দেওয়াল ঘড়িতে নটা বাজল ঢং ঢং করে।
চমকে ঝিমুনিটা কেটে গেল স্বাতীর। দেখেছ, এখনো বাড়ি ফেরেনি মেয়েটা! কতবার বলেছে, বাপী বাড়ি ঢোকার আগে ফিরে এসো, যেখানেই যাও। অথচ আর কিছুক্ষনের মধ‍্যেই বাড়ি ফিরবে অংশুমান। মেয়েকে না দেখতে পেলে কুরুক্ষেত্র বাঁধাবে আজ।

গায়ে চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে ব‍্যালকনিতে আসে স্বাতী। শীতটা এবার বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে কিন্তু। রেলিঙ ছুঁয়ে থাকা রাধাচূড়া গাছটার মাথায় এখন কুয়াশার ঘরবাড়ি। রাস্তার রাতআলো গুলোও কেমন ঢুলছে একপায়ে দাঁড়িয়ে। সবে রাত নটাতেই তাদের এই অশোক কলোনীতে মধ‍্যরাতের নিস্তব্ধতা। একটা লোক নেই গলিতে। মাঝে মাঝে শুধু এক দুটো রিক্সা ঢিমেতালে যেতে যেতে জমাট কুয়াশাতে মিশে যাচ্ছে বিদেশী ভূতের সিনেমার মত। শীতে জবুথবু রাস্তার কুকুর গুলো পর্যন্ত চেঁচাতে ভুলে গেছে। আজকাল বাড়ি লাগোয়া খেলার মাঠটাও বড্ড তাড়াতাড়ি চুপচাপ হয়ে যায়।

ঠিক তখনই ঘাড়ের কাছে ঠান্ডা নিঃশ্বাসটা টের পেল স্বাতী। শিরদাঁড়া বেয়ে একটি বরফের কিউব নেমে গেল না চাইতেই। খুব ভাল করে জানে, ঘাড় ঘোরালে কাউকেই দেখতে পাবে না। গত কদিন ধরেই হচ্ছে এটা। বাড়ি ফাঁকা হলেই কাউকে স্পষ্ট অনুভব করে সে। কে জানে মনের ভুল কিনা। কেউ যেন সবসময় তাকে দেখতে থাকে, দেখা না দিয়ে‌ । গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে মনে হয়েছে, পাশের চেয়ারটাতে বসেছিল কেউ একটু আগেও, তাকিয়েছিল তার ঘুমন্ত মুখটার দিকে, অপলক। অদ্ভুত একটা অনুভূতি। অংশুমান বা মিতিনকে বললে হয়ত কালই সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাবে।

সত‍্যি বলতে, ব‍্যাপারটা খুব খারাপ লাগে না স্বাতীর। সকাল নটার পর এত বড় বাড়িটাতে যখন হঠাৎ করে একা হয়ে যায়, তখন এই অশরীরী উপস্থিতিটা একরকম স্বস্তিই দেয় তাকে। ভয় পাওয়ার বদলে, একটা গা ছমছমে ভালোলাগা জড়িয়ে ধরে চারপাশ থেকে। বাবা, মেয়ের এই ব‍্যস্ত রুটিনে মানিয়ে নিতে নিতে, নিজের কোনও আলাদা জগত গড়ে তোলার ফুরসত পায়নি আর। তাই, তার মধ‍্যেই যখন পাশের বাড়ির অনিকেতের বছর পঁচিশের আঙুলগুলো, খবরের কাগজ চাইতে আসার অজুহাতে অল্প ছুঁয়ে যায় তার দশ বছর বেশি পুরোনো হাত… বা, রাস্তা চলা কোনও অপরিচিত চোখ দুপুরের ফাঁকা ব‍্যালকনিতে তাকে খোঁজে, ভালোই লাগে তার। টুকরো টুকরো খুশীর মেঘ জমে মনের কোণে… চারদিক ভাসানো বর্ষার মেঘ হয়ত নয়, কিন্তু শান্ত শীতল গোধূলি-ছায়া ফেলে অল্প, সেটা সত‍্যি।

ডাইনিংএর ঘড়িটার দিকে চোখ যায়। যাচ্চলে সাড়ে নটা পেরিয়ে গেল। এখনও অংশুমান বা মিতিনের টিকির দেখা নেই। বরের ফোনে ট্রাই করে সুইচড্ অফ পেল, মেয়ের ফোনে রিঙ হয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা আক্কেল এদের যাইহোক! সত‍্যি, তার কথা ভাবার কেউ বোধহয় নেই। আগের শীতে বাবা চলে গেল, একরকম হঠাৎ করেই। মায়ের মুখটা মনে পড়েনা আর। তার যখন বছর পাঁচেক বয়স, বাবার বেস্ট ফ্রেন্ড হিতেনকাকুর সাথে চলে যায় মা। তারপর থেকেই বাবা কেমন চুপচাপ, নিজের মধ‍্যে গুটিয়ে গিয়েছিল। সংসারে থেকেও যেন বহুদূরের একটা মানুষ। মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগত স্বাতীর। চেষ্টাও কম করেনি বাবাকে মূলস্রোতে ফেরানোর। না পেরে, অভিমানে একসময় নিজেই দূরে সরে এসেছে। কিন্তু বাবা একেবারে চলে যাওয়ার পর, আরো একা হয়ে গেছে সে। লোকটা বেশী কিছু না বলুক, শুনত তো সব, তার যত রাগ, দুঃখ, অভিমান সব চিৎকার করে বের করে দিত। আর তার দীঘির জলের মত শান্ত বাবা শুধু চুপ করে দেখত তাকে। এখন মনে হয়, সেটাই অনেক ছিল। হঠাৎ করে শীত করতে থাকে তার।

এমন সময়, গেটের সামনে একটা গাড়ির হেডলাইটের আলো। মিতিন, না? দেবরূপ, ওর ক্লাসমেটটা ড্রাইভিং সীটে। একনম্বরের বখাটে ছেলে একটা। হঠাৎ বড়লোক বাপের ছেলে হলে যা হয়‌। নিচে গিয়ে সদর দরজা খুলে দাঁড়াল স্বাতী। মেয়ে গাড়ির জানালায় মুখ নামিয়ে হেসে হেসে কিছু বলছে। তার আওয়াজ পেয়ে চুপ করে গেল। এগিয়ে এল বাড়ির দিকে।
- কিরে! এতক্ষন কোথায় ছিলি? ফোন ধরছিলি না কেন?
- রূপের বাড়িতে। উফ্ফ মা, দরজা থেকে সরো তো! ভীষন টায়ার্ড লাগছে, শুতে গেলাম।
- ডিনার করবি না?!
- খেয়ে এসেছি..
- আর এতগুলো রান্না? বলতে পারলি না খেয়ে আসছিস?
- ফ্রীজে তুলে রাখো
- তোর বাবার ফোনটাও এদিকে সুইচড্ অফ…
- ও, বাপী তোমায় বলেনি? ভুলে গেছে দেন। বাপীর আজ ফিরতে রাত হবে। অফিস পার্টি!
বলতে বলতে স্বাতীকে পেছনে ফেলে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল মিতিন। সেই ছোট্ট মিতিন, আজ কত বড় হয়ে গেছে! স্বাতী তাকিয়ে দেখতে থাকল, মেয়ের উঠে যাওয়া… আরো শীত করছে তার, খুব শীত…

আবার সেই পুরোনো ব‍্যালকনি। মেয়ের ঘরের দরজা বন্ধ। ভেতর থেকে হাসির আওয়াজ আসছে। কথা বলছে ফোনে। খাবারগুলো ডাইনিং টেবিল থেকে উঠিয়ে রাখতেও ইচ্ছে করছে না। শরীর জুড়ে অদ্ভুত এক ক্লান্তি! বাবার কথা খুব মনে পড়ছে, সমুর কথাও… যেদিন প্রথম অংশুমানের পরকীয়ার হাতেনাতে প্রমাণ পেয়ে কেঁদে কেটে ঝগড়া করে, বছর দুয়েকের মিতিনকে সাথে নিয়ে শিমূলতলায় বাবার কাছে এসে উঠেছিল… অথবা, কলেজে পড়ার সময় এক মেঘলা বিকেলে হঠাৎ যখন খবর পেল, সমুর বাইক আ্যক্সিডেন্ট হয়েছে.. যার সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখত শিমূলতলার পুরোনো মসজিদ লাগোয়া পোড়োবাড়িটার ছাদে শুয়ে, দুজনে মিলে হেমন্তের শিশিরে ভিজতে ভিজতে… সমু চলে যাওয়ার পরে তো নিজের ভাঙা টুকরো গুলো জোড়াতালি দিয়ে আবার কোনওভাবে ঘুরে দাঁড়ানো। বাবা কিন্তু সব বুঝত, বেশি কিছু না বললেও। কারো সাতে পাঁচে না থাকা চুপচাপ একটা লোক… শীতের নির্মল, আদিগন্ত, ঠান্ডা আকাশের মত চুপচাপ লোকটা।

বেশ হাওয়া দিচ্ছে… সামনের রাধাচূড়া গাছ থেকে শুকনো পাতাগুলো উড়ে পড়ছে রাস্তায়, স্ট্রীটলাইটের আলোর বৃত্তে.. একটা মায়াবী মূহুর্ত, খুবই অল্প সময়ের জন‍্য হয়ত… স্বাতীর চোখের কোণে কয়েক টুকরো মনখারাপ চিকচিক করে ওঠে।

আর ঠিক তখনই, ঘাড়ের কাছে ঠান্ডা নিঃশ্বাসটা ফের টের পেল সে। ঘাড় না ঘুরিয়েও বলে দিতে পারে, কেউ একজন তাকে দেখছে, একদৃষ্টিতে।

উপস্থিতি
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments