফোনটা পকেটে পুরতে দেখল হেডমিস্ট্রেস অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন।
'সরি ম্যাম। হঠাতই ফোনটা এল। অ্যাম এক্সট্রীমলি সরি।'
'ফোনটা তোমার?'
'না ম্যাম। আমার স্যরের। আমাকে ফোনটা আপাতত রাখার দায়িত্ব দিয়েছেন।'
'কে তোমার স্যর?'
'অরিজিৎ চ্যাটার্জী, গোল্ড মেডালিস্ট, লেকচারার, জে ইউ।'
'তিনি আসেননি?' হেডমিস্ট্রেসের গলায় উৎকন্ঠা।
'এসেছেন, কিন্তু শুধু আমায় পাঠালেন। নিজে এলেন না। আমি অনেক করে বললাম—'
'ঠিক আছে। দাঁড়াও ওঁকে আনার ব্যবস্থা করি।' একটা কাগজে কিছু লেখে বেয়ারাকে দিয়ে নীচে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোককে দিয়ে আসার অর্ডার দিলেন।
দশ মিনিট বাদেই সিঁড়িতে একটা দুড়দাড় আওয়াজ শোনা গেল। ঝোড়ো কাকের মত চেহারা নিয়ে ভেতরে ঢুকে অরিজিৎ প্রথম প্রশ্নটাই করলেন, 'এত্ত ইগো? এখনো? কেন রে?'

অরিজিতের ঝোড়ো কাকের মতো চেহারা দেখে অর্ক ঘাবড়ে গেল। অর্ক কোনদিন তার স্যরকে এরকম অবস্থায় দেখেনি। অরিজিৎ বরাবরই ফিটফাট প্রকৃতির। সামান্য চুল ঘেঁটে গেলেও যে মানুষটা পকেট-চিরুনী দিয়ে চুল আঁচড়ে নেয়, তার এ কী চেহারা? তার ওপর বোঝাই যাচ্ছে সদ্য সিগারেট খেয়েছেন। এটাও অরিজিতের একটা নতুন রূপ। এর আগে কখনো এক কুচি সুপুরি দিয়েও অরিজিতকে নেশা করতে দেখেনি অর্ক। হেডমিস্ট্রেসের মুখ সাম্ন্য হাসি। তিনি বললেন, 'এখনো সিগারেটটা ছাড়তে পারলি না?'
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে অর্ক বলে উঠল, 'স্যর? এ কী চেহারা হল আপনার? শরীর খারাপ করছে? আপনি সিগারেট খান?'
অরিজিৎ কোনোমতে একটু ধাতস্থ হয়ে চেয়ারে বসে বললেন, 'আমি সিগারেট খাই কী খাই না, ছাড়তে পেরেছি কী পারিনি, সে কৈফিয়ৎ তোমাদের দেব না।' তারপর হাতের কাগজটা হেডমিস্ট্রেসকে দেখিয়ে বললেন, 'এর অর্থটা জানতে পারি? এত ঘ্যাম হয়েছে তোর? গাইড ছাড়া কোনো রিসার্চ স্কলারের সঙ্গে দেখাই করিস না!'
'করব না কেন? নিশ্চয়ই করি। কিন্তু যে স্কলারের গাইড মিস্টার অরিজিৎ চ্যাটার্জী, অর অ্যাস ইউসুয়াল, শুড আই সে, মাস্টার? হোয়াটএভার। তো সেই গাইডের সঙ্গে দেখা না করে কী ডিসকাশন শুরু করা যায়?'
'দেখা হয়েছে? এবার ডিসকাশন করে নে। আমার তাড়া আছে।'
'অরি, কেমন আছিস?'
'অবান্তর প্রশ্ন করিস না। তি খুব ভালোই জানিস যে প্রশ্নটা আপেক্ষিক। কেউ শারিরীকভাবে ভালো থাকলেও মানসিক ভাবে থাকে না, কেউ মানসিকভাবে ভালো থাকলেও শারিরীকভাবে থাকে না, কেউ দুদিক দিয়েই ভালো থাকে, কেউ দুদিক দিয়েই খারাপ থাকে, কেউ কিছু মানুষের সঙ্গে থাকলে মানসিকভাবে ভালো থাকে, কিছু মানুষের সঙ্গে থাকলে থাকে না, সুতরাঙ তোর প্রশ্নের জবাব দেওয়া অসম্ভব।'
'বাব্বাঃ! এখনো লেকচার দেওয়ার স্বভাবটা যায় নি দেখছি!'
হাসি ফুটল অরিজিতের মুখে, 'প্রেসেন্ট ডেসিগনেশনটাই তো লেকচারার। তাই অভ্যেস হয়ে গেছে লেকচার দেওয়া। যাকগে, তোরা একটু ক্যুইক ডিসকাশনটা করবি প্লিস? আমার কোলকাতায় কাজ রয়েছে। আর অর্ক, টেপরেকর্ডারটা নীচে দেখছিলাম গোলমাল করছে, একটু শর্টহ্যান্ডে লিখে নিও।'
যতক্ষণ ডিসকাশন চলল, ততক্ষণ অরিজিৎ পুরোপুরি চুপচাপ রইলেন। একটা কথাও তিনি বলেননি, শুধু দু-এক জায়গায় অর্ক কিছু পয়েন্ট মিস করে যাচ্ছিল, সেগুলো একটু ধরিয়ে দিলেন। আলোচনার শেষে যখন অরিজিৎ বেরোবার জন্যে উঠছেন, তখন হেডমিস্ট্রেস জিজ্ঞাসা করলেন, 'অরি, এখনো আমার ওপর রেগে আছিস, বল?'
'না তো! কেন?'
'সত্যি বল।'
'দেখ মৌ, কাসুন্দী অতিরিক্ত ঘাঁটলে তেতো হয়ে যায়, যেটা আমি করেছিলাম। আর পুরোনো কাসুন্দী ঘাঁটলেও সেম ব্যাপার হয়। তাই আর তেতো করিস না। বাই দ্য ওয়ে, কাকুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমার নাম শুনে তো মনে হল চিনতে পেরেছেন। যাকগে, আসি, এসো অর্ক।' অরিজিৎ বেরিয়ে গেলেন।
অর্ক এতক্ষণ এই কথোপকথন চুপ করে শুনছিল। স্যরের ডাক শুনে কোনোমতে বিদায়ী সম্ভাষণ জানিয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় দেখল হেডমিস্ট্রেস মধুপর্ণা বোসের মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে গেছে। সেখানে এখন বৃষ্টির আগের থমথমে অবস্থা।

***

বঙ্গ বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে হোটেলে গিয়ে লাগেজ নিয়ে চেক আউট করা থেকে স্টেশনে পৌঁছে টিকিট কাটা, ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা করা অবধি অরিজিৎ কোনো কথা বলেননি। অর্কের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি তাঁর চোখে পড়লেও তিনি দেখেও না দেখার ভান করেছেন। দুপুরের ট্রেন ছিল। তাই বেশ ফাঁকাই ছিল গাড়ি। ট্রেনে উঠে অর্ক আর চুপ থাকল না, অরিজিতকে চেপে ধরল, 'ঢাক ঢাক গুড় গুড় চলবে না স্যর। খুলে বলুন না কী ব্যাপার!'
'সব কথা না জানলেও তোমার চলবে অর্ক।' ক্লান্ত গলায় বললেন অরিজৎ।
'স্যর, মাস্টার্স করতে যেদিন থেকে আমি জে ইউ তে ঢুকেছি, সেদিন থেকে আপনার ছায়ায় থেকে অনেক কিছু শিখেছি। এখনো কোথাও কোনো রিইউনিয়ন থাকলে নতুন মানুষদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় আপনার স্নেহধন্য বলে। আর তাছাড়া অন্যদের কাছে আপনি শুধুই স্যর। কিন্তু আমার কাছে তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। সেটা আপনি নিজেও জানেন। আর আপনিই তো বলেন যে মনে কোনো কষ্ট থাকলে তা শেয়ার করলে মনটা হাল্কা হয়ে যায়।'
'ইউ নটি বয়, ইউ হ্যাভ হিট অ্যাট মাই উইক ফিলোসফিস।' হেসে বললেন অরিজিৎ, 'শোনো তবে,' অরিজিৎ শুরু করলেন, 'হ্যাঁ, মধুপর্ণার সঙ্গে আমার কলেজের প্রথম জীবনে একটা ইমোশন্যাল সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। আমিই ইনসিস্ট করেছিলাম। মৌ প্রথম থেকেই আমায় সিরিয়াসলি বিষয়টা নিতে বারণ করত। আমি ভাবতাম আমি প্রচন্ড ইম্পালসিভ, তাই হয়তো সিরিয়াসলি নিতে বারণ করছে। তাই আমি ব্যাপারটা খুবই সিরিয়াসলি নিতাম, ওকে নানাভাবে বিরক্তও করে তুলতাম সেই সিরিয়াসনেসের জ্বালায়। মধুপর্ণা বলেই দিয়েছিল, সিরিয়াসলি নিলে নিজের রিস্কে নাও, পরে ভেঙে পড়লে আমার দায়িত্ব নেই। আমি তাও নিয়েছিলাম। কিন্তু পরে দেখলাম, সত্যিই মধুপর্ণা বিষয়টা সিরিয়াসলি নেয়নি। আমাদের বিষয়টা ওর, আমার দুজনের বাড়িতেই জানাজানি হয়ে গেছিল। আমার বাড়িতে ব্যাপারটা অ্যাকসেপ্ট করলেও কাকু, কাকিমা, মানে মৌয়ের বাবা-মা, আমার ওপর খুব রেগে যান। তার আগে থেকেই আমার আর মধুপর্ণার সম্পর্ক আর বন্ধুত্ব, দুটো সুতোতেই প্রচুর আঘাত পড়েছিল। এই ঘটনাটা শুধু আগুনে ঘি ঢেলেছিল। মৌ হঠাতই আমার সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তারপর আর ওর কোনো খবর পাই নি। তবে মাঝে মাঝে সুনতে পেতাম যে আমি ওর লাইফে, এমনকি বন্ধু-চক্রেও না থাকায় নাকি ওর জীবনটাই অন্য খাতে বইছে। ও নাকি অসাধারণ স্টুডেন্ট। হ্যাঁ। সেটা আমি জানতাম। কিন্তু সেই ধাক্কাটা আমি আজও সামলে উঠতে পারিনি। ব্যাপারটা ঘটার পর প্রথম প্রথম কষ্টগুলো সবাইকে বলতাম, তারপর আস্তে আস্তে নিজের কষ্টগুলো কনসীল করে নিই। তবে এখনো যেসব জায়গার সঙ্গে মৌয়ের স্মৃতি জড়িয়ে আছে্‌ সেগুলোকে এড়িয়ে চলি।
'যেমন পার্ক স্ট্রীট, চন্দননগর?'
'হুঁ। আরো আছে। দশ নম্বর প্ল্যাটফর্মের বিশ্বভারতী এক্সপ্রেস, রামকৃষ্ণপুর ঘাট –‘
'আর ঐ কবিতার কেসটা কী স্যর?'
'ওটা তেমন কিছু না। আমি ঐ লাইনদুটো মধুপর্ণাকে হোয়াটসঅ্যাপের স্টেটাস করতে সাজেস্ট করেছিলাম। আমাদের শেষ কথা হওয়ার দিন অবধি সেটা ছিল। তার পর আমি ওটাকেই আমার রিংটোন করি। পাল্টাই নি আর সে থেকে।'
'স্যর, আপনার রুড বিহেভিয়ারে ম্যাডাম কষ্ট পেয়েছেন মনে হল মুখ দেখে। উনি হয়তো ব্যাপারটা আবার ঠিক করে নিতে চাইছিলেন।'
'জানি। কিন্তু ইচ্ছে করেই করলাম না আর ঠিক।'
'কেন স্যর?'
'আমি জানি, মধুপর্ণা যদি আবার আমার জীবনে ফিরেও আসে, আবার চলে যাবে। সেই চলে যাওয়ার ধাক্কাটা আর সামলাতে পারব না হে অর্ক। বয়সটা বেড়ে গেছে। ইমিউনিটি পাওয়ারটা কমেছে।' অরিজিৎ চুপ করলেন।
ট্রেন তখন হাওড়ায় ঢুকছে। বাঙালবাবু ব্রীজের আলো আঁধারিতে তিনি দেখলেন অর্কের চোখে জল। দূর থেকে শোনা গেল স্টেশনের যান্ত্রিক অ্যানাউন্সমেন্ট, "ফাইভ থ্রী জিরো ফোর ফাইভ, বিশ্বভারতী ফাস্ট প্যসেঞ্জার বিকেল চারটে বেজে চল্লিশ মিনিটে দশ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে।"

সমাপ্ত

 

সময়টা চারটে চল্লিশ
  • 3.00 / 5 5
1 vote, 3.00 avg. rating (71% score)

Comments

comments