যশোধরা, রাহুল, ধরণীমন্ত্র

পুত্র রাহুলকে তাঁর পথে নিয়ে আসবেন এই মনোকামনায়, মৌদগল্যায়নকে সঙ্গে নিয়ে, পরমজন, যাঁকে স্ত্রীরূপে পেয়েছিলেন জীবনে, সেই যুবরাণী যশোধরার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। রাহুলের তখন ১৯ বছর বয়স। যশোধরা রাহুলের উত্তরাধিকারের কথা বিবেচনা করে কাতর অনুনয় করলেন।
বুদ্ধ বললেন, “আমি রাহুলকে আরো উত্তম উত্তরাধিকার প্রদান করব”, এই বলে মৌদগল্যায়ণকে আদেশ করলেন, রাহুলের মস্তক মুণ্ডন করিয়ে সংঘে যোগদান করালেন।


এর পর তাঁরা কপিলাবস্তু থেকে বেরিয়ে পড়লেন। কপিলাবস্তুর কাছে প্রমোদকাননে একদল শাক্য রাজকুমারের সঙ্গে দেখা, এঁরা সকলেই গৌতমের নানান সম্পর্কিত ভাই। এঁদের মধ্যে ছিলেন আনন্দ ও দেবদত্ত – যথাক্রমে বুদ্ধের পরম মিত্র ও পরম শত্রু। কয়েক বছর পরে পরমজন আনন্দকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে আনন্দ তখন বুদ্ধের মধ্যে কি এমন দেখেছিলেন যে জাগতিক যাবতীয় আনন্দ সম্ভোগ-বাসনা তুচ্ছ করে স্ব-আলোকিত মনের সারাৎসার উপলব্ধিই তখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল, আনন্দ বলেছিলেন, “হে, প্রভু! সর্বাগ্রে আমি আমার প্রভুর ব্যক্তিত্বে ৩২টি পরম মহামহিম চিহ্ন দেখেছিলাম। নরম, সূক্ষ্ম, ও স্ফটিকের ন্যায় স্বচ্ছ হয়ে তারা আমার চোখে প্রতিভাত হয়েছিল।” জ্ঞানের দিক থেকে এই উষ্ণহৃদয় যুবকটির স্থান মৌদগল্যায়ণের পরেই। আবার গুরুদেবের প্রতি একপেশে অন্ধপ্রেম, ও তীক্ষ্ণধীর অধিকারী হওয়াই আনন্দের সংস্কারমুক্ত সমানতা ও সম্যক বোধিপ্রাপ্তির অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এ হচ্ছে সেই ধরণের বোধি, খুব সামান্য ভিক্ষুরাও যাকে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে খুব প্রাচীনপন্থী, ভবঘুরে ভিক্ষুদের নাম করা যায়, যেমন সুনীতা (মেথর ছিলেন), বোধিপ্রাপ্তির প্রাককালে অটবীতে এককালে নরখাদক ছিলেন যে অলাবক, সেই অলাবক, ব্যায়ামবীর উগ্রসেন, প্রভৃতি। আনন্দ কালক্রমে বুদ্ধের ছায়া নামে প্রসিদ্ধি পেয়েছিলেন, সদাসর্বদা পরমজনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলতেন; যখন যেখানে যেভাবে বুদ্ধ চলতেন, বসতেন, তাঁর পায়ে পায়ে, প্রতি শরণে, আনন্দ প্রতিপদে তাঁকে অনুসরণ করতেন। অল্পকাল পরে আনন্দ প্রায় স্বভাবত বুদ্ধদেবের যাবতীয় দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, বুদ্ধের আসন তৈরী করে রাখতেন, যে শহরে বুদ্ধ যেতেন সেখানে আগে থেকে গিয়ে যাবতীয় ব্যবস্থাপনা করে আসতেন, বুদ্ধদেবের যখন যা প্রয়োজন হত, আনন্দ সেই প্রয়োজন মেটাতে তৎপর থাকতেন। আনন্দ বুদ্ধদেবের সর্বক্ষণের সঙ্গী, বুদ্ধদেবও নীরবে সেই সঙ্গ গ্রহণ করেছিলেন।


এর ঠিক বিপরীত দেবদত্ত। নির্বোধ ও হিংসুটে। দেবদত্ত সংঘে যোগ দিয়েছিলেন অতীন্দ্রিয় সমাপত্তি অর্জনের উদ্দেশ্য নিয়ে; এই অতীন্দ্রিয় সমাপত্তি গভীর ধ্যান অতিক্রম করার পরের চেতনার স্তর – যাতে করে দেবদত্ত কিছুটা জাদুমন্ত্র আয়ত্ত করতে পারেন। তাতে এই জাদুমন্ত্র যদি বুদ্ধের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে হয়, তাই সই। দেবদত্ত ছক কষেছিলেন যে নিজের একটা আলাদা সম্প্রদায় গড়বেন।


সমাপত্তির যে ঐশ্বরিক চেতনা, তার মধ্যে ছিল অতীন্দ্রিয় ভাবসংযোগ, অতীন্দ্রিয় উপায়ে মানুষের মনের কথা বুঝে নেওয়া। গোরক্ষপুরে যখন বুদ্ধদেবের সঙ্গে প্রমোদকাননে দেবদত্তের প্রথম দেখা হয়, তখন তার এই দুরভিসন্ধির কথা বোঝা যায়নি। বুদ্ধ সর্বজীবের প্রতি সমপ্রেমসম্পন্ন, সর্ব জীবে একই শূন্যতা দর্শন, দীক্ষার সময়ে দেবদত্ত তার মনে কি পুষে রেখেছে, তা নিয়ে বুদ্ধের খুব একটা কিছু যেত আসত না। এমনকি পরেও, দেবদত্ত যখন বুদ্ধকে মারবার চেষ্টা করছেন, তখনো, আমরা পরের দিকে দেখব, যে, পরমজন অপরিমিত মাধুরীতে তাকে অন্তর থেকে ক্ষমা করে আশীর্বাদ করেছেন।
গুরুদেব সশিষ্য রাজগৃহে গেলেন, সেখানে সুদত্ত নামে এক ধনী বণিক তাঁদের সম্বর্ধনা জানালেন। সুদত্ত গরীব ও অনাথ মানুষের প্রতি তাঁর দয়াদাক্ষিণ্যের কারণে অনাথপিণ্ডক বলে প্রসিদ্ধ ছিলেন। এক রাজকুমারের কাছ থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে তিনি জেতবন নামে একটি উদ্যান ক্রয় করেছিলেন। সেখানে বুদ্ধদেব ও তাঁর শিষ্যদের জন্য ভারি চমৎকার একটি মঠ বা আশ্রম তৈরী করেছিলেন। সেই আশ্রমটিতে প্রায় ৮০টা প্রকোষ্ঠ, বাড়িঘর, ছাত, স্নানের জায়গা ছিল। শ্রাবস্তীনগরীর অদূরেই, এখানেই পরমজন অনাথপিণ্ডকের আতিথ্য গ্রহণ করে বসবাস শুরু করলেন। শুধু বর্ষাকালে রাজগৃহের বেলুবনের মঠে চলে আসতেন।


সেইখানে অধিকাংশ সময়ে তিনি একাকী অরণ্যে সময় কাটাতেন। অন্যান্য সাধুরা যে যার নিজের মতন করে সাধনা করতেন, ধ্যান করতেন, অরণ্য থেকে উদ্গীত প্রেমময় নীরবতা যেন পান করতেন তাঁরা। সেই অরণ্যে বুদ্ধদেব শান্ত সমাহিত হয়ে গাছের ছায়ায় কুশাসনে বসে থাকতেন। সে জীবন কখনো সুখকর (“জঙ্গলটি ভারি রমণীয়; যে জায়গায় জগতের কোন আনন্দ নেই, সেখানে নির্লিপ্ত উদাসীন মানুষ আনন্দ অনুভব করে, কারণ তারা তো ভোগবাসনার সন্ধানে ফেরে না”); সবসময় অবশ্য সুখকর ছিল না।


“শীতের রাত বড় শীতল প্রভু”, সাধুরা গান ধরতেন, “হিমকাল সমাসন্ন, গোচারণ হেতু রুক্ষ্ম জমি; পত্রের এই পালঙ্কটি নেহাতই শীর্ণ, কাষায বস্ত্র বড়ই ক্ষীণ; শীতের হাওয়া অন্তহীন”।


তবে সনাতন ভারতের সন্ন্যাসীদের প্রথানুযায়ী এই সব সাধকের দল নিজেদের জাগ্রত করেছিলেন, তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন যে ইহজগতে মশামাছির কামড়, সর্পের গমন, বৃষ্টিভেজা শীতের রাত, কি গ্রীষ্মের খরতাপ অপেক্ষা নিকৃষ্টতর আরো বহু বিষয় আছে।


বুদ্ধ লোলুপতা জয় করেছিলেন, কাম, মোহজাল ছিন্ন করেছিলেন; বুদ্ধ সকলের কাছ থেকে অন্ন গ্রহণ করতেন; সে খাবার খারাপ হোক, ভাল হোক, যা আসত, যার কাছ থেকে আসত, সব তিনি গ্রহণ করতেন। ধনী কি দরিদ্র, উচ্চ কি নীচ, তিনি ভেদাভেদ করতেন না। ভিক্ষাপাত্র পূর্ণ হয়ে গেলে একক নির্জনতায় ফিরে আসতেন। সেখানে প্রার্থনা করতেন সর্বজীবের দুঃখ, জন্ম-মৃত্যু, মৃত্যু-পুনর্জন্ম, অজ্ঞান তমসায় লিপ্ত জগতের যুদ্ধের পরিত্রাণ, প্রাণীজগতের হত্যা, পিতার পুত্রকে তাড়না, শিশুর আরেক শিশুকে যাতনা, প্রেমিকের ছলনা, ডাকাতের হাতে সাধারণ মানুষের সর্বস্বহরণ, উন্মত্ত রক্তগৃধু মানুষের আরো রক্তপানের লালসা, সাধারণ মানুষের আত্মকৃত শ্মশানে উন্মত্ত ভ্রমণ, জগতজোড়া দুঃখ, এক ভয়ংকর পশু যেন কোথা থেকে ভয়ংকর অনন্ত আঁধারে প্রাণির পর প্রাণীকে ছুড়ে ফেলছে, এমন আঁধার, সেসবের থেকে পরিত্রাণের। কারণ যেইমাত্র অন্ধ জগতের কার্য কারণ হেতু উন্মাদ অজ্ঞতার অবসান হবে, সেই অবসান কল্পে অন-উন্মাদ, অন-অজ্ঞান রূপ প্রতিভাসিত হবে। যেন মনসরোবরে ডুব দিয়ে ভোরের শিশু স্বর্গে প্রবেশ করছে; সেই মন, যা পরম, সৎচিৎ, যেখান থেকে শূন্যতার বিকিরণ, একমেবাদ্বিতীয়ম, তন্মাত্র, সর্বগামী, একশো ভাগ মনসিজ, যার পরে এই স্বপ্নময় আঁধার যেন ছেয়ে আছে, যেখানে এই মায়াময় শরীর ক্ষণমাত্র উদয় হয়েই পুনরায় চিরকালের জন্য বিলীন হয়ে যায়।


হাজার হাজার সাধু সন্ন্যাসীর দল জাগ্রতজনকে অনুসরণ করে চললেন, তাঁরই পথে পথ তৈরী করলেন। শরতের শেষ পূর্ণিমা রাতে উন্মুক্ত আকাশের তলায় শত শত সাধুর মাঝে জাগ্রতজন আসন পাতলেন। তারপর জাগ্রতজন সেই নীরব জনতার দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেন,
“সাধুগণ, এই যে নিঃশব্দ, নীরবতা, এই সভা, প্রকৃত অর্থে যেন এক অন্তর্বীজ।
“তাই এই ভ্রাতৃসঙ্ঘ এ জগতে মহত্তম, সর্বজনশ্রদ্ধেয়।
“তাই, এই ভ্রাতৃসঙ্ঘ অতুলনীয়।
“তাই, এই ভ্রাতৃসঙ্ঘে মানুষ পিছন থেকে চলতে হলেও যোগদান করতে চাইবে।
“আমাদের এই সঙ্ঘে এমন অনেক সাধু আছেন, যাঁরা স্বয়ংসম্পূর্ণ, যাঁরা মায়ার অন্ত দর্শন করেছেন, যাঁরা মুক্তিপ্রাপ্ত হয়েছেন, নিজেদের মুক্ত করেছেন”
এই বলে বুদ্ধ তাঁর যে জাগ্রতজন তাঁর পূর্বজ, সর্বকালে সকল বুদ্ধের প্রতি, সর্বজগতের প্রতি তিনি মহাধরণী মন্ত্রের হৃদয় প্রার্থনা করলেন, অন্তহীন জন্ম-মৃত্যুর চক্র হতে মুক্তির প্রার্থনা, এইরূপ:
“ওং!
যিনি শক্তি ধারণ করে আছেন,
আপনার রত্নহস্ত উত্তোলন করুন,
শূন্যতায় নিয়ে আসুন তাকে
ধ্বংস করুন,
হে পালনকারী,
পালন করুন সর্বজীবকে
হে বিশুদ্ধকারী,
যারা আত্মবদ্ধ তাদের শুদ্ধ করুন,
তারা যেন যাতনাকে জয় করতে পারে
হে সম্পূর্ণ আলোকিতজন,
সর্বজীবকে আলোকিত করুন,
হে পরমজ্ঞানী পরমকৃপালু,
সর্বজীবকে মুক্ত করুন,
তাদের সকলকে বুদ্ধত্ব প্রদান করুন
তথাস্তু!”

(চলবে)

জেগে ওঠ – ৮: যশোধরা, রাহুল, ধরণীমন্ত্র
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments