আজকাল বৃষ্টি ভেজা সন্ধ‍্যে গুলোতেও কেমন যেন একা হয়ে যাই। অথচ এই কিছুদিন আগে অব্দিও বৃষ্টি নিয়ে আদেখলামির শেষ ছিল না। বাড়িতে থাকলে বৃষ্টির সময় রবীন্দ্রনাথ বা অতুলপ্রসাদের গান শোনা, ছাদে একলা ভেজা, আরো কত কি! এখন শুধু চুপ করে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বসে থাকি। পুরোনো কথা ভাবি, আবার ভাবিও না। একলা জানলার বাইরে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ‍্যে নামে, আমি চেয়ে দেখি। আকাশের রঙ পাল্টে যায়, কিন্ত্ত আগের মত কারো জন্যেই আর মন টা হু হু করে ওঠে না। ফোনে হাতও চলে যায় না, অজান্তে। তোর অভাবটাও কি তাহলে অভ‍্যেস হয়ে গেল আস্তে আস্তে ?

সেদিন হঠাৎ তোর ভাইকে দেখলাম, জানিস? নেতাজীভবন মেট্রোর সামনে। বাপীর জুয়েলারী স্টোর্স টাতো ওদিকেই কোথাও, না? অনেকবার চিনিয়ে দিয়েছিস, তাও খুঁজে পাবোনা। আমার রাস্তা চেনার প্রতিভা তো তোর অজানা নয়। নিজেই মজা করে নাম দিয়েছিলি, লেডি কলম্বাস। যখন দক্ষিণ কলকাতার অলিগলি ঘুরে বেড়াতাম একসাথে, তখনও পড়া ধরার মত করে জানতে চাইতিস, “একা এখানে ছেড়ে দিলে, বাড়ি ফিরতে পারবি?” সেই দেখ, একাই তো চলে এলাম এতটা রাস্তা, হারাইনি কোথাও! ইচ্ছে করে না হলে, কেউ সত‍্যি সত‍্যি হারায়ও না, হয়ত।

পিকু কত বড় হয়ে গেছে! তোদের ভবানীপুরের বাড়ি যেতাম যখন, ক্লাস সিক্সের পুচকি মিষ্টি বাচ্চা একটা। প্রত‍্যেক দিন একটা করে ডেয়ারী মিল্ক দিয়ে দলে টেনেছিলাম ওকে। আমাদের ঝগড়া দেখলে, ও মামণির কাছে একছুটে গিয়ে বলত, “মা, দাদা আবার ইতুদির সাথে ঝগড়া করছে। তুমি বকবে চলো।” আমি ঝগড়া ভুলে, হেসে গড়িয়ে পড়তাম, ওর পাকামো দেখে। আর, তুই আরো খেপে যেতিস। সেই পিকু এখন হিসেব মতো ক্লাস টুয়েলভ হওয়ার কথা। বেশ খানিকক্ষন তাকিয়ে রইলাম। অবিকল তোকে দেখতে পেলাম ওর মধ‍্যে, জানিস? সেই কাটা কাটা নাক, মুখ, স্বপ্নভেজা দুটো নীলচে চোখ, আলো পিছলানো রেশম চুল, সরু ঠোঁটদুটোর ওপর নরম ঘাসের রেখা।

টাইমমেশিনে করে এক ধাক্কায় পিছিয়ে গেলাম বেশ কয়েক বছর। মনে পড়ল, আমাদের প্রথম একা দেখা, ঠিক এই জায়গাটাতেই। হেডফোন কানে অপেক্ষা করছি স্টেশনের বাইরে, তুই এলি হেলতে দুলতে। মাত্র পনেরো মিনিট দাঁড় করিয়ে রেখে। ঘুমিয়ে পড়েছিলি নাকি! আমার ওপরই চোটপাট করলি উল্টে, মেট্রোতে ওঠার আগে ফোন না করার জন‍্য। কি যেন একটা নোটস্ নেওয়ার ছিল তোর থেকে। কথায় কথায় আগেই বলেছিলি, কেউ বাড়িতে থাকবে না। মুখে না বললেও, বুঝতে পারতাম, তোরও ভাল্লাগে আমাকে। তাই আর আপত্তি করিনি তোর সাথে একা হতে। তোদের সেই পুরোনো সবুজ বাড়ির দোতলা, তোর নিজস্ব ঘরটা। একদম রাস্তার পাশে, উল্টোদিকে হরিশ মুখার্জী পার্ক। কত হাসি, আড্ডা, ফ্রীজ থেকে মামণির হাতে বানানো কেক, অনুরোধের আসর। ওঠার আগে টেনে নিলি নিজের দিকে। ভেজা ঠোঁটে চোখ বুজলাম আবেশে।

সেই শুরু। তারপর, দুদিন দেখা না হলেই জানলা বেয়ে মনখারাপ নামত শরীরে। ঝগড়া হলে, মনে হত, তিনতলার ছাদ থেকে ঝাঁপ দিই, কখনো। বেশ কয়েকবার তো না জানিয়ে, তোদের বাড়ির সামনের পার্কটাতেও গিয়ে বসে থেকেছি, একা। ফোন করে বলেছি, “একবার বেরো, একটু কথা বলেই চলে যাবো।” তুই বিরক্ত হয়েছিস, বকেছিস, কিন্তু শুনতাম না। তিনটে বছর গাঙচিলের ডানায় ভর করে উড়ে গেল, বুঝতেই পারলাম না। আমার শহরটা যে এত সুন্দর, এত সবুজ, এমন ভেজা, নাম ভুলে যাওয়া গলির বাঁকের অন্ধকারটা যে এত আদরের বুঝিনি আগে। ইলেকট্রিকের তারে ঝুলে থাকা বুড়ো চাঁদটাও যে এমন ম‍্যাজিক জানে, জানতেই পারতাম না কখনো, তুই না পাশে থাকলে।

মা আমার সব বুঝত, হাবে ভাবে। বাবা কোনোদিনই খুব একটা কাছের মানুষ ছিল না। দুজনের মধ‍্যে মা ই ছিল যোগসূত্র। মনে আছে, মা বড়ি, নাড়ু, সন্দেশ বানিয়ে আমাকে দিত, তোকে দেওয়ার জন‍্য। কই, আরো তো কত বন্ধু ছিল, কিন্তু আগ্রহ ছিল শুধু তোর খবরেই। সব গল্প অবশ‍্যি সুখের ছিল না। প্রচুর মন কষাকষিতে কেটেছে বিকেল থেকে সন্ধ‍্যে। আমাকে সব বলতিস তুই। আমার আগে একজনের সাথে সম্পর্ক ছিল তোর – অনু। তুই নিজেই বেরিয়ে এসেছিস সে সম্পর্ক থেকে, কিন্তু অনু নাকি বুঝতে চায়না। সুইসাইডের কথা বলে ইমোশনাল ব্ল‍্যাকমেইল করে, দেখা করতে চায় যখন তখন। তুইও বন্ধু হিসেবে না করতে পারিস না। আমি এটা মানতে পারতাম না। চেঁচিয়ে মাথায় করতাম রাস্তাঘাট। তোকে পার্কের ঘাসে, কখনো নদীর কাছে একা ফেলে, হাঁটা দিতাম দিকশূণ‍্যপুরের দিকে। এদিক ওদিক ঘুরে মাথা ঠাণ্ডা করে ঘরে ফিরতাম। চেয়ে বসে থাকতাম ফোনের দিকে, যদি আমার নীললোহিত, তুই, ফোন করিস একবার। পরে না পেরে, নিজেই গভীর রাতে ফোন করে স‍্যরি বলতাম। পাগলী ছিলাম একদম​, সত‍্যিই। জানিস, আমাদের বংশে পাগলামি কিন্তু নতুন নয়। দাদুর এক পিসী পাগল ছিল পুরোপুরি। অল্পবয়সে পাড়ার একজনের সাথে ঘর ছেড়েছিল, ভালোবেসে। সে ছেলে এক বেশ‍্যাপাড়ায় নিয়ে গিয়ে তোলে, বিয়ের বদলে। মেয়ে পালিয়ে আসে কোনোরকমে, কিন্তু বিশ্বাসভঙ্গের ধাক্কাটা মেনে নিতে পারেনি। খুব ছোট্টবেলায় দেখতাম, ছাদের চিলেকোঠার ঘরে বন্ধ করে রাখা হত সেই পিসীদিদাকে। আমাকে দেখলেই কেমন ফোকলা হাসি হেসে কাছে ডাকত। ভয় পেয়ে ছুটে নীচে পালিয়ে আসতাম, মায়ের কাছে। খুব চিন্তা হত, আমি কখনো ওরকম হয়ে যাবো না তো!

দিনটা এখনো মনে আছে। সরস্বতী পূজো, ভ‍্যালেনটাইনস্ ডে একদিনে প​ড়েছিল​ সে বছর। খুব করে বলেছিলাম, দেখা করি। তুই বললি, কাকুদের ওখানে পূজোতে বাড়ির সবার নেমন্তন্ন, না গেলে বাপী রাগারাগি করবে। কেন জানি, কোথায় যেন খটকা লাগল। সত‍্যি বলছি, মন মানতে চায়নি তুই মিথ‍্যে বলতে পারিস। একা গিয়ে পার্কটাতে বসলাম। বাড়ির মেইন গেট ভিতর থেকে আটকানো। তোর জানলা খোলা, দেখা যায়না বাইরে থেকে কিছু। আধঘণ্টা কেটে গেল। একবার ভাবলাম, বাড়ির মধ‍্যেই আছিস যখন, কলিংবেলটা বাজাই গিয়ে। এইসব ভাবছি আকাশ পাতাল, দরজা খুলে রাস্তায় নামলি তুই। অনুর হাতটা এখনও তোর মুঠোর মধ‍্যে ধরা। তোরা হাসছিস, খুনসুটি করছিস একসাথে। তোর চোখের ওই দৃষ্টি আমি চিনি। প্রত‍্যেকবার নিজেদেরকে তুমূল ভালোবাসার পর, তোর খোলা বুকে মাথা রেখে শুয়ে থাকতাম যখন, তোর চোখদুটো ঠিক এই ভাষাতেই কথা বলত আমার সাথে। প্রথমদিনের চুমুটা হঠাৎ শেষবিকেলের হাওয়া হয়ে আমার শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটদুটো ভিজিয়ে দিয়ে গেল। বৃষ্টি এল প্রথমে হালকা চালে, মিহি তুষারপাতের মত। পরে, আরো জোরে।

বাকিটা রাস্তা কিভাবে এসেছিলাম, মনে নেই। বাড়ির গেট পেরিয়ে, সোজা তিনতলার ছাদে। ওপর থেকে নিজেকে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে, সেই পাগল পিসীদিদার কথা মনে পড়ল হঠাৎ। জানি না, কেন। স্পষ্ট দেখতে পেলাম, সেই ফোকলা দাঁতের হাসি, সেই আয় আয় আয় ডাক। তবে, আর ভয় করছিলনা একটুও। কেমন অদ্ভুত নির্ভার হয়ে চোখ বুজলাম, মাটি ছোঁয়ার ঠিক আগের মূহুর্তে।

তারপর থেকে, এই চিলেকোঠার ঘরটাই আমার আস্তানা‌। মরচে ধরা জানলার শিক বেয়ে সন্ধ‍্যে নামে, পুরোনো পাগলা-গারদে। নিরাবয়ব​ আমি চেয়ে থাকি, বাইরের চেনা মুখগুলোর দিকে। তাদের রাগ, হতাশা, অভিমান, আনন্দ, সুখ, কান্না সব পড়তে পারি কপালের ভাঁজগুলোতে। চুপচাপ দেখে যাই শুধু। দেখি, কিভাবে জীবন বয়ে চলেছে, নিজের নিয়মে। তুই এখন শর্মিকে বিয়ে করেছিস, বেশ কয়েক মাস প্রেমের পর। তোর হিউস্টনের আ্যপার্টমেন্টে এখন সকাল হচ্ছে। আড়মোড়া ভেঙে পাশ ফিরছিস তুই। শর্মিকে জড়িয়ে ধরছিস, ভালোবেসে। এসবই তো হওয়ার কথা ছিল। কোথাও কিছু থেমে থাকেনি, আমার না থাকাতে। শুধু, মা বাবার বিয়েটা টিকল না, জানিস। পরে বুঝেছিলাম, আমিই ছিলাম দুজনের মধ‍্যে একমাত্র​ যোগসূত্র। হঠাৎ করে সেটা ছিঁড়ে যাওয়ায়, আর কোনো টানই দুজনকে এক ছাদের তলায় রাখতে পারেনি। এখন দুটো মানুষ, দুটো আলাদা শহরে বসে, যে যার নিজের মত করে, একই শোক উদযাপন করে। আর, চেনা শহরটা প্রতিদিন একটু একটু করে পাল্টে যায়​, আমার চিলেকোঠার বাইরে। আমি চুপ করে চেয়ে চেয়ে দেখি। অনন্তকাল​।

ভ‍্যালেনটাইনস্ ডে
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments